আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা একটি অন্যতম উৎকৃষ্ট ভাষা, এর শব্দ ও সাহিত্য ভান্ডার অপরিসীম। যেকোনো উৎকৃষ্ট ভাষার একটি প্রধান সম্পদ হল প্রবাদ, ইংরেজিতে যাকে বলে proverb। বাংলা ভাষায় প্রাচীনকাল থেকেই অনেক প্রবাদ লোকমুখে বা সাহিত্যে প্রচলিত আছে। এই রকমই একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল “ধর্মের ষাঁড়”। এই প্রবাদটির প্রচলিত অর্থ হল: অকর্মণ্য ব্যক্তি। কখনও কখনও এর অর্থ হিসেবে স্বেচ্ছাচারী ব্যক্তি যিনি অন্যের ক্ষতি করেন তাঁকেও বোঝানো হয়। ধর্মের ষাঁড় প্রবাদের পিছনে বাংলার প্রচলিত ধর্মাচরণের সরাসরি সংযোগ রয়েছে তবে এই প্রবাদের ‘ধর্ম’ ঠাকুরের উৎপত্তি সম্পর্কে মতভেদ আছে। এখানে আমরা জেনে নেব কে এই ধর্ম আর ধর্মের ষাঁড় প্রবাদটি এলো কীভাবে।
বরাহপুরাণ অনুসারে, সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা যখন সৃষ্টির উদ্দেশ্যে গভীর চিন্তায় নিমগ্ন ছিলেন, তখন তাঁর শরীরের ডান অংশ থেকে এক পুরুষের আবির্ভাব ঘটে। এই পুরুষই হলেন ধর্ম। ব্রহ্মার আদেশে ধর্মের আকৃতি হয় বৃষভাকৃতি—অর্থাৎ তিনি ছিলেন ষাঁড়ের মতো এবং চার পায়ে স্থিত। তাঁর দায়িত্ব ছিল প্রজাপালন, অর্থাৎ সৃষ্ট জীবের কল্যাণ ও নৈতিক রক্ষাকল্পে কাজ করা।
ব্রহ্মার নির্দেশ অনুযায়ী ধর্ম বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন রূপ ধারণ করেন। সত্যযুগে তিনি ছিলেন চতুষ্পদ, অর্থাৎ চার পায়ে স্থিত, যা ধর্মের পূর্ণতা ও স্থিতিশীলতার প্রতীক। ত্রেতাযুগে তিনি হন ত্রিপদ, দ্বাপরযুগে দ্বিপদ এবং কলিযুগে একপদ। এই রূপান্তর ধর্মের ক্রমাবনতি ও নৈতিকতার অবক্ষয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
সমাজের শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী ধর্মের প্রভাবও যুগে যুগে ভাগ হয়ে পড়ে। সত্যযুগে ব্রাহ্মণদের মধ্যে ধর্মের পূর্ণতা বিরাজ করত, কারণ তারা জ্ঞান, গুণ ও নৈতিকতার ধারক। ত্রেতাযুগে ধর্মের তিন ভাগ ক্ষত্রিয়দের মধ্যে বিস্তৃত হয়, যারা যুদ্ধ ও শাসনের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। দ্বাপরযুগে বৈশ্যরা ধর্মের দুই ভাগ পায়, যাদের কাজ ছিল কৃষিকাজ ও পশুপালন। আর কলিযুগে ধর্মের একমাত্র অবশিষ্ট অংশটি শূদ্রদের মধ্যে থাকে, যারা সেবামূলক কাজে নিয়োজিত।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে ধর্মপূজা বৌদ্ধধর্মের রূপান্তর মাত্র। পালবংশীয় রাজা ধর্মপালের (৭৮১-৮২১ খ্রি.) সময় এদেশে ধর্মপূজা ব্যাপকতা লাভ করে । ডোম-পুরোহিতরাই এ পূজার প্রধান পুরোহিত ছিলেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেছেন –
‘ধর্মঠাকুরকে কোনো কোনো স্থলে বিষ্ণুরূপে পূজা করে, তুলসী দেয়, বলিদান করে না। কোথাও শিবরূপে পূজা করে, বিল্বপত্র (বেলপাতা) দেয় । কোথাও বা ছাগবলি, মেষবলিও দেয়, কিন্তু অধিকাংশ স্থলে মুরগি, শূকর বলিই হয়। ধর্মঠাকুরের পুরোহিত কোথাও কৈবর্ত, কোথাও দুলে (ডুলি, পালকি ইত্যাদির বাহক), কোথাও বাগদি, কোথাও আগুরি (উগ্র ক্ষত্রিয় জাতি)। কিন্তু অধিকাংশ স্থলে ডোম বা পোদ। শেষোক্ত দুই জাতি এখনো ব্রাহ্মণ লয় নাই, এখনো তাহারা আপনাদের জাতীয় পণ্ডিত দিয়া সব কাজ করায় । ধর্মঠাকুর ইহাদের নিজস্ব দেবতা।’
বৌদ্ধ আমলে সমগ্র বাংলাদেশ ধর্মপূজার আয়োজনে ব্যস্ত থাকত। সমাজের উচ্চশ্রেণীর বৌদ্ধ ডোম পুরোহিতরা ধর্মান্তরিত না হওয়ায়, সময়ের পরিবর্তনে তারা আর আগের মতো সম্মান ও সম্ভ্রমের সঙ্গে সমাজের নেতৃত্বে থাকতে পারেননি। অনেকেই বেদনানির্ধারিত আচার-অনুষ্ঠান মেনে নিয়েছিলেন, কিন্তু যাঁরা তা গ্রহণ করেননি, তাঁরা ধীরে ধীরে সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে পিছিয়ে পড়েন। এমনকি জীবিকার প্রয়োজনে অনেককে নিম্নশ্রেণীর পেশায় নিয়োজিত হতে বাধ্য হতে হয়।
আজকের সনাতন ধর্মের ভিত্তিতে যতটা বেদের প্রাধান্য রয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী মহাযানী বৌদ্ধধর্মের ছাপ—এ কথা অস্বীকার করার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। যদিও বৌদ্ধদের শাস্ত্র আমাদের কাছে ব্রাহ্মণ্য রূপে উপস্থাপিত হয়েছে, তবু সনাতন হিন্দুদের চিন্তা, বিশ্বাস ও আচরণে মহাযানী বৌদ্ধধর্মের প্রভাব সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। বৌদ্ধ আমলের দেবদেবীদের হিন্দুরা আজও ভক্তিভরে পূজা করেন, এবং তাঁদের রূপ যুগোপযোগী করে গ্রহণ করেছেন।
ধর্ম বা ধর্মঠাকুর আজও বাংলার সমাজে পূজনীয় — কখনও বিষ্ণুরূপে, কখনও শিবরূপে, আবার কখনও যম বা অন্য কোনও মহিমায়। বৌদ্ধ যুগের মতো আজও ধর্মের নামে মানত করে ষাঁড় বা ছাগল ছেড়ে দেওয়ার রীতি প্রচলিত রয়েছে। বিভিন্ন হাটবাজারে মুক্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়ানো দু’একটি ষাঁড় বা পাঁঠা দেখা যায়, যাদের ধর্মের নামে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তারা যত্রতত্র তরিতরকারির ডালা কিংবা ক্ষেতের ফসল খেয়ে ফেললেও সাধারণ মানুষ তাদের উপর অত্যাচার করে না। কোন কোন ক্ষেত্রে ক্ষতি হলেও মানুষ যেন সেই অবস্থাকে ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ হিসেবে মেনে নেয়।
ধর্মঠাকুর বা ধর্ম সম্পর্কে বিশদে না গিয়ে বলা যায়, ধর্মের নামে উৎসর্গ করা ষাঁড় — যাদের হত্যা করা হয় না — তাদের অবাধে ঘুরে বেড়ানোর রীতি আজও সমাজে প্রচলিত। তারা অনেক সময় মানুষের ক্ষতি করে, ক্ষেতের ফসল খেয়ে ফেলে, বাজারের তরিতরকারি নষ্ট করে। তবু সাধারণ মানুষ তাদের শাস্তি দেয় না। এই সহনশীলতা এক ধরনের সামাজিক ধর্মবোধেরই প্রকাশ।
তবে যখন এই আচরণ মানুষের মধ্যে দেখা যায় — অর্থাৎ কেউ স্বচ্ছন্দে ঘুরে বেড়ায়, পরের অনিষ্ট করে, অথচ কেউ কিছু বলে না — তখন তাকে ব্যঙ্গ করে “ধর্মের ষাঁড়” বলা হয়। আবার কেউ যদি শুধু খায়-দায়, কিন্তু কোনও কাজকর্মে মনোযোগ না দেয়, তাকেও “ধর্মের ষাঁড়” নামে অভিহিত করা হয়।
ধর্মঠাকুরের মাহাত্ম্যকে ঘিরে বাংলার সমাজে বহু প্রবাদ চালু রয়েছে। “যজ্ঞের ঘোড়া”, “গোকুলের ষাঁড়” কিংবা “খোদার খাসি”—এই প্রবচনগুলোর সঙ্গে “ধর্মের ষাঁড়” প্রবাদটি তুলনীয়, কারণ সবগুলোই এমন কিছু বা কাউকে বোঝায়, যাদের কার্যকলাপের সীমা নেই, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনও প্রতিক্রিয়া দেখানো হয় না।
‘ধর্মের ষাঁড়’ প্রবাদটি দিয়ে বাক্যগঠন:
১। ও তো সারাদিন অফিসে ধর্মের ষাঁড়ের মতো ঘুরে বেড়ায়, কাজের কাজ কিছুই করে না।
২। সারাদিন ঘরে বসে বসে খাচ্ছে ধর্মের ষাঁড়ের মতো, কাজের কাজ কিছু তো করো না।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- প্রবাদের উৎস সন্ধান – সমর পাল, শোভা প্রকাশ / ঢাকা ; ৯১ পৃঃ


আপনার মতামত জানান