ইতিহাস

বেণু সেন

বেণু সেন (Benu Sen) একজন প্রবাদ প্রতিম ভারতীয় বাঙালি পেশাদার ফটোগ্রাফার যিনি ফোটোগ্রাফির ক্ষেত্রে সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে মাস্টার্স অফ ফোটোগ্রাফি উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। ফেডারেশন অফ ইণ্ডিয়ান ফোটোগ্রাফির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বেণু সেন। ছবি তোলার ক্ষেত্রে ভারতে তিনিই প্রথম সাদা-কালো নেগেটিভ থেকে রঙিন ফোটোগ্রাম তৈরি এবং রঙ পৃথকীকরণের পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন। বিএসফোর, ট্যানোরামা, ম্যাক্রো পিক্টোগ্রাফি ইত্যাদি পদ্ধতিতে সাদা-কালো ছবি ডেভেলপ করার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা ছিল অসামান্য। ফোটোগ্রাফিক অ্যাসোসিয়েশন অফ দমদম-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বেণু সেন আমৃত্যু ঐ প্রতিষ্ঠানে উৎসাহী চিত্রগ্রাহকদের ছবি তোলা শিখিয়ে গিয়েছেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।

১৯৩২ সালের ২৬ মে বেণু সেনের জন্ম হয়। তাঁর প্রকৃত নাম পরিতোষ সেনগুপ্ত। বাবা মণীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত এবং মা প্রভাবতী দেবীর সাত সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন বেণু সেন।

বেণু সেনের প্রথাগত শিক্ষা গড়ে উঠেছিল গ্রাউণ্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পড়তেই ছবি তোলা, ক্যামেরার প্রযুক্তিগত খুঁটিনাটি সম্পর্কে তিনি উৎসাহী হয়ে ওঠেন। বলা যায় একপ্রকার খেলতে খেলতেই ক্যামেরার প্রযুক্তি শিখে ফেলেছিলেন বেণু সেন। ১৯৫৪ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের এক অনুষ্ঠানে চিত্রগ্রাহক এক বন্ধুর সঙ্গে যোগদান করার সময়েই ঐ যন্ত্রটি সম্পর্কে তিনি উৎসাহী হয়ে ওঠেন এবং বন্ধুর থেকে ক্যামেরাটি চেয়ে দেখতে চান হাতে নিয়ে। কিন্তু নষ্ট হয়ে যেতে পারে ভেবে বন্ধুটি বেণু সেনকে ক্যামেরাটি দেয়নি। এতে অসন্তুষ্ট হয়ে পরের দিনই তিনি বাজার থেকে ঘুরে ঘুরে টিনের খোল, লেন্স সহ ক্যামেরার অন্যান্য অংশগুলি সব যোগাড় করে ফেলেন। আর নিছক খেলার ছলেই সেই সব সরঞ্জাম জুড়ে জুড়ে ক্যামেরা বানিয়ে ফেলেন বেণু সেন যা তাঁকে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। ক্যামেরা-প্রযুক্তি এবং ডার্করুম কৌশলের বিষয়ে তিনি ধীরে ধীরে দক্ষ হয়ে ওঠেন। তাঁর কারিগরিবিদ্যার প্রশিক্ষণ তাঁকে আরো বেশি সাহায্য করেছিল এই কাজে। এই পর্যায় থেকেই ক্যামেরা এবং তা দিয়ে ছবি তোলার ক্ষেত্রে বেণু সেনের সৃষ্টিশীলতা শীর্ষে পৌঁছায়। ১৯৫৭ সালে সমমনস্ক বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে ছবি তোলা অভ্যাসের জন্য গড়ে তোলেন ফোটোগ্রাফিক অ্যাসোসিয়েশন অফ দমদম। সেখানে তাঁরা নিজেদের মধ্যে চিত্রগ্রহণ শিল্পের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করতেন, বিভিন্ন ভাবে নতুন নতুন কৌশল শেখার চেষ্টা করতেন। ১৯৬৩ সালে তিনি ভারতীয় যাদুঘরে শিল্পকলার নিদর্শনের ছবি তোলার একটি সর্বাঙ্গীণ ব্যবস্থা গড়ে তোলেন যা সেইসময়ের ভারতে একেবারে প্রথম কাজ ছিল। বেণু সেনই ছিলেন এই ইউনিটের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক। ১৯৬৯ সালে ‘ফোটোগ্রাফিক অ্যাসোসিয়েশন অফ দমদম’-এ তাঁর উদ্যোগেই বিনামূল্যে ছবি তোলার প্রশিক্ষণের কোর্স চালু করা হয় যার ফলে পরবর্তীকালে বহু প্রশিক্ষিত চিত্রগ্রাহক উঠে এসেছেন বেণু সেনের প্রশিক্ষণে। তবে শুধু বেণু সেনই নয়, এই সংস্থায় আরো অনেক বিখ্যাত চিত্রগ্রাহকেরা ক্লাস নিতেন। এই সংস্থা থেকেই এক বছরের একটি সার্টিফিকেট কোর্স এবং দুই বছরের ডিপ্লোমা কোর্স চালু করা হয়েছিল উৎসাহী শিক্ষার্থীদের জন্য যেখানে শিক্ষার্থীদের বয়স বা শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো বাধা ছিল না। তাঁর প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত বহু ছাত্রই ভারত সরকারের অধীনে রাষ্ট্রপতি ভবনে, তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রকে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রকে এবং সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি দপ্তরে কর্মরত আছেন।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


ফোটোগ্রাফির ক্ষেত্রে বেণু সেনের সবথেকে বড়ো অবদান ছিল বিএসফোর ফর্মুলা যার সাহায্যে নিরক্ষীয় অঞ্চলের দেশগুলিতে সাদা-কালো ছবি ডেভেলপ করা হয়। এছাড়াও ট্যানোরামা এবং ম্যাক্রো পিক্টোগ্রাফি পদ্ধতিতে খুব সূক্ষ্মভাবে সাদা-কালো ছবি ডেভেলপ করার ক্ষেত্রে বেণু সেনের দক্ষতা ছিল অতুলনীয়। তিনিই ছিলেন প্রথম ভারতীয় যিনি রঙিন ফোটোগ্রাম আবিষ্কার করেন এবং সাদা-কালো নেগেটিভ থেকেও রঙ পৃথকীকরণ করতে সক্ষম হন। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বেণু সেন শ্রেষ্ঠ আন্তর্জাতিক সালোঁ প্রদর্শকের খ্যাতি পেয়েছেন এবং বহু আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সম্মান-পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর জীবৎকালেই সাতটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজন করেছিলেন বেণু সেন। এছাড়াও সারা বিশ্বে ফোটোগ্রাফি চর্চাকে ছড়িয়ে দিতে ১২টি নিখিল ভারত সমাবেশ, ৪৮টি আন্তর্জাতিক সালোঁ সহ আরো বহু স্থানীয় প্রদর্শনী, সভা- সমাবেশ আয়োজন করেছিলেন তিনি। তবে শুধুই ছবি তোলার প্রায়োগিক শিক্ষা নয়, এই বিষয়ে বহু গবেষণাপত্র লিখেছেন বেণু সেন যেগুলি বিখ্যাত সব জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল। টিভিতে, রেডিওয় ফোটোগ্রাফি নিয়ে অনেক বক্তব্য রেখেছেন তিনি আর তারই পাশাপাশি তাঁর লেখা ফোটোগ্রাফি বিষয়ক বইগুলি আজও সমানভাবে সমাদৃত হয়। বেণু সেনের লেখা উল্লেখযোগ্য বইগুলির মধ্যে ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত ‘আর্ট অফ ফোটোগ্রাফি’ খুবই বিখ্যাত। এছাড়া এক্সপেরিমেন্টাল ফোটোগ্রাফি এবং লার্ন ফোটোগ্রাফি নামে দুটি বইয়ের সহ-লেখকও ছিলেন তিনি যেগুলি তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘ফোটোগ্রাফিক অ্যাসোসিয়েশন অফ দমদম’ থেকে প্রকাশিত হয়। ১৯৯০ সালে ভারতীয় যাদুঘরের ‘ফোটো অফিসার’ হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন বেণু সেন। তাঁর চাকরিজীবনে মিউজিয়াম ফোটোগ্রাফির ক্ষেত্রে তিনি প্রভূত অবদান রেখেছেন।

ইউনেস্কোর অধীনে ‘ফেডারেশন অফ ইন্টারন্যাশনাল ফোটোগ্রাফি’র পক্ষ থেকে ‘মাস্টার অফ ফোটোগ্রাফি’র সম্মান প্রাপক হিসেবে তিনিই ছিলেন বিশ্বে তৃতীয়। এই সংস্থা থেকে ১৯৬০ সালে এবং ১৯৭২ সালে দুবার সম্মানিত হন বেণু সেন। ১৯৭৫ সালে গ্রেট ব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটি অফ ফোটোগ্রাফির সদস্যপদ লাভ করেন তিনি। এছাড়াও জাপান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, রোম ইত্যাদি বহু দেশ থেকে ফোটোগ্রাফির জন্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। ভারতের তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রকের পক্ষ থেকে জাতীয় চিত্রগ্রাহক সম্মান দেওয়া চালু হয়েছিল যার শত বছর পূর্তিতে ২০১০ সালে নিউ দিল্লিতে ভারতের উপ-রাষ্ট্রপতি মহম্মদ হামিদ আনসারি বেণু সেনকে শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহকের সম্মান জানিয়ে দশ হাজার টাকা পুরস্কারমূল্য এবং লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে। এরপর থেকে এই পুরস্কার অনেকে পেলেও বেণু সেনই ছিলেন প্রথম প্রাপক। অস্ট্রেলিয়ার ‘ক্যামেরা ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল’-এর পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ ভারতীয় চিত্রগ্রাহকের সম্মান লাভ করেন বেণু সেন। মিউজিয়াম ফোটোগ্রাফির শ্রেষ্ঠত্বের জন্য তাঁকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হার্ভার্ড সিনেটিক মিউজিয়াম প্রভূত সম্মাননা জ্ঞাপন করে।

২০১১ সালের ১৭ মে পশ্চিমবঙ্গের বারাসাতে বেণু সেনের মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য