ইতিহাস

কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ

ব্যোমকেশ, ফেলুদা, কিরীটি ইত্যাদিরা বাঙালিদের কাছে অন্যতম প্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র। গল্পের গোয়েন্দা চরিত্রগুলি মগজাস্ত্রের সাহায্যে একের পর এক অপরাধের কিনারা করেছেন। বাস্তব জীবনেও অপরাধের কমতি কিছু নেই এবং তার বেশ কিছু অপরাধের কিনারা করতে মগজাস্ত্রে শান দিতে হয় বৈকি! তাই প্রয়োজন গোয়েন্দা বাহিনীর, কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ ভারতের প্রাচীনতম তো বটেই এমনকি গোটা বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন গোয়েন্দা বিভাগ।  কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ পৃথিবী বিখ্যাত স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের থেকেও প্রায় এক দশকের পুরনো।

বর্তমান কলকাতা পুলিশ প্রশাসনের ইতিহাসের উৎপত্তি হয় কলকাতার ঔপনিবেশিক সময় থেকে, যখন এই কলকাতা, ‘ক্যালকাটা’ নামে পরিচিত ছিল। কলকাতা এর আগে ছিল মুঘলদের অধীনে। ইংরেজ আমলে কলকাতা মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে কিছুটা থেকে গেলেও বাংলার নবাবরা প্রধানত মুর্শিদাবাদ ও উত্তরবঙ্গে শাসন কার্যকরী রেখেছিলেন। ১৭২০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একজন অফিসার ঠিক করেন যাকে বেসামরিক ও অপরাধমূলক প্রশাসনের পুরো দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। “ব্ল্যাক ডেপুটি” বা “ব্ল্যাক জমিন্দার” নামে একজন ভারতীয় কার্যনির্বাহকের দ্বারা সহায়তা পেতেন। তাঁর অধীনে ছিল তিনজন নবাব-দেওয়ান যাদের মধ্যে একজন ছিলেন পুলিশ। এই নিষ্পত্তির জন্য “থানা” ভাগ করা ছিল। “থানাদার”দের অধীনে কাজ করত দু’ধরনের মানুষ যাদেরকে “নায়েক” ও “পাইক” বলে ডাকা হত। এছাড়াও নদী-পুলিশেরও একটি ছোটো দল গঠন করা হয়।

১৭৭৮ সালে একটি বিধি পাশ হয়ে কলকাতা পুলিশের শক্তি উত্থাপিত হয় ৭০০ টা পাইক, ৩১ টা থানাদার এবং ৩৪ টা নায়েব একজন অধীক্ষকের অধীনে। ১৭৮০ সালে সংরক্ষণের জন্য কমিশনার নিযুক্ত করা হয়েছিল যারা ঘড়ি বা ওয়ার্ড দেখাশোনা করত। পুলিশি প্রশাসন তখনও খুব নড়বড়ে ছিল।

১৭৯৪ সালে একজন প্রধান ম্যাজিস্ট্রেট অধীনে কলকাতা এবং শহরতলির পৌর প্রশাসনে শান্তি বিচারক নিযুক্ত করা হয়েছিল, এই প্রধান ম্যাজিস্ট্রেট সরাসরি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত ছিলেন। ১৮০৬ সালে ২৪ পরগনার ম্যাজিস্ট্রেট এবং পার্শ্ববর্তী জেলাগুলির কিছু অংশ ও ২০ মাইল  মধ্যে অবস্থিত জেলাগুলিতে শান্তি বিচারক গঠন করা হয়েছিল।

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি কলকাতার পুলিশি ব্যবস্থাকে আরও ভালভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয় ও পদ্ধতিতে ফেলা হয়। উইলিয়াম কোটস ব্ল্যাককিয়ার নামে একজন সিটি ম্যাজিস্ট্রেট গুপ্তচর বা গোয়েন্দাদের নেটওয়ার্কের উদ্বোধন করেছিলেন। ১৮৪৫ সালে পুলিশ কমিশনার পদের সৃষ্টি করা হয়েছিল যাঁর ক্ষমতা শান্তি বিচারকের সমান ছিল ও অপরাধীর খোঁজ ও তাদের দমন করা। কিন্তু তখনও ‘ডিটেক্টিটিভ ডিপার্টমেন্ট’ গঠিত হয়নি।তার জন্য একটি বিশেষ ঘটনার উল্লেখ করতেই হয় – রোজমেরি হত্যাকান্ড।

তখন ১৮৬৮ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম দিন। ঘড়ির কাঁটা রাত দুটোর ঘর পেরিয়ে গিয়েছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। বাড়ি ফিরছেন এক পুলিশ অফিসার। রাস্তাটা মধ্য কলকাতার আমহার্স্ট স্ট্রিট। এখন যার নাম রাজা রামমোহন রায় সরনী। প্রতিদিনই তিনি এই রাস্তা ধরে ফেরেন। গা ছমছমে আলোয় হঠাৎ ওঁর চোখে পড়ল রাস্তার পাশে বড় মাপের কিছু একটা পড়ে রয়েছে। জিনিসটার কাছাকাছি যেতেই তিনি চমকে উঠলেন। দেখলেন কাপড় মোড়া জিনিসটা আর কিচ্ছু নয়। একটা লাশ! পরীক্ষা করে দেখলেন লাশটি এক মহিলার।

রক্তে ভেসে যাওয়া অবস্থা। পুলিশের দায়িত্বে আছেন তাই পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। হাতের টর্চ জ্বেলে লাশ পরীক্ষা করলেন। চোখে পড়ল মহিলার বাঁ-হাতটি তাঁর কোমরের নীচে মুচড়ে বেঁধে রাখা। আর ডান হাতটি ওপরে। যে কেউ দেখে বলে দিতে পারে এটি কোনও সাধারন মৃত্যু হতেই পারে না। খুনের ঘটনা বুঝতে পারার পরে, সেই পুলিশ অফিসার আবার ফিরে গেলেন থানার পথে। কাছেই থানা। সেই থানার বড়কর্তা তখন পুলিশ ইন্সপেক্টর রিচার্ড রিড। খবর আসতেই তিনি তৈরি হয়ে গেলেন। রাত তিনটের সময় পৌঁছলেন ঘটনাস্থলে।

রিড সাহেব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন সবটা। প্রাথমিক তদন্তে যা বুঝলেন দেহটি একজন খ্রীস্টান মহিলার। ঘটনার সূত্র মেলানোর জন্য জেদ চেপে গেল তাঁর। এদিকে ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই খবর ছড়িয়ে পড়ল কলকাতা শহরে। খবরের কাগজের লোকজনও জেনে গেল। খুনের ঘটনায় মহিলার মৃত্যু নিয়ে যা চিৎকার তার চেয়ে অনেক বেশি শোরগোল কলকাতা পুলিশের কাজ নিয়ে। শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা আলগা সে নিয়ে আঙ্গুল উঠতে লাগল। ব্যাপারটা ছড়াল পুলিশ কমিশনার পর্যন্ত। সেই পদে তখন হগ সাহেব। স্যার স্টুয়ার্ট হগ। যিনি আবার কলকাতা পুরসভার চেয়ারম্যানও। তাঁর নামেই ধর্মতলার ‘হগ মার্কেট’।

অধঃস্তন পুলিশ কর্মীদের ওপর প্রচণ্ড রেগে গেলেন হগ সাহেব। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঘটনার কিনারা করার নির্দেশ দিলেন। ঘটনাটি যে অঞ্চলে ঘটে সেই অঞ্চল অর্থাৎ আমহার্স্ট স্ট্রিট থানার দায়িত্বে ছিলেন রিচার্ড রিড। ভীষণ তৎপর হয়ে উঠলেন তিনি। নিহত মহিলার পরিচয় জানা গেলে রহস্যের কিনারা কিছুটা সুবিধা হবে। তাই মহিলার সমস্ত তথ্য বের করার জন্য কাজে লাগালেন ‘টিকটিকি’। আজ আমরা যাদের বলি গোয়েন্দা। খুব বেশি খাটতে হল না। সুন্দরী, খ্রিস্টান মহিলা। পরিচয় বের করতে অসুবিধা হল না। জানা গেল মহিলার নাম ‘রোজ মেরি’। ব্যক্তিগত আক্রোশ এবং অপরাধজগতের সঙ্গে জড়িত থাকার কারনেই খুন হতে হয় তাঁকে।

শহরে ঘটে যাওয়া নানা রকম ঘটনার মাঝে একটা খুনের ঘটনাকে বেশ ‘মামুলি’ চোখেই দেখা হয়। কিন্তু এই ঘটনা বড় পরিবর্তন এনেছিল তৎকালীন কলকাতার সামগ্রিক পুলিশি ব্যবস্থায়। অপরাধের তদন্ত এবং অপরাধী খুঁজে বের করার জন্য একটি বিশেষ বিভাগের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন কলকাতা পুলিশের কর্তারা।

১৮৬৮ সালের ২৮ নভেম্বর চালু হল কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। ‘রোজমেরি হত্যা কান্ডের’ ঠিক ৬ মাসের মাথায়। পুলিশ কমিশনার হগ সাহেব বিভাগ চালুর আগে রীতিমত নোটিশ জারি করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি যখন ঘটে তখনও জন্ম হয়নি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের। পৃথিবী বিখ্যাত গোয়েন্দাকুল তখনও তাঁদের যাত্রা শুরু করেনি। কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ জন্ম নেওয়ার আরও এক দশক পর স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড তৈরি হয়।

সম্ভবত কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগই বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো গোয়েন্দা বিভাগ যারা এখনও কাজ করে চলছেন। এই বিভাগের প্রথম প্রধান হিসাবে দায়িত্ব নেন ‘এ. ইয়োনান’। প্রথম শ্রেণীর ইন্সপেক্টর হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন ‘আর. ল্যাম্ব’। এঁরা আগে কলকাতার পুলিশের অন্য বিভাগে যুক্ত ছিলেন। মাসিক ৬০ টাকা বেতনে চার দারোগাকে এই বিভাগে বদলি করে নিয়ে আসা হয়। এছাড়াও নতুন বিভাগে ১০ জন হেড কনস্টেবল, ১০ জন সেকেন্ড ক্লাস কনস্টেবল এবং ১০ জন তৃতীয় শ্রেনীর কনস্টেবল নিয়োগ করা হল। কলকাতা শহর এবং অন্যান্য অঞ্চল থেকে। বদলি হয়ে আসা পুলিশ কর্মীদের বেতনও বেশি করা হল। আজকের ভাষায় ‘স্মার্টনেস’ আর ‘ইনটেলিজেন্স লেভেল’ দেখেই নির্বাচন করা হয় তাঁদের। এই বিভাগের চার দারোগার মধ্যে একজন ছিলেন রিচার্ড রিড। রোজ মেরি কান্ডের তদন্তকারী অফিসার।

বাঙালি যুবকদের মেধা ও সাহসের জন্য এই বিভাগে নিয়োগ করার ব্যাপারে খুব আগ্রহী ছিলেন ইংরেজ কর্তারা। ১৮৭৫ সালে বিভাগে বাঙালি কনস্টেবলের সংখ্যা ছিল ৩৩০ জন। ১৮৭৩ সালে এই বিভাগকে ঢেলে সাজাবার নির্দেশ দিলেন হগ সাহেব। এই বিভাগ তখনও তাঁরই অধীনে।

পদোন্নতি ঘটে রিচার্ড রিডের। এই বিভাগের রোজকার কাজকর্ম দেখাশোনার ভার তুলে দেওয়া হয় তাঁর হাতেই। পরে তিনি বিভাগের সুপারিনটেনডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কিন্তু ১৮৭৯ সালে আচমকাই পদত্যাগ করেন তিনি। ঠিক কী কারণে তিনি পদত্যাগ করলেন তার কোনও কারণ আজও জানা যায়নি। পুলিশ কর্তার পদ থেকে সরে যাওয়ার পর তিনি এই কলকাতা শহরেরই বাসিন্দা হয়ে যান।

চাকরিজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে পরে একটি বই তিনি লিখেছিলেন। বইটির নাম দেন ‘এভরি ম্যান হিজ ওন ডিটেকটিভ’। প্রকাশকাল ১৮৮৬।

পরবর্তী সময়ে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে অনেক পরিবর্তন হয়। অনেক নতুন বিভাগ, নতুন দায়িত্ব, প্রচুর পুলিশকর্মী। কিন্তু সব কিছুর উৎস রিচার্ড রিডের রোজ-মেরি খুনের কিনারা। সেই কারণে তিনি আজও কলকাতা পুলিশের প্রথম সরকারী গোয়েন্দা।

খুনে অভিযুক্তদের দু’জনই ধরা পড়েছে, খুনের মোটিভ পরিষ্কার হয়েছে, খুনের গোটা ঘটনার বিশদ বিবরণও পাওয়া গিয়েছে অভিযুক্তদের কাছ থেকে। এই অবস্থায় আপাত দৃষ্টিতে তদন্তের আর তেমন কিছু পড়ে থাকতে পারে না। অথচ তারপরেও কিন্তু পুলিশের গোয়েন্দাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। লালবাজারের এক শীর্ষকর্তার কথায়, “অপরাধের কিনারা করা ও অভিযুক্তদের গ্রেফতার করার মধ্যেই পুলিশের দায়িত্ব শেষ নয়। অভিযুক্ত যাতে দোষী প্রমাণিত হয়ে সাজা পায়, সেটাও নিশ্চিত করতে হয়। অপরাধের কিনারা করায় যেমন, তেমন এই ব্যাপারেও গোয়েন্দা বিভাগ বিশেষ ভাবে দক্ষ। সেই জন্যই বিশেষ ঘটনার তদন্তভার তাঁদের দেওয়া হয়।”

বর্তমানে ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশ গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান ও সহকারী হিসেবে ডেপুটি কমিশনার ডিডি ২ দায়িত্ব পালন করেন। গোয়েন্দা বিভাগ নারী, বরিষ্ঠ নাগরিক, নাবালোক, মাদকাসক্ত ইত্যাদিদের কাউন্সেলিং সার্ভিস

শুধু দক্ষ নয়, কলকাতা পুলিশের আভিজাত্য ও কৌলীন্যেরও প্রতীক অনেকাংশে এই বিভাগ।

কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের দেড়শো বছরের ইতিহাসে স্মরণকালের মধ্যে লালবাজারের গোয়েন্দারা কেবল ‘স্টোনম্যান রহস্য’ ভেদ করতে পারেননি বলে কলকাতা পুলিশের পোড় খাওয়া অফিসারদের দাবি করেন। ১৯৮৯ সালে ছ’মাসের ব্যবধানে খাস কলকাতার ফুটপাথে ঘুমিয়ে থাকা ভিখারি বা ভবঘুরে গোছের ডজন খানেক মানুষকে রাতের অন্ধকারে পাথর দিয়ে মেরে মাথা থেঁতলে খুন করা হয়েছিল। কে বা কারা কেন পর পর এত জনকে হত্যা করেছিল, সেটা আজও রহস্য থেকে গিয়েছে। তবে বাকি সব বড় ঘটনায় লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগের সাফল্যই সাফল্য, এমনটা মনে করেন পুলিশের তাবড় কর্তারা।

 

 

 

তথ্যসূত্র


  1. http://www.kolkatapolice.gov.in/DetectiveDepartment.aspx
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/Kolkata_Police_Force
  3. গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার, এক ডজন খুনের রুদ্ধশ্বাস নেপথ্যকথা, সুপ্রতিম সরকার, আনন্দ পাবলিশার্স।
  4. আনন্দবাজার পত্রিকা, ১১ই সেপ্টেম্বর ২০১৬ সাল।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top
error: Content is protected !!