আমরা প্রতিদিনই বিদ্যুৎ ব্যবহার করি — আলো জ্বালি, ফোনে চার্জ দিই, ফ্যান চালাই ইত্যাদি। কিন্তু খুব কমই ভাবি, এই বিদ্যুৎ আমাদের ঘরে পৌঁছায় কীভাবে? অনেকেই বলবেন তার দিয়ে। তারের ভিতর যে ধাতু থাকে তা বিদ্যুৎ বহন করে, অধাতব পদার্থ সাধারণত বিদ্যুৎ পরিবহন করে না। আবার যেকোন ধাতুই বিদ্যুতের সুপরিবাহী সুপরিবাহী নয়। বিশেষ কিছু ধাতু আছে যারা বিদ্যুতের সুপরিবাহী, আর কিছু নয়। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, কিছু পদার্থ বিদ্যুতের সুপরিবাহী আর কিছু নয় কেন?
সাম্প্রতিক পোস্ট
বিদ্যুৎ পরিবাহী — এই শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে তামার তার, বৈদ্যুতিক মোটর কিংবা রূপার জটিল সার্কিট। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সব ধাতু কি সমানভাবে বিদ্যুৎ পরিবাহী? উত্তর হলো না। কিছু ধাতু খুব সহজেই বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে যাদের আমরা বলি বিদ্যুতের সুপরিবাহী, আবার কিছু পদার্থ তুলনামূলকভাবে কম বিদ্যুত পরিবহন করে তাদের আমরা বলি বিদ্যুতের কুপরিবাহী। কেন এই পার্থক্য ঘটে, তা বোঝার জন্য আমাদের ঢুকতে হবে পদার্থবিজ্ঞানের গভীরে — ইলেকট্রনের প্রকৃতি, ব্যান্ড থিওরি এবং পরমাণুর কাঠামোর জগতে।
কঠিন পদার্থের বিদ্যুৎ পরিবাহিতার মূল ভিত্তি হলো মুক্ত ইলেকট্রনের উপস্থিতি। পদার্থের পরমাণুতে বাইরের কক্ষের যে ইলেকট্রনগুলো আলগা হয়ে পদার্থের ভিতরে সহজে চলাচল করতে পারে তাদের মুক্ত ইলেকট্রন বলে। এই মুক্ত ইলেকট্রনই বিদ্যুৎ প্রবাহ ঘটায়। যে ধাতুতে বেশি মুক্ত ইলেকট্রন থাকে, সেটি তত বেশি বিদ্যুৎ পরিবাহক হয়। উদাহরণস্বরূপ, রূপা (Ag) ও তামা (Cu)-তে প্রচুর মুক্ত ইলেকট্রন থাকে, তাই তারা চমৎকার পরিবাহক।
এবার সহজে বুঝে নেওয়া যাক ইলেকট্রন ব্যান্ড থিওরির ব্যাপারটা। ধাতুর ইলেকট্রন ব্যান্ডে দুটি স্তর থাকে— ভ্যালেন্স ব্যান্ড (Valence Band) এবং কণ্ডাকশন ব্যান্ড (Conduction Band)। ভ্যালেন্স ব্যান্ড হলো সেই শক্তিস্তর যেখানে পরমাণুর ইলেকট্রনগুলো সাধারণত অবস্থান করে। এগুলো মূলত পরমাণুর সাথে বাঁধা থাকে এবং খুব সহজে নড়াচড়া করতে পারে না। অন্যদিকে কণ্ডাকশন ব্যান্ড হলো সেই শক্তিস্তর যেখানে ইলেকট্রন স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারে। একবার ইলেকট্রন এই ব্যান্ডে চলে গেলে তারা আর পরমাণুর সাথে বাঁধা থাকে না, বরং পদার্থের মধ্যে অবাধে ঘুরে বেড়ায়। এই চলাচলই আসলে বিদ্যুৎ প্রবাহ তৈরি করে। ধাতুতে ভ্যালেন্স ব্যান্ড প্রায়ই কণ্ডাকশন ব্যান্ড-এর সাথে মিলেমিশে থাকে, ফলে ভ্যালেন্স ব্যান্ড-এর ইলেকট্রন সহজেই কণ্ডাকশন ব্যান্ড-এ চলে যায় এবং বিদ্যুৎ পরিবহন ঘটে। সেমিকন্ডাক্টর বা অর্ধপরিবাহীতে ভ্যালেন্স ব্যান্ড আর কণ্ডাকশন ব্যান্ড-এর মধ্যে ছোট একটা ফাঁক থাকে, যাকে ব্যাণ্ড গ্যাপ (Band Gap) বলে। তাপ বা আলো দিলে ইলেকট্রন সেই ফাঁক পার হয়ে কণ্ডাকশন ব্যান্ড-এ যেতে পারে। কিন্তু ইনসুলেটর বা অপরিবাহীতে ব্যাণ্ড গ্যাপ অনেক বড় হয়, তাই সাধারণ অবস্থায় ইলেকট্রন কণ্ডাকশন ব্যান্ড-এ যেতে পারে না, ফলে বিদ্যুৎ পরিবাহিতা প্রায় শূন্য হয়। সহজভাবে বললে, ভ্যালেন্স ব্যান্ড হলো ইলেকট্রনের “বসার জায়গা”, কণ্ডাকশন ব্যান্ড হলো ইলেকট্রনের “দৌড়ানোর মাঠ”, আর ব্যাণ্ড গ্যাপ হলো এই দুইয়ের মাঝের “দেয়াল”।
ধাতুর বিশুদ্ধতাও পরিবাহিতায় বড় ভূমিকা রাখে। বিশুদ্ধ ধাতুতে ইলেকট্রনের চলাচল বাধাহীন হয়, ফলে পরিবাহিতা বেশি থাকে। কিন্তু যদি ধাতুতে অন্যান্য উপাদান মিশে যায়, যেমন ব্রোঞ্জ বা স্টেইনলেস স্টিলের মতো সঙ্কর ধাতুতে ইলেকট্রনের চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়। অ্যালয়ে পরমাণুর বিন্যাসে বিশৃঙ্খলা থাকে, যা ইলেকট্রনের প্রবাহকে ব্যাহত করে। তাই অ্যালয় সাধারণত কম পরিবাহী হয়।
তাপমাত্রার প্রভাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তাপমাত্রা বাড়লে ধাতুর পরমাণু আরও বেশি কাঁপতে থাকে, ফলে ইলেকট্রনের গতি বাধাগ্রস্ত হয়। তাই অধিকাংশ ধাতুতে তাপমাত্রা বাড়লে পরিবাহিতা কমে যায়। তবে কিছু বিশেষ ধাতু ও পদার্থ আছে যেগুলোকে আমরা সুপারকন্ডাক্টর বলি — অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় এদের প্রতিরোধ শূন্য হয়ে যায় এবং বিদ্যুৎ প্রবাহ বাধাহীনভাবে চলতে পারে। সুপারকন্ডাক্টরের এই বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিপ্লব ঘটিয়েছে।
বাস্তব জীবনে প্রয়োগ
- তামা (Cu): বৈদ্যুতিক তার, মোটর, ট্রান্সফরমার — প্রায় সব জায়গায় তামা ব্যবহৃত হয় কারণ এটি সস্তা ও কার্যকর পরিবাহক।
- রূপা (Ag): খুব ভাল পরিবাহক হলেও দাম বেশি হওয়ায় সীমিত প্রয়োগ আছে। উচ্চমানের সার্কিট, সেন্সর বা বিশেষ বৈজ্ঞানিক যন্ত্রে ব্যবহৃত হয়।
- অ্যালুমিনিয়াম (Al): হালকা ও সস্তা হওয়ায় বিদ্যুৎ পরিবাহক হিসেবে ট্রান্সমিশন লাইনে ব্যবহৃত হয়।
- অ্যালয়: স্টেইনলেস স্টিল বা ব্রোঞ্জের মতো ধাতুতে পরিবাহিতা কম হলেও এরা শক্তিশালী ও টেকসই, তাই যান্ত্রিক কাজে বেশি ব্যবহৃত হয়।
সুপারকন্ডাক্টরের ব্যবহার
সুপারকন্ডাক্টর হলো এমন পদার্থ যা অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় বিদ্যুৎ প্রবাহকে কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই বহন করতে পারে। এর ফলে শক্তি ক্ষয় হয় না। বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ অসাধারণ:
- MRI মেশিন: সুপারকন্ডাক্টর ব্যবহার করে শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করা হয়।
- ম্যাগলেভ ট্রেন: সুপারকন্ডাক্টরের কারণে ট্রেন ট্র্যাকের ওপর ভেসে চলে, ঘর্ষণ কমে যায় এবং গতি বেড়ে যায়।
- কোয়ান্টাম কম্পিউটার: সুপারকন্ডাক্টর ব্যবহার করে কোয়ান্টাম বিট (qubit) তৈরি করা হয়, যা ভবিষ্যতের কম্পিউটিংকে বদলে দিতে পারে।
- শক্তি সঞ্চয় ও ট্রান্সমিশন: সুপারকন্ডাক্টর দিয়ে বিদ্যুৎ পরিবাহনের সময় কোনো শক্তি ক্ষয় হয় না, ফলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটতে পারে।
বিদ্যুৎ পরিবাহিতা শুধু ধাতুর নামেই নির্ধারিত হয় না — এর পেছনে রয়েছে পরমাণু কাঠামো, ইলেকট্রনের গতি, ব্যান্ড থিওরি, এবং পদার্থের বিশুদ্ধতা। এই বিষয়টি বুঝলে আমরা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারব যে কিছু পদার্থ বিদ্যুতের সুপরিবাহী আর কিছু নয় কেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান