সববাংলায়

আলেকজান্ডার মৃত্যুরহস্য

বিভাগঃ ,

ইতিহাসে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট-এর নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত। তাঁর নামের সঙ্গে পরিচিত নয়, এমন শিক্ষিত মানুষ হয়তো কমই পাওয়া যাবে। মাত্র ৩২ বছর বয়সে তিনি বলকান থেকে আধুনিক পাকিস্তান পর্যন্ত একটি বিস্তৃত সাম্রাজ্য জয় করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই ৩২ বছর বয়সেই ৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রায় ১২ দিন নির্মম কষ্ট ভোগ করার পর আকস্মিকভাবেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। এই মৃত্যুর আসল কারণ কী ছিল তা নিয়ে নানারকম বিতর্ক দানা বেঁধে উঠেছিল। কেউ বলেছেন টাইফয়েড, কেউ আবার ম্যালেরিয়ার কথা বলেছেন, এমনকি আলেকজান্ডারকে বিষ দিয়ে হত্যা করবার তত্ত্বও তুলে ধরেছেন কেউ কেউ। এতসব অনুমান, জল্পনা-কল্পনা সরিয়ে আজও নিশ্চিতভাবে আলেকজান্ডার মৃত্যুরহস্য (Alexander Death Mystery)সমাধান করতে পারেননি ঐতিহাসিক এবং গবেষকরা। আলেকজান্ডারের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্থাপিত তত্ত্বগুলির দিকেই দৃকপাত করা যাক।

ব্যাবিলনীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ডায়েরি অনুসারে ৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ১০ জুন সন্ধ্যা থেকে ১১ জুন সন্ধ্যার মধ্যে ব্যাবিলনের দ্বিতীয় নেবুকাডনেজারের প্রাসাদে মাত্র ৩২ বছর বয়সে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের মৃত্যু হয়েছিল। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী মৃত্যুর পর আলেকজান্ডারের দেহতে নাকি ছয়দিন পর্যন্ত কোন পচন ধরেনি। এই তথ্যের ভিত্তিতে অনেকে বলেন, আদতে মৃত্যু হওয়ার আগেই আলেকজান্ডারের তিরোধানের খবর ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছিল। উক্ত ছয়দিন আসলে আলেকজান্ডার জীবিত থাকলেও কোমায় আচ্ছন্ন ছিলেন।

অনেকের মতে, মৃত্যুর আগে প্রায় দুই সপ্তাহ প্রবল জ্বরে ভুগে কষ্ট পেয়েছিলেন আলেকজান্ডার। কেউ আবার বলেন আদতে কোন জ্বরই তাঁর হয়নি বরং কঠিন যন্ত্রণায় কষ্ট পেয়ে মৃত্যু হয় তাঁর। ম্যালেরিয়া, টাইফয়েডের পাশাপাশি নীলনদের সংক্রামক ভাইরাসের কথাও তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। এরই পাশাপাশি আবার হত্যার তত্ত্বটিও উঠে এসেছে সঙ্গতভাবেই। সাম্প্রতিককালেও আলেকজান্ডারের মৃত্যুর নেপথ্য কারণ হিসেবে একরকম রোগের কথা তুলে ধরেছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে জড়িত অধ্যাপক। ধাপে ধাপে আলেকজান্ডার মৃত্যুরহস্য নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্বের দিকে তাকানো যাক।

১৯৯৮ সালে আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের স্কুল অব মেডিসিনের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী আলেকজান্ডারের মৃত্যুর কারণ হিসেবে টাইফয়েডের উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাবিলনে সেসময় টাইফয়েড রোগেরও অস্তিত্ব ছিল। এছাড়াও মৃত্যুর আগে তাঁর যে নিদারুণ জ্বর, মাঝে মাঝে জ্বর কমে গিয়ে শরীর ঠান্ডা হয়ে আসা, ঘাম হওয়া ইত্যাদি উপসর্গগুলিও টাইফয়েডের লক্ষণগুলির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। যদিও এ থেকেই নিশ্চিত হওয়া যায় না যে টাইফয়েডই মৃত্যুর কারণ। কয়েকটি তথ্য আবার এই তত্ত্বের বিরূদ্ধাচারণ করে। টাইফয়েডের অন্যান্য কয়েকটি লক্ষণের মধ্যে রয়েছে কাশি, ডায়রিয়া, এপিস্ট্যাক্সিস, রক্তাক্ত মল ইত্যাদি, কিন্তু আলেকজান্ডারের মৃত্যু সম্পর্কিত প্লুটার্কের রচনায় এইসব লক্ষণের উল্লেখ ছিল না।

টাইফয়েড ছাড়াও আরও কয়েকজনের লেখা থেকে উঠে আসে ম্যালেরিয়ার কথাও। ম্যালেরিয়ার অস্তিত্ব একসময় মেসোপোটেমিয়ায় তো ছিলই, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে এটি একটি সাধারণ রোগে পরিণত হয়েছে। আলেকজান্ডারের কিছু লক্ষণ ম্যালেরিয়ার সঙ্গেও মেলে, যেমন, একটানা জ্বর, ঠান্ডা লাগা, ডায়াফোরসিস, প্রসটেশন, ক্রমবর্ধমান শারিরীক দুর্বলতা, প্রলাপ উচ্চারণ ইত্যাদি। বর্তমানে ইরাকের বেশিরভাগ ম্যালেরিয়া হয় প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স-এর কারণে, কিন্তু আলেকজান্ডারের ভ্রমণ-ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, যদি তাঁর ম্যালেরিয়া হয়ে থাকে তবে তা হয়েছিল পি. ফ্যালসিপেরামের কারণে। লেখক অ্যান্ড্রু চুগের মতে বন্যার সময় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে জলাভূমি পেরোনোর সময় ম্যালেরিয়াতে আক্রান্ত হন আলেকজান্ডার। তাঁর নিরবচ্ছিন্ন জ্বর শরীরে ফ্যালসিপেরামের অস্তিত্বের স্বাক্ষর, যা-কিনা ম্যালেরিয়ার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তোলে। পল কার্টলেজও এই ম্যালেরিয়ার তত্ত্বটিকে সমর্থন করেছিলেন।

টাইফয়েড এবং ম্যালেরিয়ার পাশাপাশি আলেকজান্ডারের মৃত্যুকে ঘিরে উঠে আসে আরও একটি জ্বরের সংক্রমণের কথা, যেটি ওয়েস্ট নাইল ফিভার নামে পরিচিত। এপিডেমিওলজিস্ট জন মার এবং চার্লস ক্যালিশার মূলত এই তত্ত্বটি উপস্থাপন করেছিলেন। ইউনিভার্সিটি অফ রোড আইল্যান্ডের মহামারী বিশেষজ্ঞ টমাস ম্যাথার জানিয়েছিলেন যে, ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস বয়স্কদের এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যাদের দুর্বল, সেইসব ব্যাক্তিদেরই মৃত্যুর কারণ হতে পারে। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট যে-বয়সে মারা যান উপরোক্ত দুটি শর্তই প্রায় তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এছাড়াও মার এবং ক্যালিশারের প্রতিক্রিয়ায় অন্যান্য লেখকদের বিশ্লেষণ অনুসারে, এই পশ্চিমা নীল ভাইরাস অষ্টম শতাব্দীর আগে মানুষকে সংক্রমিত করতে পারেনি।

এরপরেই বলতে হয় ষড়যন্ত্র এবং হত্যার তত্ত্বের কথা, যা-কিনা এমন রাজনৈতিক ক্ষমতাসম্পন্ন জনপ্রিয় মানুষদের রহস্যমৃত্যুর আলোচনায় প্রায় অনিবার্যভাবেই উঠে আসে। ঐতিহাসিকরা আলেকজান্ডারের হত্যার নেপথ্যে থাকা কোন একটি মুখকে নিশ্চিতভাবে নির্দেশ না করলেও অনেকের দিকে তাঁদের সন্দেহ ধাবিত হয়েছিল যেমন, আলেকজান্ডারের একজন স্ত্রী, তাঁর কয়েকজন জেনারেল, তাঁর অবৈধ সৎ ভাই এমনকি রাজকীয় কাপ-বাহকও রেহাই পায়নি। এই তত্ত্ব অনুযায়ী বিষপ্রয়োগ করে আলেকজান্ডারকে হত্যা করা হয়েছিল। কেউ কেউ আলেকজান্ডারের হত্যাকারী হিসেবে খ্যাতনামা একজন অধিনায়ক অ্যান্টিপাটারের কথা বলেছেন। আলেকজান্ডার যখন দেশ ছেড়ে এশিয়ার উদ্দেশে রওনা দেন তখন এই অ্যান্টিপাটারের হাতেই মেসোপোটেমিয়ার দায়িত্ব তিনি অর্পণ করেছিলেন। ইতিহাসবিদ জাস্টিন বলেছিলেন, খুবই শক্তিশালী বিষ প্রয়োগ করে অ্যান্টপাটার হত্যা করেছিলেন আলেকজান্ডারকে। সে-বিষ নাকি এতই বিষাক্ত ছিল যে তা ঘোড়ার খুরে করে আনা হয়েছিল। অন্যদিকে আবার পল সি. ডোহার্টি তাঁর ‘আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট: দ্য ডেথ অফ আ গড’-এ জানিয়েছেন যে, আলেকজান্ডারের সম্ভাব্য অবৈধ সৎ ভাই প্রথম টলেমি বিষাক্ত আর্সেনিক প্রয়োগ করে আলেকজান্ডারকে হত্যা করেছিলেন।

তবে নিউজিল্যান্ডের ওটাগো ইউনিভার্সিটির ন্যাশনাল পয়জনস সেন্টারের দুজন গবেষক লিও স্কেপ এবং প্যাট উইটলে জানান বিষাক্ত মদ হল আলেকজান্ডারের মৃত্যুর কারণ। তাঁরা তাঁদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশও করেছেন ‘ক্লিনিক্যাল টক্সিকোলজি’ জার্নালে। এই গবেষণায় তাঁরা উল্লেখ করেছেন ভেরাট্রাম অ্যালবাম নামক এক বিষাক্ত প্রজাতির উদ্ভিদের কথা। সেই উদ্ভিদ থেকে তৈরি বিষাক্ত মদ পান করেই আলেকজান্ডার মৃত্যুমুখে পতিত হন বলে তাঁদের মত। এতদিন যে আর্সেনিক বা স্ট্রিকনিন বিষের কথা বলা হত উক্ত দুই গবেষক সেই তত্ত্বকে উড়িয়ে দিয়ে বলেন আর্সেনিক বা স্ট্রিকনিন প্রয়োগ করা হলে মৃত্যু আরও দ্রুত হত কিন্তু আলেকজান্ডার তো ১২ বা ১৪ দিন ভুগে তবে মারা গিয়েছিলেন। জানা যায় মদ্যপানের পরেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি, ধীরে ধীরে কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেলতে থাকেন। উল্লেখ্য যে, সেইসময় ভেরাট্রাম অ্যালবাম থেকে তৈরি বিষের ব্যবহারও প্রচলিত ছিল। তবে চক্রান্ত করে এই বিষ তাঁর মদে মেশানো হয়েছিল কিনা তা ধোঁয়াশাতেই রয়ে গেছে তবে তিক্ত স্বাদের এই বিষ মিশ্রিত মদ পান করেই যে সম্রাটের মৃত্যু হয়েছিল এ-ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন স্কেপ এবং উইটলে। গ্রীক ঐতিহাসিক ডিওডোরাসের লেখাতেও পাওয়া যায় যে, একটি বড় পাত্রে করে ওয়াইন পান করার পর প্রচন্ড ব্যথায় আক্রান্ত হয়েছিলেন আলেকজান্ডার।

এতকিছুর পরেও অবশ্য আলেকজান্ডার মৃত্যুরহস্য নিয়ে গবেষণা থেমে থাকেনি। সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে আরও একটি নতুন তত্ত্ব উঠে আসে যে, হয়তো আলেকজান্ডার স্নায়বিক ব্যাধি গুইলেন-বারে সিনড্রোম-এ ভুগছিলেন, যা থেকে টাইফয়েডের মতো জটিল রোগ সৃষ্টি হতে পারে। মনে করা হয়, মুলতান অবরোধের সময় তাঁর ফুসফুসে ক্ষত হওয়ার পর হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি সংক্রমণ থেকে তিনি এই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। কেউ কেউ আবার বলেছেন যে, আলেকজান্ডারের স্কোলিওটিক সিনড্রোম ছিল যা-কিনা তাঁর জন্মগত। যদিও তাঁর দেহের সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ না করে এই বিষয়ক কোন সিদ্ধান্তেই আসা যাবে না।

আলেকজান্ডার মৃত্যুরহস্য নিয়ে এতসব জল্পনা-কল্পনার পরেও মৃত্যুর আসল কারণ আজও রহস্যের অন্ধকারেই নিমজ্জমান। ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের মৃত্যুর অমীমাংসিত এই রহস্যের অন্তরাল থেকে সত্যের উদঘাটন ভবিষ্যতে আদতেই সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading