ছৌ নাচ একপ্রকার ভারতীয় আদিবাসী যুদ্ধ নৃত্য যাকে ইউনেস্কো মানবতার অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের (Intangible Cultural Heritage of Humanity) তালিকাভুক্ত করেছে। এই ছৌ নাচ পূর্ব ভারতের একটি জনপ্রিয় লোকনৃত্য। ছৌ নাচের উৎপত্তিস্থল অনুযায়ী একে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে; যথা – ময়ূরভঞ্জ ছৌ যার উৎপত্তিস্থল ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলা, পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার পুরুলিয়া ছৌ, ঝাড়খন্ডের সরাইকেল্লা ছৌ।
অঞ্চলভেদে আঞ্চলিক উচ্চারণ অনুযায়ী ‘ছৌ ‘ কথাটি বিভিন্নভাবে সুপরিচিত, যেমন: ‘ছো’, ‘ছ’, ‘ ছট’, ‘ছাউ’। তবে ‘ছৌ’ নামটি সকলের কাছে বেশি পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া ও মেদিনীপুরের ছৌ এর অর্থ হল ‘ঢং করা’। বিভিন্ন মত অনুসারে ছৌ নাচ “ছয় নাচের সমাহার” বলে মনে করা হয়। ওড়িশার ছৌ এর অর্থ হলো “গোপনে শিকারের অনুসরণ করা”। রামায়ণ ও মহাভারতের বিভিন্ন ঘটনা, যুদ্ধ, পৌরাণিক কাহিনী ছৌ নাচের মধ্যে দিয়ে অভিনয় করে দেখানো হয়। এছাড়াও প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে জড়িত ঘটনাও এই ছৌ নাচের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়।
ছৌ নাচের মধ্যেও পার্থক্য লক্ষ করা যায়। ময়ূরভঞ্জ ছৌ, সরাইকেল্লা ছৌ, পুরুলিয়া ছৌ এই তিন ধরনের ছৌ নাচে বিশেষ পার্থক্য হিসেবে পুরুলিয়া আর সরাইকেল্লা ছৌ নাচে মুখোশ ব্যবহৃত হলেও ময়ূরভঞ্জ ছৌ নাচে কোনো মুখোশ ব্যবহার করা হয় না। সব ছৌ নাচে যুদ্ধের কৌশল রপ্ত করা, শিকার করার কৌশল রপ্ত করার মিল রয়েছে।
ছৌ নাচের উৎপত্তিস্থল নিয়ে মতান্তর রয়েছে – বিশেষত বাংলা, ওড়িশা, ঝাড়খন্ডের গবেষকরা যা যার নিজের রাজ্যকেই এর উৎপত্তিস্থল বলে প্রমাণ করতে চান। তবে এর কোন নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি,তবে বর্তমানের ছোটনাগপুর অঞ্চল, মানভূম, ময়ূরভঞ্জ আগে মোটামুটি একই ভৌগলিক এলাকার মধ্যেই পড়ত তাই এর মধ্যে ঠিক কোথায় প্রথম এই নাচ এর সূচনা হয়েছিল তা বলা যায় না।
ছৌ নাচের উৎপত্তি ও বিকাশ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ঐতিহাসিকেরা মনে করেন – প্রাচীনকালের মানুষ সম্পূর্ণরূপে প্রকৃতির উপরেই নির্ভরশীল ছিলেন। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মোকাবিলা করার মত কোন সাহস বা শক্তি তাঁদের ছিল না। প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে মহা শক্তি হিসেবে পূজা অর্চনা করতেন তাঁরা। মনের ভক্তি ও শ্রদ্ধার উপর নির্ভর করে প্রকৃতিকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে এক বিশেষ ধরনের নৃত্য পরিবেশন করতেন। ব্যবহার করা হত মুখোশও। প্রাচীনকালের সমাজের বিভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে এই ছৌ নৃত্যের মাধ্যমে।
জীবনযাপনের জন্য শিকার করার মত দুঃসাহসিক কাজ করতে হতো দুর্গম বন, জঙ্গল, পাহাড়, ঝর্ণা পেরিয়ে। বন্য পশুপাখির অঙ্গভঙ্গিও নকল করতে শিখেছিলেন তাঁরা। হিংস্র বাঘ, সিংহের হাত থেকে বাঁচার জন্য মুখোশের ব্যবহার করতেন। প্রতিদিন যুদ্ধ করেই বেঁচে থাকতে হত। যুদ্ধের বিভিন্ন কৌশলও ছৌ নাচের মধ্যে লক্ষ করা যায়। শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আর আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে প্রাচীনকালে এই ছৌ নাচ বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। আর সেই জন্যই ছৌ নৃত্যকে ‘যুদ্ধ নৃত্য’ হিসেবেও অনেকেই জানেন। যুদ্ধে জয়লাভ করার জন্য ছৌ নাচ মহড়ার কাজ করত।
তখনকার মানুষজন আনন্দ, আবেগ, উল্লাস, উচ্ছ্বাস আর মনের ভয় দূর করার জন্য নিজেদের খুবই শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তুলতেন। এক্ষেত্রেও এই ছৌ নাচ ছিল তাঁদের একমাত্র অবলম্বন।
মূলত প্রকৃতি ও জীবনধারণের বিভিন্ন বিষয় ছৌ নাচের প্রভাব থেকে ছৌ নাচের উৎপত্তি ও বিকাশ হলেও ঐতিহাসিকদের মতে রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনীর অনুপ্রবেশ ব্রিটিশরা ঝাড়খন্ড-মানভূম অংশে আধিপত্য কায়েম করার পর সভ্য মানুষের সংস্পর্শে আসার পর হয়েছে।
ছৌ নাচে ব্যবহৃত সব থেকে প্রয়োজনীয় অংশ হলো মুখোশ, কেননা মুখোশ এই নাচের ঐতিহ্য। মুখোশের পাশাপাশি রাজকীয় পোশাকে সেজে ওঠেন ছৌ নৃত্যশিল্পীরা। কারুকার্যময় মুখোশ তৈরি করতে বেশ অনেকদিন সময় লাগে। খুবই সাধারণ এবং সামান্য জিনিসপত্র দিয়েই তৈরি করা হয় ছৌ নাচের মুখোশ। এই মুখোশ তৈরি করার জন্য কাগজের মন্ড দিয়ে ছাঁচে ঢেলে কোনো চরিত্রের মুখের রূপের আদল দেওয়া হয়। তারপর শুকিয়ে গেলে মুখোশটিকে সুন্দর করে সাজানো হয় মুকুট, চুমকি, বিভিন্ন রংবেরঙের পাথর ও কাপড়ের লেস দিয়ে। রংবেরঙের মুখোশগুলি রঙিন ও আকর্ষণীয় করে তোলা হয় মুখোশ শিল্পীর তুলির টানে।
আকারে বড় মুখোশগুলি ধারণ করার জন্য একজন দক্ষ শিল্পীর প্রয়োজন পড়ে। রঙিন পোশাক, রঙিন উজ্জ্বল মুখোশ পরে ছৌ নাচের মাধ্যমে শিল্পীরা তাঁদের দক্ষতা আর অভিনয় দিয়ে দর্শকদের মন জয় করে নেন।
অন্যান্য নাচে যেমন বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয়, তেমনি ছৌ নাচে নানা বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার করা হয়। গান ও বাজনা সহযোগে এই লোকনৃত্য সকলের সম্মুখে পরিবেশন করা হয়। ছৌ নাচের একটি বিশেষত্ব হল প্রথমে গণেশ বন্দনার মধ্যে দিয়ে যাঁরা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে থাকেন তাঁরা নাচের পরিবেশ সৃষ্টি করেন। ছৌ নাচে যে সমস্ত প্রাচীন চিরাচরিত বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয় সেগুলি হল: চড়চড়ি, মাহুরি, ধামসা, ঢোল প্রভৃতি। কিন্তু বর্তমানে ছৌ নাচে বিভিন্ন আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার করা হয়, যেমন: পাখোয়াজ, বাঁশি, মৃদঙ্গ, সানাই প্রভৃতি।
ছৌ নাচের মূল বিষয় বা রস হল বীর ও রুদ্র। এই লোকনৃত্যের মধ্যে প্রতিটি দৃশ্যের একেবারে প্রথমে ঝুমুর গানের মাধ্যমে সম্পূর্ণ পালার বিষয়বস্তুটি সংক্ষেপে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। ছৌ নাচের মধ্যে দিয়ে নাচের শেষে দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন অর্থাৎ ধর্মের জয় দেখানো হয়। ছৌ নাচে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কম্পন, সংকোচন ও প্রসারণ এর মাধ্যমে চরিত্রের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন শিল্পীরা। কেননা মুখে মুখোশ থাকার কারণে মুখের অভিব্যক্তি প্রকাশ পায় না। প্রতিটি নাচের যেমন একটি নির্দিষ্ট ছন্দ, তাল থাকে তেমনি ছৌ নাচের অঙ্গ সঞ্চালন কিছু নিয়ম ও ছন্দ মেনে করতে হয়। আর এই অঙ্গ সঞ্চালনকে পাঁচটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। যেমন: স্কন্ধ সঞ্চালন, বক্ষ সঞ্চালন, মস্তক সঞ্চালন, উল্লম্ফন এবং পদক্ষেপ। নাচের ছন্দ ও পায়ের সূক্ষ্ম কাজ শরীরের বিভিন্ন অংশের অভিব্যক্তি গুলি দিয়েই সেই চরিত্রের অভিনয় ফোটাতে হয়।
প্রাচীনকালে কেবলমাত্র পুরুষশিল্পীরাই ছৌ নাচে অংশগ্রহণ করতে পারতেন, কিন্তু বর্তমানে ছৌ নাচে নারী-পুরুষ সকলেই কমবেশি অংশগ্রহণ করেন। ছৌ নৃত্যের শিল্পীরা কোনরকম সংলাপ উচ্চারণ করেন না। সেই কারণে কণ্ঠসঙ্গীতের স্থান এই ছৌ নৃত্যে নেই বললেই চলে। বাজনার তালে হাত ও পায়ের সঞ্চালন কে ‘চাল’ বলা হয়। ছৌ নাচে ‘বীরচাল’, ‘দেব-চাল’, ‘পশু চাল’, ‘রাক্ষস চাল’ প্রভৃতি বিভিন্ন রকমের ‘চাল’ রয়েছে। এই চালগুলি ‘ডেগা’, ‘ফন্দি’, ‘উড়ামালট’, ‘উলফা’, ‘মাটি দলখা’, ‘বাঁহিমলকা’ প্রভৃতি বিভাগে বিভক্ত।
ছৌ নৃত্যের দেহভঙ্গিতে আক্রমণ, প্রতিরোধ ও যুদ্ধের প্রস্তুতি লক্ষ করা যায়। এরপর লাফ দিয়ে শূন্য থেকে এক হাঁটু বা দুই হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে পড়া। লাফ দিয়ে শূন্যে ঘোরা, বাঘ, সিংহ, ঘোড়া, হনুমানের অনুকরণে লাফ দেওয়া প্রভৃতি বিভিন্ন প্রক্রিয়া ছৌ নাচে লক্ষ করা যায়। ছৌ নৃত্যে পর্যায়ক্রমে ‘বিলম্বিত’, ‘মধ্য’, ‘দ্রুততাল’ বা ‘লয়’কে অনুসরণ করা হয়।
নিঃসন্দেহে ছৌ নাচ খুবই কঠিন নাচ। নৃত্যশিল্পীদের অনেকটাই কষ্ট করতে হয় এই নাচের জন্য। ছৌ নাচের সমস্ত তাল, ছন্দ, নিয়ম মেনে অভিনয় ফুটিয়ে তোলা সকলের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। রাজকীয় সাজসজ্জা, মুখোশ সবকিছু মিলিয়ে ছৌ নাচের সরঞ্জাম অনেক। ছৌ নৃত্য শিল্পী থেকে শুরু করে মুখোশ নির্মাতারাও অনেক পরিশ্রম করেন।
একজন বিখ্যাত ভারতীয় ছৌ নৃত্যশিল্পী ছিলেন গম্ভীর সিং মুড়া, তিনি তাঁর ছৌ নৃত্যের জন্য ভারত সরকার দ্বারা পদ্মশ্রী উপাধিতে ভূষিত হন। এছাড়াও আরও অনেক ছৌ নৃত্যশিল্পী রয়েছেন, তাঁরা হলেন: শম্ভুনাথ কর্মকার, হেম মাহাতো, ভুবনকুমার, দেবী লাল কর্মকার, জগন্নাথ চৌধুরী, মৌসুমী চৌধুরী, বীরেন কালিন্দী, বীনাধর কুমার, কার্তিক সিং মুড়া, অনিল মাহাতো, বাঘাম্বর সিং মুড়া।
কোনও নৃত্য যখন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জনপ্রিয়তা লাভ করে তখন সেটি লোকনৃত্যে পরিণত হয়। লোকনৃত্য প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত সমানভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীনকালের সংস্কার, বিশ্বাস, ঐতিহ্য, প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকার প্রয়াস এই সবকিছুর মধ্যে এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মে এই ছৌ নাচ বিশেষ প্রভাব ফেলে। সময় যত উন্নত হয়ে চলেছে ততই এই লোকনৃত্যের প্রসার কমতে শুরু করেছে। অনেক জায়গায় এই নৃত্য লুপ্তপ্রায়। তবে আজও অনেক জায়গায় স্ব-গৌরবে অনুষ্ঠিত হয় ছৌ নাচ। ২০১০ সালে ছৌ নৃত্যকে ইউনেস্কো মানবতার অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের (Intangible Cultural Heritage of Humanity) তালিকাভুক্ত করেছে। এছাড়া কেন্দ্র ও এই তিনটি রাজ্য সরকার এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে নানারকম পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে যা বর্তমান প্রজন্মকে প্রাচীনকালের এই ঐতিহ্য সম্পর্কে উৎসাহিত করছে।


আপনার মতামত জানান