ইতিহাস

জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল

জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল

সমগ্র বিশ্বে পদার্থবিদ্যার ইতিহাসে অত্যন্ত সুপরিচিত একটি নাম জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল (James Clerk Maxwell)। তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণের ধ্রুপদী সমীকরণের প্রণেতা হিসেবেই তিনি সমধিক পরিচিত। ১৮৬৫ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘এ ডায়নামিক্যাল থিওরি অফ দ্য ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ফিল্ড’ গবেষণাপত্রে ম্যাক্সওয়েল প্রথম বলেন যে মহাশূন্যে তড়িৎ ও চৌম্বক-ক্ষেত্র তরঙ্গের আকারে আলোর গতিবেগে চলাচল করে। ম্যাক্সওয়েলকে আধুনিক ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর জনক বলা হয়ে থাকে। তিনিই প্রথম বেতার তরঙ্গের উপস্থিতির সম্ভাব্যতার কথা প্রকাশ্যে আনেন। ১৮৬১ সালে তিনিই প্রথম স্থায়ী রঙিন ছবি প্রকাশ করেছিলেন। বিশেষ আপেক্ষিকতা এবং কোয়ান্টাম বলবিদ্যার জগতে ম্যাক্সওয়েলের অবদান আজও স্মরণীয়। অনেকেই আইজ্যাক নিউটন এবং অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের মর্যাদায় ম্যাক্সওয়েলের অবদানকে স্থাপন করে থাকেন। এমনকি ১৯২২ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে আইনস্টাইন নিজে বলেছিলেন যে, তিনি ম্যাক্সওয়েলের ঘাড়ে বসেই গোটা বিশ্বকে দেখেছেন।

১৮৩১ সালের ১৩ জুন স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় এক বিত্তশালী পরিবারে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের জন্ম হয়। তাঁর বাবা জন ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল পেশায় একজন উকিল ছিলেন এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল ফ্রান্সিস কে। ম্যাক্সওয়েলের জন্মের আগে তাঁদের এলিজাবেথ নামের একটি কন্যা সন্তানও জন্ম নিয়েছিল, কিন্তু অকালেই সে মারা যায়। ম্যাক্সওয়েলের বাল্যকালেই তাঁর পরিবার গ্লেনলেয়ারে চলে আসে নতুন নির্মিত বাড়িতে। ছোটবেলা থেকেই প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি। জন মিল্টনের দীর্ঘ কবিতা এমনকি বাইবেলের দীর্ঘ স্তুতিও তিনি অনায়াসে মুখস্থ করে ফেলতে পারতেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সেই প্রথম একটি গবেষণাপত্রে গাণিতিক গ্রাফ অঙ্কনের কিছু বিশেষ উপায় দেখিয়েছিলেন ম্যাক্সওয়েল। তাঁর সেই গবেষণাপত্র রয়্যাল সোসাইটি অফ এডিনবরায় পাঠও করা হয়েছিল। ১৮৩৯ সালে তাঁর মায়ের যখন মৃত্যু হয় তখন ম্যাক্সওয়েলের মাত্র আট বছর বয়স। মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর বাবাই মূলত ম্যাক্সওয়েলের পড়াশোনার ভার নেন।

ম্যাক্সওয়েলের প্রথাগত শিক্ষা শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী এডিনবরা অ্যাকাডেমিতে। এই সময়েই ছবি আঁকার প্রতি তাঁকে আগ্রহী করে তোলেন ম্যাক্সওয়েলের খুড়তুতো দিদি জেমিমা। ১০ বছর বয়সী ম্যাক্সওয়েলের শৈশব একাকীত্বের মধ্যেই কেটেছে। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম দিনই অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁকে ‘ড্রাফটি’ নামে ডাকতে থাকে। খুব একটা বন্ধু-বান্ধব ছিল না তাঁর। ছোটবেলা থেকেই জ্যামিতির প্রতি গভীরভাবে আগ্রহী ছিলেন জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। ১৩ বছর বয়সে স্কুল থেকে গণিত পদক অর্জন করেন তিনি এবং একইসঙ্গে ইংরেজি কবিতা পাঠে প্রথম পুরস্কার অর্জন করেন। স্কুলের পাঠ্যক্রমের বাইরেই তাঁর ভাবনা-চিন্তার জগত বিচরণ করত। ১৮৪৭ সালে ১৬ বছর বয়সে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেখানে এক বছর পড়ার পর এডিনবরায় তাঁর স্নাতকের পড়াশোনা সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেন ম্যাক্সওয়েল। সেখানে স্যার উইলিয়াম হ্যামিলটন, ফিলিপ কেল্যান্ড, জেমস ফোর্বস প্রমুখ বিখ্যাত মানুষেরা ছিলেন তাঁর শিক্ষক। ক্লাস করার কোনও বাধ্যবাধকতা না থাকায় তিনি নিজে নিজেই পড়াশোনা ও গবেষণায় মগ্ন থাকতেন। ১৮ বছর বয়সে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল দুটি গবেষণাপত্র লেখেন – ‘অন দ্য ইকুইলিব্রিয়াম অফ ইলাস্টিক সলিড’ এবং ‘রোলিং কার্ভস’। তাঁর শিক্ষক কেল্যান্ড এই গবেষণাপত্রটি রয়্যাল সোসাইটিতে পাঠ করেছিলেন। ১৮৫০ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল স্কটল্যান্ড ত্যাগ করেন। সেখানে প্রথম বছর পড়ার পরে তাঁকে ট্রিনিটি কলেজে স্থানান্তরিত করা হয়। ১৮৫১ সালে উইলিয়াম হপকিন্সের অধীনে পড়াশোনা করার সময় তাঁকে সকলেই ‘সিনিয়র র‍্যাংলার মেকার’ নামে ডাকত। ১৮৫৪ সালে ট্রিনিটি কলেজ থেকে গণিতে স্নাতক উত্তীর্ণ হন জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। সেই পরীক্ষায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করায় তিনি দ্বিতীয় র‍্যাংলার পদক পান এবং পরে কেমব্রিজ বিশ্বপবিদ্যালয় থেকে স্মিথস পুরস্কারেও ভূষিত হন তিনি। এই সময়পর্বেই ১৮৫৫ সালের মার্চ মাসে রয়্যাল সোসাইটি অফ এডিনবরায় ম্যাক্সওয়েল ‘এক্সপেরিমেন্টস অন কালার’ নামে একটি গবেষণাপত্র পাঠ করেন।

১৮৫৫ সালের শেষ দিকে ট্রিনিটি কলেজে সদস্যপদ লাভ করেন ম্যাক্সওয়েল এবং সেই সুবাদে জলস্থিতিবিদ্যা (Hydrostatics) এবং আলোকবিজ্ঞান (Optics)-এর উপর বক্তৃতা প্রস্তুত করতে হত তাঁকে আর একইসঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও তৈরি করতে হত। ২৫ বছর বয়সে এবারডিন বিশ্ববিদ্যালয়ে চেয়ার অফ ন্যাচারাল ফিলোজফি পদে নিযুক্ত হন জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। এর কিছুদিনের মধ্যেই শনি গ্রহের বলয় সম্পর্কে গবেষণা করে গাণিতিকভাবে ম্যাক্সওয়েল প্রমাণ করেন যে শনির বলয় আসলে অসংখ্য ক্ষুদ্র গ্রহাণুর সমষ্টিমাত্র যারা আসলে শনির উপগ্রহ। ফলে যেহেতু গ্রহাণুগুলি একইদিনে একই গতিতে চলে তাই একটা স্থিতিশীলতা বা ভারসাম্য বজায় থাকে বলে শনি গ্রহের সঙ্গে সেই বলয়ের মাধ্যাকর্ষণ সূত্রানুসারে কোনও রকম সংঘর্ষ হয় না। জ্যোতির্বিজ্ঞানের জগতে এমন অভাবনীয় আবিষ্কার তখনও পর্যন্ত কেউই করে উঠতে পারেননি। সেই সময় ম্যাক্সওয়েল এও বলেছিলেন যে শনির বলয়গুলি একসময় দূরে সরে যাবে। এর অনেক পরে ১৯৮০ সালে ভয়েজার মহাকাশযানের পর্যবেক্ষণ থেকেই জানা যায় যে শনির বলয় আসলে অসংখ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গ্রহাণুর সমষ্টি যা ম্যাক্সওয়েল অনেক আগেই গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেন। এরপরে লন্ডনের কিংস কলেজে অধ্যাপনা করতে শুরু করেন জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। এই কলেজে পড়ানোর সময়েই তিনি তাঁর বিখ্যাত ম্যাক্সওয়েল সমীকরণগুলি প্রকাশ করেন যা পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক ঘটনা। এই সমীকরণের সাহায্যেই প্রথম ম্যাক্সওয়েল প্রমাণ করেন যে তড়িৎ-চৌম্বক বলের কারণেই আলো, তড়িৎ এবং চৌম্বকত্বের সৃষ্টি হয়। ১৮৬১ সালে প্রকাশিত তাঁর এই সমীকরণ পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় এক নতুন দিশা দেখায়। তড়িৎ-চুম্বক তরঙ্গও আবিষ্কার করেছিলেন তিনি এবং তিনিই প্রথম দেখান যে তড়িৎ-চুম্বক তরঙ্গ এবং আলোর গতি সমান। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ক্ষেত্রে তাঁর প্রভূত অবদান রয়েছে। উইলিয়াম থমসনের সুপারিশে ১৮৬২ সালে ব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটির হয়ে তড়িৎ-চুম্বকত্বের গাণিতিক কাঠামো গড়ে তোলার কাজে নিবিষ্ট হন জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। সেই সময় মাইকেল ফ্যারাডের সঙ্গে দেখা করে তাঁর তত্ত্বের সঙ্গে অ্যাম্পিয়ার, গাউস, কেলভিন প্রমুখদের গবেষণা একত্রিত করে নিউটনীয় বলবিদ্যা, প্রবাহী বলবিদ্যা এবং তাপগতিবিদ্যার সহায়তায় ম্যাক্সওয়েল ১৮৭৩ সালে প্রকাশ করেন তাঁর অন্যতম বিখ্যাত গবেষণাপত্র ‘এ ট্রিটিস অন ইলেক্ট্রিসিটি অ্যান্ড ম্যাগনেটিজম’। এই গবেষণাপত্রেই তড়িৎ-চুম্বকত্বের চারটি সাধারণ সমীকরণ লিপিবদ্ধ করেন। বেতার তরঙ্গের অস্তিত্বের সম্ভাবনার কথাও বলেছিলেন তিনি। ম্যাক্সওয়েলই প্রথম বলেন যে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের চেয়ে ছোট বা বড় তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তরঙ্গেরও উপস্থিতি রয়েছে যাকে তিনি তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তাঁর এই অনুমান সেকালে কেউ মেনে না নিলেও, পরে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের দ্বারা এই মতবাদ সত্য বলে প্রমাণিত হয়। তবে ম্যাক্সওয়েল মনে করতেন যে মহাশূন্য আসলে কেবলই শূন্য নয়, তা ইথার দ্বারা সমসত্ত্বভাবে পরিপূর্ণ। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁর এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়।

এছাড়া জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলই প্রথম রঙিন ছবি তৈরিতে সমর্থ হন। দৃষ্টিগ্রাহ্য লাল, নীল এবং সবুজ রঙের স্কটিশ টার্টান ফিতেকে পরপর একত্রে সাজিয়ে দৃষ্টিগ্রাহ্য রঙিন ছবি তৈরি করেছিলেন তিনি। ‘বর্ণ-চক্র’ (Colour Wheel) এবং ‘বর্ণ-কুঠুরি’ (Colour Box)-র সাহায্যে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে একটি মিশ্র রঙ থেকে একেক ব্যক্তি একেক রকম রঙ দেখতে পান। গ্যাসের গতিতত্ত্ব, তাপগতিবিদ্যার জগতেও ম্যাক্সওয়েলের অবদান অনস্বীকার্য। তিনিই গ্যাসের গতিতত্ত্বের জনক। ১৮৭৪ থেকে ১৮৭৯ সালের মধ্যে হেনরি ক্যাভেন্ডিশের গবেষণাপত্রটি সম্পাদনা করেছিলেন তিনি। ১৮৬৫ সালে কিংস কলেজ থেকে পদত্যাগ করে জন্মভিটে গ্লেনলেয়ারে ফিরে যান তিনি। পরে ১৮৭১ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যাক্সওয়েল পদার্থবিদ্যার ক্যাভেন্ডিশ অধ্যাপকের পদে আসীন হন। সেখানে ক্যাভেন্ডিশ গবেষণাগারের উন্নয়নে মুখ্য কার্যনির্বাহী ছিলেন জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল। ১৮৭৬ সালে আমেরিকান ফিলোজফিক্যাল সোসাইটির সদস্য হন তিনি।

১৮৬০ সালে রঙ সংক্রান্ত ধারণার জন্য রয়্যাল সোসাইটির পক্ষ থেকে রামফোল্ড পদকে ভূষিত হন জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল।

১৮৭৯ সালের ৫ নভেম্বর কেমব্রিজে পেটের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের মৃত্যু হয়।  


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

1 Comment

1 Comment

  1. Pingback: আজকের দিনে ।। ১৩ জুন | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়