কলকাতা শহরের বুকে সবুজের সমাহার—রাজারহাট নিউটাউনে অবস্থিত ইকো পার্কে এলে সত্যিই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতে হয়। ভারতের সবচেয়ে বড় পার্ক এই ইকো পার্ক বা প্রকৃতি তীর্থ। সারা বছর ঘোরার পাশাপাশি শীতকালে এই পার্ক সেজে ওঠে নানান মেলা আর পিকনিকের ভিড়ে। ইকো পার্ক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে সাধারণত সপ্তাহের শেষে মানুষ এখানে ভিড় জমায়। দেখবার এত জিনিস এখানে রয়েছে একদিনে কখনই তা শেষ করা যাবে না। ইকো পার্কে প্রবেশের জন্য মোট ছয়টি গেট রয়েছে। কোন গেট দিয়ে ঢুকলে ইকো পার্কে কী দেখবেন , তা বোঝবার সুবিধার্থে গেট নম্বর ধরে ধরে নিম্নে আলোচনা করা হল।
গেট নম্বর ১ থেকে ঢুকে ইকো পার্কে কী দেখবেন
গেট নম্বর ১-এর কাছে পার্কিং-এর জায়গা রয়েছে। মূলত চারচাকা গাড়ির পার্কিং জোন রয়েছে এখানে। তার পাশেই বসে বিভিন্ন মেলা। এই গেট দিয়ে ঢুকে ইকো পার্কে কী দেখবেন তা নিচে আলোচনা করা হল।
এক্সিবিশন এরিয়া | বিভিন্ন মেলা
১ নম্বর গেটের কাছে পার্কিং এরিয়ার পাশেই যে বিস্তীর্ণ সবুজ জায়গাটি রয়েছে সেখানে মূলত শীতকালে এবং বছরের বিশেষ কিছু সময়ে নানারকম মেলা আয়োজিত হয়ে থাকে। শীতকালে ইকো পার্ক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ করতে হলে অবশ্যই ইকো পার্কে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন মেলায় আপনাকে যেতে হবে। এই এক্সিবিশন এরিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় একটি মেলা হল হস্তশিল্পের মেলা। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার এমনকি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের হস্তশিল্পের নিদর্শন এই মেলায় খুঁজে পাওয়া যাবে। এখান থেকে পছন্দমতো শিল্পসামগ্রী পর্যটকেরা কিনতে পারেন।
জাপানীস ফরেস্ট
জাপানী বাগানের স্টাইলটিকে অনুসরণ করে প্রায় ৩.৫ একর জমি জুড়ে ইকো পার্কে একটি জাপানীস ফরেস্ট তৈরি করা হয়েছে। ইকো পার্ক তৈরির সময় এই স্থানে একটি বুদ্ধের ভাস্কর্য খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল৷ তখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, ‘মনাস্ট্রি ইন আ ফরেস্ট’ এই থিমের ওপর ভিত্তি করে এই বন তৈরি করা হবে। জাপানীরা প্রাকৃতিক উপাদানকেও ভগবান হিসেবে পুজো করে এবং তাঁদের বাগানকে তাঁরা ধ্যানের উপযুক্ত স্থান হিসেবে গড়ে তোলে। বৌদ্ধদর্শনের সঙ্গে তাঁদের সেই বাগান তৈরির রীতিনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ইকো পার্কের এই জাপানীস ফরেস্ট সেই নীতিকে অনুসরণ করেই তৈরি করবার চেষ্টা করা হয়েছে। এই ফরেস্টে এলে মনাস্ট্রির মৃদু ঘন্টার শব্দ, জলপ্রপাতের ধ্বনি অদ্ভুত এক প্রশান্তি এনে দেবে মনে। বিভিন্ন সুগন্ধি উদ্ভিদেরও সমাহার দেখা যায় এখানে। এছাড়াও ছোটবড় নানা আকারের বুদ্ধের ভাস্কর্য চোখে পড়বে। ফরেস্টের কেন্দ্রে প্যাগোডা ধরনের একটি মঠও রয়েছে। একটি জলাশয় রয়েছে এবং তার ওপরে রয়েছে সেতু। সেখানে এমন একটি খাওয়ার জায়গাও আছে যেখানে খাঁটি জাপানী খাবার পাওয়া যায়।
সবুজ সাথী আইল্যান্ড
ইকো পার্কের বিশাল লেকটির ঠিক মাঝখানে সাত একরের এই আইল্যান্ডটি অবস্থিত। এই দ্বীপটির মূল আকর্ষণ হল, এখানে অবস্থিত ২৮০০ বর্গমিটারের একটি গ্লাস হাউস অর্থাৎ কাচের বাড়ি ৷ তার ভিতর থেকে সমগ্র ইকো পার্কের একটি ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ পাওয়া যায়। এমনকি তাতে তিনটি ওপেন এয়ার ভিউয়িং গ্যালারিও রয়েছে। মূলত অফিসিয়াল বা কর্পোরেট ইভেন্টের জন্য এই বাড়িটি তৈরি করা হয়েছে।
রবি অরণ্য
ইকো পার্কের আরও একটি আকর্ষণীয় জিনিস হলো রবি অরণ্য। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে উল্লিখিত সমস্ত গাছপালা এই অরণ্যে দেখতে পাওয়া যাবে। মূলত শান্তিনিকেতন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে এই বিস্তীর্ণ অরণ্য প্রকৃতির নির্মাণ করা হয়েছে। শান্তিনিকেতনের পাঠভবনের কথা মাথায় রেখে একটি ঘন্টাঘরও এখানে তৈরি করা হয়েছে। এই রবি অরণ্যে আলপনা দেওয়া মাটির কুঁড়েঘরও দেখতে পাওয়া যাবে।
আইফেল টাওয়ার
প্যারিসের বিখ্যাত আইফেল টাওয়ারের অনুসরণে ইকো পার্কে তারই একটি অসাধারণ রেপ্লিকা তৈরি করা হয়েছে। এই রেপ্লিকা প্রায় ৫৫ মিটার লম্বা। এতে লিফটের বন্দোবস্তও আছে, যাতে করে পর্যটকেরা এই আইফেল টাওয়ারের চুড়তে উঠে যেতে পারেন। লিফটে করে উপরে উঠতে হলে মাথাপিছু ৩০ টাকা মূল্যের টিকিট কাটতে হবে। আইফেল টাওয়ারের উপর থেকে ইকো পার্কের যে দৃশ্য চোখে পড়ে তা অসাধারণ।
গেট নম্বর ২ থেকে ঢুকে ইকো পার্কে কী দেখবেন
ঝিল | ইকো পার্কের পিকনিক স্পট

ইকো পার্ক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এই ঝিলে না এলে অসম্পূর্ণ। বলা হয় এটি ইকো পার্কের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। ইকো পার্কের মধ্যে প্রায় ৪২ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত যে বিশাল জলাশয় বা ঝিলটি রয়েছে তা এই ২ নম্বর গেট দিয়ে ঢুকলেই দেখতে পাওয়া যাবে। সবুজ ঘাসের গালিচার ওপর ঝিলের ধারে বসে অনায়াসে সময় কেটে যায় এছাড়াও ইকো পার্ক কলকাতার জনপ্রিয় পিকনিক স্পটের মধ্যে অন্যতম। ইকো পার্কের এই ঝিলপাড় পিকনিকের জন্য উপযুক্ত, তবে এখানে রান্না করার অনুমতি নেই। বাইরে থেকে খাবার নিয়ে নতুবা ভিতরের ফুড কোর্ট থেকে খাবার কিনে খেতে হবে। দিনের শেষে ঝিলের অপর পাড়ে সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্যটিও মনোমুগ্ধকর। এছাড়াও ঝিলে বোটিং করারও সুযোগ রয়েছে। একেকরকম বোটিং-এর জন্য নির্দিষ্ট মূল্যের টিকিট কেটে বোটিং করা যায়।
গোলাপ বাগান
ইকো পার্কের ২ নম্বর গেটের কাছে অবস্থিত এই গোলাপ বাগানটি দেখবার মতো জায়গা। মুঘল যুগে প্রাসাদের অন্দরমহলে যেমন রাণীর খাস গোলাপ বাগান থাকত, অনেকটা তেমন মনে হতে পারে। এই গোলাপ বাগানে মোট ৯৬টি জাতের গোলাপ রয়েছে৷ এগুলির মধ্যে কালো রঙের গোলাপটি অসাধারণ সুন্দর। কালো নয়, আসলে এটি খুব ডিপ লাল রঙের দেখতে হয়। এই গোলাপ বাগানের সামনেটা ছবি তোলার জন্য বেশ উপযুক্ত এক জায়গা। ফুলপ্রেমীদের জন্য এ-যেন স্বর্গ।
ফলের বাগান
ইকো পার্কে ফলের বাগানেরও দেখা মিলবে। বিবিধ রকমের ফলের গাছ একত্রে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেখানে। সারা বাংলার বিভিন্ন রকম প্রজাতির ফলগাছ এখানে দেখা যাবে এবং সেসম্পর্কে জ্ঞান আহরণও করা যাবে। ইকো সিস্টেম এবং সবুজের গুরুত্ব সম্পর্কে শিশুদের শিক্ষিত করে তোলবার জন্য এই স্থানটি আদর্শ। প্রায় ১৬২ রকমের ফলগাছ রয়েছে এই বাগানে। খুব সুন্দর পাখিদেরও দেখা মিলবে এখানে। শান্ত ও নির্জন এক পরিবেশ সেখানে বিরাজমান।
বাঁশ বাগান
২ নম্বর গেট দিয়ে ইকো পার্কে ঢুকলে বাঁশ বাগানেরও দেখা মিলবে, যা একেবারেই গ্রাম্য এক পরিবেশের মধ্যে পর্যটকদের নিয়ে যাবে। সেই বাঁশ বাগানে বিভিন্ন আকারের বাঁশ গাছ, বাঁশের অঙ্কুর এমনকি ছোট ছোট ঘাসও চোখে পড়ে। গোল্ডেন বাঁশ, কালো বাঁশ, ঘোটি বাঁশ ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের বাঁশ গাছ এখানে দেখা যায়।
হার্বাল গার্ডেন
২ নম্বর গেটের কাছেই হার্বাল গার্ডেনের দেখা মিলবে৷ এই ভেষজ উদ্ভিদের বাগানটিও শিক্ষার ক্ষেত্রে খুবই কার্যকরী। এই বাগানে ১৪৬ রকম ভেষজ উদ্ভিদের দেখা মিলবে। যাঁরা আয়ুর্বেদিক শিক্ষার ছাত্র এবং গবেষক তাঁদের জন্য এই হার্বাল গার্ডেন খুবই প্রয়োজনীয় হতে পারে। এমনকি অনেক গবেষক এই ভেষজ উদ্ভিদের বাগানে তাঁদের গবেষণার জন্য পর্যবেক্ষণের কাজও করেন।
বেঙ্গল ভিলেজ বা বাংলার গ্রাম
৩ একর জমি জুড়ে ইকো পার্কে বাংলার গ্রামের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ নির্মাণ করা হয়েছে। শহুরে মানুষদের গ্রাম-বাংলার পরিবেশের সঙ্গে পরিচয় করানোই এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য। এখানে কুঁড়েঘর, পালকি, চন্ডীমন্ডপ, গ্রামের বাজার সবকিছুই নিখুঁতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। এই গ্রামটিতে প্রবেশের জন্য মাথাপিছু ১০টাকা করে টিকিট মূল্য লাগবে।
ওয়াইল্ড ফ্লাওয়ার মেডো ও ফর্মাল গার্ডেন
এই দুটি এলাকায় প্রচুর বন্যফুল এবং বাগানের শোভা উপভোগ করা যায়। তৃণভূমি এবং বাগানের মধ্যে দিয়ে দারুণ হাঁটাহাঁটি করা যায়। এই ফর্মাল গার্ডেনে বোগেনভিলিয়া থেকে পাম গাছ—এমনই নানারকম গাছের সমাহার লক্ষ করা যায়। এই ফর্মাল গার্ডেনটি এমনকি ইভেন্টের জন্যেও ভাড়া নেওয়া যায়।
গেট নম্বর ৩ থেকে ঢুকে ইকো পার্কে কী দেখবেন
৩ নম্বর গেটের কাছে দুচাকার গাড়ির জন্য রয়েছে পার্কিং এরিয়া। এই গেট দিয়ে ঢুকে ইকো পার্কে কী দেখবেন তা নিচে আলোচনা করা হল।
মাস্ক গার্ডেন

মাস্ক গার্ডেন একটি দেখবার মতো জায়গা। সারা বিশ্বের বিভিন্ন ধরনের মুখোশ দিয়ে এই বাগানটির পরিকল্পনা করা হয়েছে। উত্তরদিকের পার্কিং লটের কাছে এই মাস্ক গার্ডেনটি দেখতে পাওয়া যায়। সেই মুখোশগুলি থেকে বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি হতে পারে।
স্কাল্পচার গার্ডেন
পাথরের ভাস্কর্য দ্বারা এই থিম গার্ডেনটি সজ্জিত। এখানে এমনকি উনিশ ও বিশ শতক এমনকি আরও আগের বিভিন্ন কিংবদন্তি মানুষ, যথা, শ্রীচৈতন্যদেব, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, সত্যজিৎ রায় প্রমুখের ভাস্কর্য চোখে পড়বে। এমনকি পলাশির যুদ্ধের মতো বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাকেও ভাস্কর্যের সাহায্যে তুলে ধরা হয়েছে এখানে। ভাস্কর্যের পাশাপাশি এখানে আকর্ষণীয় মুরাল চোখে পড়বে। এই স্কাল্পচার গার্ডেনে আবার একটি লাইট অ্যান্ড শো-ও প্রদর্শিত হয়।
চা বাগান
ইকো পার্কে কী দেখবেন এই তালিকায় আরেকটি দেখবার মতো জিনিস হল মডেল চা বাগান। অ্যান্ড্রু ইউল অ্যান্ড কোম্পানি এই চা বাগানটি ডিজাইন করেছিল। কথিত আছে যে, ডিজাইনাররা উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স অঞ্চল থেকে ৪০টি ট্রাকে করে মাটি এনেছিলেন। এর কারণ, ডুয়ার্সের মাটি চা গাছের দ্রুত বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দার্জিলিং-এর সুগন্ধি চা বাগানের অভিজ্ঞতা এখানে পাওয়া যাবে। এছাড়াও এখানকার টি লাউঞ্জে খাঁটি দার্জিলিং চায়ের স্বাদ গ্রহণেরও সুযোগ রয়েছে।
চিলড্রেনস পার্ক
ইকো পার্কের ২.৪৭ একর জমি জুড়ে শিশুদের জন্য একটি চিলড্রেনস পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। এখানে শিশুদের আনন্দ উপভোগের জন্য বিনোদনের নানারকম বন্দোবস্ত রয়েছে। এই পার্কের মধ্যেই রয়েছে একটি ঝর্ণা, সুন্দর সব ভাস্কর্য যা সহজেই শিশুদের মন কাড়ে এবং রয়েছে দোলনা, স্লাইডিং-এর মতো নানারকম খেলার উপাদান। একটি সুদৃশ্য বাগানের মতো পরিবেশে এই পার্কটিতে শিশুরা যেমন খেলতে পারবে তেমনি খেলতে খেলতেই বিবিধ শিক্ষার অভিজ্ঞতাও হবে তাদের।
ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্ট
আমাজনের সুবিখ্যাত ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্টের অনুসরণে ইকো পার্কে একটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রেইন ফরেস্ট নির্মাণ করা হয়েছে। এত ঘন গাছের সমাহার এখানে যে, এই অরণ্যের মধ্যে দিয়ে হাঁটার সময় মনে হতে পারে যে আপনি কুয়াশার মধ্যে দিয়ে হাঁটছেন। এই রেইন ফরেস্টে শিমুল, পলাশ, চালতা, কাঠবাদাম, ছাতিম, কদমের মতো আরও বিবিধ রকম গাছের দেখা মিলবে। আমাজনের কথা মাথায় রেখেই এই রেইন ফরেস্টের মধ্যে হরিণ-সহ আরও কিছু জীবজন্তুর মূর্তি বসানো রয়েছে।
আর্টিস্ট কটেজ, আড্ডা জোন, মিউজিক্যাল শো
মূলত সৃষ্টিশীল মানুষদের কথা মাথায় রেখেই এই আর্টিস্ট কটেজের নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে এমনই এক পরিবেশ রয়েছে যাতে শান্তিতে বসে শিল্পীরা তাঁদের কাজ করতে পারেন। এই আর্টিস্ট কটেজের পিছনে রয়েছে একটি গোলাপ বাগান। এই আর্টিস্ট কটেজের ঠিক বিপরীতদিকে আড্ডা জোনের অবস্থান। এখানে পাশাপাশি বসে আড্ডা মারবার জন্য সারিবদ্ধ বেঞ্চ রয়েছে। বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটনোর জন্য এই জায়গাটি উপযুক্ত। ঝিলে সন্ধেবেলায় যে মিউজিক্যাল ফোয়ারার বন্দোবস্ত রয়েছে এখান থেকে তা দেখা যায়। ভারতের প্রথম এই ভাসমান থিয়েটারে ৩০ ফুট উঁচু জলের ঝর্ণার ওপর রঙবেরঙের আলোর আভা যে দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য তৈরি করে তা সত্যিই খুবই উপভোগ্য। এখানে উল্লেখ্য যে, এই মিউজিক্যাল শো ইকো পার্কের যে-কোনো কোণ থেকেই দেখা যায়।
গেট নম্বর ৪ থেকে ঢুকে ইকো পার্কে কী দেখবেন
৪নং গেটের সামনে চারচাকা গাড়ির জন্য পার্কিংয়ের জায়গা রয়েছে। ৪নং গেটটি খুবই জনপ্রিয় কারণ এর মধ্যে দিয়ে প্রবেশ করলেই সপ্তম আশ্চর্যের রেপ্লিকা সামনেই দেখতে পাওয়া যাবে। সপ্তম আশ্চর্য-সহ আরও যে-কয়েকটি জিনিস দেখা যাবে তা নিচে আলোচনা করা হল।
সপ্তম আশ্চর্যের রেপ্লিকা
ইকো পার্কের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ হল বিশ্বের সাতটি আশ্চর্যের রেপ্লিকা। ইকো পার্ক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ করতে হলে অবশ্যই এই সপ্তম আশ্চর্য ঘুরে দেখতে হবে। কলোসিয়াম, তাজমহল, দ্য গ্রেট ওয়াল অফ চায়না, ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার, সিটি অফ পেট্রা, স্ফিংস এবং মিশরের পিরামিড—বিশ্বের এই সাতটি আশ্চর্যকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে শিল্পীরা ফুটিয়ে তুলেছেন এখানে। এইসব প্রতিলিপিগুলির মধ্যে প্রবেশ করে দারুণ ছবি তোলাও যাবে। নিঃসন্দেহে এই সপ্তম আশ্চর্য ইকো পার্কের শোভা ও আকর্ষণ আরও বৃদ্ধি করেছে। এখানে প্রবেশের জন্য আলাদা টিকিট কেটে ঢুকতে হয়।
ফর্মাল গার্ডেন ২
সমতল জায়গায় উল্লম্বভাবে বাগান করবার ধারণা থেকেই এই ফর্মাল গার্ডেনটি তৈরি করা হয়েছে। বাড়িতে কীভাবে বাগান তৈরি করা যেতে পারে, দর্শনার্থীরা এই বাগানটি থেকে সে-সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন।
গেট নম্বর ৫ থেকে ঢুকে ইকো পার্কে কী দেখবেন
বিশ্ব বাংলা হাট
ইকো পার্কে ৫ নম্বর গেট দিয়ে ঢুকলেই পাওয়া যাবে বিশ্ব বাংলা হাট। সেখানে নানারকম হস্তশিল্পের প্রদর্শন এবং বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। শিল্পমনস্ক মানুষের পিপাসা মেটাতে পারে এই হাট। সারা বাংলার ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্পের নিদর্শন এখানে খুঁজে পাওয়া যাবে। ইচ্ছে করলে মনমতো শিল্পসামগ্রী পর্যটকেরা এখান থেকে কিনতে পারেন। আরবান এবং রুরাল, মোট দুটি জোন রয়েছে এই হাটের। এছাড়াও এখানে রয়েছে বেঙ্গল হ্যান্ডিক্রাফটস মিউজিয়াম, বাদ্যযন্ত্রের প্রদর্শনশালা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য রয়েছে অডিটোরিয়াম, রয়েছে সুদৃশ্য বাগান, এমনকি ভিআইপি রেস্ট রুম এবং লাউঞ্জেরও বন্দোবস্ত রয়েছে এখানে।
পাখিবিতান
যাঁরা পাখিপ্রেমী এবং পাখি পর্যবেক্ষক তাঁদের জন্য ইকো পার্কের এই পাখিবিতান একটি উপযুক্ত জায়গা। পাখিদের জন্য নির্মিত এই সুদৃশ্য অভয়ারণ্যে পাখিদের যত্নসহকারে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়ে থাকে। বিচিত্ররকম পাখির কলতানে এই স্থানটি সদাই মুখর।
গেট নম্বর ৬ থেকে ঢুকে ইকো পার্কে কী দেখবেন
অ্যাম্পিথিয়েটার
কংক্রিট দিয়ে বাঁধানো বিরাট স্টেডিয়ামের মতো বসবার জায়গা একদিকে, অন্যদিকে অর্ধবৃত্তাকার উঁচু একটি মঞ্চ—এটিই হল ইকো পার্কের অ্যাম্পিথিয়েটার। আনুমানিক ১০০০ জনের বসবার বন্দোবস্ত এখানে হতে পারে। মঞ্চ সংলগ্ন যে গ্রীনরুম, তার নকশাটি এমন মনে হয়, তা যেন জলের ওপর ভাসমান৷ এখানে আবার একটি ফুড গ্যালারিও রয়েছে। যে-কোনো ইভেন্টের জন্য এই অ্যাম্পিথিয়েটার ভাড়া নেওয়া যায়।
ডিয়ার পার্ক বা হরিণালয়
ইকো পার্কের আরেকটি আকর্ষণীয় জিনিস হল ডিয়ার পার্ক বা হরিণালয়। প্রায় ১২.৫ একর জমি নিয়ে হরিণদের এই আবাস তৈরি করা হয়েছে। এখানে বিশ্বের সবচেয়ে অহিংস প্রাণী স্পটেড ডিয়ার, এমনকি বার্কিং ডিয়ারও দেখতে পাওয়া যাবে। এই হরিণালয়টি কিন্তু আদতে চিড়িয়াখানার অধীনস্থ।
বাটারফ্লাই গার্ডেন
ইকো পার্ক আসলে প্রকৃতি তীর্থ। খুব কাছ থেকে প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে হলে ইকো পার্কের বাগানগুলিতে অবশ্যই ঘুরতে হবে৷ তেমনই একটি বাগান হল বাটারফ্লাই গার্ডেন। বিচিত্র রকমের গাছপালার সমাহার এখানে এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল রঙবেরঙের বাহারি প্রজাপতির মেলা। প্রচুর পরিমাণ গাছপালা প্রজাপতিদের বেঁচে থাকা ও বিকাশের জন্য তাপমাত্রা এবং যথাযথ পরিবেশ বজায় রাখতে সাহায্য করে।
গল্ফ কোর্স
ইকো পার্কের এই গল্ফ কোর্সটি বিনোদনের চমৎকার একটি জায়গা। গল্ফ ডিজাইন ইন্ডিয়া ইকো পার্কে এই ১৫০০ ইয়ার্ডের ৯টি হোলযুক্ত গল্ফ কোর্সটিকে পেশাদারীভাবে ডিজাইন করেছিল। ইকো পার্কের ২০ একর জমি নিয়ে এই গল্ফ কোর্সটি তৈরি করা হয়েছিল। এখানে নিয়মিত গল্ফ খেলবার জন্য একটি বার্ষিক মেম্বারশিপ নেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। সরকার বিদেশী প্রতিনিধি, মূলত শিল্পপতিদের আকৃষ্ট করার জন্যেও এই গল্ফ কোর্স নির্মাণের প্রজেক্টটি নিয়েছিল৷ ২০১৭ সালে এই গল্ফ কোর্সটির উদ্বোধন করা হয়।
হেলিকোনিয়া গার্ডেন
এই হেলিকোনিয়া আবার ফলস বার্ড অব প্যারাডাইজ নামেও পরিচিত। বিভিন্নধরনের হেলিকোনিয়া ফুল ফোটবার জন্য ছায়ার প্রয়োজন হয়, তাই এই বাগানের মধ্যে মাঝেমাঝেই চোখে বিরাট গম্বুজের মতো শেড তৈরি করা, যার মধ্যে বায়ুমন্ডলটি এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় যা, সূর্যালোকের তীব্রতা কমিয়ে ফুল ফুটতে সহায়তা করে। এই ফুল সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৫,০০০ ফুট উপরে জন্মায়। এছাড়াও এই বাগানে ক্যাকটাস হাউস, অর্কিড হাউস, কাঠের সেতু, ঝর্ণা ইত্যাদিও দেখতে পাওয়া যাবে৷
এগুলি ছাড়াও ইকো পার্কে আরেকটি যে, দারুণ শিল্পকর্ম চোখে পড়বে তা হল, গ্রাফিত্তি করা দেওয়াল। ইকো পার্কে প্রকৃতি এবং শিল্পের অপূর্ব এক মেলবন্ধন দেখতে পাওয়া যায়। সপ্তম আশ্চর্য, স্কাল্পচার গার্ডেন ইত্যাদি তো রয়েছেই, এছাড়াও এখানে যোগেন চৌধুরী এবং শুভাপ্রসন্নের মতো দুই বড় শিল্পীর করা দেওয়ালজোড়া গ্রাফিত্তি দেখতে পাওয়া যায়। ইকো পার্কের পার্কিং লটের দক্ষিণ দিকের দেওয়ালে এই অসাধারণ গ্রাফিত্তির কাজ দেখতে পাওয়া যাবে।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৫
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান