ভ্রমণ

বর্গভীমা মন্দির ভ্রমণ

বর্গভীমা মন্দির তমলুক তথা সমগ্র বাংলার মানুষের কাছে জনপ্রিয় একটি তীর্থস্থান। তমলুক শহরে যে কোন বাড়িতে কোন অনুষ্ঠানের আগে বর্গভীমা মন্দিরে পূজা দিয়ে তবেই কাজ শুরু হয়। এই মন্দিরটি একটি সতীপীঠ, যেখানে সতীর বাঁ পায়ের গোড়ালি পড়েছিল বলে মানুষের বিশ্বাস। অন্নদামঙ্গল কাব্যেও সে কথার উল্লেখ আছে। একটি জনশ্রুতি অনুসারে কালাপাহাড় অনেক হিন্দু মন্দির ধ্বংস করলেও বর্গভীমা মন্দিরে এসে মন্দির ধ্বংস না করেই ফিরে গিয়েছিলেন। অনেকের মতে তিনি মায়ের মূর্তি দেখে ভয় পেয়েছিলেন। আবার অনেকে বলেন তিনি মন্দিরের ভেতরে এসে দেবীমূর্তি ভাঙতে গেলে মূর্তিতে নিজের মায়ের রূপ দেখেছিলেন।

বর্গভীমা মন্দির পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত তমলুক শহরে অবস্থিত। তমলুক স্টেশন থেকে মন্দিরের দূরত্ব তিন কিলোমিটার।

মন্দির চত্বর। ছবি ইন্টারনেট

বর্গভীমা নিয়ে অনেক জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। সেইরকম একটি জনশ্রুতি অনুসারে তৎকালীন তাম্রলিপ্তে ময়ূরবংশীয় রাজা তাম্রধ্বজ মাছ খেতে খুব ভালোবাসতেন। একজন জেলেবউ রাজবাড়িতে রোজ মাছ পৌঁছে দিতেন। একদিন জেলেবউ বনের মধ্যে দিয়ে মাছ নিয়ে যাবার পথে মাছগুলি মারা যায়। পথিমধ্যে তিনি একটি জলভরা গর্ত দেখতে পান এবং সেই গর্ত থেকে একটু জল নিয়ে তিনি মাছগুলোর উপর ছিটিয়ে দেন। সেই জলের ছিটে পেয়ে মরা মাছগুলি জ্যান্ত হয়ে ঝুড়ির মধ্যে লাফাতে শুরু করে। রাজা তাম্রধ্বজ এই ঘটনা জানতে পেরে জেলেবউয়ের থেকে জায়গাটি কোথায় জেনে সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখেন যে সেই জলভরা গর্তের মধ্যে একটি বেদী রয়েছে এবং তার উপরে একটি দেবী মূর্তি বসানো আছে। এই দেবী মূর্তি দেখার পর রাজা তাম্রধ্বজ সেখানে বর্গভীমা মন্দির গড়ে তোলেন। এই জনশ্রুতির আরেকটি কাহিনী অনুসারে তাম্রলিপ্তে ময়ূরবংশীয় অন্য একজন রাজা গরুড়ধ্বজ প্রতিদিন তাজা শোলমাছ খেতেন। যে জেলে তাঁকে তাজা মাছ সরবরাহ করতেন, একদিন তিনি তা করতে ব্যর্থ হলে রাজা তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। তারপর সেই জেলেকে দেবী বর্গভীমা স্বপ্নাদেশে শোল মাছ ধরে সেগুলিকে শুকনো করে রেখে জঙ্গলের একটি কুয়োর জল ছিটিয়ে দিলেই জীবন্ত করার উপায় বলেন। এভাবে সেই জেলে রাজাকে প্রতিদিন জ্যান্ত শোলমাছ সরবরাহ করতে থাকেন। রাজা একদিন সেই জেলেকে তাজা মাছের রহস্য জানতে চাইলে সেই জেলে কুয়োর কথা জানায়। রাজা সেখানে এসে দেখেন যে ওই কুয়োর মুখেই রয়েছে একটি দেবীমূর্তি। তখন সেখানেই রাজা বর্গভীমা মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।

অন্য একটি জনশ্রুতি অনুসারে এক সওদাগর রূপনারায়ণ নদীপথে ব্যবসা করতে যাবার সময় একবার তাম্রলিপ্ত বন্দরে নামেন। তিনি লক্ষ্য করেন নগর দিয়ে এক ব্যক্তি সোনার কলসি নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। তাঁকে জিজ্ঞেস করে সওদাগর জানতে পারেন তাম্রলিপ্ত নগরে আশ্চর্য একটি কুন্ড আছে যেখানে পিতলের জিনিস ডোবালে সেটি সোনায় পরিণত হয়। সওদাগর সেই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করে জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত অলৌকিক সেই কুয়োর সন্ধান পান। সওদাগর অনেক পিতলের জিনিস সোনায় পরিণত করে সেগুলো বিক্রি করে অনেক অর্থ উপার্জন করেন। তারপর ব্যবসা করে ফেরার পথে তিনি সেই কুয়োর পাশে বর্গভীমা মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।

বলা হয় তমলুক শহরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন বর্গভীমা। হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সকল মানুষের অগাধ বিশ্বাস বর্গভীমা দেবীর ওপর। তমলুক শহরে যে কোন বাড়িতে কোন অনুষ্ঠানের আগে বর্গভীমা মন্দিরে পূজা দিয়ে তবেই কাজ শুরু হয়। এটি একটি সতীপীঠ। প্রত্যেকটি সতীপীঠ বা শক্তিপীঠে দেবী এবং ভৈরব অধিষ্ঠিত থাকে। দেবী হলেন সতীর রূপ। ভৈরব হলেন দেবীর স্বামী। দেবীর বর্গভীমার ভৈরব হলেন সর্বানন্দ বা কপালি। এখানে দেবীকে প্রধানত কালীরূপে পূজা করা হয়। তবে কখনও মহিষাসুরমর্দিনী বা জগদ্ধাত্রী রূপেও তাঁকে পূজা করা হয়। পৌষ সংক্রান্তি এখানকার বাৎসরিক উৎসব।

ট্রেনে করে এলে হাওড়া থেকে তমলুক স্টেশন আসতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা লাগে। সকালবেলার ট্রেনে করে আসা ভালো। স্টেশন থেকে গাড়ির ব্যবস্থা করে মন্দির আসা যায়।

দেবী বর্গভীমা। ছবি ইন্টারনেট

এখানে থাকার ব্যবস্থা নেই। দিনের দিন ঘুরে আসা ভালো। সকালে পূজা দিয়ে ফিরে আসা যায়। রাতে অনেক যাত্রী যারা দূর থেকে আসে, মন্দির প্রাঙ্গণে তাঁদের থাকতে দেওয়া হয়। কিন্তু এই ব্যবস্থা এক দুই জনের জন্য করা হয় না।

মন্দিরটি একটি উঁচু ভূখণ্ডের উপর অবস্থিত। পশ্চিমমুখী মন্দিরে উঠতে গেলে ছাব্বিশটি সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে হয়। উড়িষ্যার রেখদেউল রীতিতে তৈরি এই মন্দিরের উচ্চতা প্রায় ৬০ ফুট। দেউলের চার দেওয়ালে বিভিন্ন দেবতার মূর্তি খোদাই করা আছে। সবটাই টেরাকোটার কাজ। মূল মন্দিরের সামনে রয়েছে যজ্ঞমন্দির। এর সামনে রয়েছে নাটমন্দির, নহবতখানা ও বলির জায়গা। সিঁড়ির নিচে বাঁদিকে রয়েছে ভূতনাথ শিবের দেউল। গর্ভগৃহের ভিতর বেদীর ওপর স্থাপন করা আছে দেবীমূর্তি। দেবীর মূর্তি চতুর্ভুজা এবং তাঁর নীচে শায়িত শিবের মূর্তি।

২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী মন্দির খোলে সকাল ছয়টায় এবং বন্ধ হয়ে যায় দুপুর দেড়টায়। আবার বেলা তিনটেয় খোলে এবং রাত নয়টায় বন্ধ হয়ে যায়। তবে আপনি যখন যাবেন, তার আগে অবশ্যই মন্দিরের সময়সূচি দেখে নেবেন বা স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করে নিতে পারেন।

সারা বছর ধরেই মন্দিরে বহু মানুষ আসেন। তবে চৈত্র সংক্রান্তি ও পৌষ সংক্রান্তির সময় মন্দিরকে কেন্দ্র করে মেলা বসে। মেলা দেখতে চাইলে সেই সময় আসতে পারেন। তাছাড়াও অন্যান্য পূজাতেও অনেক ভিড় হয়।

মন্দিরের একটি বিশেষত্ব হল দেবীর ভোগে প্রতিদিন শোল মাছ দেওয়া হয়। আগে থেকে বলা থাকলে দেবীর ভোগ (ভাত, শোল মাছের ঝোল) পাওয়া যায়। খেয়ে দেখতে পারেন।


ট্রিপ টিপস

  • কিভাবে যাবেন – ট্রেনে করে এলে হাওড়া থেকে তমলুক স্টেশন আসতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা লাগে। সকালবেলার ট্রেনে করে আসা ভালো। স্টেশন থেকে গাড়ির ব্যবস্থা করে মন্দির আসা যায়।
  • কোথায় থাকবেন – এখানে থাকার ব্যবস্থা নেই। দিনের দিন ঘুরে আসা ভালো।
  • কি দেখবেন – বর্গভীমা মন্দির, দেবীমূর্তির দর্শন।
  • কখন যাবেন – সারা বছর ধরেই এখানে আসা যায়। বিভিন্ন উৎসবে প্রচুর ভিড় হয়।
  • সতর্কতা
    • মন্দিরের সময়সূচি দেখে নেবেন বা স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করে নিতে পারেন।
  • বিশেষ পরামর্শ
    • দেবীর ভোগে প্রতিদিন শোল মাছ দেওয়া হয়। আগে থেকে বলা থাকলে দেবীর ভোগ (ভাত, শোল মাছের ঝোল) পাওয়া যায়। খেয়ে দেখতে পারেন।

তথ্যসূত্র


  1. সত্যের সন্ধানে ৫১ পীঠ - হিমাংশু চট্টোপাধায়, মুসলমান-শিখ-হিন্দু নির্বিশেষে সকলের মা দেবী বর্গভীমা, পাতা নং ১৪৩-১৫২
  2. https://www.anandabazar.com/
  3. https://thewall.in/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।