ইতিহাস

দারাশাউ নশেরওয়ান ওয়াদিয়া

দারাশাউ নশেরওয়ান ওয়াদিয়া(Darashaw Nosherwan Wadia) একজন স্বনামধন্য ভূতাত্ত্বিক(Geologist), জীবাশ্ম বিশেষজ্ঞ(Paleontologist) যিনি জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার প্রথম ভারতীয় বিজ্ঞানী ছিলেন। হিমালয় বিশেষত হিমালয়ের স্তর বিন্যাসের ওপর প্রথম কাজ করেন তিনি। ভারতে ভূতাত্ত্বিক গবেষণা ও পঠন পাঠনের প্রথম পথিকৃৎ ওয়াদিয়ার স্মরণে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ হিমালয়ান জিওলজির নামকরণ করা হয় ওয়াদিয়া ইনস্টিটিউট অফ হিমালয়ান জিওলজি। ভারতে ভূতত্ত্ববিদ্যার প্রথম পাঠ্য পুস্তক রচয়িতা তিনি। ভারতবর্ষের প্রথম ভূতাত্ত্বিক মানচিত্র তাঁর হাতেই করা। ১৯৮৪ সালে ওয়াদিয়ার স্মরণে ভারতীয় ডাক বিভাগ থেকে একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়।

১৮৮৩ সালের ২৩ অক্টোবর গুজরাটের সুরাট শহরে এক পার্শী পরিবারে দারাশাউ নশেরওয়ান ওয়াদিয়া -র জন্ম হয়। তাঁর বাবা নশেরওয়ান ওয়াদিয়া ও মা কুভারবাইয়ের নয় সন্তানের মধ্যে চতুর্থ সন্তান ছিলেন দারাশাউ। তাঁদের পরিবারের ছিল জাহাজ তৈরির ব্যবসা। ব্রিটিশ শাষিত ভারতে ব্যবসা,বাণিজ্য,ও শিক্ষায় ওয়াদিয়ারা এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছিল। তাঁর বাবা নশেরওয়ান ওয়াদিয়া গুজরাটের একটি ছোট্ট শহরে রেলের স্টেশনমাস্টার ছিলেন।

সেখানে পড়াশুনার সেরকম সুযোগ না থাকায় দারাশাউ সুরাটে ঠাকুমার কাছে থেকে প্রথমে একটি গুজরাটি স্কুল ও পরে স্যার,জে জে ইংলিশ স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ করেন। ১১ বছর বয়সে তাঁর পরিবার বরোদায় স্থানান্তরিত হলে তিনি বরোদা হাইস্কুলে ভর্তি হন। বরোদায় থাকাকালীন বড় দাদা শিক্ষাবিদ মুঞ্চেরশাউ. এন. ওয়াদিয়ার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসেন তিনি এবং তাঁর প্রভাবেই বিজ্ঞানের প্রতি দারাশাউয়ের ঐকান্তিক ভালোবাসা ও আগ্রহ তৈরী হয়। ১৬ বছর বয়সে বিদ্যালয় শিক্ষা সমাপ্ত করে বরোদা কলেজে ভর্তি হন দারাশাউ এবং ক্রমান্বয়ে প্রানীবিদ্যা,উদ্ভিদবিদ্যা,ও ভূতত্ত্ববিদ্যা এই তিনটি বিষয়ে তিনি বি.এসসি (B.Sc) ডিগ্ৰী অর্জন করেন। বরোদা কলেজের ন্যাচারাল হিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক আদারজী এম মাসানি ভূতত্ত্ববিদ্যার প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরী করেন। কিন্তু বরোদা কলেজে সেইসময় ভূতত্ত্ববিদ্যা পঠন পাঠনের কোনো সুষ্ঠ পরিকাঠামো না থাকায় ওয়াদিয়া প্রায় নিজের প্রচেষ্টায় এই বিষয়টি অধ্যয়ন করেন। বরোদা কলেজের ইংরাজীর অধ্যাপক শ্রী অরবিন্দ ঘোষের দ্বারাও তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন। ১৯০৬ সালে তিনি জীববিদ্যা ও ভূতত্ত্ববিদ্যা এম.এসসি(M.Sc) ডিগ্ৰী লাভ করেন।   

১৯০৭ সালে দারাশাউ নশেরওয়ান ওয়াদিয়া কাশ্মীরের প্রিন্স অফ ওয়েলস কলেজে(অধুনা মহাত্মা গান্ধী কলেজ নাম পরিচিত) অধ্যাপক পদে নিযুক্ত হন ও চোদ্দ বছর এখানে অধ্যাপনা করেন। এখানে অধ্যাপক থাকাকালীন হিমালয়ের পাদদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তিনি ভূতাত্বিক সমীক্ষা চালান। সংগৃহীত খনিজ, প্রস্তরখন্ড, ফসিল তিনি ছাত্রদের স্যাম্পল স্পেসিমেন হিসাবে দেখাতেন। কখনো কখনো তিনি ছাত্রদের অ্যাডভেঞ্চার ট্রেকিংয়ে নিয়ে যেতেন।শিবালিক হিমালয়ে এইরকমই এক ট্রেকিংয়ের সময় তিনি বিশালাকৃতি আধুনিক হাতীর পূর্বপুরুষ ‘স্টেগোডন গানেসা’ (Stegodon ganesa) -র তিন মিটার দীর্ঘ প্রস্তরীভূত একটি দাঁতের ফসিল আবিষ্কার করেন। এটি জম্মু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগে এখনো সংগৃহীত আছে। একনিষ্ঠ ভাবে তিনি কাশ্মীর হিমালয়ের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর যেমন এর গঠন, স্তরবিন্যাস, ও বিভিন্ন স্তরে জীবাশ্মের উপস্থিতি গবেষণা করেছিলেন। উত্তর পশ্চিম হিমালয়ের বিশদ গঠনের ওপরও তিনি পরীক্ষা করেছিলেন।

১৯২১ সালে প্রিন্স অফ ওয়েলস কলেজে ইস্তফা দিয়ে দারাশাউ অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিনটেনডেন্ট পদে জিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়াতে তিনি যোগ দেন যার ফলে তিনি পেলেন গবেষণা করার এক অভূতপূর্ব সুযোগ। দারাশাউ নশেরওয়ান ওয়াদিয়া ছিলেন জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার ইতিহাসে প্রথম ভারতীয় যাঁর কোনো ইউরোপীয়ান ডিগ্রী ছিল না। তিনি এখানে যুক্ত হয়ে উত্তর পশ্চিম হিমালয়ের গঠন, স্তরবিন্যাসের ওপরই শুধু গবেষণা করলেন না,শুরু করলেন সেই অঞ্চলের মানচিত্র তৈরির মতো একটি দুরূহ ও পরিশ্রমসাধ্য কাজ। তিনি মধ্য ও নিম্ন হিমালয়ের(Middle And Lesser Himalaya) অন্তর্গত কাশ্মীরের পুঞ্চ জেলার প্রায় ২০০০ বর্গ মাইল এবং সংলগ্ন পাঞ্জাবের প্রায় ২১০০ বর্গ মাইলের ভূতাত্ত্বিক মানচিত্র(Geological Map) প্রস্তুত করেন। হিমালয়ের যে স্থানেই তিনি গেছেন সেখানকার স্তরবিন্যাস ও টেক্টোনিকের ওপর আলোকপাত করেছেন তিনি। ওয়াদিয়া প্রায় শতাধিক গবেষণা পত্র, নানা বিষয়ের ওপর মনোগ্রাফ(Monograph) এবং জিওলজিকাল সার্ভের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লিখেছেন।সুদূর উত্তর পশ্চিম কাশ্মীরের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস বুঝতে দারাশাউর কাজ অপরিসীম সাহায্য করে। অনেক বিপর্যয় অতিক্রম করে নাঙ্গা পর্বত ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক গঠন, শিলা ও খনিজের সংযুক্তির বিশ্লেষণ এবং ভূতাত্ত্বিক মানচিত্র প্রস্তুত করেন তিনি। দারাশাউ নাঙ্গা পর্বত সংক্রান্ত যে সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন তা ওই অঞ্চলের ওপর পরবর্তী গবেষণার এক মূল আধার স্বরূপ বলা যায়।করেন। নাঙ্গা পর্বতশ্রেণীতে হাঁটুর মত বাঁক(Knee Bend) বা সিনট্যাক্সিসের উপস্থিতির কারণ তিনিই প্রথম বিশ্লেষণ করেছিলেন।

 ১৯২৮ সালে লোয়ার গন্ডোয়ানা ল্যান্ডের গঙ্গামপ্টেরিস(Gangamopteris) উপত্যকা থেকে এক্টিনোডনের(Actinodon) ভালো ভাবে সংরক্ষিত একটি খুলি(Skull), গ্যানোইড মাছ(Ganoid fish) ,টেরিডোস্পেরমাস(Pteridospermous) নামক নিম্ন শ্রেণীর উদ্ভিদের জীবাশ্ম (Fossil) আবিষ্কার করেন দারাশাউ। এই আবিষ্কার থেকে অনুমান করা যায় কাশ্মীর হিমালয় সৃষ্টি হয়েছিল ৩৫৫-২৫০ মিলিয়ন বছর আগে। মৃত্তিকা বিজ্ঞানেও দারাশাউয়ের অবদান প্রচুর। ১৯৩৫ সালে এম এস কৃষ্ণান এবং পি এন মুখার্জির সাথে যৌথ ভাবে জিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে ভারতের প্রথম মৃত্তিকা মানচিত্র (Soil Map) প্রকাশ করেন। ভারতবর্ষের কৃষির উন্নতির জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি বড়ো পদক্ষেপ। ১৯৩৫ সালে অক্সফোর্ডে অনুষ্ঠিত তৃতীয় ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অফ সয়েল সায়েন্সে(International Congress Of Soil Science) তিনি ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন ও ইংল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ডের সয়েল প্রোফাইল অধ্যয়ন করার সুযোগ পান। তিনি হল্যান্ডের হিরলিনে(Heerlen) অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অফ কার্বোনিফেরাস স্ট্রেটিগ্রাফির দ্বিতীয় সম্মেলনেও যোগ দিয়েছিলেন।

১৯১৯ সালে স্যার টি এইচ হল্যান্ড এবং সি. সি. মিডলমিসের উৎসাহে জিওলজি অফ ইন্ডিয়া (Geology Of India) শীর্ষক একটি পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন তিনি যেটি লন্ডনের ম্যাকমিলান কোম্পানী থেকে প্রকাশিত হয়। এই বইটির আগে ভারতবর্ষে ভূতত্ত্বের কোনো পাঠ্যপুস্তক ছিল না। প্রিন্স অফ ওয়েলস কলেজে পড়ানোর সময়ই এই অভাবটি তিনি অনুভব করেছিলেন । পাকিস্তান,ভারত,বাংলাদেশ,মায়ানমার,শ্রীলংকা অর্থাৎ সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের ভূতত্ত্বের রূপ এই পুস্তকে তিনি লিপিবদ্ধ করেন। জিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার প্রাক্তন ডিরেক্টর আর. ডি. ওয়েস্ট এই পুস্তকটির ভূয়সী প্রশংসা করেন। সারা পৃথিবীতে এই পুস্তকটি আলোড়ন ফেলে দেয়। ছাত্র শিক্ষক নির্বিশেষে ভূতত্ত্ববিদ্যার সর্বস্তরের মানুষদের কাছে এটি অতি প্রয়োজনীয় ও জনপ্রিয় পুস্তক হয়ে দাঁড়ায়। পরপর ৬টি সংস্করণ বের হয় পুস্তকটির।

তিনি এছাড়াও বিভিন্ন পুস্তক রচনা করেন, যেমন- সিন্ট্যাক্সিস অফ নর্থ ওয়েস্টার্ন হিমালয়াস, মিনারেলস এন্ড মেটাল রিসোর্সেস অফ ইন্ডিয়া,জিওলজি অফ নাঙ্গা পর্বত এন্ড গিলগিট ডিস্ট্রিক্ট ইত্যদি। জিওলজিক্যাল সার্ভেতে থাকাকালীন শিক্ষাবকাশে তিনি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে যান। পটওয়ার ও কাশ্মীর থেকে প্রাপ্ত মেরুদন্ডী প্রাণীর ফসিল নিয়েও কাজ করেছেন।

এই সময় তিনি জার্মানি, অস্ট্রিয়া, চেকোস্লোভাকিয়ার বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক সংস্থায় পরিভ্রমণ করেন তিনি। জেনেভায় আলপাইন জিওলজির ওপর বিশেষ কোর্স করেন তিনি। ১৯৩৫ সালে চীন, জাপান, আমেরিকা পরিভ্রমণ করেন তিনি। ১৯৩৭ সালে মস্কোতে ইন্টারন্যাশনাল জিওলজিকাল কংগ্রেসে তাঁর বিখ্যাত গবেষণা পত্র “টেক্টোনিক রিলেশনস অফ দা হিমালয়াস উইথ নর্থ ইন্ডিয়ান ফোরল্যান্ড”(Tectonic Relations Of The Himalayas With The North Indian Foreland) পেশ করেন।

১৯৩৮ সালে জিওলজিক্যাল সার্ভে থেকে অবসর গ্রহনের পর শ্রীলংকায় সরকারি খনিজবিদ(Government Mineralogist) পদে আসীন হন। দ্বীপভূমিতে সম্ভাব্য পানীয় জলের উৎস, বাঁধ নির্মাণের উপযুক্ত স্থান, ইত্যাদির ভূতাত্ত্বিক মানচিত্র তিনি অঙ্কন করেন। শ্রীলংকার রাজধানী কলম্বোর মানচিত্র তাঁর হাতেই তৈরী। ১৯৪৫ সালে জহরলাল নেহেরুর জাতীয় সরকারে তিনি ভূতাত্ত্বিক উপদেষ্টা নিযুক্ত হয়ে ভারতের জন্য একটি খনিজ নীতি(Mineral Policy)প্রনয়ণ করেন তিনি।

সমগ্র জীবনে তিনি বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ভারত সরকার তাঁকে ভূতত্ত্ববিদ্যার প্রথম জাতীয় অধ্যাপক মনোনীত করে। তিনি ভারত সরকার দ্বারা পদ্মভূষণ পুরস্কারে ভূষিত হন। তাঁর কর্মজীবনে তিনি অজস্র সন্মান জনক পদে আসীন ছিলেন যথা- জিওলজিকাল সোসাইটি অফ লন্ডনের কমনওয়েলথ সদস্য, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স ইন্ডিয়ার প্রেসিডেন্ট, ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রেসিডেন্ট, ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেসের জেনারেল প্রেসিডেন্ট, ক্যালকাটা জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট, ন্যাশনাল কমিটি অফ ওসেনিক রিসার্চের চেয়ারম্যান প্রভৃতি। শুধু তাই নয় ,তিনি আমেরিকার জিওলজিকাল সোসাইটির একজন করেসপন্ডেন্ট এবং জার্মান ও বেলজিয়ান জিওলজিকাল সোসাইটির সম্মানীয় সদস্য ছিলেন।

১৯৬৯ সালের ১৫ জুন ৮৬ বছর বয়সে দারাশাউ নশেরওয়ান ওয়াদিয়ার মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন