ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের একজন বিখ্যাত অভিনেতা, প্রযোজক এবং রাজনীতিবিদ হলেন ধর্মেন্দ্র (Dharmendra)। তাঁর আসল নাম ধরম সিং দেওল। হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে ষাটের দশকের রোম্যান্টিক নায়কদের মধ্যে তিনি অন্যতম। নায়ক হিসেবে একশোটিরও বেশী সফল ছবি রয়েছে হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে তাঁর। বহু নায়িকার সাথে জুটি বেঁধে তিনি কাজ করলেও হেমা মালিনীর সাথে তাঁর জুটি বলিউডে অন্যতম হিট জুটি। শুধু রোমান্টিক নায়ক নন, অ্যাকশন ফিল্মেও তিনি অভিনয়ে বলিষ্ঠতার ছাপ রেখেছেন। এইজন্য তিনি ‘হিম্যান’ বলেও পরিচিত । সারাজীবনের অবদানের জন্য ১৯৯৭ সালে হিন্দি চলচ্চিত্র জগত থেকে তাঁকে ‘লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট’ পুরস্কার দেওয়া হয়। রাজনীতির আঙিনায়তেও তিনি একজন পরিচিত ব্যাক্তিত্ব। ১৯৯২ সালে রাজস্থানের বিকানের লোকসভা আসন থেকে বিজেপির হয়ে জিতে পার্লামেন্টের সদস্য হন।
১৯৩৫ সালের ৮ ডিসেম্বর পাঞ্জাবের লুধিয়ানা জেলার নাসরাল গ্রামে এক জাঠ পরিবারে ধর্মেন্দ্রর জন্ম হয় । লুধিয়ানা জেলার দাঙ্গােল গ্রামে ছিল তাঁদের আদি নিবাস। তাঁর বাবার নাম কেওয়াল সিং দেওল এবং মায়ের নাম সত্যবন্ত কর। তাঁর বাবা ছিলেন সাহনেওয়াল গ্রামীণ স্কুলের শিক্ষক। মাত্র উনিশ বছর বয়সে ধর্মেন্দ্র প্রকাশ কউরের সাথে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন। তাঁদের চার সন্তানের মধ্যে সানি দেওল ও ববি দেওল হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচিত অভিনেতা। এছাড়াও রয়েছেন দুই কন্যা বিজেতা ও অজিতা দেওল। পরবর্তীকালে ১৯৮০ সালে তিনি বিখ্যাত অভিনেত্রী হেমা মালিনীকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে বিবাহ করেন বলে শোনা যায়। এষা দেওল ও অহনা দেওল তাঁর দ্বিতীয় পক্ষের সন্তান। তাঁর দুই স্ত্রী বর্তমান। তাঁর অন্যতম শখের মধ্যে সাইকেল চালানো, ঘুরে বেরানো এবং সিনেমা দেখা উল্লেখযোগ্য।
ধর্মেন্দ্রর শিক্ষা জীবন শুরু হয় সাহনেওয়াল গ্রামের লাল্টন কালান সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৫২ সালে ফাগওয়ারার রামগড়িয়া কলেজ থেকে তিনি ইন্টারমিডিয়েট পাস করার [পর আর পড়েননি। ছোট থেকেই গুরু দত্ত ,দেব আনন্দ, মধুবালা, দেবীকা রানীদের মত অভিনেতা অভিনেত্রীদের সিনেমা দেখতে ভালবাসতেন তিনি। মূলত এঁদের অভিনয় দেখেই ধর্মেন্দ্রর ইচ্ছে হয় অভিনেতা হওয়ার। তিনি এই সমস্ত অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের পোষ্টার জোগাড় করে নিজের কাছে রাখতেন। অভিনেত্রী ‘সুরাইয়ার বিশেষ ভক্ত তিনি ১৯৪৯ সালে সুরাইয়ার ‘দিল্লাগী’ সিনেমাটি দেখার জন্য এক মাইল হেঁটে যান । তিনি অন্তত চল্লিশবার এই সিনেমাটি দেখেছিলেন।
জাতীয় ফিল্মফেয়ার ম্যাগাজিনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘নিউ ট্যালেন্ট এ্যাওয়ার্ড’ প্রতিযোগিতার শর্ত ছিল, যে জিতবে সে বোম্বে (অধুনা মুম্বাই ) চলচ্চিত্র জগতে অভিনয়ের সুযোগ পাবে। ধর্মেন্দ্র প্রতিযোগিতা জিতে পাঞ্জাব থেকে মুম্বাই আসেন। ১৯৬০ সালে ‘দিল ভি তেরা হাম ভি তেরা’ ছবির মাধ্যমে হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে আত্মপ্রকাশ ঘটে ধর্মেন্দ্রর। ‘বয়ফ্রেন্ড’ চলচ্চিত্রে তিনি সহ অভিনেতা রূপে কাজ করেন। ১৯৬০ সালে শুরু হয়ে ধর্মেন্দ্রর অভিনয় যাত্রা প্রসারিত হতে শুরু করে বিভিন্ন অভিনেত্রীদের সাথে কাজ করতে করতে। সেই সময়কার সমস্ত অভিনেত্রীদের সাথেই ধর্মেন্দ্র কাজ করেছেন কিন্তু এঁদের মধ্যে অন্যতমা ছিলেন মীনা কুমারী। তিনি সেইসময়ে একজন তারকা। কিন্তু ফিল্ম জগতে নতুন আসা ধরমপালের ‘ধর্মেন্দ্র’ হয়ে ওঠাতে তাঁর ভূমিকা ছিল অন্যতম। মীনাকুমারীকে ধর্মেন্দ্র নিজের বন্ধু হিসেবে দেখতেন। তাঁর সাথে ধর্মেন্দ্রর সাতটি ছবি রয়েছে যেগুলি হল ‘ম্যায় লাড়কি হু’ (১৯৬৪), ‘কাজল’ (১৯৬৫), পূর্ণিমা (১৯৬৫), ‘মঝলি দিদি’ (১৯৬৭),’চন্দনা কা পালনা’ (১৯৬৭), ‘বাহারো কি মনফিল’ (১৯৬৮) । ১৯৬৬ সালে মীনাকুমারীর সাথে অভিনীত ‘ফুল অউর পাত্থর’ ছবিটি ধর্মেন্দ্রর জীবনের একটি অন্যতম সফল চলচ্চিত্র। এই ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মনে দাগ কেটে যায়। এটি ছিল তাঁর অভিনীত প্রথম অ্যাকশন সিনেমাও। এই ছবিটির জন্য তিনি প্রথম ফিল্মফেয়ার পুরষ্কারও পান। এছাড়াও ১৯৬২ সালে অভিনেত্রী নূতনের সাথে ‘সুরত সিরাত’, ১৯৬৩ সালে ‘বন্দিনী’ দুলহন এক রাত কি’, ‘দিল নে ফির ইয়াদ কিয়া’ ইত্যাদি ছবিগুলিতে কাজ করেন। অভিনেত্রী মালা সিনহার সাথে ‘আনপড়’ (১৯৬২), ‘পূজা কে ফুল’ (১৯৬৪), অভিনেত্রী সায়রা বানুর সাথে ‘শাদী’ ১৯৬৪ তে ‘আয়ে মিলন কি বেলা’ ছবিতে কাজ করেছেন তিনি। এই সমস্ত ছবিগুলিতে ধর্মেন্দ্রর এক রোমান্টিক ইমেজ তৈরী হয়। ১৯৬৬ সালে ‘অনুপমা’ তে ধর্মেন্দ্রর অভিনয় সমালোচকদের দৃষ্টি আর্কষণ করে। এই ছবিটির গানগুলি যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়। রোমান্টিক ইমেজ ভেঙ্গে কিছু থ্রিলার ছবিতেও ধর্মেন্দ্রর অভিনয় দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়ে নিয়েছে। এইগুলি হল ‘ব্ল্যাকমেইল’, ‘শিকার’, ‘কব কিঁউ অর কাঁহা’ ইত্যাদি। অভিনেত্রী হেমা মালীনির সাথে ধর্মেন্দ্রর জুটি খুব হিট হয়। এই হিট জুটি ‘রাজা জানী’, ‘সীতা অউর গীতা’, ‘শরাফত’, ‘তু হাসিন ম্যায় জওয়ান’ ‘শোলে’ র মত ছবিগুলি আমাদের উপহার দিয়েছেন। এর মধ্যে ১৯৭৫ সালে রমেশ সিপ্পি দ্বারা পরিচালিত ‘শোলে’ ছবিতে বীরুর ভূমিকায় ধর্মেন্দ্রর অভিনয় এক মাইলষ্টোন। এই ছবিতে অ্যাকশন এবং রোমান্টিক দুইই ইমেজকেই খুব ভালভাবে কাজে লাগিয়েছেন ধর্মেন্দ্র। এই ছবিটি ভারতীয় চলচ্চিত্রে একটি অন্যতম সফল এবং মাইলফলক ছবি। এই ছবির সাফল্য ধর্মেন্দ্রকে সফলতার শীর্ষে পৌঁছে দেয়। অনেকগুলি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জেতে ‘শোলে’। দেশে এবং বিদেশেও সমান জয়প্রিয়তা অর্জন করে ছবিটি। তিনি হিন্দি ছবি ছাড়াও পাঞ্জাবি ছবিতেও অভিনয় করেছেন।
ধর্মেন্দ্র প্রযোজক হিসেবেও সফলতা অর্জন করেছেন। ১৯৮৩ সালে ‘বিজেতা ফিল্মস’ নামে প্রোডাকশন কোম্পানির যাত্রা শুরু করেন। বড় ছেলে সানি দেওলকে নিয়ে ‘বেতাব’ ছবিটি প্রযোজনা করেন প্রথম। এই ছবিটি যথেষ্ট সফলতা পায়। এর চৌদ্দ বছর পরে ছোট ছেলে ববি দেওলকে নিয়ে নিয়ে করেন ‘বরসাত’ ছবিটি। এই দুটি ছবির মাধ্যমেই সানি দেওল ও ববি দেওল হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে আত্মপ্রকাশ করেছেন। এই প্রোডাকশনের ‘ঘায়েল’ ছবিটি ১৯৯০ সালে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছবির নিরিখে জাতীয় পুরস্কার এবং সাতটি ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পুরস্কারে সম্মানিত হয়। এছাড়াও ১৯৯৯ সালে ‘দিল্লাগী’, ২০০১ সালে ‘ইন্ডিয়ান’, ২০০২ সালে ‘শহিদ’, ২০০৫ সালে ‘সোচা না থা’, ২০০৭ সালে ‘আপনে’, ২০০৮ সালে ‘চমকু’, ২০১৬ ‘ঘায়েল ওয়ানস এ্যাগেইন’, ২০১৮ সালে ট্রাভেল সলিউশন’, ২০১৮ সালে ‘যমলা পাগলা দিবানা’, ২০১৯ সালে ‘পল পল দি কে পাস’ ইত্যাদি ছবিগুলো প্রযোজনা করেন।
ধর্মেন্দ্র নিজের জীবনে তাঁর কাজের জন্য প্রচুর সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন। ১৯৬৫ সালে ‘আয়ি মিলন কি বেলা’, ১৯৬৭ সালে ‘ফুল অউর পাত্থর’, ১৯৭২ সালে ‘মেরা গাঁও মেরা দেশ’, ১৯৭৪ সালে ‘ইঁয়াদো কি বারাত’ ১৯৭৫ সালে ‘রেশম কি ডোরি’ ছবিগুলির জন্য সেরা অভিনেতার জন্য মনোনীত হন। ১৯৯১ সালে ধর্মেন্দ্র প্রযোজিত সেরা ছবি হিসেবে ‘ঘায়েল’ ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে সম্মানিত হয়। ১৯৯৭ সালে ধর্মেন্দ্র ‘লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট’ অ্যাওয়ার্ড পান। এছাড়াও ধর্মেন্দ্র ‘ওর্য়াল্ড আয়রন ম্যান’ সম্মান পেয়েছেন। সত্তরের দশকে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে সুপুরুষ আখ্যা পান। তিনি ‘লিডিং লেজেন্ড অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন ইন্ডিয়ান চেম্বার অফ কর্মাস অ্যান্ড ইন্ড্রাষ্ট্রি থেকে। ২০০৪ সালে তিনি বিশেষ সম্মান পান ভারতীয় সিনেমায় বিশেষ অবদানের জন্য। ২০০৫ সালে তিনি ‘জি সিনে অ্যাওয়ার্ড” থেকে লাইফ টাইম অ্যার্চিভমেন্ট পুরষ্কারে সম্মানিত হন। ২০০৭ সালে পুণে আর্ন্তজাতিক ফিল্ম ফেষ্টিভ্যাল থেকে লাইফ টাইম অ্যার্চিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পান। ২০০৯ সালে ‘নাসিক আর্ন্তজাতিক ফিল্ম ফেষ্টিভ্যাল’ থেকেও তিনি লাইফ টাইম অ্যার্চিভমেন্ট পুরস্কার পান। ২০১১ সালে ‘সালাম মহারাষ্ট্র অ্যাওয়ার্ড’ পান তিনি চলচ্চিত্র জগতে পঞ্চাশ বছর পূর্ণ করার জন্য। ২০১২ সালে ভারত সরকার থেকে তাঁকে ‘পদ্মভূষণ’ পুরস্কারে সম্মানিত করেন।
২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বর বার্ধক্যজনিত কারণে ধর্মেন্দ্রর মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান