সববাংলায়

আর্নল্ড সোমারফিল্ড

আর্নল্ড সোমারফিল্ড (Arnold Sommerfeld) ছিলেন একজন বিখ্যাত জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতবিদ, অধ্যাপক ও বিজ্ঞান বিষয়ক পত্রিকার সম্পাদক। পদার্থবিজ্ঞান শাখার পারমাণবিক বিদ্যা ও কোয়ান্টাম তত্ত্ব ছিল তাঁর গবেষণার প্রধান বিষয়। তিনি বোরের পারমাণবিক মডেলের সরলীকরণ করেন এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের উপর তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এছাড়াও তিনি ছিলেন জার্মানির জনপ্রিয় অধ্যাপক ও পরামর্শদাতা।

১৮৬৮ সালের ৫ ডিসেম্বর জার্মানির প্রুশিয়া প্রদেশের কোনিসবার্গে (বর্তমানে রাশিয়া) আর্নল্ড সোমারফিল্ডের জন্ম হয়। তাঁর সম্পূর্ণ নাম আর্নল্ড জোহানেস উইলহেল্ম সোমারফিল্ড (Arnold Johannes Wilhelm Sommerfeld)। তাঁর বাবার নাম ফ্রাঞ্জ সোমারফিল্ড এবং মায়ের নাম ক্যাসিল ম্যাথিয়াস। তাঁর বাবা ছিলেন বিজ্ঞান বিষয়ে উৎসাহী এক চিকিৎসক। বিজ্ঞানের প্রতি ভালবাসা আর্নল্ড সোমারফিল্ড উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেছিলেন। সোমারফিল্ড জোহোনা হোপনারকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের চারটি সন্তান ছিল।

সোমারফিল্ড ছোট থেকে পছন্দ করতেন সাহিত্য, ইতিহাস ও দর্শনশাস্ত্র, তবে বিজ্ঞানের প্রতিও তাঁর ছিল অসীম আগ্রহ। তাই তিনি কোনিসবার্গের আল্টস্টাডটিস জিমনাসিয়ামে (Altstadtishe Gymnasium) ভর্তি হন গণিত বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের জন্য। পরবর্তী সময়ে তিনি কোনিসবার্গের আলবারটিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে (Albertina University) ভর্তি হন এবং বাইশ বছর বয়সেই গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে পি.এইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৮৯২ সালে তিনি শিক্ষকতার ডিপ্লোমা পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি প্রায় এক বছর সেনাবাহিনীতে প্রশিক্ষণ নেন এবং পরবর্তী আট বছর তিনি নানা সময়ে স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন কাজে যুক্ত ছিলেন। দেশের প্রতি তাঁর ভালবাসা ও শ্রদ্ধা থাকলেও হিটলারের উগ্র জাতীয়তাবাদকে তিনি কখনও সমর্থন করেননি।

এক নজরে আর্নল্ড সোমারফিল্ড-এর জীবনী:

  • জন্ম: ৫ ডিসেম্বর, ১৮৬৮
  • মৃত্যু: ২৬ এপ্রিল, ১৯৫১
  • কেন বিখ্যাত: আর্নল্ড সোমারফিল্ড একজন বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতবিদ, অধ্যাপক ও বিজ্ঞান বিষয়ক পত্রিকার সম্পাদক। পদার্থবিদ্যার পারমাণবিক বিদ্যা ও কোয়ান্টাম তত্ত্ব ছিল তাঁর গবেষণার প্রধান বিষয়। তিনি বোরের পারমাণবিক মডেলের সরলীকরণ করেন এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের উপর তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। আজিমুথাল কোয়ান্টাম সংখ্যার প্রবর্তন করেন তিনি।
  • পুরস্কার ও স্বীকৃতি: ৮৪ বার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন তিনি। বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞান একাডেমী তাঁকে বিশেষ সম্মান দিয়েছে। চন্দ্রগর্ত ও গ্রহাণুর নাম করা হয়েছে তাঁর নামে।

আর্নল্ড সোমারফিল্ড প্রথম জীবনে প্রাইভেটডোজেন্ট পদে আসীন তরুণ অধ্যাপক উইচার্ট (Wiechart) দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তিনি ১৮৯৩ সালে নিজের কর্মজীবন শুরু করেন গোটিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ে (Gottingen University) থিওডোর লিবিশের সহকারী হিসাবে। পরবর্তীকালে তিনি সেখানে গণিতবিদ ফ্লেলিক্স কাইনের সাহচর্যে আসেন এবং তাঁর প্রভাবে ধীরে ধীরে পদার্থবিজ্ঞানের নানা বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ক্লাইনের সহায়তায় সেই সময় তিনি হ্যাবিলিটেশনসক্রিফট (Habilitationsschrift) সফলভাবে সম্পূর্ণ করেন। এই গবেষণাকর্মটিকে বিবেচনা করে সোমারফিল্ডকে গোটিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাইভেটডোজেন্ট পদে নিয়োগ করা হয়। তারপর সোমারফিল্ড আরডবলুটিএইচ আচেন বিশ্ববিদ্যালয়ে (RWTH Aachen University) ফলিত মেকানিক্সের অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। এই সময় তিনি হাইড্রোডাইনামিক্স সম্পর্কে গবেষণা করে নতুন তথ্য আবিষ্কার করেন। পরবর্তীকালে তিনি কিছুদিন ক্লসথাল বিশ্ববিদ্যালয়েও (Clausthal University of Technology) অধ্যাপনা করেন। পরে তাঁকে ১৯০৬ সালে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসাবে নিযুক্ত করা হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সোমারফিল্ড প্রায় বত্রিশ বছর শিক্ষকতা করেন। এছাড়া ১৯২৮ সালে ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সিটিউট তাঁকে ভিসিটিং প্রফেসর নিযুক্ত করে। এইসময় তিনি ওই ইন্সিটিউটে অধ্যাপনার পাশাপাশি ভারত-চিন-জাপান-ব্রিটেনের নানা শহরে গিয়েও পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে বক্তৃতা দিতেন।

সোমারফিল্ড ছিলেন মূলত বিজ্ঞানী, তিনি গবেষণার মাধ্যমে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার নতুন দিগন্ত খুলে দেন। আলবার্ট আইনস্টাইনের পূর্বসূরীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম জনপ্রিয় পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক, ওল্ডেমার ভয়েগটের মতো শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীদের সাথে যেমন বিজ্ঞানচর্চা করেছেন আবার ম্যাক্স বর্ণ, নিলস বোর, এরউইন শ্রোডিঙ্গার মতো তরুণদের সাথেও নানা পরীক্ষামূলক গবেষণা করেন। ১৯১৫ সালে সোমারফিল্ড ও উইলিয়ম উইলসন যুগ্মভাবে প্রবর্তন করেন ‘উইলসন-সোমারফিল্ড কোয়ান্টাইজেশন রুলস’ (Wilson-Sommerfeld quantization rules)। তবে বিজ্ঞান জগতে তাঁর খ্যাতি মূলত বোরের পারমাণবিক মডেলের সংস্কার ও উন্নতির জন্য। ‘বোর-সোমারফিল্ড পরমাণু মডেল’-এর উপর ‘কোয়ান্টাইজেশন রুলস’-এর ব্যাপক প্রভাব লক্ষ করা যায়। ১৯১৬ সালে ওই পরমাণু মডেলে সোমারফিল্ড প্রমাণ করেন যে নিউক্লিয়াসের চারিদিকে ইলেকট্রনগুলি বৃত্তাকার কক্ষপথে নয় উপবৃত্তাকার কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে এবং তাদের গতির পার্থক্যও থাকে। এক্ষেত্রে আরও বিস্তারিত গবেষণার মধ্যে দিয়ে তিনি আজিমুথাল কোয়ান্টাম সংখ্যা (l) ও চুম্বকীয় কোয়ান্টাম সংখ্যা (m) প্রবর্তন করেন। তাছাড়া ওই বছর সোমারফিল্ড আলোর গতির সাথে যুক্ত ‘সূক্ষ কাঠামো ধ্রুবক’ (Fine-structure constant) আবিষ্কার করেন।

১৯১৯ সালে তিনি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের উপর ‘অটোমাউ এন্ড স্পেকট্রালিনিনেন’ (Atomau and Spektralininen) গ্রন্থটি রচনা করেন। নতুন তথ্য যুক্ত করার জন্য গ্রন্থটির প্রায় চারবার সংস্করণ করানো হয়। পারমাণবিক পদার্থবিদ্যা সম্পর্কে সোমারফিল্ডের ধারণা, তাঁর গবেষণালব্ধ ফল সুন্দরভাবে উপস্থাপিত করা হয়েছে এখানে। তাই পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় আজও এই গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ। এরপর ১৯১৯ সালে বিজ্ঞানী ওয়ালথার কোসলের সাথে সোমারফিল্ড ইলেকট্রন বিন্যাস বিষয়ে ‘সোমারফিল্ড-কোসেলের স্থানচ্যুতি ল’ (Sommerfeld-Kossel displacement law)-এর আবিষ্কার করেন। তাছাড়া লিওন ব্রিলোইনের সাথে বিচ্ছুরণের মাধ্যমে তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ বিষয়েও গবেষণা করেন তিনি। জ্যোতির্বিদ্যা, ভূ-পদার্থবিদ্যা ও নানা প্রযুক্তির প্রয়োগের বিষয় তিনি ফ্লেলিক্স কাইনকে ‘ডাই থিওরি দেশ ক্রাইসেলস’ (Die Thorie Des Kreisels) গ্রন্থটি রচনা করতে সাহায্য করেন।

১৯২৭ সালে সোমারফিল্ড ‘ড্রূড মডেল’কে আরও বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেন, সেখানে তিনি ধাতুতে ইলেকট্রনের আচরণ সম্পর্কে পুঙ্খনাপুঙ্খ বর্ণনা দেন। এই মডেলকে ‘মুক্ত ইলেকট্রন মডেল’ও বলা হয়। তাপীয় বৈশিষ্ট্যের পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় এই মডেল। তিনি যেভাবে অন্যান্য বিজ্ঞানীদের সাথে নানা গবেষণাকর্ম চালিয়ে গেছেন তাতে তাঁর একাগ্রতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। আইনস্টাইনের আপেক্ষিতার সূত্র যে সকল বিজ্ঞানীরা প্রথম গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করেন, তাঁদের মধ্যে সোমারফিল্ড ছিলেন একজন এবং তিনি এ বিষয়ে আইনস্টাইনকে পূর্ণ সমর্থন করেন। এছাড়া সোমারফিল্ড, পারমাণবিক গঠন এবং বর্ণালি রেখা, এক্স-রে তরঙ্গতত্ত্বের উপরও গবেষণা পত্র তৈরি করেন, যার প্রভাবে তরুণ গবেষকরা নানাভাবে উপকৃত হয়।

১৯১৯ সালে তিনি ভারতে আসেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘তরঙ্গ বলবিদ্যা’ (Wave Machanics) বিষয়ে বক্তৃতা দেন। তাছাড়া মাদ্রাজ ও ব্যাঙ্গালোরেও তিনি পদার্থবিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে নিজের বক্তব্য ভারতীয় ছাত্র, গবেষকদের সামনে তুলে ধরেন। মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সময়ে তাঁর বক্তৃতা ও ক্লাসের নোটগুলিকে একত্রিত করে ছটি খণ্ডে ‘লেকচারস অন থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স’ (Lectures on Theoretical Physics) নামক গ্রন্থটি প্রকাশ করেন। পদার্থবিজ্ঞান সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ এটি। আবার সোমারফিল্ড তরুণ বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানচর্চায় উৎসাহিত করার জন্য ‘জিতচ্রিফট ফার ফিসিক’ (Zeitchrift fur physic) পত্রিকায় সম্পাদক থাকাকালীন গবেষণাপত্র প্রকাশের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ গবেষকদের পাশাপাশি তরুণ গবেষকদের গবেষণাপত্রকেও সমান গুরুত্ব দিতেন। ১৯২৬ সাল পর্যন্ত তিনি জার্মানির গণিত এনসাইক্লোপিডিয়ার সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন।

একজন কঠোর পরিশ্রমী বিজ্ঞানী হওয়ার পাশাপাশি আর্নল্ড সোমারফিল্ড ছিলেন এক উদার ও মহান অধ্যাপক। ছাত্রদের মধ্যে তিনি কখনও ভেদাভেদ করতেন না, তাই একসময় তাঁকে নাৎসি সরকারের রোষের মুখে পড়তে হয়েছিল। প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি তিনি ছাত্রদের বিভিন্ন সময়ে পদার্থবিজ্ঞানের নানা বিষয় যেমন তড়িৎ গতিবিদ্যা, বলবিদ্যা, আলোকবিদ্যা, তাপগতিবিদ্যা ইত্যাদির উপর স্বল্পকালীন কোর্স করাতেন। কোনও ক্লাস বা সেমিনার শেষে ছাত্রদের ক্লাসের সমস্যার বিষয়ে আলোচনার জন্য তিনি কোনও কফিশপে গিয়ে তাদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে সময় কাটাতেন। বিজ্ঞান সম্পর্কে সোমারফিল্ডের জ্ঞান ও ছাত্রদের প্রতি তাঁর আত্মনিবেদনের ফল পায় সমগ্র বিজ্ঞান জগৎ। সোমারফিল্ডের ছাত্রদের মধ্যে ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ, উলফগ্যাং পাউলি, পিটার ডেবে, হ্যান্স বেথি, লিনাগ পাউলিঙ, ইসিডোর আই রাবি, ম্যাক্স ভন লাউ ছিলেন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী। এছাড়া হারবার্ট ফ্রেহিচ, পল পিটার এয়োলাড, ওয়াল্টার রগো ওস্কি প্রমুখ বিজ্ঞানীরাও ছিলেন তাঁর ছাত্র। নানা সূত্র থেকে জানা যায় যে, ১৯২৪ সাল পর্যন্ত জার্মানির প্রায় এক তৃতীয়াংশ পদার্থবিদই তাঁর ছাত্র ছিলেন।

আর্নল্ড সোমারফিল্ডের বিজ্ঞান সাধনাকে সম্মান জানিয়ে এথেন্স-আচেন-রোষ্টক বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটি, ভারতীয় বিজ্ঞান একাডেমী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বিজ্ঞান একাডেমী, ইউএসআরের বিজ্ঞান একাডেমী তাঁকে নানা সম্মানে ভূষিত করে। এছাড়া তিনি লরেন্টেজ পদক, ম্যাট্রিউচ্চি পদক, ফরমেমআরএস পদক, ম্যাক্স-প্ল্যাঙ্ক পদক, ওস্টেড পদকও লাভ করেন। চুরাশিবার তিনি নোবেল প্রাইজের জন্য মনোনীত হলেও কখনও নোবেল পুরস্কার পাননি। এছাড়া তাঁকে সম্মান জানিয়ে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা গবেষণা বিভাগের নামকরণ করা হয় আর্নল্ড সোমারফিল্ড সেন্টার। অন্যদিকে ১৯৭০ সালে চন্দ্রগর্তের নাম এবং ২০০২ সালে গ্রহাণু ৩২৮০৯- এর নামকরণ করা হয় তাঁর নামে ।

১৯৫১ সালের ২৬ এপ্রিল মিউনিখে সড়ক দুর্ঘটনায় আর্নল্ড সোমারফিল্ডের মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading