ইতিহাস

খ্রিশ্চিয়ান ডপলার

খ্রিশ্চিয়ান ডপলার (Christian Doppler) অস্ট্রিয়ার পদার্থবিজ্ঞানী এবং গণিতবিদ যিনি আধুনিক তরঙ্গবিজ্ঞানের জগতে ‘ডপলার প্রভাব’ আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত। তিনিই প্রথম প্রমাণ করেন যে আলোক ও শব্দের উৎস এবং পর্যবেক্ষকের আপেক্ষিক গতি আলোক ও শব্দ তরঙ্গের কম্পাঙ্ককে প্রভাবিত করে। এই ধারণাটি তিনি ‘দ্বৈত নক্ষত্র’-এর (Binary Stars) রঙ ব্যাখ্যা করতে ব্যবহার করেছিলেন।

১৮০৩ সালের ২৯ নভেম্বর অধুনা অস্ট্রিয়ার সালজ্‌বার্গে (Salzburg) খ্রিশ্চিয়ান ডপলারের জন্ম হয়। তাঁর বাবা মায়ের নাম সঠিকভাবে জানা যায় না। তবে জানা যায় যে তাঁদের পারিবারিক পাথরের ব্যবসা ছিল। সালজ্‌বার্গে তাঁর বাবার একটি সমৃদ্ধ দোকান ছিল। পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণেই বড় হয়ে ডপলারকে তাঁদের এই পাথরের ব্যবসার হাল ধরতে হয়। তবে তাঁর স্বাস্থ্য ছোট থেকেই বেশ দূর্বল ছিল বলে এই ব্যবসার কাজ তিনি চালাতে পারেননি।

খ্রিশ্চিয়ান ডপলারের প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় সালজ্‌বার্গের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং তারপর তিনি লিন্‌জ-এর একটি উচ্চ-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তাঁর বাবা-মা ছেলের পড়াশোনার বিষয়ে বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাঁর বাবা ডপলারের উন্নতির জন্য ‘সালজ্‌বার্গ লাইসিয়াম’ (Salzburg Lyceum)-এর গণিতের শিক্ষকের সঙ্গে পরামর্শ করেন। সেই অধ্যাপকের সুপারিশেই ডপলার ভর্তি হন ভিয়েনার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে। সেই ইন্সস্টিটিউটটি ১৮১৫ সালে গড়ে উঠেছিল আর ডপলার সেখানে ভর্তি হন ১৮২২ সালে। ১৮২৫ সালে তিনি স্নাতক উত্তীর্ণ হন। এরপর সালজ্‌বার্গে ফিরে আসেন তিনি। সালজ্‌বার্গ লাইসিয়ামে অনুষ্ঠিত হওয়া দর্শনশাস্ত্রের বিভিন্ন বক্তৃতায় অংশ নেন। তারপর তিনি ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন উচ্চতর গণিত, বলবিদ্যা (Mechanics) এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান (Astronomy) নিয়ে পড়াশোনা করার জন্য।

১৮২৯ সালে ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার শেষ পর্বেই ডপলার ঐ বিশ্ববিদ্যালয়েরই উচ্চতর গণিত ও বলবিদ্যার অধ্যাপক এ. বার্গের সহকারী হিসেবে চাকরি পান। তাঁর কর্মজীবনের শুরু হয়েছিল এভাবেই। এই সহকারী হিসেবে থাকাকালীন চার বছরের মধ্যে ডপলার চারটি গণিতের গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। তবে এই সহকারীর পদটি ছিল একটি অস্থায়ী পদ। ডপলার এরপর তিরিশ বছর বয়সে একটি স্থায়ী চাকরির খোঁজ করতে শুরু করেন। এই চাকরি দেবার ব্যাপারে আবেদনকারীদের সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত ভিয়েনার কমিশন। শুধুমাত্র লিখিত পরীক্ষাই নয়, প্রার্থীদের শিক্ষকতার সক্ষমতারও যাচাই হত নকল ক্লাস নেবার মাধ্যমে। ডপলার ভিয়েনার স্কুল এবং কলেজ উভয় ক্ষেত্রেই আবেদন করেন। লিন্‌জ, সালজ্‌বার্গ, গোরিজিয়া-র স্কুলগুলিতে, ভিয়েনা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে উচ্চতর গণিতের অধ্যাপনার জন্য এবং ১৮৩৩ সালের ২৩ মার্চ ডপলার প্রাগের টেকনিক্যাল সেকেণ্ডারি স্কুলে পাটিগণিত, বীজগণিত, জ্যামিতি এবং হিসাবশাস্ত্রে অধ্যাপনার জন্য আবেদন করেন। এরই মধ্যে জীবন নির্বাহের কারণে তিনি একটি সুতাকলে হিসাবরক্ষক (Bookkeeper)-এর কাজ করেন প্রায় ১৮ মাস। কঠিন দারিদ্র্য এবং সমস্যাসঙ্কুল জীবন কাটাতে হয়েছে ডপলারকে। এমনকি কঠিন সময়ে সমস্ত সম্পত্তি বিক্রি করে আমেরিকায় চলে যাবার জন্যেও তিনি পরিকল্পনা করেছিলেন। ঠিক সেই সময়েই ১৮৩৫-এ প্রাগের টেকনিক্যাল সেকেণ্ডারি স্কুলের পক্ষ থেকে অধ্যাপকের পদে চাকরির নিয়োগপত্র পান। তবে উচ্চাভিলাষী ডপলার এর পরেও প্রাগের পলিটেকনিক কলেজে উচ্চতর গণিত পড়ানোর জন্য আবেদন করেন। ১৮৩৬ থেকে ১৮৩৮ সাল পর্যন্ত তিনি ঐ কলেজে দিনে চার ঘণ্টা পড়ানোর সুযোগ পান ফলে একটু বেশি উপার্জনের পথ খুলে যায়। ১৮৪৪ সালের মার্চ মাসে প্রাগের পলিটেকনিক কলেজে ব্যবহারিক জ্যামিতি ও প্রাথমিক গণিতের অধ্যাপকের স্থায়ী পদ লাভ করেন। ১৮৫০ সালের ১৭ জানুয়ারি তিনি ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্যনির্মিত পদার্থবিজ্ঞানের নতুন ইনস্টিটিউটের প্রথম পরিচালক (Director) হিসেবে নিযুক্ত হন। এই সময় ডপলার তাঁর কর্মজীবনের একেবারে চূড়ান্ত উচ্চতায় পৌঁছোন।

১৮৪৩ সালে তাঁর একটি বই প্রকাশিত হয় প্রাগে যার নাম ‘অ্যারিথমেটিক অ্যাণ্ড অ্যালজেব্রা’ (Arithmetic & Algebra)। তবে তাঁর সব থেকে বিখ্যাত কাজ যা ‘ডপলার নীতি’ (Doppler principle) নামে পরিচিত তা ১৮৪২ সালে ‘অন দ্য কালারড লাইট অফ দ্য বাইনারি স্টারস্‌ অ্যাণ্ড সাম আদার স্টারস অফ দ্য হেভেনস্‌’ (On the coloured light of the binary stars and some other stars of the heavens) নামে গবেষণাপত্রে প্রকাশ করেন। এই বইটির একটি ইংরেজি অনুবাদের ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ রয়েছে যার অনুবাদ করেছেন অ্যালেক ইডেন। এই বইতেই ডপলার তাঁর বিশেষ আবিষ্কৃত নীতিটি ব্যাখ্যা করেন যা ‘ডপলার প্রভাব’ বা ‘ডপলার এফেক্ট’ নামে পরিচিত। এই প্রসঙ্গে ‘ডপলার প্রভাব’ আসলে কী তা সংক্ষেপে বলে নেওয়া ভাল। ডপলার পর্যবেক্ষণ করেছিলেন যে যে কম্পাঙ্কে আলোক বা শব্দ তরঙ্গ উৎস থেকে নির্গত হয়, তার থেকে পর্যবেক্ষকের কাছে পৌঁছাবার সময় সেই আলোকতরঙ্গ বা শব্দতরঙ্গের কম্পাঙ্ক বদলে যায়। এই পার্থক্য ঘটে মূলত উৎস বা পর্যবেক্ষকের আপেক্ষিক গতির কারণে। এই ঘটনাটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিমাপে, মাসবাউর প্রভাব (Mossbaur effect) পর্যবেক্ষণে এবং রাডার জাতীয় আধুনিক যন্ত্রে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ১৮৪৬ সালে ডপলার তাঁর এই নীতিটির পরিমার্জিত ও সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশ করেন যাতে উৎসের গতি এবং পর্যবেক্ষকের গতি উভয় বিষয়েই তিনি আলোকপাত করেন। ডাচ গণিতবিদ এইচ.ডি. বাইস ব্যালট ডপলারের এই নীতিটির সত্যতা প্রমাণ করেন। আর এখানেই ১৮৪৫ সালের সেই বিখ্যাত ‘ট্রেন স্টেশন পরীক্ষা’-র কথা চলে আসে। ট্রেনের হুইসলের শব্দ-কম্পাঙ্ক স্টেশনে আসার সময় এবং স্টেশন ছেড়ে চলে যাবার সময় যে পার্থক্য তৈরি করে তা পরীক্ষা হয়েছিল এভাবে। অর্থাৎ ডপলারের তাত্ত্বিক নীতির প্রমাণ হয় এই পরীক্ষায়। কম্পাঙ্কের এই পরিবর্তন বা ডপলার শিফট (Doppler shift) আসলে যেকোনো তড়িৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ এবং শব্দ তরঙ্গের জন্য এই নীতিটি বৈধ। এইসব তরঙ্গের মধ্যে গামা রশ্মি, এক্স রশ্মি, অতিবেগুনি রশ্মি, মাইক্রোওয়েভ কিংবা ইনফ্রারেড রশ্মি, অতি উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ-তরঙ্গ সবই ডপলারের নীতি মেনে চলে। বিখ্যাত পদার্থবিদ আর্মাণ্ড হিপ্পোলিট লুই ফিজু (Armand Hippolyte Louis Fizeau) ডপলার এফেক্টের সহায়তায় প্রথম তারার বর্ণালির ব্লু-শিফট এবং রেড-শিফট আবিষ্কার করেন। এই নীতি ফরাসিদের কাছে ‘ডপলার-ফিজু প্রভাব’ নামে পরিচিত। প্রাগ পলিটেকনিক-এ অধ্যাপনা করাকালীন তিনি প্রায় পঞ্চাশটিরও বেশি প্রবন্ধ লিখেছেন গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের উপর। ১৮৪৭ সালে তিনি প্রাগ শহর ত্যাগ করে ‘একাডেমি অফ মাইন্স অ্যান্ড ফরেস্টস’-এ গণিত, পদার্থবিজ্ঞান এবং বলবিদ্যার অধ্যাপকের পদে যোগ দেন। এই সংস্থাটি সেকালের হাঙ্গেরির রাজধানী সেলমেকবনিয়া তথা অধুনা স্লোভাকিয়ার বান্সকা স্টিভনিকা শহরে অবস্থিত। এরপরে ১৮৪৯ সালে তিনি ভিয়েনায় চলে যান। গবেষণার কাজ অসমাপ্ত রেখে তাঁর হঠাৎ ভিয়েনায় পলায়নের কারণ ছিল ১৮৪৮-এর হাঙ্গেরির বিপ্লব। ভিয়েনায় ১৮৫০ সালে ‘ইনস্টিটিউট ফর এক্সপেরিমেন্টাল ফিজিক্স’-এর প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন ডপলার। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই বংশগতির জনকরূপে পরিচিত তরুণ গ্রেগর জোহান মেন্ডেলকে প্রভাবিত করেন ডপলার এবং অধ্যাপক ফ্রাঙ্ক উঙ্গার (Franz Unger)।

১৮৪০ সালের ২৮ জুন ডপলার ‘রয়্যাল বোহেমিয়ান সোসাইটি’-র একজন সহযোগী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৮৪৭-এ ঐ সংস্থার উপ-সচিব (Deputy Secretary) নির্বাচিত হন। ১৮৪৮ সালে ‘ইম্পেরিয়াল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস’-এর সাধারণ সদস্যপদ লাভ করেন খ্রিশ্চিয়ান ডপলার এবং একইসঙ্গে প্রাগ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাম্মানিক ডক্টরেট উপাধি লাভ করেন। ২০১৭-র ২৯ নভেম্বর গুগ্‌ল ডুড্‌ল ডপলারের ২১৪তম জন্মদিন পালন করেছে। তাঁর মৃত্যুর পর স্যান মাইকেল-এ ভিনিসীয় সমাধিস্থলে ডপলারের সমাধিস্তূপ নির্মাণ করেন ড. পিটার এম স্কুস্টার (Dr. Peter M Schuster)।  

১৮৫৩ সালের ১৭ মার্চ মাত্র ৪৯ বছর বয়সে ভেনিসে পালমোনারি প্রতিবন্ধকতায় আক্রান্ত হয়ে খ্রিশ্চিয়ান ডপলারের মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন