সববাংলায়

চাউমিন

উৎপত্তি সুদূর চীনে হলেও ভারতের ঘরে ঘরে এখন যে খাদ্যটি জায়গা করে নিয়েছে তা হল চাউমিন (Chaomin)। স্কুলে যাওয়া বাচ্চার টিফিন বক্সে হোক কিংবা সান্ধ্য আহার – চাউমিন এখন সবারই ভীষণ প্রিয় খাদ্যের মধ্যে একটা। এখন পাড়ার মোড়ে একটি চাউমিনের দোকান দেখাই যায়। এই খাবারটি যেমন সহজলভ্য তেমনই তুলনামূলক স্বল্প খরচে পাওয়া যায় বলে সকলের কাছেই কম বেশী প্রিয় হয়ে উঠেছে। চীন থেকে আসা এই খাদ্যটি কখন যে আগাগোড়া ভারতীয় রুচিতে মিশে গেছে তা বলা মুশকিল।

এই চাউমিন কেবল ভারতে নয় সারা বিশ্বজুড়ে নিজের জায়গা করে নিয়েছে। তবে প্রতিটা দেশই কমবেশি নিজস্ব রন্ধন পদ্ধতি অনুসরণ করে এই খাদ্যটিকে নিজ নিজ রুচি অনুসারে তৈরি করে নিয়েছে। আসলে এই খাদ্যটি খুব সহজেই নিজেদের মত রেসিপি অনুযায়ী রদবদল করে নেওয়া যায় আর এই কারণেই বিশ্ব জুড়ে এর এত জনপ্রিয়তা।

চাউমিন কখনও সব্জি এবং কখনও মাংস বা টফু দিয়ে ভেজে বা সিদ্ধ করে তৈরি করা হয়। চীনা ভাষায় চাওমিয়ান  (chaomian)-এর ইংরেজি রূপটি হচ্ছে চাও মেইং (‘Chao mein’)। এই উচ্চারণ এসেছে ক্যান্টোনিজ উচ্চারণ চাওমিন (Chaomin) থেকে। ইংরাজিতে এই শব্দটির প্রথম আর্বিভাব ঘটে ১৯০৬ সালে। চাউ শব্দটির অর্থ ভাজা (Stir Fried) আর Mein কথাটির অর্থ নুডলস অর্থাৎ ময়দার মণ্ড দিয়ে তৈরি এক প্রকার খাদ্য বিশেষ। নুডুলস হল ময়দা দিয়ে তৈরি এক প্রকার মন্ড যা সেদ্ধ করে খাওয়া হয়। আর মন্ডকেই যখন ভেজে ফেলা হয় এবং বানানো হয় ডিশ, যেখানে থাকে বহু স্বাদের সবজি আর সস ও অন্যান্য উপাদান তখন তাকে বলা হয় চাওমিন।

চীনের দক্ষিণ পশ্চিম শহর তাশিয়ান বা তোশিয়ান থেকে একসময় বহু মানুষ উত্তর আমেরিকার কাছে এসে বসতি স্থাপন করে। আর তাদেরই পাকশালায় একটি খাদ্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যার নাম চাওমিং৷ পরবর্তী সময়ে আমেরিকানরা তাদের ভাষায় এর নাম করে চাওমিন। ১৮৪৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়া গোল্ড রাশ যুগের গুয়াংডং প্রদেশ থেকে চীনা অভিবাসীদের দ্বারা চীন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চাউমিনের আগমন ঘটে।

এই চাউমিন রান্নারও কিন্তু প্রকারভেদ রয়েছে।  প্রতিটা দেশের বা অঞ্চল বিশেষে রন্ধনশৈলীর পার্থক্য দেখা যায়।

আমেরিকান চাইনিজ রন্ধনশৈলীতে নুডুলস বা চাউমিন ভাজা ভাজা করে রান্না করা হয়। চাউমিনে থাকে মাংস এবং পেঁয়াজের মেলবন্ধন। তবে কেবল ভাজা নয় আমেরিকায় দুই ধরনের চাউমিন পরিবেশন করা হয় তার মধ্যে একটি রয়েছে ক্রিস্পি চাউমিন এবং অপরটি স্টিমড চাউমিন। স্টিমড চাউমিন স্বভাবতই নরম টেক্সচারের হয়ে থাকে।   আর ক্রিস্পি চাউমিন তেলে ভেজে প্রস্তুত করা হয়। ক্রিস্পি চাউমিনে কিন্তু কোনও প্রকার সবজি দেওয়া হয় না কেবল পেঁয়াজ এবং মাংস দেওয়া হয়। আর  স্টিমড চাউমিনে বিভিন্ন ধরণের সবজি থাকতে পারে। সাধারণত পেঁয়াজ, গাজর, বাঁধাকপি এবং মুগ ডালের স্প্রাউটও এতে দেওয়া হয়ে থাকে। ক্রিস্পি চাউমিনে সোয়াসসের ব্যবহার লক্ষ করা যায়।

চাউমিন (“chow mein”) শব্দটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব এবং পশ্চিম উপকূল ব্যবহারের মধ্যে একটি আঞ্চলিক পার্থক্য দেখা যায়। পূর্ব উপকূলের চাউমিন সবসময় খাস্তা করে রান্না করা হয় । এই ধরনের চাউনিম রান্না করার জন্য “ডিপ ফ্রাই” করা হয়ে থাকে।  পশ্চিম উপকূলে কিন্তু চাউমিন রান্নার জন্য সবসময় ভাপা বা স্টীম পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়৷ ক্রিস্পি চাউমিন কখনও ভাতের সঙ্গে বা হ্যামবার্গার-বানেও স্যান্ডউইচ হিসাবে পরিবেশন করা হয়ে থাকে।

১৯৪৬ সালে সর্বপ্রথম ‘চুং কিং’ (Chun King) নামক একটি কোম্পানি বাজারে প্যাকেটজাত চাউমিন আনে। পণ্যটির স্রষ্টা ছিলেন ইতালীয় অভিবাসী জেনো পাউলুচি (Jeno Paulucci) ।

এই তো গেল বিদেশের কথা তবে ভারতে এবং কলকাতায় চীনেদের দ্বারাই প্রবর্তিত হয়েছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে (১৭৭৮ সাল নাগাদ) এক চীনা ব্যবসায়ী, টোং আচিউ (Tong Achew) কলকাতায় আসেন। কলকাতার কাছাকাছি এক জায়গায় তিনি বেশ কিছু জমি নিয়ে আখ চাষ শুরু করেন ও চিনি কারখানা খোলেন। সেই সময় তিনি অনেক চীনা শ্রমিক নিয়ে আসেন। আচিউ এর মৃত্যু হলে এই সব চীনা শ্রমিকেরা কলকাতায় গিয়ে বসবাস শুরু করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আচিউ এর মৃত্যুর পর এই এলাকার নাম হয় আচিপুর – যা ভারতের প্রথম চীনা বসতি। এছাড়াও চীনের রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য অনেকে চলে আসেন কলকাতায়। এই সব চীনারা ‘হাক্কা’ সম্প্রদায়ের ছিলেন। তাঁরা মূলত টেরিটিবাজার এলাকায় থাকা শুরু করেন – এখানেই শুরু হয় কলকাতার প্রথম চায়নাটাউন। পরবর্তীকালে ট্যাংরায় গড়ে ওঠে দ্বিতীয় চীনাপট্টি – বা চায়না টাউন। আর এইভাবে এই চীনাদের হাত দিয়েই কলকাতায় চাউমিনের আগমন। এখানে চাউমিন গ্রেভি সহ হাক্কা-স্টাইলে দেওয়া হয় আবার তেলে ভেজেও পরিবেশন করা হয়। প্রতিটা দেশ যেমন নতুন আসা খাদ্যদ্রব্যকে নিজেদের সংস্কৃতির রুচি অনুসারে বদল করে নেয় ভারতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। চাউমিনের চীনা অনুসঙ্গ সোয়াসস ও ভিনিগারের সঙ্গে ভারতীয় রুচির ঝাল-মশলা মিশিয়ে ‘ভারতীয় চাউমিন’ রান্না করা হয়। নিরামিষ খাবার হিসেবে চাউমিন বাঁধাকপি, মটর শুঁটি, কাঁচালঙ্কা, গাজর, বিনস সহযোগে রান্না করা হয়। আবার মাংস, পেঁয়াজ, চিংড়ির মিশ্রণেও সুস্বাদু চাউমিন ভারতে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

ছোট থেকে বড় সকলের জিভে জল আনে অনন্য স্বাদের চাউমিন। রেঁস্তেরা হোক কিংবা পাড়ার মোড়ের দোকানটা সব জায়গায়ই সমানভাবে খাওয়ার চল আছে চাউমিনের। কেবল মানুষ নয় ঠাকুরের প্রসাদেও দেওয়া হয় এই চাউমিন। ট্যাংরার চিনাপট্টির মোড়ে অবস্থিত চৈনিক কালীমন্দির ‘চিনা কালীমন্দির’ নামে খ্যাত। এখানে মা কালীকে প্রসাদ হিসেবে চাউমিন উৎসর্গ করা হয়৷

চাউমিন সুস্বাদু এবং চটজলদি আহার হিসেবে সকলের কাছে সমাদৃত হলেও চাউমিনের পুষ্টিগুণ কিন্তু নেই বললেই চলে। মাংস বা সবজির মিশ্রণে চাউমিন রান্না করা হলেও আগুনের তাপ এবং তেলের ব্যবহারে মশলার মিশ্রণে নিজস্ব গুণাগুণ তাদের কমেই যায়৷

১. চাউমিন মূলত তৈরি হয় ময়দা দিয়ে। সেই ময়দা শরীরের পক্ষে উপকারী নয়।  তাই রোজ এই খাবার খাওয়া শরীরের জন্য মোটেই ভাল নয়।

২.দীর্ঘ সময় টানা চাউমিন খেলে হজমক্ষমতা কমে যেতে পারে।

৩. চাউমিনে মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট নামক একটি রাসায়নিক মেশানো হয়। দীর্ঘ দিন এই পদার্থ শরীরে গেলে রক্তচাপ বাড়তে পারে।

৪. চাউমিন খাওয়ার ফলে বিপাকের হার কমে যায়। যার ফলে অনেক সময় দ্রুত ওজন বৃদ্ধি পায়।

৫.চাউমিনে থাকে প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম। এর ফলে রক্তচাপ বেড়ে হৃদ্‌রোগের আশঙ্কাও বেড়ে যায়।

৬.  চাউমিন বেশি পরিমাণে খেলে খিদে কমিয়ে দেয়, পুষ্টিগুণ না থাকায় শরীরের কোনও লাভ হয় না।

রোজ চাউমিন খাওয়া এড়িয়ে যাওয়াই স্বাস্থ্যকর। তবে স্বাদ বদলের জন্য অবশ্য এই মুখোরোচক খাদ্যটি খাওয়াই যায়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading