ইতিহাস

অ্যাডলফ স্যাক্স

অ্যাডলফ স্যাক্স (Adolphe Sax) বেলজিয়ামের একজন বিখ্যাত বাদ্যযন্ত্র আবিষ্কারক এবং বাদ্যশিল্পী যিনি প্রথম স্যাক্সোফোন আবিষ্কার করে বিশ্বের সঙ্গীতের ইতিহাসে এক মাইলফলক হয়ে আছেন। তিনি মূলত বাঁশি এবং সানাইবাদক ছিলেন। উনবিংশ শতাব্দীতে তাঁর এই আবিষ্কার জীবৎকালে তাঁকে স্বীকৃতি না দিলেও, মৃত্যুর পরে ‘জ্যাজ্‌’ (Jazz) ঘরানার সঙ্গীতশিল্পীদের কাছে তিনি প্রভূত সমাদৃত হন। বিখ্যাত চিত্রশিল্পী জোয়াকিম প্যাটনিয়ার (Joachim patenier)-এর পাশাপাশি বেলজিয়ামের দিনাঁ (Dinant) শহর  অ্যাডলফ স্যাক্সের স্মৃতিও বহন করে চলেছে আজ।  

১৮১৪ সালের ৬ নভেম্বর বেলজিয়ামের দিনাঁ শহরে অ্যাডলফ স্যাক্সের জন্ম হয়। সেসময় ঐ শহরটি ফ্রান্সের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাঁর আসল নাম অ্যাণ্টনি জোসেফ স্যাক্স (Antoine Joseph Sax)। বাবা চার্লস জোসেফ স্যাক্স এবং মা মেরি জোসেফ ম্যাসন-এর এগারোটি সন্তানের মধ্যে সবার বড়ো ছিলেন  অ্যাডলফ স্যাক্স। যদিও তাঁর ছয় ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে চারজন বেঁচে ছিলেন। বাকিরা খুবই অল্প বয়সে মারা যান। তাঁর শৈশবকাল খুব একটা স্থিতিশীল ছিল না। কখনো তিনতলা সমান উঁচু ছাদ থেকে পড়ে মাথায় আঘাত পাওয়া, কখনো লোহা গলানোর গরম কড়াইতে পড়ে গিয়ে এক পাশ পুড়িয়ে ফেলা কিংবা নদীতে ডুবে গিয়ে মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে এসেছেন। তাঁর মা তাই তাঁকে ‘এক দূর্ভাগা শিশু’ বলতেন আর পাড়া-প্রতিবেশিরা সকলে ‘ছোটো ভূত’ বলে ডাকতেন। তাঁর বাবা চার্লস জোসেফ স্যাক্স ছিলেন মূলত একজন ক্যাবিনেট-নির্মাতা যিনি একটি ডাচ আর্মি ব্যাণ্ডের জন্য বাদ্যযন্ত্র তৈরি করে সরবরাহ করতেন। তাঁর বাবার একটি বাদ্যযন্ত্র তৈরির কারখানাও ছিল ব্রাসেলসে। শৈশবে হেসে-খেলে কাটানোর বয়সে অ্যাডলফ স্যাক্স তাঁর বাবার কারখানায় দিনাঁ-র একজন শিক্ষক এবং তাঁর এক কাকার সাহায্যে সহজেই বাদ্যযন্ত্র নির্মাণের কৌশল রপ্ত করে ফেলেন। ছেলের মধ্যে উদ্ভাবনী শক্তির স্ফূরণ দেখে চার্লস জোসেফ স্যাক্স  অ্যাডলফকে তাঁর কর্মশালায় শিক্ষানবিশ হিসেবে নিয়োগ করেন। 

প্রথাগত পড়াশোনার বাইরে  অ্যাডলফ স্যাক্স তাঁর সঙ্গীতবিষয়ক পড়াশোনা শুরু করেন ১৮২৮ সালে ব্রাসেলসের ‘রয়্যাল স্কুল অফ মিউজিক’ থেকে। এই পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ক্ল্যারিওনেট বাজানোও শিখতে থাকেন। ‘বাস ক্ল্যারিওনেট’ (Bass Clarionet) নিয়ে তিনি বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ২৪টি ভালভ্‌যুক্ত একটি সিস্টেম তৈরি করেন। এটি ১৮৩৫ সালে ব্রাসেলসের একটি শিল্প-প্রদর্শনীতে প্রদর্শন করান তিনি এবং পরে এর জন্য পেটেন্ট পান। ১৮৪০ সাল নাগাদ তিনি ন’টি আরো নতুন বাদ্যযন্ত্র আবিষ্কার করেন যার মধ্যে ছিল একটি ‘অর্গ্যান’ (Organ), একটি ‘পিয়ানো-টিউনিং প্রসেস’ এবং একটি ‘শব্দ-প্রতিফলক পর্দা’ (Sound Reflection Screen)। এই বছরই বেলজিয়ামের একটি প্রদর্শনীতে তিনি এই নয়টি আবিষ্কার প্রদর্শন করেন কিন্তু শুধুমাত্র বয়স কম হওয়ার অছিলায় তাঁকে প্রথম স্থানাধিকারীর পদক দেওয়া হয়নি। ১৮৪১ সালে আরেকটি শিল্প-প্রদর্শনীতে  অ্যাডলফ স্যাক্স তাঁর উদ্ভাবিত আরেকটি নতুন বাদ্যযন্ত্র প্রথমবার প্রদর্শন করেন আর সেটিই ছিল বিখ্যাত ‘স্যাক্সোফোন’। লেফটেন্যান্ট জেনারেল কাউন্ট-ডি-রুমিগ্‌নি তাঁকে প্রস্তাব দেন ফরাসি সৈন্যবাহিনীর জন্য আরো ভালো বাদ্যযন্ত্র প্রস্তুত করে দিতে। তার কথাতেই  অ্যাডলফ সেসময়কার ইউরোপের সঙ্গীতের স্বর্গ প্যারিসে যাবার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে ওঠেন। প্যারিস ছিল সেসময় ইউরোপের সঙ্গীতের রাজধানী। সেইমতো ১৮৪২ সালে তিনি প্যারিসে পাড়ি দেন এবং সেখানে রিউ সেন্ট জর্জেস-এ একটি সামান্য আশ্রয়ে থাকতে শুরু করেন। নিজের কোম্পানি তৈরি করে প্রভূত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য তাঁকে এক পরিচিত সঙ্গীতশিল্পীর কাছ থেকে টাকা ধার করতে হয়েছিল। এই সময়েই তাঁর জীবন সম্পূর্ণ মোড় বদল করে যখন প্যারিসে ফ্রোমেন্টাল হ্যালভি (Fromental Halevey) অ্যাডলফের সঙ্গে হেক্টর বার্লিওজ্‌-এর (Hector Berlioz) পরিচয় করিয়ে দেন। হেক্টর বার্লিওজ্‌ ছিলেন ফ্রান্সের সবথেকে বিতর্কিত এক সুরকার এবং প্যারিসের পত্রিকা ‘জার্নাল-ডি-ডিবেট্‌স’ (Journal-Des-Debates)-এর বিখ্যাত সঙ্গীত সমালোচক। এর কিছুদিন পরেই ১২ জুন ১৮৪২-এ ‘জার্নাল-ডি-ডিবেট্‌স’ পত্রিকায় অ্যাডলফ নির্মিত স্যাক্সোফোন বাদ্য যন্ত্রটির শ্রুতিমাধুর্য্যের সমূহ প্রশংসা করেন বার্লিওজ্‌। স্যাক্সের কাছে এটি ছিল তাঁর জীবনের আনন্দময় সূচনা। সেই থেকেই বহু বিখ্যাত সুরকার, সঙ্গীত পরিচালকের সামনে তিনি নিজের বাদ্যযন্ত্র উপস্থাপন করেছেন, বহু সালোঁ-তে (Salon), বহু কর্মশালায়, প্রেক্ষাগৃহে অসংখ্যবার নিজের আবিষ্কারগুলির উপস্থাপন করেছেন। প্যারিসে স্যাক্স ধীরে ধীরে পরিচিত হতে থাকেন।

 অ্যাডলফ স্যাক্স তাঁর নিজের নামে চারটি প্রধান বাদ্যযন্ত্রের নামকরণ করেছিলেন, ‘স্যাক্সোফোন’ (Saxophone) ছাড়াও সেই তালিকায় ছিল ‘স্যাক্সহর্নস’ ( Saxhorns), ‘স্যাক্সট্রম্বোন্স্‌’ (Saxtrombones) এবং ‘স্যাক্সটুবাস’ (Saxtubas)। তিনিই ছিলেন প্রথম বাদ্যযন্ত্র-প্রস্তুতকারক যিনি শুধু নির্দিষ্ট একটি নয়, একই বর্গের একাধিক বাদ্যযন্ত্রের উপর আগ্রহী ছিলেন। কনসার্ট এবং অর্কেস্ট্রায় বাজানোর উপযোগী এই স্যাক্সোফোন যন্ত্রটিরই সাতরকম প্রকার রয়েছে – ‘সোপ্রানিনো’ (Sopranino), ‘সোপ্রানো’ (Soprano), ‘অল্টো’ (Alto), ‘টেনর’ (Tenor), ‘ব্যারিটোন’ (Barritone), ‘বাস’ (Bass) ও ‘ডবল বাস’ (Double Bass)। পিতলের তৈরি এই পরাবৃত্তাকার শঙ্কুজাতীয় (Parabolic Cone) বাদ্যযন্ত্রটির রিড চেপে ফুঁ দেওয়ামাত্রই গভীর, দূরগামী মধুর সুর উৎপন্ন হয়। ১৮৪৬ সালের ২১ মার্চ তিনি স্যাক্সোফোনের পেটেন্ট পান। যদিও এরপর নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর বিরোধী এবং প্রতিদ্বন্দ্বীরা একজোট হয়ে প্রচার করে তাঁর নির্মিত যন্ত্রগুলি সুরকাররা আর ব্যবহার করতে চান না এই মর্মে। সংবাদপত্রে তাঁর নামে বিরূপ বিতর্কিত নিবন্ধ প্রকাশ পেতে থাকে। এমনকি বাদ্যযন্ত্রগুলি থেকে স্যাক্সের নিজস্ব সীলমোহর তুলে দিয়ে সেগুলো রফতানি করে পুনরায় অন্য সীলমোহর লাগিয়ে ফ্রান্সে আমদানি করে আদালতের কাছে তাঁর পেটেন্ট প্রত্যাহার করার মামলা রুজু করা হয়। এই মামলা চালাতে গিয়ে পরপর তিনবার ১৮৫২, ১৮৭৩ এবং ১৮৭৭-এ তিনি নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করেন। কিন্তু অবশেষে  অ্যাডলফই মামলায় জয়ী হন। সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন ছিলেন স্যাক্সের একজন গুণমুগ্ধ যিনি অভাবিতভাবে চতুর্থবার দেউলিয়া হওয়া থেকে তাঁকে বাঁচান। এই স্যাক্সোফোন নির্মাণের জন্যই ১৮৫৭ সালে তিনি প্যারিস সঙ্গীত বিদ্যালয়ে চাকরি পান। ১৮৪৩ থেকে ১৮৬০ এর মধ্যে তাঁর পেটেন্ট নেওয়া প্রায় ২০ হাজার বাদ্যযন্ত্র বিক্রি হয় সমগ্র ফ্রান্স জুড়ে। তার মধ্যে সবথেকে সফল যন্ত্রটি ছিল স্যাক্সহর্ন। ব্রিটিশ বাঁশি নির্মাতারা এই স্যাক্সহর্ণের অনুকরণ করতে শুরু করলে স্যাক্সহর্ন বাজার ছেয়ে ফেলে। ১৮৫৪-তে ‘জেডফরেস্ট ইন্সট্রুমেন্টাল ব্যাণ্ড’ এবং ১৮৫৫-তে ‘হাউইক স্যাক্সহর্ন ব্যাণ্ড’ তৈরি হলে স্কটল্যাণ্ডে এবং ইউরোপে স্যাক্সহর্ন-এর মডেলটি সহজলভ্য হয়।  

১৮৫৮ থেকে ১৮৭০ সাল পর্যন্ত  অ্যাডলফ স্যাক্স ফ্রান্সে আউবার (Auber) পরিচালিত ‘প্যারিস কনজারভেটরি’-র সেনাদলের সুরকারদের শিক্ষকরূপেও বহাল হন। বিশ্ব সঙ্গীতের ইতিহাসে  অ্যাডলফ স্যাক্স স্মরণীয় হয়ে থাকবেন আরো বেশ কিছু কারণে। যেমন – বাদ্যযন্ত্র নির্মাণের পাশাপাশি তাদের নোটেশন তৈরি, অর্কেস্ট্রা পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করা, কনসার্ট হলের একাউস্টিক তথা শব্দ-প্রক্ষেপন ব্যবস্থায় নতুনত্ব আরোপ, পিতল ও কাঠ নির্মিত বায়ুচালিত যন্ত্রগুলির পরিমার্জন করা ইত্যাদি আরো কত কি! তাঁর স্যাক্সোফোন প্রথমদিকে অভিজ্ঞ সুরকারদের প্রশংসা না পেলেও ধীরে ধীরে বিশ্বে পরিচিত হয়ে ওঠে এই বাদ্যটি। ‘জ্যাজ্‌’ সঙ্গীতধারায় এরপরে স্যাক্সোফোন একটি আবশ্যিক বাদ্যযন্ত্রের মর্যাদা লাভ করে। জীবৎকালে  অ্যাডলফ স্যাক্স বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। ১৮৪৯ সালে ‘লিজিয়ন অফ অনার’-এর ঈর্ষনীয় সম্মান লাভ করেন স্যাক্স। তাঁর মৃত্যুর পরে ১৯৯৫ সালে বেলজিয়ামে  অ্যাডলফ স্যাক্সের ছবি ছাপা হতে থাকে সেখানকার ২০০ ফ্রাঙ্কের নোটের উপর। ২০১৫ সালে গুগল ডুড্‌ল তাঁর ২০১তম জন্মদিনে তাঁকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছে। এমনকি দিনাঁ-র যে বাড়িটিতে  অ্যাডলফ থাকতেন সেটি একটি হেরিটেজে পরিণত হয়েছে। ১৯৯৪ সালের জানুয়ারি মাসে  অ্যাডলফ স্যাক্সের মৃত্যুর শতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘আন্তর্জাতিক  অ্যাডলফ স্যাক্স অ্যাসোসিয়েশন’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি তথা বিখ্যাত স্যাক্সোফোনবাদক বিল ক্লিন্টনকে একটি টেনর স্যাক্সোফোন উপহার দেয় যখন তিনি ব্রাসেলসে এসেছিলেন।

১৮৯৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ঠোঁটের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ রোগভোগের পর অত্যন্ত দারিদ্র্যের মধ্যে  অ্যাডলফ স্যাক্সের মৃত্যু হয়।             

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন