ইতিহাস

চিন্নাস্বামী রাজম

চিন্নাস্বামী রাজম (Chinnaswami Rajam) আধুনিক ভারতের একজন প্রথিতযশা উদ্যোগপতি এবং শিল্পপতি। চেন্নাইয়ের আন্না বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিকীকরণের মাধ্যমে মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (MIT) স্থাপন করেন তিনি। চিন্নাস্বামী রাজমকে ‘আধুনিক শিল্পক্ষেত্রের একজন অগ্রপথিক’ আখ্যা দিয়েছেন প্রয়াত ড. সি পি রামস্বামী আইয়ার।

১৮৮২ সালের ২৮ নভেম্বর ম্যাড্রাসের (অধুনা তামিলনাড়ু) থাঞ্জাভুর জেলার কুম্বকোনম্‌-এর কাছে স্বামীমালাই গ্রামে চিন্নাস্বামী রাজমের জন্ম হয়। তাঁর বাবা মায়ের নাম সেভাবে জানা যায়নি। 

চিন্নাস্বামীর উচ্চ-প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় কুম্বকোনম্‌ টাউন হাই স্কুল থেকে। কুম্বকোনম্‌ টাউন হাই স্কুল থেকে উচ্চ বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করার পরে বহুদিন পর্যন্ত তিনি সরকারি চাকরির চেষ্টা করে যান। পরে বুনন প্রক্রিয়াতে (weaving process) দক্ষতা অর্জনের জন্য ১৯০৪ সালে ‘সালেম সরকারী তাঁত বিদ্যালয়’-এ যোগদান করেন চিন্নাস্বামী রাজন। 

 চিন্নাস্বামীর কর্মজীবনের প্রথমদিকে তিনি ধুতি, তোয়ালে, শার্টের সামগ্রী ইত্যাদি তৈরির জন্য একটি তাঁত কারখানা (Fly shuttle loom) প্রতিষ্ঠা করেন। মাত্র হাজার টাকা মূলধন নিয়ে তাঁর এই ব্যবসাটি প্রথমে বেশ ভালোই চলেছে। এই কারখানায় তিনিই প্রথম উন্নতমানের তাঁত সামগ্রী উৎপাদন করেন যেগুলির একটি প্রতিযোগিতামূলক পূর্ব-প্রস্তুত বাজার ছিল সমগ্র মাদ্রাজ জুড়ে। ১৯০৬ সালে এই বয়ন কারখানার দায়িত্ব এক বন্ধুস্থানীয় অংশীদারকে দিয়ে চিন্নাস্বামী ঘি এবং তেঁতুলের ব্যবসা শুরু করেন ত্রিপলিকনে (Triplicane)। এই ব্যবসাও সফল হয়নি বলে পরবর্তীকালে তিনি মুদিখানা তথা পণ্যদ্রব্যের ব্যবসা শুরু করেন। ১৯০৯ সালের শুরুর দিকে, বন্ধুদের সহায়তায় চিন্নাস্বামী মাইসোর চর্মকারখানার চামড়ার সামগ্রী নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। শ্রী এন. এস. টি চারি এবং শ্রী বিশ্বনাথ পিল্লাই যারা তখন ‘মাইসোর ট্যানারিজ’-এ ছিলেন, চিন্নাস্বামীকে চামড়ার পণ্য কিনে ব্যবসা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। নিজের উদ্যোগে তিনি একটি চামড়ার জুতোর দোকানও খোলেন। টানা পাঁচ বছর কঠিন পরিশ্রমের পরে তিনি ‘মাইসোর ট্যানারিজ’-এর ম্যানেজার পদে যোগ দেন। তাঁর উদ্যোগে এই সংস্থাটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত হয়। ভারতের বাইরে সমুদ্রপারের ইউরোপীয় কোম্পানি হোয়াইটওয়ে লেইডল’ অ্যান্ড কোং (Whiteway Laidlaw & Company)-এর সঙ্গেও এই কোম্পানি ব্যবসায়িক সম্পর্কস্থাপন করে।

১৯০৮ সালে চিন্নাস্বামী রাজম শ্রী ভি. এস শ্রীনিবাস শাস্ত্রীর অধীনে কংগ্রেস পার্টিতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর সাধারণ মানুষের জীবনের নানাবিধ কষ্টের সাথে পরিচিত হন। সেসময় খাদ্য সংগ্রহের তহবিল গড়ে তুলতে যে দল গঠন হয়েছিল তার স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন তিনি। ইতিমধ্যে পণ্ডিত মদনমোহন মালব্য’র সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ তাঁকে জীবনের দার্শনিক উপলব্ধির প্রতি আকৃষ্ট করে। মদনমোহন মালব্য তাঁর পুত্রদের নিয়ে মাদ্রাজ শহরে এলে তাঁদের পুরো শহর ঘুরিয়ে দেখান চিন্নাস্বামী। ১৯০৯ সাল নাগাদ তিনি অনুভব করেন যে জীবন নির্বাহের জন্য তাঁর একটি স্থায়ী চাকরির খুবই প্রয়োজন । বহু জায়গায় তিনি চাকরির সন্ধান করেন, এমনকি একটি কাপড়ের দোকানে ১৫ টাকা বেতনের কাজও পান। কিন্তু এখানেও কাজটি বেশিদিন করতে পারেননি তিনি।  ১৯০৯ সালে মাইসোর ট্যানারির হয়ে ‘মহামহম্‌ প্রদর্শনী’তে একটি স্টলও দিয়েছিলেন। এই কোম্পানিরই কলেজ স্ট্রিটের জুতোর দোকানে তিনি প্রথমে ২৫০ টাকা বেতনে নিযুক্ত হন ম্যানেজার হিসেবে। এর পরে কাশিমবাজারের মহারাজার প্রতিষ্ঠিত ‘বহরমপুর লেদার ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি’তে তিনি কাজ করা শুরু করেন। এই কোম্পানিতে থেকে তাঁর উদ্যোগে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংল্যাণ্ডে চামড়ার জুতো সরবরাহ করা হয়েছিল। কিন্তু এই ব্যবসাগুলিতে সফল হলেও তিনি থেমে থাকেননি। তারপরে পুনরায় নিজের উদ্যোগে তিনজন অংশীদার নিয়ে তিনি একটি ভারতীয় কোম্পানি চালু করেন মাত্র সতেরোশো টাকা মূলধন নিয়ে। এই কোম্পানির কাজ ছিল কয়লাজাত আলকাতরা উৎপাদন করা। এবারে বেশ খানিকটা সফল হলেন চিন্নাস্বামী।

১৯২৩ সালে তাঁর ‘ইণ্ডিয়া কোম্পানি লিমিটেড, মাদ্রাজ’ টাটা স্টিল সংস্থার এজেন্সি গ্রহণ করে। এরপরে দীর্ঘ দশ বছর ধরে ‘ইণ্ডিয়া কোম্পানি লিমিটেড, মাদ্রাজ’ প্রতি মাসে প্রায় দুই হাজার টন ইস্পাত বিক্রি করে টাটা স্টিল সংস্থাকে, তাও খুবই সামান্য লাভে। ফলে ধীরে ধীরে মাদ্রাজে তাঁর খ্যাতি প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং চিন্নাস্বামী রাজম এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক আইকনে পরিণত হন। ১৯৩২ সালে চিন্নাস্বামী স্থাপন করেন ‘কুম্বকোনম্‌ ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশন লিমিটেড’ এবং ঠিক তার পরের বছর ১৯৩৩-এ আরো দুটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি ‘নাগাপাটম্‌ ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড’ এবং ‘ইণ্ডিয়ান স্টিল রোলিং মিলস্‌ লিমিটেড’। এই সমস্ত কোম্পানি প্রভূত লাভের মুখ দেখেছিল। চিন্নাস্বামী মাদ্রাজে এক অন্যতম প্রধান শিল্পপতি হয়ে ওঠেন। মোট পাঁচটি কোম্পানির চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি যেগুলির মধ্যে পূর্বোক্ত কোম্পানিগুলির পাশাপাশি ছিল ‘গ্যারেজ লিমিটেড’ নামের আরেকটি কোম্পানি। এই সমস্ত সংস্থাগুলির প্রাথমিক পরিশোধিত মূলধনের পরিমাণ টাকার মূল্যে প্রায় ৫ মিলিয়ন অর্থাৎ প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা।     

১৯৪৯ সালে স্ত্রীর মৃত্যুর পরে চিন্নাস্বামী রাজম তাঁর বিলাসবহুল দুটি বাংলো বিক্রি করে প্রাপ্ত ৫ লক্ষ টাকা অনুদানের সাহায্যে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’ (Madras Institute of Technology)। মনে রাখতে হবে, এর পরের বছরই ১৯৫০-এ পশ্চিমবঙ্গের খড়গপুরে স্থাপিত হয় প্রথম আই. আই. টি। চিন্নাস্বামী রাজমকে তাঁর রোলিং মিল এবং বিদ্যুৎ কর্পোরেশনের জন্য প্রায়ই বহু বিদেশি প্রযুক্তির সাহায্য নিতে হত, এমনকি কোম্পানিগুলি তৈরির সময় ভিত গড়ার কাজেও বিদেশিদের অবদান ছিল। তাই তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নেন যে ভারতের অভ্যন্তরেই ইঞ্জিনিয়ার তথা প্রায়োগিক কুশলী (Practical men) তৈরির চেষ্টার জন্য একটি সংস্থা নির্মাণ করবেন। এতে শিল্প-বাণিজ্য কিংবা প্রতিরক্ষা বিভাগ এমনকি ডাক বিভাগেও বিভিন্ন পদগুলিতে বিদেশিদের পরিবর্তে ভারতীয় কুশলীরা কাজ করতে পারবে। এই ধারণা থেকেই এম. আই. টি (MIT) গড়ে ওঠে এবং বিগত পাঁচ বছরে এই প্রতিষ্ঠান খ্যাতি এবং মেধার শীর্ষে উঠেছে। ক্রমপেট রেল স্টেশনের ধারে এক বিস্তীর্ণ জমিতে এই প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। ২৭ একর এই জমিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধবিমান ওঠা নামা করত। প্রাথমিকভাবে এরোনটিক্স, ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল বিষয়ে প্রযুক্তিগত ডিপ্লোমা কোর্স চালু হয় এখানে। বেসরকারি উদ্যোগে কারিগরি শিক্ষার পথিকৃৎ এম. আই. টি প্রতিষ্ঠানটি। ভারতে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার বিস্তারে এই প্রতিষ্ঠানের অবদান অনস্বীকার্য। চিন্নাস্বামীর পৌত্র মি. বালাসুব্রাহ্মণ্যম তাঁকে একজন ‘স্ব-প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি’ আখ্যা দিয়েছেন। এই প্রতিষ্ঠানের জন্মকাহিনি এবং প্রতিষ্ঠাতা চিন্নাস্বামীর জীবন নিয়ে বহু তথ্য ও প্রামাণ্য ছবিসহ একটি বইও প্রকাশিত হয়েছে ‘এ ভিশনারি’স রিচ’ ( A Visionary’s Reach) নামে যেটি সংকলন করেছেন ড. প্রেমা শ্রীনিবাসম। এই বই থেকেই জানা যায় যে ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৭ পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানে এরোনটিক্সের ছাত্র ছিলেন ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি কৃতী বিজ্ঞানী এ. পি. জে আব্দুল কালাম। এম. আই. টি-র প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫২ সালের অক্টোবরে যেখানে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু চিন্নাস্বামীর জীবনের প্রচেষ্টাগুলিকে সম্মান জানিয়েছেন। 

শিল্পপতির পরিচিতির বাইরে চিন্নাস্বামী সঙ্গীতের একজন নিষ্ঠাবান শ্রোতা ও বোদ্ধা ছিলেন। মাদ্রাজে তিনিই প্রথম কিংবদন্তী গায়িকা এম. এস সুব্বুলক্ষ্মীকে পরিচয় করান। তাঁর পরিচিতির জন্য নিজে অর্থসাহায্য করে ১৯৩৩-এর ডিসেম্বর মাসে একটি কণ্ঠসঙ্গীত- বীণা ও বেহালা বাদনের অনুষ্ঠান আয়োজন করেন। 

১৯৫৫ সালের ২১ জুলাই ৭৩ বছর বয়সে চিন্নাস্বামী রাজমের মৃত্যু হয়। 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন