ইতিহাস

চার্লস অগাস্টিন ডি কুলম্ব

চার্লস অগাস্টিন ডি কুলম্ব

ফরাসি ইঞ্জিনিয়ার এবং পদার্থবিজ্ঞানী চার্লস অগাস্টিন ডি কুলম্ব (Charles Augustin De Coulomb) বিজ্ঞানের জগতে ‘কুলম্বের সূত্র’ প্রণয়নের জন্যেই বিখ্যাত। তিনিই প্রথম দুটি তড়িদাহিত কণার মধ্যেকার আকর্ষণ বল এবং কণা দুটির মধ্যবর্তী দূরত্বের মধ্যে একটি সম্পর্কের কথা বলেন। তাছাড়া ঘর্ষণ বল নিয়েও কাজ করেছেন তিনি। এই ক্ষেত্রে গণিতের একটি বিশেষ উন্নত কৌশল ব্যবহার করে বাড়ি-ঘর নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত উপাদানের ঘর্ষণ বল নির্ণয় করেছিলেন চার্লস কুলম্ব। সেই উন্নত গাণিতিক পদ্ধতিটির নাম ছিল পরিবর্তনশীল ক্যালকুলাস (Variational Calculus)। তাঁর প্রণীত কুলম্বের সূত্রই প্রথম স্থির তড়িৎ বলের কথা প্রকাশ্যে আনে। ১৮৮০ সালে তাঁর সম্মানে স্থির তড়িৎ আধানের এস আই এককের (S.I Unit) নাম রাখা হয় ‘কুলম্ব’।

১৭৩৬ সালের ১৪ জুন ফ্রান্সের অ্যাঙ্গোমুইস প্রদেশের রাজধানী অ্যাঙ্গোউলেমে চার্লস অগাস্টিন ডি কুলম্বের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম হেনরি কুলম্ব এবং মায়ের নাম ক্যাথারিন বাজেট। কুলম্বের বাবা পারিবারিকভাবে আইনি পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং ফ্রান্সের ল্যাঙ্গুইডক প্রদেশের প্রশাসনের অংশ ছিলেন। অন্যদিকে কুলম্বের মাও একইরকম ধনী পরিবারের কন্যা ছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁদের পরিবার প্যারিসে চলে আসে।

প্যারিসের কলেজ মাজারিনে কুলম্বের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয়। প্রাথমিক পর্বে চার্লস অগাস্টিন ডি কুলম্ব দর্শন, ভাষা এবং সাহিত্য বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। তাছাড়া গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, রসায়ন এবং উদ্ভিদবিদ্যা বিষয়েও বহু জ্ঞান অর্জন করেন তিনি। কিন্তু বাবার অর্থনৈতিক অবস্থা হঠাৎ খারাপ হয়ে পড়ায় প্যারিস ছাড়তে বাধ্য হন তিনি এবং কুলম্ব সেই সময় চলে আসেন মন্টপিলিয়ারে। এই সময়পর্বেই চার্লস অগাস্টিন ডি কুলম্ব মন্টপিলিয়ারের সায়েন্স সোসাইটিতে যোগ দেন এবং সেখানে প্রথম একটি বিজ্ঞান-সম্পর্কিত গবেষণাপত্র জমা করেন। তাছাড়া এই সোসাইটিতে গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার উপর বহু গবেষণাপত্র পড়ারও সুযোগ পান তিনি। পরে আবার তিনি প্যারিসে ফিরে যান এবং ১৭৬০ সালে ‘ইকোলে রয়্যাল ডু জিনি ডি মেজারিস’ (Ecole Royale Du Genei De Mezieres) প্রতিষ্ঠানের প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তবে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য তিনি ১৭৫৮ সাল থেকে প্যারিসে কাম্যু নামের এক শিক্ষকের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন বেশ কয়েক মাস ধরে। ১৭৬১ সালে স্নাতক উত্তীর্ণ হন তিনি।

এরপরে প্রথমে ফরাসি সেনাবাহিনীতে একজন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে লেফটেন্যান্ট পদে যোগ দেন চার্লস অগাস্টিন ডি কুলম্ব। পরবর্তী ২০ বছর ধরে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁকে কাজ করতে হয়েছে। কখনও ইঞ্জিনিয়ারিং, কাঠামোগত দুর্গ-নির্মাণবিদ্যা (Structural Fortifications), মৃত্তিকা বলবিদ্যা (Soil Mechanics) ছাড়াও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আরও নানা ক্ষেত্রে কাজ করেছিলেন কুলম্ব। প্রথমে তাঁকে ব্রেস্ট অঞ্চলে পাঠানো হয় কাজের জন্য, কিন্তু ১৭৬৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মার্টিনিকে তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে তাঁকে বাওয়ারবন দুর্গ নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৭৭২ সাল পর্যন্ত এই কাজেই যুক্ত ছিলেন চার্লস অগাস্টিন ডি কুলম্ব। কিন্তু কাজ শেষের তিন বছর তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে যার কারণে বাকি জীবনটা ভুগতে হয়েছিল কুলম্বকে।

ফ্রান্সে ফিরে এলে কুলম্বকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বুচেইনে। এই সময় থেকেই প্রায়োগিক বলবিদ্যার বিষয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ লেখাপত্র লিখতে শুরু করেন তিনি এবং ১৭৭৩ সালে প্যারিসের ‘অ্যাকাডেমি ডেস সায়েন্সস’-এ তিনি তাঁর প্রথম গবেষণাপত্র পাঠ করার সুযোগ পান। ১৭৭৯ সালে কুলম্বকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় রোচফোর্টে যেখানে মার্কুইস ডি মন্টালেমবার্টের সঙ্গে একত্রে লিড-এইক্সের কাছে একটি কাঠের দুর্গ  নির্মাণের কাজে সহায়তা করতে হত কুলম্বকে। রোচফোর্টে থাকাকালীন বলবিদ্যার বিষয়ে বহু গবেষণা করতে থাকেন কুলম্ব এবং রোচফোর্টের জাহাজবন্দরগুলিকেই তিনি নিজের গবেষণাগার বানিয়ে নিয়েছিলেন। ১৭৭৯ সালে ঘর্ষণের সূত্র বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন তিনি। তরলের রোধ বিষয়ে এর কুড়ি বছর পরে আরেকটি একইরকম গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছিলেন তিনি। ফ্রান্সে ফিরে এসে ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত হয়েছিলেন কুলম্ব, এই সময় তাঁকে লা রোচেলে কাজে নিযুক্ত করা হয়। তিনি প্রথম আবিষ্কার করেন যে, দুটি তড়িদাহিত কণার বা বস্তুর মধ্যেকার আকর্ষণ বল এবং তাদের মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের মধ্যে একটি ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক রয়েছে। একইরকমভাবে চৌম্বকীয় মেরুর মধ্যেও এই সম্পর্ক আবিষ্কার করেন তিনি। এই সম্পর্ক থেকেই পরে তিনি কুলম্বের সূত্র প্রণয়ন করেন যা স্থির তড়িৎ বিজ্ঞানের জগতে আলোড়ন ফেলে দেয়। ১৭৮১ সালে কিছু সময়ের জন্য প্যারিসে ছিলেন তিনি। ১৭৮৪ সালে কুলম্বের লেখা বিখ্যাত বই ‘থিওরিটিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টেশন অন টরসান অ্যান্ড দ্য ইলাস্টিসিটি অফ মেটাল ওয়্যার’ প্রকাশ পায় যেখানে ধাতব তারের উপর টরসনাল বলের (Torsional Force) প্রভাব সম্পর্কে বিশদে আলোচনা করেছিলেন। এর পরের বছর ১৭৮৫ সালে তড়িৎ এবং চুম্বকত্বের উপর তাঁর প্রথম তিনটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন কুলম্ব। ১৭৮৭ সালে টেনন নামের এক সহযোগীর সঙ্গে স্টোনহাউজের রয়্যাল ন্যাভাল হসপিটাল পরিদর্শন করেন কুলম্ব এবং সেখানকার বৈপ্লবিক প্যাভিলিয়ন নির্মাণের শৈলী লক্ষ্য করে সেই বিষয়টি ফরাসি সরকারের গোচরে আনেন তিনি। ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব দেখা দিলে কুলম্ব নিজের পদ থেকে ইস্তফা দেন। পরে আবার তাঁকে প্যারিসে ডেকে আনা হয় নতুন করে ওজন ও পরিমাপের নির্ধারণের বিষয়টি দেখাশোনা করার জন্য। ফ্রেঞ্চ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটের প্রথম সদস্য হন তিনি এবং ১৮০২ সালে তাঁকে ইন্সপেক্টর অফ পাবলিক ইনস্টিটিউশন পদে তাঁকে নিযুক্ত করা হয়। তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থা তখনও খুবই দুর্বল। ‘জিওটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ (Geotechnical Engineering) বিষয়ে চার্লস অগাস্টিন ডি কুলম্ব প্রাচীরের স্থায়ী নক্‌শা প্রবর্তনের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। আইফেল টাওয়ারে খোদিত এমন ৭২ জন বিখ্যাত ব্যক্তির তালিকার মধ্যে তাঁরও নাম রয়েছে।

তাঁর লেখা অন্যান্য বিখ্যাত প্রতিবেদনগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘অন ম্যাগনেটিজম’ (১৭৮৯)। এছাড়াও ১৭৮৬ থেকে ১৭৮৯ সালের আগে পর্যন্ত আরও তিনটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল কুলম্বের। ‘ট্রাইবোলজি’ বা ঘর্ষণবিদ্যার (Tribology) জগতেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। এই ক্ষেত্রে তাঁর মেধা এবং পাণ্ডিত্যের কারণে ডানকান ডাউসন তাঁকে ২৩ জন ‘মেন অফ ট্রাইবোলজি’-র অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি দেন।

১৮০৬ সালের ২৩ আগস্ট ফ্রান্সের প্যারিসে ৭০ বছর বয়সে চার্লস অগাস্টিন ডি কুলম্বের মৃত্যু হয়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়