চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক্স রশ্মিকে কাজে লাগিয়ে মানব শরীরের কোনও বিশেষ অংশের অভ্যন্তরীণ অবস্থা শনাক্ত করার একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি হল সি টি স্ক্যান (C T Scan)। এক্স রশ্মি খুব সহজেই মানব শরীরের নরম কলা ভেদ করতে পারে, কিন্তু ক্যালশিয়াম ও ফসফেট দ্বারা গঠিত হাড় ভেদ করতে পারে না। ফলে এই নীতিকে কাজে লাগিয়ে ফটোগ্রাফিক প্লেটের উপর আমাদের শরীরের নির্দিষ্ট অংশ রেখে এক্স রশ্মি প্রযুক্ত করা হলে প্লেটের উপর শরীরের ঐ অংশের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। একইভাবে মস্তিষ্কের বা শরীরের অন্য কোনও অঙ্গের অভ্যন্তরীণ অবস্থা শনাক্ত করতে বিশেষ প্রযুক্তির সহায়তায় এই সি টি স্ক্যান করে থাকেন চিকিৎসকেরা।
সি টি স্ক্যান-এর পুরো কথা হল কম্পিউটেড টোমোগ্রাফি স্ক্যান (Computed Tomography Scan)। এক্স রশ্মির সাহায্যে এই সি টি স্ক্যান করা হলেও, এক্ষেত্রে শরীরের নির্দিষ্ট অংশের দ্বিমাত্রিক লম্বচ্ছেদের অনেকগুলি প্রতিচ্ছবি নেওয়া হয় এবং তা আবার বিভিন্ন দিক থেকে। সবকটি প্রতিচ্ছবি মিলিয়ে একটি ত্রিমাত্রিক রূপ হিসেবে ফটোগ্রাফিক প্লেট থেকে শরীরের ঐ অংশের অবস্থা সম্পর্কে জানা যায়। বিভিন্ন দিক থেকে নেওয়া প্রতিচ্ছবিগুলি কম্পিউটারের সাহায্যেই একটি প্লেটের মধ্যে একত্রিত অবস্থায় সাজানো হয়। এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ অঙ্গ, হাড়, নরম কলা কিংবা রক্তনালীগুলির একটি বিধৃত চিত্র পাওয়া যায়। অনেকক্ষেত্রে ক্যান্সারের শনাক্তকরণের সময়েও সি টি স্ক্যান করা হয়ে থাকে। কোনও দুর্ঘটনার পরবর্তী আপদকালীন পরিস্থিতিতে সি টি স্ক্যানের সাহায্যে অভ্যন্তরীণ ক্ষত বা আঘাত, অবিরত রক্তপাতের কারণ সম্পর্কে খুব দ্রুত জানতে পারা যায়। এই প্রক্রিয়ায় যেমন খুব বেশি সময় লাগে না, তেমনি কোনও প্রকার ব্যাথাও অনুভব করেন না রোগী। সাধারণ এক্স রে করার সময় শরীরের নির্দিষ্ট অংশের পিছন দিকে একটি ফটোগ্রাফিক প্লেট রাখা থাকে এবং একটি এক্স রশ্মি পাঠানো হয় সেই অংশকে লক্ষ্য করে যা ঐ অংশের ভিতর দিয়ে গিয়ে ফটোগ্রাফিক প্লেটে তার ছাপ ফেলে। অন্যদিকে সি টি স্ক্যানের ক্ষেত্রে এক্স রশ্মির শরীরের নির্দিষ্ট অংশের চারদিকে বৃত্তাকারে ঘোরে। এর ফলেই একই অঙ্গের বিভিন্ন দিক থেকে প্রতিচ্ছবি তোলা সম্ভব। সাধারণ এক্স-রে’র তুলনায় এই পদ্ধতিতে অনেক সূক্ষ্মতর তথ্যও নজরে আসে।
প্রাথমিকভাবে সি টি স্ক্যান করার সময় রোগীকে নির্দিষ্ট একটি গাউন বা পোশাক পরানো হয় আর তারপরে রোগীর শরীরে থাকা অলঙ্কার, ঘড়ি, অন্যান্য ধাতব জিনিস আলাদা করে রাখতে বলা হয়। এই সি টি স্ক্যান কনট্রাস্ট এজেন্ট (Contrast Agent) সহ বা এজেন্ট ব্যতীতও হতে পারে। কনট্রাস্ট এজেন্টের ব্যবহার দুভাবে হতে পারে – প্রথমত ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে কন্ট্রাস্ট মাধ্যমটি শরীরের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে, অথবা কন্ট্রাস্ট মাধ্যমের দ্রবণ খাওয়ানো হতে পারে রোগীকে। এরপর একটি বিশাল টেবিলে রোগীকে শুইয়ে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে টেবিলের একদিকে একটা বিরাট গোলাকার হাঁ করা অংশ থাকে, তার দিকে রোগীর মাথা রাখা হয়। এই স্ক্যানিং পদ্ধতি পর্যালোচনার জন্য একজন প্রযুক্তিবিদ থাকেন, প্রক্রিয়া চলাকালীন কথা বলা বা চোখ খোলা যায় না। তবে কোনও রকম সমস্যা হলে একটি বোতাম টিপে প্রযুক্তিবিদকে জানানো যেতে পারে। তাছাড়া প্রক্রিয়া চলার সময় বিভিন্ন মুহূর্তে রোগীকে শ্বাস ধরে রাখতে বলা হয়। যদি কন্ট্রাস্ট মাধ্যম ব্যবহার করা হয়, সেক্ষেত্রে রোগীর বমি ভাব, মাথা ঘোরা, মুখের মধ্যে একটা ধাতব স্বাদ অনুভূত হতে পারে। তবে সি টি স্ক্যান প্রক্রিয়া চলার সময় যদি রোগী শ্বাসকষ্ট, ঘাম হওয়া কিংবা হৃদস্পন্দনজনিত কোনও সমস্যা দেখা দেয়, তবে তা সত্বর প্রযুক্তিবিদকে জানানো উচিত। প্রক্রিয়া শেষ হলে পুনরায় টেবিলটি ঐ গোলাকার মুখের ভিতর থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাইরে বেরিয়ে আসে। তবে সি টি স্ক্যান একটি সম্পূর্ণ ব্যাথামুক্ত প্রক্রিয়া। বেশ কিছু রোগ নির্ণয়ের জন্য সি টি স্ক্যান করা হয়ে থাকে। যেমন –
- অভ্যন্তরীণ টিউমার নির্ণয়
- মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে কিনা জানার জন্য
- হৃদযন্ত্রের রোগ নির্ণয়ে অথবা হৃদপিণ্ডের রক্তবাহে কোনও প্রতিবন্ধকতা আছে কিনা জানার জন্য
- ফুসফুসের রোগ নির্ণয়ে
- কিডনি বা মূত্রসংবহনতন্ত্রের কোনও রোগ নির্ণয়ে, পিত্তথলি, অগ্ন্যাশয় বা যকৃতের কোনও রোগ নির্ণয়ে এমনকি মূত্রথলির পাথর শনাক্তকরণেও এই সি টি স্ক্যান ব্যবহৃত হয়।
তবে এই প্রক্রিয়ার সামান্য কিছু ঝুঁকির দিকও রয়েছে। যদিও এই প্রক্রিয়ায় খুবই সামান্য পরিমাণ তেজস্ক্রিয় এক্স রশ্মি বিকিরণ হয়, তবু রোগীর শরীরের ক্ষেত্রে এই মাত্রার তারতম্য ঘটলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। আবার অন্যদিকে গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের আগে থেকে জানানো হলে তারা আল্ট্রাসোনোগ্রাফি বা এম আর আই পরীক্ষার মাধ্যমে শিশুর অবস্থান জেনে নিয়ে সেই মত সি টি স্ক্যান প্রক্রিয়া চালাতে পারেন যাতে ভ্রূণস্থ শিশুর কোনও ক্ষতি না হয়। যদিও এখনও পর্যন্ত সি টি স্ক্যানের কোনও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কথা জানা যায়নি। তবে কন্ট্রাস্ট এজেন্টগুলি অনেক রোগীর ক্ষেত্রে শরীরে অ্যালার্জিজনিত বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই প্রতিক্রিয়ার মাত্রা খুব সামান্য থাকে, তবে অ্যালার্জিঘটিত সমস্যা মারাত্মক আকার নিতে পারে। তাই কোনও রোগীর কোনও প্রকার অ্যালার্জি জাতীয় সমস্যা থাকলে তা আগেই চিকিৎসককে জানানো দরকার।
বর্তমানে সি টি স্ক্যান প্রক্রিয়া আরও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হয়েছে। ফলে ফুসফুসের সমস্যার জন্য ‘হাই রেজোলিউশন সি টি স্ক্যান’ (High Resolution C T Scan), হৃদপিণ্ডের ধমনীর বিস্তৃত ছবি পাওয়ার জন্য হেলিক্যাল বা স্পাইরাল সি টি স্ক্যান (Helical or Spiral C T Scan) ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া আলট্রাফাস্ট সি টি (Ultrafast C T) এবং পজিট্রন এমিশন টোমোগ্রাফি (Positron Emission Tomography) নামেও নতুন ধরনের সি টি স্ক্যান পদ্ধতি চালু হয়েছে যা চিকিৎসাক্ষেত্রে দ্রুত ও নির্ভুল রোগ শনাক্তকরণে অত্যন্ত সহায়ক।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


Leave a Reply to আলট্রাসোনোগ্রাফি ।। ইউএসজি ।। USG | সববাংলায়Cancel reply