বিজ্ঞান

নক্ষত্রপুঞ্জ ।। কনস্টেলেশন

নক্ষত্রপুঞ্জ ।। কনস্টেলেশন

রাতের আকাশের দিকে তাকালে প্রায়ই ঘন কালো পটভূমিতে জ্বলজ্বল করতে দেখা যায় তারাদের। অনন্ত অসীম আকাশ জুড়ে কত সহস্র তারা রয়েছে তার পরিমাপ করাও দুঃসাধ্য। তারা কিংবা নক্ষত্রগুলি মেঘমুক্ত আকাশে প্রকট হয়ে ওঠে। উত্তর আকাশে ধ্রুবতারার অবস্থান লক্ষ্য করে প্রাচীনকালে নাবিকেরা সমুদ্রপথে দিক নির্ণয় করতেন। তখনও আকাশ জুড়ে বহু নক্ষত্রের সমাবেশ লক্ষ্য করতেন তাঁরা। বহু কাল থেকেই এই নক্ষত্রদের নিয়ে গবেষণা চলে আসছে। কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের তারাদের উপস্থিতি বিজ্ঞানীদের গবেষণায় ক্রমেই জানা গেছে। তারই মধ্যে আকাশে এই নক্ষত্রগুলিই কত রকম বস্তু বা প্রাণীদের আকার নেয়, কখনো কুকুর, কখনো ঘোড়া, কখনো শিকারি, কখনো আবার জিজ্ঞাসা চিহ্ন। এই সব আকারের বিশ্লেষণ করে নক্ষত্রদের নির্দিষ্ট অবস্থান নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। এরকমই বেশ কয়েকটি তারা বা নক্ষত্রদের নিয়েই গড়ে ওঠে নক্ষত্রপুঞ্জ (Constellations)।

মহাকাশীয় গোলকের একটি নির্দিষ্ট বৃত্তের মধ্যে অবস্থিত নক্ষত্রের একটি গোষ্ঠী বা সমাহারকেই নক্ষত্রপুঞ্জ বলা হয়ে থাকে যারা কিনা এক একটি নির্দিষ্ট প্রাণী বা পৌরাণিক বস্তুর আকার নেয়। রাতের আকাশে এই নক্ষত্রপুঞ্জ ব্যবহার করেই মানুষ দিক নির্ণয় করে থাকত। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষ বিশেষ সময়ে এই নক্ষত্রপুঞ্জগুলিকে দেখা যায়। প্রতিটি নক্ষত্রপুঞ্জের আলাদা আলাদা নাম দেওয়া হয়েছে। পৃথিবী থেকে বহু বহু দূরে এই সকল নক্ষত্রপুঞ্জ কিন্তু কখনোই একটির সঙ্গে অপরটি যুক্ত নয়। মানুষ নিজেদের কল্পনার খাতিরে সেগুলিকে যুক্ত করে বিশেষ বিশেষ বস্তু বা প্রাণীর রূপ দিয়েছে। প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত নানা সময় মানুষ এই নক্ষত্রগুলিকে পর্যবেক্ষণ করেছে। নক্ষত্রপুঞ্জ বা কনস্টেলেশন শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ ‘কনস্টেলাশিও’ (Constellatio) থেকে। এর অর্থ ছিল নক্ষত্রের সমাহার। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে একেকটি নক্ষত্রপুঞ্জের মধ্যে পৃথক পৃথক নক্ষত্রকে পৃথিবী থেকে একই সমতলে অবস্থিত বলে মনে হলেও সবসময় তা ঘটে না। প্রতিটি নক্ষত্রের মধ্যে পারস্পরিক দূরত্ব যেমন আলাদা হয়, তেমনি তাপমাত্রারও পার্থক্য ঘটে। পৃথিবী থেকে তুলনায় নিকটতম নক্ষত্রকে উজ্জ্বল বলে মনে হয়, অন্যদিকে ম্লান নক্ষত্রগুলি পৃথিবী থেকে বহু দূরে অবস্থিত বলে মনে করা হয়।

প্রাচীন পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ৪৮টি নক্ষত্রপুঞ্জকে আকাশে চিহ্নিত করেছিলেন যাদের নামকরণ বেশিরভাগই হয়েছিল গ্রিক পুরাণের নায়ক বা দেব-দেবীদের কেন্দ্র করে। যেমন – হাইড্রা (Hydra), ক্যাসিওপিয়া (Casiopia), হারকিউলিস (Hercules) ইত্যাদি। তারপরে ১২টি অতি পরিচিত নক্ষত্রমণ্ডলকে রাশিচক্র নক্ষত্রপুঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় মোটামুটিভাবে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে। এই ১২টি রাশিচক্রের নক্ষত্রপুঞ্জ হল ধনু (Sagittarious), মকর (Capricorn), কুম্ভ (Aquaris), মীন (Pisces), মেষ (Aries), বৃষ (Taurus), মিথুন (Gemini), কর্কট (Cancer), সিংহ (Leo), তুলা (Libra), কন্যা (Virgo) ও বৃশ্চিক (Scorpio)। রাতের আকাশে চোখ মেলে তাকালে যে কয়েকটি নক্ষত্রপুঞ্জ প্রায়ই দেখা যায় তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – কালপুরুষ (Orion), ফিনিক্স (phoenix), পক্ষীরাজ (Pegasus), বৃহৎ ভল্লু (Ursa Major), ক্ষুদ্র ভল্লু (Ursa Minor) এবং অফিউকাস (Ophiuchus)। তাছাড়া অন্যান্য আরো কয়েকটি নক্ষত্রপুঞ্জের নাম হল যথাক্রমে অ্যান্ড্রোমিডা (Andromida), করতল মণ্ডল (Corvus), কৃকলাস (Chameleon), ড্রাগন মণ্ডল (Draco), মক্ষিকা মণ্ডল (Musca), মৃগব্যাধ (Canis Major) ইত্যাদি। তবে ১৯২২ সালে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট (IAU) মোট ৮৮টি নক্ষত্রপুঞ্জের একটি তালিকা প্রকাশ করে। এই তালিকাটি মূলত তৈরি হয়েছিল জ্যোতির্বিজ্ঞানী টলেমির ‘অ্যালমাজেস্ট’ বইতে কথিত গ্রিক নক্ষত্রপুঞ্জগুলির উপর ভিত্তি করে। পরে পেট্রাস প্ল্যানসিয়াস এই তালিকার পরিমার্জন করেন। ১৭৫০ থেকে ১৭৫৪ সাল পর্যন্ত উত্তমাশা অন্তরীপ থেকে বিজ্ঞানী ডি ল্যাসাইল দক্ষিণ গোলার্ধের নক্ষত্রগুলি অধ্যয়ন করেছিলেন একটি ১৩ মিমি. প্রতিসারক টেলিস্কোপের সাহায্যে। ১৯২২ সালে হেনরি রাসেল ৮৮টি নক্ষত্রপুঞ্জের একটি তালিকা প্রকাশ করেন এবং তার মধ্যে ১৪টির নামকরণও করেন তিনি নিজে। এই সমস্ত নক্ষত্রপুঞ্জগুলি সবসময় একই স্থানে রাতের আকাশে দেখা যায় না। আমাদের পৃথিবী বছরে একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে এবং পৃথিবীর এই বার্ষিক গতির কারণে প্রত্যেক রাতেই পৃথিবী থেকে রাতের আকাশের চেহারা খানিক বদলে যায়। কক্ষপথে পৃথিবীর স্থান বদলের সঙ্গে সঙ্গে যে নক্ষত্র আগে এক স্থানে ছিল, তার স্থানও বদলে যায়। অদ্ভুত ব্যাপার হল পৃথিবীতে কোন স্থান থেকে নক্ষত্রগুলি দেখা হচ্ছে, সেই অবস্থানটিও গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে অস্ট্রেলিয়ার আকাশে যে নক্ষত্রগুলি দেখা যায়, সেগুলির সবকটি হয়ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ থেকে দেখা যাবে না কিংবা অতিরিক্ত আরো কিছু নক্ষত্র দেখা যাবে। তাছাড়া বিশেষ বিশেষ সময়ের ভূমিকাও রয়েছে এখানে। যেমন ২১ সেপ্টেম্বর উত্তর গোলার্ধ থেকে রাতের আকাশে মীন (Pisces) নক্ষত্রপুঞ্জ চোখে পড়লেও কন্যা (Virgo) নক্ষত্রপুঞ্জটি দেখা যাবে না। কিন্তু ঐ গোলার্ধেই তা দেখা সম্ভব হবে দিনের বেলায়।     

এই নক্ষত্রপুঞ্জের অধিকাংশেরই নামকরণ করা হয়েছে প্রাচীন মধ্য-প্রাচ্যে, গ্রিসে কিংবা রোমান সংস্কৃতিতে। অনেকে মনে করেন আজ থেকে প্রায় ১৭ হাজার বছর আগে দক্ষিণ ফ্রান্সের লাসাক্স গুহাচিত্রের মধ্যেই প্রথম বৃষ (Taurus), কালপুরুষ (Orion’s Belt) ইত্যাদি নক্ষত্রের আকার আবিষ্কৃত হয়েছিল। প্রত্নলেখ থেকে জানা যায় যে ৩০০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে মেসোপটেমিয়ার মানুষেরা এই নক্ষত্রপুঞ্জ চিহ্নিত করেছিল। ব্রোঞ্জ যুগের মাঝামাঝি সময়ে প্রাচীন ব্যাবিলনে নক্ষত্রপুঞ্জকে ভিত্তি করেই রাশিচক্র তৈরি হয়েছিল। নক্ষত্রপুঞ্জের নামকরণ নিয়ে কিছু কিংবদন্তীও রয়েছে গ্রিক ও রোমান সংস্কৃতিতে। খুব পরিচিত কয়েকটি নক্ষত্রপুঞ্জের অবস্থান আর তাদের অন্তর্গত নক্ষত্র সম্পর্কে সংক্ষেপে এই অবসরে জেনে নিই চলুন।

কালপুরুষ

প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় কালপুরুষের (Orion) কথা। বেশিরভাগ সময় শীতকালে রাতের আকাশে এই নক্ষত্রপুঞ্জ দেখা যায়। প্রাচীন পৌরাণিক গ্রিক শিকারী অরিয়নের নাম থেকেই এই নক্ষত্রপুঞ্জের নাম দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে বিষ্ণুর ঔরসে মায়াদেবীর গর্ভে কালপুরুষের জন্ম হয়েছিল। এই কালপুরুষ নক্ষত্রপুঞ্জটি একটি শিকারীর মতো দেখতে যার কোমরবন্ধ থেকে উন্মুক্ত তরবারি ঝুলছে। মোট ১৪টি নক্ষত্র এবং তিনটি পৃথক নীহারিকা নিয়ে এই নক্ষত্রপুঞ্জ গড়ে উঠেছে। এই নক্ষত্রগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল উষা (Alnitak), অনিরুদ্ধ (Alnilam) এবং চিত্রলেখা (Mintaka) যেগুলি ঐ কালপুরুষের কোমরবন্ধে অবস্থিত। এছাড়াও একেবারে উত্তরে রয়েছে আর্দ্রা (Betelgeuse), কালপুরুষের বাম কাঁধে থাকে কার্তিকেয় (Bellatrix), ডান পায়ে থাকে কার্তবীর্য (Kappa Ori) এবং বাম পায়ে অবস্থিত নক্ষত্রের নাম বাণরাজা (Rigel)। জানুয়ারি মাসের রাতের আকাশে এটি সবথেকে ভালো দেখা যায়। পাশের ছবিটি দেখে নিশ্চয় বোঝা যাচ্ছে শিকারীর মত এই কালপুরুষ নক্ষত্রপুঞ্জকে।

সপ্তর্ষিমণ্ডল

এরপরে সপ্তর্ষিমণ্ডলের (Ursa Major) কথা বলতেই হয়। মহাকাশের অন্যতম বিখ্যাত এই নক্ষত্রপুঞ্জ মোট সাতটি নক্ষত্র নিয়ে গড়ে উঠেছে এবং জিজ্ঞাসা চিহ্নের মত আকার নিয়েছে। Ursa Major কথার অর্থ ছিল বৃহৎ ভল্লুক, যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একে বৃহৎ পেয়ালা (Big Dipper) নামে চিহ্নিত করা হয়। উত্তর-পূর্ব আকাশে দেখতে পাওয়া এই নক্ষত্রপুঞ্জের সাতটি নক্ষত্রের নাম যথাক্রমে ক্রতু (Dubhe), পুলহ (Merak), পুলস্ত্য (Phecda), অত্রি (Megrez), অঙ্গিরা (Alioth), বশিষ্ঠ (Mizar), মরীচি (Alkaid)। প্রাচীন ভারতীয় ঋষিদের নামানুসারে এই নক্ষত্রগুলির নামকরণ করা হয়েছে। নীচের ছবিটা ভালো করে দেখলেই বোঝা যাবে রাতের আকাশে দূরে দূরে ছড়িয়ে থাকা এই সাতটি নক্ষত্রকে কাল্পনিক রেখা দিয়ে জুড়লে কীভাবে একটি জিজ্ঞাসা চিহ্নের আকার তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি পৃথিবী থেকে প্রায় ৭০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে প্রায় ৩ লক্ষ কোটি নক্ষত্রের সমাহারে গড়ে ওঠা ফিনিক্স নক্ষত্রপুঞ্জের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এই নক্ষত্রপুঞ্জের ভর সূর্যের ভরের থেকে প্রায় আড়াই হাজার কোটি গুণ বেশি। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় জানা গেছে যে এই নক্ষত্রপুঞ্জের কেন্দ্রে সর্বদা প্রবল উত্তাপ ও শক্তি নির্গত হয় এবং সেখানে সমস্ত মৃত নক্ষত্রগুলি এসে জমা হয়। পুরাণের ফিনিক্স পাখি ঠিক যেভাবে নিজের পুড়ে যাওয়া ছাই থেকে আবার জন্ম নিতে পারে, সেভাবে এই নক্ষত্রপুঞ্জেও মৃত নক্ষত্র থেকেই পুনরায় নতুন নক্ষত্র জন্ম নেয়।

বলা বাহুল্য বিভিন্ন নক্ষত্র নিয়ে গড়ে ওঠা এই কাল্পনিক নক্ষত্রপুঞ্জগুলির নাম বিভিন্ন দেশ, সমাজ ও সংস্কৃতির অনুযায়ী আলাদা ও বিভিন্ন দেশে এগুলিকে নিয়ে বিভিন্ন আকর্ষণীয় কাহিনী, পৌরাণিক গল্পও শুনতে পাওয়া যায়।

  • অফিস ও হোম রিলোকেশন

     

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

  • প্যাকার্স ও মুভার্স এর বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান 

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

ঈশ্বরচন্দ্র ও তাঁর পুত্রের সম্পর্ক



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন