ইতিহাস

আনন্দমোহন বসু

আনন্দমোহন বসু

ব্রিটিশ শাসিত ভারতের একজন অন্যতম রাজনীতিবিদ, আইনজীবি এবং সমাজ সংস্কারক আনন্দমোহন বসু (Ananda Mohan Bose) ছিলেন ‘র‍্যাংলার’ উপাধিপ্রাপ্ত প্রথম ভারতীয়। ‘ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা আনন্দমোহন পরবর্তীকালে জাতীয় কংগ্রেসের এক উল্লেখযোগ্য নেতা হয়ে ওঠেন। শিবনাথ শাস্ত্রীর পরিচালনায় ব্রাহ্মধর্মের প্রচারক ছিলেন তিনি। তিনিই ছিলেন সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের প্রথম সভাপতি। ১৮৭৪ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে তিনি গণিতে ট্রাইপস বৃত্তি অর্জন করে ‘র‍্যাংলার’ উপাধি পেয়েছিলেন। ময়মনসিংহে ‘আনন্দমোহন কলেজ’ প্রতিষ্ঠিত হয় তাঁরই উদ্যোগে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বঙ্গীয় আইন পরিষদের প্রথম প্রতিনিধি নির্বাচিত হন আনন্দমোহন বসু। ১৮৭৬ সালে কলকাতায় নারীর শিক্ষাবিস্তারের লক্ষ্যে তিনি ‘বঙ্গমহিলা বিদ্যালয়’ স্থাপন করেন। ১৮৭৯ সালে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের একটি ছাত্র সংগঠন হিসেবে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ‘ছাত্রসমাজ’। এছাড়া কলকাতার সিটি কলেজ প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তাঁর অবদানের স্বীকৃতি জড়িয়ে রয়েছে ওতপ্রোতভাবে। ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে কলকাতার কফিহাউজে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী সভায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পাশাপাশি আনন্দমোহন বসুর সভাপতিত্ব ও সুপ্রযোজ্য বক্তব্য সত্যই স্মরণীয়। বাংলার রেনেসাঁর সামাজিক ইতিহাসে আনন্দমোহন বসু এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব।

১৮৪৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর অবিভক্ত বাংলার ময়মনসিংহ জেলার জয়সিদ্ধি গ্রামে (অধুনা বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার ইটানা উপজেলায়) এক ভূস্বামী পরিবারে আনন্দমোহন বসুর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম পদ্মলোচন বসু এবং মায়ের নাম উমাকিশোরী দেবী। পদ্মলোচন বসু পেশায় ছিলেন ময়মনসিংহ জজ আদালতের পেশকার।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

প্রথমে ময়মনসিংহের হার্ডিঞ্জ স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় আনন্দমোহন বসুর। পরে ময়মনসিংহ জেলা স্কুলে ভর্তি হন তিনি। এই স্কুল থেকেই ১৮৬২ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় নবম স্থান অর্জন করেন আনন্দমোহন। এরপরে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন তিনি এবং সেখান থেকে ক্রমান্বয়ে এফ.এ ও বি.এ পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাশ করেন। ১৮৭০ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি পেয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ১৮৭৮ সালে বিদেশে পাড়ি দেন তিনি। এর আগে ১৮৬৯ সালে আনন্দমোহন বসু এবং তাঁর স্ত্রী উভয়েই ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। বিদেশ যাত্রার সময় তাঁর সঙ্গী ছিলেন কেশব চন্দ্র সেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ক্রাইস্ট চার্চ কলেজে উচ্চশিক্ষা সম্পূর্ণ করেন আনন্দমোহন বসু। গণিত ছিল তাঁর প্রধান বিষয় এবং তার পাশে গ্রিক ও ল্যাটিন ভাষাও শেখেন তিনি। কেমব্রিজ থেকে গণিতে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে আনন্দমোহন বসু ‘র‍্যাংলার’ উপাধি লাভ করেন। তিনিই ছিলেন প্রথম ভারতীয় র‍্যাংলার। ব্রিটেনে থাকাকালীন তিনি ব্যারিস্টারিও পড়েছিলেন যার দরুন ১৮৭৪ সালে তাঁকে বার অ্যাসোসিয়েশন থেকে ডাকা হয়।

১৮৭১ সালেই বিদেশে সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জির সঙ্গে আনন্দমোহন বসুর দেখা হয়। ইংল্যাণ্ডে থাকাকালীন প্রবাসী ভারতীয়দের একত্রিত করে তিনি ‘ইণ্ডিয়া সোসাইটি’ গড়ে তোলেন। তাছাড়া শিশিরকুমার ঘোষ স্থাপিত ‘ইণ্ডিয়ান লিগ’-এর সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। দেশে ফিরে আনন্দমোহন বসু আইনজীবী হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন কলকাতা উচ্চ আদালতে এবং তাঁর কর্মজীবনে ডিস্টিংশন পান। ১৮৭৪ সালে যখন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জিকে অনৈতিকভাবে আইসিএস থেকে বাদ দেওয়া হয়, আনন্দমোহন বসু তাঁকে সাহায্য করেন। সুরেন্দ্রনাথ এবং আনন্দমোহন একত্রে ১৮৭৫ সালে গড়ে তোলেন ‘দ্য ক্যালকাটা স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’। সাংগাঠনিক রাজনৈতিক কাজকর্মের জন্য এই সংগঠন গড়ে তোলা প্রাথমিকভাবে খুবই সফল হয়েছিল। তিনি লক্ষ করেছিলেন দেশসেবায় ভারতের ছাত্রসমাজ তখন যথেষ্ট সক্রিয় ছিল। তিনি ভেবেছিলেন দেশের ছাত্ররাই পারবে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের মধ্য দিয়ে নারীজাতির বিকাশ, দারিদ্র্য দূরীকরণ ইত্যাদি সমস্যার মোকাবিলা করতে। আর তাই ছাত্রদের নিয়ে সক্রিয় রাজনীতির মঞ্চে নামার জন্য এই সংগঠন একটি ধাপ ছিল। আনন্দমোহন বসুই ছিলেন ‘দ্য ক্যালকাটা স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’-এর সভাপতি। ১৮৭৬ সালে আনন্দমোহন বসুর সহায়তায় গড়ে ওঠে ‘ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’ যা সেকালের ভারতে প্রথম কোনো রাজনৈতিক সংগঠন ছিল। তার আগের ভিত্তিভূমি গড়ে দিয়েছিল ‘দ্য ক্যালকাটা স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’। ভারতীয়দের অধিকার ও দাবি-দাওয়া ব্রিটিশদের কাছে পৌঁছে দিতেই এই সংগঠনটির উৎপত্তি হয়। ‘ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’ থেকে প্রাথমিকভাবে আইসিএস পরীক্ষায় বসার জন্য ভারতীয়দের জন্য ধার্য ন্যূনতম বয়স বাড়ানোর দাবি জানানো হয়। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরোধিতা করাও ছিল এই এর লক্ষ্য। ১৮৮৩ সালে আনন্দমোহন বসুর নেতৃত্বে ‘ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’-এর পক্ষ থেকে একটি সর্বভারতীয় সভা ডাকা হয়। পরে ১৮৮৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর তারিখে এই ‘ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন’ থেকেই তৈরি হয় ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস’। আনন্দমোহন বসু ছিলেন কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং ১৮৯৮ সালে মাদ্রাজের নির্বাচনে তিনি কংগ্রেসের সভাপতিও নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৮৮৪। ১৮৯০ এবং ১৮৯৫ এই তিন বছর তিনি ছিলেন বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য। সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ আইনের তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন আনন্দমোহন বসু। লর্ড কার্জন যখন বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা করেন ১৯০৫ সালে, তখন এর প্রতিবাদে কলকাতার অধুনা কফি হাউজে (সেকালের ভারতসভা হল) একটি প্রতিবাদ সমাবেশ আয়োজন করেন আনন্দমোহন বসু। এই সমাবেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পাশাপাশি তিনিও সভাপতিত্ব করেছিলেন।

কেশব চন্দ্র সেনের নেতৃত্বে ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্ম সমাজ থেকে বেরিয়ে গিয়ে আনন্দমোহন বসু এবং আরো কয়েকজন অনুরাগী ব্রাহ্ম একত্রিত হয়ে গড়ে তোলেন ‘সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ’ যার প্রথম সভাপতি ছিলেন আনন্দমোহন বসু। ১৮৭৮ সালের ১৫ মে তারিখে প্রতিষ্ঠিত এই ব্রাহ্ম সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন শিবনাথ শাস্ত্রী, শিবচন্দ্র দেব, উমেশচন্দ্র দত্ত, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, দ্বারকানাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। এই ব্রাহ্মসমাজের পক্ষ থেকেই ছাত্রদের উপযোগী ‘স্টুডেন্ট উইকলি সার্ভিস’ নামে একটি সাপ্তাহিক নিয়মিত নীতিশিক্ষার ক্লাস চালু করেন তিনি। দীর্ঘ তেরো বছর সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের সভাপতি ছিলেন আনন্দমোহন বসু। ১৮৭৯ সালে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের একটি ছাত্র সংগঠন হিসেবে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ‘ছাত্রসমাজ’ এবং ঐ বছরই তাঁরই উদ্যোগে ও প্রচেষ্টায় কলকাতায় গড়ে ওঠে সিটি স্কুল এবং সিটি কলেজ। আজও তাঁর স্মৃতিরক্ষার্থে সিটি কলেজের নিশা বিভাগের নামকরণ করা হয়েছে আনন্দমোহন কলেজ। তিনি ১৮৮৩ সালে ময়মনসিংহে রাম বাবু রোডে নিজের পৈতৃক বাড়িতে কলকাতা সিটি কলেজের একটি শাখা তৈরি করেন। ১৯০১ সালে এর নামকরণ হয় ময়মনসিংহ কলেজিয়েট স্কুল। তাঁর মৃত্যুর পরে সাময়িকভাবে এই প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলেও দুই বছর পরে আবার নতুনভাবে ‘আনন্দমোহন কলেজ’ নাম দিয়ে এই প্রতিষ্ঠান পথ চলা শুরু করে। ১৮৮২ সালে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হান্টার কমিশনের সদস্য হন আনন্দমোহন বসু। পরবর্তীকালে ক্রমান্বয়ে তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেনেট’ সদস্য নির্বাচিত হন। ‘ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট অফ ইনকর্পোরেশন’ তাঁর উদ্যোগেই পরিবর্তন করা হয়। ১৮৯২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বঙ্গীয় আইন পরিষদের প্রথম প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। নারীশিক্ষার বিস্তারের জন্য ১৮৭৬ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বঙ্গমহিলা বিদ্যালয়’ পরবর্তীকালে বেথুন কলেজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

কিশোরগঞ্জ জেলার ইটানা উপজেলায় আনন্দমোহন বসুর বাড়িটি বর্তমানে অযত্নে অবহেলায় পড়ে আছে। সরকারি তরফে কোনো হেরিটেজ সংরক্ষণের দায় না থাকায় এই বাড়িটিতে কোনো সংগ্রহশালা গড়ে ওঠেনি।

১৯০৬ সালের ২০ আগস্ট আনন্দমোহন বসুর মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন