ইতিহাস

যোগেশচন্দ্র বাগল

যোগেশচন্দ্র বাগল

যোগেশচন্দ্র বাগল (Jogesh Chandra Bagal) একজন ভারতীয় বাঙালি ইতিহাসবিদ, গবেষক, লেখক ও সাংবাদিক যিনি বাংলার বহু মনীষীর আত্মজীবনী ও বহু প্রাচীন প্রতিষ্ঠানের পরিচয় পুনরুদ্ধারে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন।

১৯০৩ সালের ২৭ মে অবিভক্ত বাংলার পিরোজপুর জেলার কুমিরমারা গ্রামে মামারবাড়িতে যোগেশচন্দ্র বাগলের জন্ম হয়। তাঁদের আদি বাড়ি ছিল বরিশালের চালিশা গ্রামে। যোগেশচন্দ্রের বাবার নাম জগদবন্ধু বাগল ও মায়ের নাম তারিণী দেবী।

যোগেশচন্দ্রের শিক্ষার প্রথম পাঠ চালিশা গ্রামের বাড়ি থেকেই শুরু হয়। রামচরণ দে’র পাঠশালা থেকে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষা শেষ করে যোগেশচন্দ্র কদমতলা জর্জ ইংলিশ হাই স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করেন। এরপর তিনি কলকাতায় আসেন উচ্চশিক্ষার জন্য। বর্তমানে যেটি প্রফুল্লচন্দ্র কলেজ তখন সেই কলেজ পরিচিত ছিল বাগের হাট কলেজ নামে। এই কলেজ থেকেই তিনি আই. এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর স্নাতকোত্তর পড়ার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও অর্থাভাবে পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত।

১৯২৯ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসাবে যোগেশচন্দ্রের কর্মজীবন শুরু হয়। এরপর তিনি ‘মর্ডান রিভিউ’ তে সহ সম্পাদক হিসেবে যুক্ত হন। ১৯৩৫ সাল থেকে ১৯৪১ সাল অবধি তিনি ‘দেশ” পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলেন। মূলত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়েই ‘দেশ’ পত্রিকায় লিখতেন তিনি। এই সময়েই তিনি ব্রজেন্দ্রনাথ দাস, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, সজনীকান্ত দাস, নীরোদ চন্দ্র চৌধুরীর মত সাহিত্যিকদের সংস্পর্শে আসেন যাঁদের প্রভাব তাঁর পরবর্তী সাহিত্যিক জীবনে পড়েছিল। ১৯৩১ সাল থেকে যোগেশচন্দ্র বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সাথে যুক্ত থাকার ১৯৪১ সালে তিনি আবার ফিরে আসেন ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় এবং ১৯৬১ সালে দৃ‌ষ্টিশক্তি হারানোর কারণে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের আগে পর্যন্ত এখানেই কাজ করেন। তিনি ইন্ডিয়ান হিষ্টরিকাল রের্কডস কমিশন ও রিজিওনাল রের্কডস কমিশনের (পশ্চিমবঙ্গ) সাথেও যুক্ত ছিলেন।

যোগেশচন্দ্রের আগে সেইভাবে কোন ঐতিহাসিকই বাংলার ধর্ম, সমাজ, শিক্ষা, রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে এত বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিতে আলোকপাত করেননি।
যোগেশচন্দ্রের বেশীরভাগ সাহিত্য রচনাই হল গবেষণাধর্মী। তাঁর গবেষণা ছিল নিরন্তর। তিনি যে শুধুই প্রাচীন নথি বা অন্যান্য উপাদান সংগ্রহ করেছেন তাই নয়, নতুন নতুন উপাদানের সন্ধান করেছেন নিরন্তর। দেড়শো বছরের ঐতিহাসিক দলিলপত্র ও অন্যান্য উপকরণ গভীরভাবে অধ্যয়ন করে তিনি এমন সব তথ্য আবিষ্কার করেছিলেন যা ছিল সর্বসাধারণের জ্ঞানের বাইরে।

সাহিত্যের সব ক্ষেত্রেই তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ। শিশু সাহিত্য থেকে আন্তর্জাতিক বিষয় সবক্ষেত্রেই তিনি গভীরভাবে মনোনিবেশ করেছিলেন। তাঁর রচিত বাংলায় একুশটি ও ইংরেজিতে মোট চারটি গ্রন্থ রয়েছে। বাঙালির উনিশ শতকের ইতিহাস তিনি পুনঃজাগরিত করে এটাই প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে বাঙালি জাতির হাত ধরেই ভারতীয় চেতনা উন্মেষিত হয়েছে এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালিই পথপ্রদর্শক।

ছাত্রাবস্থায় তিনি অশ্বিনী কুমার দত্ত, ক্যামাখ্যা চরণ নাগ প্রমুখ ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসেন যাঁদের দ্বারা তিনি প্রবলভাবে জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় অণুপ্রাণিত হন। তাঁর গবেষণামূলক সাহিত্যের মধ্যে ইতিহাস ও জীবনীমূলক রচনাগুলি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাঁর ইতিহাস বিষয়ক রচনাগুলির মধ্যে অন্যতম হল ‘ভারতের মুক্তিসন্ধানী’ (১৯৪০), ‘ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা’ (১৯৪১)। এই দুটি গ্রন্থে বাংলার নবজাগরণের পথিকৃৎ মনীষীদের নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সমাজ পরিবর্তনে যাঁদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে তাঁদের অবদানকে জনসমক্ষে নিয়ে এসেছেন যোগেশচন্দ্র তাঁর এই দুটি গ্রন্থের মাধ্যমে। সমসাময়িক বিভিন্ন সংবাদপত্র, সরকারি নথিপত্র, বিভিন্ন স্হানে উল্লেখিত সংকলন ও চিঠিপত্রের তথ্যের উপর নির্ভর করে এঁদের জীবনী সকলের সামনে উন্মোচিত করেছেন তিনি যাঁদের মধ্যে রাজা রাধাকান্ত দেব, কেশবচন্দ্র সেন, ডিরোজিও, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর,মহেশচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ প্রবাদপ্রতিম ব্যাক্তিত্বরা রয়েছেন।

‘সাহিত্য সাধক চরিতমালায়’ এরকম এগারোজন মনীষীদের নিয়ে আলোচনা করেছেন যোগেশচন্দ্র। ‘বাংলার নব্য সংস্কৃতি’ গ্রন্থে যেসব প্রতিষ্ঠান বাংলার নবজাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন তিনি। ‘ভারতের মুক্তিসন্ধানী’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে তাঁকে সাহিত্য জগতে পরিচিতি এনে দেয়। ১৯৫৯ সালে তিনি বিদ্যাসাগরের জীবনীর উপর ‘বিদ্যাসাগর পরিচয়’ নামে একটি গবেষণামূলক রচনা করেন। জাতীয়তাবাদী ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয় নিয়েও তিনি গ্রন্থ রচনা করেছেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ– ‘হিন্দুমেলা ইতিবৃত্ত’ এবং ‘দ্য হিষ্ট্রি অফ ইন্ডিয়ান আ্যসোসিয়েশান’, ‘জাগৃতি ও জাতীয়তা’। ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত “হিন্দুমেলার ইতিবৃত্ত” তাঁকে বিপুল খ্যাতি এনে দেয়। যে সমস্ত বিষয় ভারতের নব জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের একটি বিশিষ্ট স্হান অধিকার করা সত্ত্বেও জনমানসে বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল, সেসব বিষয়ের বিবরণ এই গ্রন্থে তুলে ধরা হয়েছে।

যোগেশচন্দ্র নিজে ডিরোজিওর শিক্ষা পদ্ধতির অনুগামী ছিলেন এবং তাঁর ছাত্রদেরও তিনি উদ্বুদ্ধ করেছেন ডিরোজিওর আদর্শে। ছাত্রদের সব কিছুকে সর্বদা যুক্তির মানদন্ডে বিচার করার জন্য উৎসাহিত করতেন তিনি। শিশুদের জন্যও তিনি প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তথাকথিত রূপকথার গল্প নয়। তিনি বিভিন্ন দেশের ইতিহাস থেকে মহৎ ব্যাক্তিদের জীবনী গল্পচ্ছলে লিখেছেন। শিশুদের ইতিহাসের প্রতি আগ্রহী করে তুলতেই তাঁর এই প্রয়াস। শিশুদের জন্য রচিত গ্রন্থগুলি হল ‘সাহসীর জয়যাত্রা’ (১৯৩৮), ‘জগৎ কোন পথে’ (১৯৩৯), ‘মার্কিন জাতির কর্মবীর’ (১৯৪১), ‘জাতির বরণীয় যারা ‘(১৯৪৩)। বাংলার মেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যোগেশচন্দ্র যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। স্ত্রী শিক্ষা প্রসারের জন্য তিনি রচনা করেন ‘বাংলার স্ত্রী শিক্ষা’ ও ‘এডুকেশন অফ ইষ্টার্ন ইন্ডিয়া’ এই গ্রন্থ দুটি।

১৯৬১ সাল নাগাদ যোগেশচন্দ্র সম্পূর্ণ রূপে দৃ‌ষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেলেন। অবশ্য এ কারণে তাঁর কাজ বন্ধ হয়নি। দৃষ্টিহীন অবস্থাতেই তিনি সম্পাদনার কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। শ্রুতিলেখনের মাধ্যমে তিনি ‘হিন্দু মেলার ইতিবৃত্ত’, ‘সাহিত্য সাধক চরিতমালা, “হান্ড্রেড ইয়ারস অফ ইন্ডিয়ান আর্ট কোলাজ” প্রভৃতি গ্রন্থ সম্পাদনা করেন। “সাহিত্য সংসদ থেকে মোট তিন খন্ডে ‘বঙ্কিম রচনাবলী’ ও “রমেশ রচনাবলী” সম্পাদনা করেছেন। তিনি শুধুই নিজে রচনা করেই থেমে থাকেননি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও তিনি সমানভাবে উৎসাহিত করেছেন ও সাহায্য করেছেন এ বিষয়ে এমনকি ছাত্রদের নিজের সংগ্রহে থাকা তথ্যাদিও ব্যবহার করতে দিতেন।

যোগেশচন্দ্র বাগল শেষ জীবনে নিউ ব্যারাকপুরে থাকতেন। নিউ ব্যারাকপুরের সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কার্যকলাপের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে ছিলে তিনি। তাঁর উদ্যোগেই নিউ ব্যারাকপুরে “সাহিত্যিকা” নামে একটি সংস্হা গড়ে ওঠে সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য।

সাহিত্য জগতে যোগেশচন্দ্রের অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে “রামপ্রাণ গুপ্ত” পুরস্কার দেওয়া হয় তাঁকে। ১৯৬২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে “সরোজিনী বসু গোল্ড মেডেল” ও ১৯৬৬ সালে অমৃতবাজার ম্যাগাজিন থেকে “শিশির পুরস্কার” প্রদান করে সম্মানিত করা হয় তাঁকে। তাঁর সম্মানে নিউ ব্যারাকপুরে প্রথম শ্রেণীর বালিকা বিদ্যালয়ের নাম “যোগেশচন্দ্র বাগল স্মৃতি বালিকা বিদ্যালয়” রাখা হয়। এছাড়া ২০০৩ সালে কলকাতা মিউনিসিপালিটি থেকে তাঁর নামে একটি রাস্তার নামকরণ করা হয় ও তাঁর একটি ব্রোঞ্জের মুর্তি বসানো হয়।

১৯৭২ সালের ৭ জানুয়ারি ব্যারাকপুরে যোগেশচন্দ্র বাগলের মৃত্যু হয় ।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

তথ্যসূত্র


  1. 'সংসদ বাঙালির চরিতাভিধান',সম্পাদক  অঞ্জলি বসু, পৃষ্ঠা নং -৪৩৮
  2. https://en.wikipedia.org/
  3. https://wikivisually.com/
  4. https://bangla24breakingnews.wordpress.com/
  5. https://books.readingbharat.com/-

1 Comment

1 Comment

  1. Pingback: আজকের দিনে ।। ২৭ মে | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়