ইতিহাস

ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত

ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত (Bhupendra nath Dutta) ছিলেন একজন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী, বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী এবং নৃতত্ত্ববিদ। তিনি যুগান্তর আন্দোলনের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯০৭ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ও কারাবরণের আগে পর্যন্ত তিনি ‘যুগান্তর’ পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরবর্তী বিপ্লবী জীবনে তিনি ইন্দো-জার্মান ষড়যন্ত্রের অন্যতম ব্যক্তি হিসেবে লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিলেন। তিনি ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের ছোট ভাই। ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’ তাঁর সম্মানে ‘ডঃ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি বক্তৃতা’ উপস্থাপনা করে।

১৮৮০ সালে ৪ সেপ্টেম্বর কলকাতায় ভূপেন্দ্রনাথের জন্ম হয়৷ বাবা ছিলেন অ্যাটর্নী বিশ্বনাথ দত্ত এবং মা ভুবনেশ্বরী দেবী। তাঁদের তিন সন্তানের মধ্যে প্রবাদপুরুষ স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন জ্যেষ্ঠ সন্তান, মধ্যম সন্তান মহেন্দ্রনাথ ছিলেন সাধক এবং কনিষ্ঠ সন্তান ভূপেন্দ্রনাথ ছিলেন একাধারে বিপ্লবী, সমাজতাত্ত্বিক ও নৃতত্ত্ববিদ।

শিক্ষা জীবনের প্রথম পর্বে ভূপেন্দ্রনাথ কলকাতার মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউট থেকে এন্ট্রান্স পাস করেন। তরুণ বয়সেই তিনি কেশবচন্দ্র সেন ও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রাহ্মসমাজে যোগদান করেন। ব্রাহ্মসমাজে তিনি শিবনাথ শাস্ত্রীর সান্নিধ্যে আসেন এবং তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হন। ব্রাহ্ম সমাজের আদর্শ অনুসরণ করে ভূপেন্দ্রনাথও জাতিভেদ প্রথা, সামাজিক নানা কুসংস্কারের বিরোধী ছিলেন এবং নিরাকার ব্রহ্মে বিশ্বাসী ছিলেন। পরবর্তীকালে  তিনি ১৯০২ সালে ব্যারিস্টার প্রমথ নাথ মিত্রের ‘নিখিল বঙ্গ বৈপ্লবিক সমিতি’-তে যোগদান করেন। এই সমিতিতে তিনি ভগিনী নিবেদিতা, অরবিন্দ ঘোষ প্রমুখের সাহচর্য লাভ করেন। মাৎসিনী এবং গ্যারিবল্ডির আদর্শ তাঁর বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল৷ বড় ভাই বিবেকানন্দের রচনাও তাঁকে প্রভাবিত করেছিল।

অরবিন্দ ঘোষের সহায়তায় ভূপেন্দ্রনাথ ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বিপ্লবীদের পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক যুগান্তর’-এর সম্পাদক হিসেবে কার্যভার গ্রহণ করেন। ভারতবর্ষের মধ্যে জাতীয়তাবোধের চেতনা বাড়ানোর জন্য এই পত্রিকাটি ছাড়াও ‘সোনার বাংলা’ নামে একটি বেআইনী ইস্তেহার প্রকাশের জন্য ১৯০৭ সালে তাঁর এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। ১৯০৮ সালে জুন মাসে ভূপেন্দ্রনাথ জেল থেকে ছাড়া পান। মুক্তির পর তিনি সহকর্মীদের পরামর্শে ছদ্মবেশে আমেরিকায় পাড়ি দেন।

তাঁর জীবনের দ্বিতীয়ার্ধে ভগিনী নিবেদিতার যথেষ্ট অবদান ছিল। মাতৃসমা ভগিনী নিবেদিতা ভূপেন্দ্রনাথকে ডাকতেন ‘ভূ’ বলে। জেলে থাকাকালীনই নিবেদিতা তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন পিটার ক্রপ্টোকিনের ‘মেময়ার্স অফ আ রেভোলিউশনিস্ট’ আর ‘ইন রাশিয়ান অ্যান্ড ফ্রেঞ্চ প্রিজনস’ এবং মাৎসিনির রচনাগুচ্ছ। জেল থেকে বেরোবার পর কিছুদিন তিনি বেলুড় মঠে আত্মগোপন করেছিলেন ‘বসন্তকুমার ব্রহ্মচারী’ নামে। কারণ সেই বছরেই ১৯১৮ সালের ১১ ডিসেম্বর তৃতীয় রেগুলেশন অনুযায়ী সুবোধ মল্লিক, কৃষ্ণকুমার মিত্র, অশ্বিনীকুমার দত্ত-সহ যে দশজনের নামে আন্দামানে দ্বীপান্তরে পাঠানোর তালিকা তৈরি হয়েছিল, সেই তালিকায় ভূপেন্দ্রনাথের নামও ছিল। এরপর ১৯০৮ সালে ভগিনী ক্রিস্টিনের (প্রকৃত নাম ক্রিস্টিনা গ্রিনস্টিডেল; মার্কিন অনুরাগিনী) পরামর্শে ইংরেজ সরকারের চোখে ধুলো দিয়ে ছদ্মবেশে ভূপেন্দ্রনাথ পাড়ি জমালেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে। এই সময় তিনি ভগিনী নিবেদিতার সাহায্যে ‘ইন্ডিয়া হাউসে’ আশ্রয় পান । এরপর তিনি ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ ডিগ্রি লাভ করেন ।

আমেরিকায় থাকা কালীন তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার ‘গদর পার্টি’-তে যোগদান করেন এবং সমাজতন্ত্রবাদ সম্পর্কে  জ্ঞানলাভ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার পর তিনি বার্লিনে যান। ১৯১৬ সাল থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত তিনি ঐতিহাসিক ‘বার্লিন কমিটি’র সম্পাদক ছিলেন। ১৯১৫ সালে তিনি ছদ্মবেশে দক্ষিণ ইউরোপ পৌঁছন। বার্লিন কমিটির অনুরোধে জার্মান সরকার তাঁকে গ্রিস থেকে বার্লিনে নিয়ে আসে। তাঁর নেতৃত্বে বার্লিন কমিটি তাঁদের কর্মক্ষেত্র পশ্চিম এশিয়ায় বিস্তৃত করে। এই সমস্ত অঞ্চলে অত্যন্ত বিপদসঙ্কুল কাজে যেসব বীর ভারতবাসী প্রাণ দিয়েছেন বা কাজ করেছিলেন তাঁদের সম্পর্কে নানা তথ্য ও প্রমাণাদি চিত্রসহ তিনি তাঁর বইতে বর্ণনা করেছেন ।

বার্লিন কমিটির সদস্যদের মধ্যে ছিলেন বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, অবিনাশ ভট্টাচার্য, সি. পদ্মনাভন পিল্লাই, তাঁর ভাই চম্পকরমণ পিল্লাই, ড. ধীরেন সরকার, এন. এস. মারাঠে, ড. জে এন দাশগুপ্ত প্রমুখ। পরে এই কমিটির নাম রাখা হয়েছিল ‘ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স কমিটি’। হিন্দু-জার্মান ষড়যন্ত্রের মূলচক্রী ছিলেন এই কমিটির সদস্যরাই। সমাজতত্ত্ব এবং নৃতত্ব নিয়ে গবেষণার ফলে ১৯২৩ সালে হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়  থেকে ‘ডক্টরেট’ উপাধি পান তিনি। ১৯২০ সালে জার্মান অ্যানথ্রোপলজিক্যাল সোসাইটি এবং ১৯২৪ সালে জার্মান এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য ছিলেন ভূপেন্দ্রনাথ। ১৯২১ সালে তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের আহ্বানে বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তিনি মস্কোতে আসেন। এই অধিবেশনে মানবেন্দ্রনাথ রায় এবং বীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত উপস্থিত ছিলেন। তিনি মস্কোতেও কমিনটার্ণ-এর (Comintern) বৈঠকে যোগ দিতে গিয়ে লেনিনের হাতে তাঁর নিজস্ব গবেষণা লব্ধ সমাজতন্ত্রের প্রস্তাবনাপত্র জমা দিয়ে আসেন।

১৯২৫ সালের এপ্রিলে, দেশ ছাড়ার সতেরো বছর পরে তিনি ভারতে ফিরে আসেন এবং তাঁর কাজ শুরু করেন। এর মধ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ইন্ডিয়ান নিউজ অ্যান্ড ইনফরমেশন ব্যুরো’। ভারতে ফিরে আসার পর তিনি ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে’ যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ১৯২৭—২৮ সালে ‘বেঙ্গল রিজিওনাল কংগ্রেস’ এবং ১৯২৯ সালে অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি-র সদস্য হন। ১৯৩০ সালে করাচিতে আয়োজিত ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলনে তিনি ভারতীয় কৃষকদের জন্য একটি মৌলিক অধিকারের প্রস্তাব করেছিলেন। 

ভূপেন্দ্রনাথ দুটি ‘অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন’ কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য এরপর তিনি কারাবরণও করেন। ১৯২৬ – ১৯৩১ সালের মধ্যে কয়েকটি ট্রেড ইউনিয়ন স্থাপন করেন তিনি। ১৯৩৩ সালে  স্থাপন করলেন ‘ডিস্ট্রিক্ট কিষাণসভা’। ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘কলকাতা ট্রাম-ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’। ১৯২৯ সালে ‘বাস ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’ প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও তিনি  ১৯৩০-৩১ সালে ‘জুট ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’ ও ‘প্রেস ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’-এর সভাপতি ছিলেন। ১৯২৭-২৮ সালে ‘অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস’-এর সহ-সভাপতি হন ভূপেন্দ্রনাথ। পরবর্তীকালে ১৯৩২ সালে গঠিত ‘রেড ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস’-এর কোষাধ্যক্ষও হয়েছিলেন তিনি।

দেশে ফেরার পর ভূপেন্দ্রনাথ শুধু সারা বাংলাই কেবল নয়, ভারতেরও বিভিন্ন স্থানে পরিভ্রমণ করে মার্কসবাদের তত্ত্ব প্রচার করেছেন। আইন অমান্য আন্দোলনে জন্য কারাবরণও করেছিলেণ তিনি।

সমাজবিজ্ঞান, নৃতত্ব, ইতিহাস, সাহিত্য, বৈষ্ণবশাস্ত্র, হিন্দু আর্যশাস্ত্র, মার্কসীয় দর্শন প্রভৃতি বিষয়ে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। বাংলা, ইংরেজি, জার্মান, হিন্দি, ইরানীয় প্রভৃতি ভাষায় তাঁর অনেক রচনা প্রকাশিত হয়েছে। এই সমস্ত রচনার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য, ‘ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম’ এবং ‘Swami Vivekananda-Patriot & Prophet’৷ তাঁর লেখা বইগুলি হল -‘যুগ সমস্যা’ (১৯২৬), ‘জাতি সংগঠন’ (১৯২৮), ‘বৈষ্ণব সাহিত্যে সমাজতত্ত্ব’ (১৯৪৫), ‘Dialectics of Hindu Ritualism’ (১৯৫০), ‘Dialectics of Land Economics of India’ (১৯৫২), ‘অপ্রকাশিত রাজনৈতিক ইতিহাস’ (১৯৫৩), ‘ভারতীয় সমাজ পদ্ধতি’ (১৯৫৩), ‘Swami Vivekananda Patriot-Prophet’ (১৯৫৪),‘Hindu Law of Inheritance’ (১৯৫৭)  ইত্যাদি।

স্বাধীনতার পরে ভারত সরকারের তরফ থেকে কোনরকম ভাতা নিতে তিনি অস্বীকার করেন। শেষ জীবনে তিনি একাই থাকতেন ১৩এ, গৌরমোহন স্ট্রিটের গলিতে। দু’বেলা পাইস হোটেলে খেতেন। এই হোটেলটির নাম ছিল ‘অমিয় হোটেল’ এবং ১০ নম্বর ছিল তাঁর বাঁধা আসন।

১৯৬১ সালে ২৫ ডিসেম্বর  ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পরেও ওই আসনটি কাউকে দেওয়া হয়নি, তাঁর জন্যেই রেখে দেওয়া হয়েছে।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।