বিজ্ঞান

গ্রহ নক্ষত্রের দূরত্ব মাপা হয় কীভাবে

জ্যোতির্বিজ্ঞানে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল দূরত্ব। অর্থাৎ, আমরা জানতে চাই যে আমাদের পৃথিবীর যে উপগ্রহ যার সাথে রাতে প্রায়ই দেখা হয় সেই চাঁদ আমাদের থেকে কত দূরে? আচ্ছা, সবচেয়ে কাছের যে নক্ষত্র আমাদের গ্রহের প্রাণের ধারাকে সজীব করে রাখে, আমাদের বেশিরভাগ শক্তির উৎসদাতা সেই সূর্য আমাদের থেকে কত দূরে? বা, ওই যে দেখা যায় আকাশে মঙ্গল গ্রহ, ভোর ও বিকেলে যে শুকতারা (শুক্র গ্রহ), বা ওই দূরের যে উজ্জ্বল তারা দেখা যাচ্ছে – এই সবের দূরত্ব কত? বিজ্ঞানীরা কিন্তু এগুলোর দূরত্ব হিসেব করে জানিয়েছেন। অথচ দূর দূরান্তের গ্রহ নক্ষত্রে যাওয়ার কোন উপায় নেই। তাহলে গ্রহ নক্ষত্রের দূরত্ব মাপা হয় কীভাবে? যদিও অনেক কঠিন গাণিতিক হিসেব নিকেশের ব্যাপার আছে তবে আমরা এখানে গ্রহ নক্ষত্রের দূরত্ব মাপা হয় কীভাবে সেই বিষয়ে একটা সাধারণ ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করব।

এই দূরত্ব মাপার ক্ষেত্রে প্রথমে যে ধারণার কথা আমাদের মাথায় আসে তা হল ‘ডপলার এফেক্ট বা ডপলার ক্রিয়া (Doppler effect)’। বিষয়টা কি? আমরা যখন কোনো প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করি তখন একটি বিষয় আমরা প্রায়ই লক্ষ্য করি যে, যখন ট্রেনটা কাছে আসে তখন তার থেকে নির্গত আওয়াজ বেশ জোরেই শোনায় আবার যখন সেটি দূরে চলে যায় তখন তার আওয়াজও আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসে। এই ডপলার এফেক্ট কিন্তু কেবলমাত্র শব্দের জন্য যে কাজ করে এমনটা নয়, আলোর জন্যও কাজ করে। আর এই ডপলার এফেক্টের ফলেই আমরা বুঝে যাই যে গ্রহ বা নক্ষত্রটি কত দূরে আছে। যখন কোনো আলোর উৎস আমাদের থেকে দূরে চলে যায় তখন তার আলোক তরঙ্গের কম্পাঙ্ক (frequency) কমে যায় এবং তরঙ্গ দৈর্ঘ্য (wavelength) বেড়ে যায়। আবার কোনো আলোর উৎস যখন আমাদের কাছে চলে আসে তখন তার আলোক তরঙ্গের কম্পাঙ্ক বেড়ে যায় এবং তরঙ্গ দৈর্ঘ্য (wavelength) কমে যায়। এই ব্যাপারটা বোঝা যায় দৃশ্যমান বর্ণালি (visible spectrum) বিশ্লেষণ করে। এই দৃশ্যমান বর্ণালিতে রামধনুর মতো সাতটা রং আছে। বেগুনির সবচেয়ে কম তরঙ্গ দৈর্ঘ্য থাকে আর লালের সবচেয়ে বেশি। যখন কোনো আলোর উৎস আমাদের থেকে দূরে চলে যায় তখন তার থেকে আসা আলো বর্ণালির লাল অংশের দিকে অর্থাৎ দীর্ঘ তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের দিকে সরে যায়। এই ঘটনাকে বলা হয় লাল সরণ (redshift)। আবার, যখন কোনো আলোর উৎস আমাদের কাছে চলে আসে তখন তার থেকে আসা আলো বর্ণালির নীল অংশের দিকে অর্থাৎ কম তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের দিকে সরে যায়। এই ঘটনাকে বলা হয় নীল সরণ (blueshift)। বর্ণালি মাপার যন্ত্র অর্থাৎ স্পেকট্রোস্কোপ বা বর্ণালীমাপক দ্বারা দূরবর্তী গ্রহ, নক্ষত্র বা ছায়াপথ কিংবা সৌরজগৎ কতটা দূরে অবস্থিত তা সেখান থেকে আসা আলোর সরণ দেখলেই বোঝা যায়। 

আরেকটা খুব প্রাচীন পদ্ধতি আছে যা লম্বন পদ্ধতি (parallax measurement) নামে পরিচিত। বলা হয় যে, এটা তারার দূরত্ব মাপার সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি। প্যারালাক্স পদ্ধতি কীভাবে ব্যবহার হয় বোঝার জন্য সহজ উদাহরণ হল, আমাদের একটি চোখ বন্ধ করে চোখের সামনে একটি আঙুল দিয়ে দূরের কোন বস্তুকে আড়াল করার পর খোলা চোখ বন্ধ করে বন্ধ চোখটি খুললে দেখা যায় যে আঙুলটি বস্তুটির থেকে সরে গেছে। একেই বলে প্যারালাক্স। এক্ষেত্রে চোখদুটির মধ্যে দূরত্ব ও আঙুলটির সরণের পরিমাপ করে দূরের বস্তুটির দূরত্ব নির্ণয় কয়া সম্ভব। ঠিক যখন আমরা পৃথিবীর কোন দুটি জায়গা থেকে যদি একটি তারার অবস্থান পর্যবেক্ষণ করি এবং ওই তারাটির পেছনের অন্যান্য স্থির তারাগুলোর সাপেক্ষে তার অবস্থানের কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করি। কৌণিক (angular) উপায়ে ওই পরিবর্তন মাপা হয় থাকে। পৃথিবীর ওই দু-জায়গার মধ্যে দূরত্ব জানা থাকতে হবে। তারার কৌণিক তারতম্য পরিমাপ করে ত্রিকোণমিতির কিছু সাধারণ সূত্র ব্যবহার করে নক্ষত্রের দূরত্ব মাপা হয়। 

কিছু কিছু তারার ক্ষেত্রে এই লম্বন পদ্ধতি মাপা হয় আমাদের এই গ্রহের কক্ষপথের দুটো অবস্থান নির্ণয় করে। আমরা জানি আমাদের পৃথিবী এক বছর অর্থাৎ ১২ মাস সময় নেয় সূর্যকে পরিক্রমণ করতে। অর্থাৎ সূর্যের চারপাশে তার কক্ষপথে ঘুরতে ১২ মাস লাগে। এবার, ১২ মাসের অর্ধেক অর্থাৎ ৬ মাস পরে কোনো তারার কৌণিক পরিমাপ নির্ণয় করে আগের থেকে কৌণিক পার্থক্য বা কৌণিক বিচ্যুতি পরিমাপ করে ত্রিকোণমিতির কিছু সাধারণ সূত্র ব্যবহার করে সেটার দূরত্ব জানা যায়। এক্ষেত্রে পৃথিবীর কক্ষপথের দুটো অবস্থান বা বিন্দুর মধ্যকার দূরত্ব জানা প্রয়োজন। এভাবে যদি কোনো তারার কৌণিক লম্বনের পরিমাপ আসে ১ আর্কসেকেন্ড তবে সেই তারা আমাদের থেকে ১ পারসেক দূরে অবস্থিত। চিত্র ১ দেখলে ব্যাপারটা বোঝা সহজ হবে।

চিত্র ১

এবার অত দূরের কোনো বস্তুর দূরত্ব তো আর কিলোমিটার দিয়ে মাপা যায় না। আলোকবর্ষ (light year) নামক একক ব্যবহার করা হয় এক্ষেত্রে দূরত্ব পরিমাপের ক্ষেত্রে। এক বছরে আলো যতদূর যায় বা যত দূরত্ব অতিক্রম করে তাই হল আলোকবর্ষ। এই ১পারসেক হল ৩.২৬ আলোকবর্ষ বা কিলোমিটারে বললে তা হয় ৩১০০০০০০০০০০০০ কিলোমিটার। কত বড় তাই না? তাই আলোকবর্ষ ব্যবহার করাই শ্রেয়। এক মিলিয়ন পারসেককে এক মেগা পারসেক বলা হয়। ধরা যাক, প্রক্সিমা সেন্টরি তারার কৌণিক বিচ্যুতি ০.৭৬” (০.৭৬ সেকেন্ড)। এবার এই কৌণিক বিচ্যুতিকে ১ দিয়ে ভাগ করলে অর্থাৎ এর বিপরীত নির্ণয় করলে আমরা পারসেকের মান পেয়ে যাব। এক্ষেত্রে, আমরা পাই প্রায় ১.৩ পারসেক। এই উপায়ে আমরা ০.০১ কৌণিক বিচ্যুতি বা  ১০০ পারসেকের বেশি দূরত্ব মাপতে পারি না। তাই, বেশি দূরত্ব মাপতে গেলে অত্যাধুনিক বিভিন্ন যন্ত্র জ্যোতির্বিদরা ব্যবহার করে থাকেন। বহু কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত কোনো মহাজাগতিক বস্তুর সঠিক দূরত্ব নির্ণয় বেশ কঠিন কাজ। লম্বন পদ্ধতির পাশাপাশি সেক্সট্যান্ট যন্ত্রও ব্যবহার করা হয় কোনো গ্রহ বা নক্ষত্রের কৌণিক দূরত্ব পরিমাপ করার জন্যে। ইংরেজি ‘সেক্সট্যান্ট’ শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ‘সেক্সটাস (Sextus)’ শব্দ থেকে যার অর্থ একের ছয় ভাগ। এই যন্ত্রটি মূলত জাহাজে এবং বিমান থেকে অক্ষাংশ বা নিরক্ষরেখা থেকে কোনো কিছুর দূরত্ব নির্ণয় করা হয়। আসলে এই যন্ত্রটি একটি বৃত্তের ৬ ভাগ (অর্থাৎ ৬০° পর্যন্ত মাপা যায়)। এর কেন্দ্রে রয়েছে এক ব্যাসার্ধ বাহু (radial arm) যার শেষ প্রান্তে একটি আয়না থাকে আর অপর প্রান্তে থাকে স্কেল। যন্ত্রের ওপর একটি টেলিস্কোপ ও টেলিস্কোপের সামনে একটি আয়না যুক্ত থাকে। টেলিস্কোপের মধ্যে দিয়ে সোজা দিগন্ত দেখা যায় তারপর আয়নাটি নক্ষত্র বা গ্রহের দিকে ঘোরানো হয় যাতে সেটা দিগন্তের ওপর দেখা যায়। এবার আয়নাযুক্ত বাহুটি চালনা করে কৌণিক দূরত্ব মাপা যায়। ক্রোনোমিটারে প্রাপ্ত কৌণিক দূরত্ব থেকে এবং সঠিক সময়ের হিসেব কষে অক্ষাংশ পাওয়া যায়। 

র‍্যাডার যন্ত্র দিয়ে বিভিন্ন গ্রহ, নক্ষত্র থেকে আসা রেডিও তরঙ্গ র‍্যাডার যন্ত্রে নির্ণয় করে সেটার দূরত্ব মাপা যায়। বর্তমানে আরও অত্যাধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে এবং আলোকবর্ষ, পারসেক ইত্যাদি একক নিয়ে বিভিন্ন গ্রহ, নক্ষত্রের দূরত্ব মাপা হয়। 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন