ইতিহাস

এডমন্ড হিলারি

স্যার এডমন্ড হিলারি (Edmund Hillary) ছিলেন একজন নিউজিল্যান্ডীয় পর্বতারোহী যিনি শেরপা তেনজিং নোরগের সাথে বিশ্বে প্রথমবারের জন্য এভারেস্ট জয় করেছিলেন। ১৯৮৫ -১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ভারত এবং বাংলাদেশে নিউজিল্যান্ডের হাই কমিশনার এবং নেপালে রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেছেন।

১৯১৯ সালের ২০ জুলাই নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে এডমন্ড হিলারির জন্ম হয়৷ তাঁর বাবার নাম পার্সিভাল অগস্টাস হিলারি ও মায়ের নাম ছিল গার্ট্রুড ক্লার্ক। হিলারির বাবা পেশায় ছিলেন একজন মৌমাছি পালক৷

হিলারি টুয়াকাউ প্রাথমিক বিদ্যালয় ও অকল্যান্ড গ্রামার স্কুল থেকে শিক্ষালাভ করেন৷ সম্ভবত এগারো বছর বয়েস বা তারও আগে তিনি প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করেছিলেন৷ তাঁর মা চেয়েছিলেন হিলারি ভাল স্কুলে পড়াশোনা করুক৷ তাই স্কুলে যাওয়ার জন্য সকাল ৭টার আগে টুয়াকাউ স্টেশনে সাইকেল চালিয়ে পৌঁছে যেতেন এবং আবার সন্ধে ৬ টায় ফিরে আসতেন তিনি৷ প্রায় সাড়ে তিন বছর এই যাতায়াত চলেছিল৷ ১৯৩৫ সালে তাঁরা সকলে অকল্যান্ডের রিমুয়েরাতে চলে আসেন৷ এডমন্ড হিলারি সমবয়সীদের তুলনায় লাজুক স্বভাবের ছিলেন। যদিও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর এই মুখচোরা স্বভাব কেটে গেছিল।

হাইস্কুলে পড়ার সময় তিনি নিউজিল্যান্ডের দক্ষিন আল্পসে আরোহণ করেন।১৯৩৫ সালে স্কুল থেকে শিক্ষামূলক ভ্রমণে তাঁরা রূপােহু পাহাড়ে গিয়েছিলেন৷ সেখানে গিয়ে তিনি পর্বতারোহণে আগ্রহী হয়ে ওঠেন৷  অবশ্য তারপর থেকে পড়াশোনার থেকে আরোহণের প্রতি তাঁর আগ্রহ বেড়ে যায়৷  তিনি এরপর  অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটি কলেজে(Auckland University College) বিজ্ঞান ও অঙ্ক নিয়ে ভর্তি হন এবং একই সাথে ওখানকার ট্রাম্পিং ক্লাবেও (Tramping Club) ভর্তি হন৷ কিন্তু দুই বছর পড়াশোনা করার পর তিনি পড়াশোনা শেষ না করেই কলেজ ছেড়ে দেন৷

এডমন্ড হিলারির প্রাথমিক কর্মজীবন শুরু হয়েছিল তাঁর বাবা এবং ভাই রেক্সের সঙ্গে মৌমাছি পালনকারী হিসেবে৷ গ্রীষ্মকালে তিনি মৌমাছি প্রতিপালন করতেন এবং শীতকালে পাহাড়ে আরোহণ করতেন ৷

১৯৩৮ সালে তিনি সপরিবারে হারবার্ট সুত্লিফের জীবন দর্শন “Radiant Living” এর উপর বক্তৃতা শুনতে গেছিলেন। ১৯৪১ সালে তিনি Radiant Living দর্শনের ওপর শিক্ষক হওয়ার জন্য পরীক্ষা দেন ও পরীক্ষায় পাশ করেন৷ এর মধ্যে ১৯৩৯ সালে তিনি দক্ষিন আল্পসের মাউন্ট কুকের কাছাকাছি মাউন্ট অলিয়েভিয়ার শীর্ষে পৌঁছান। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তিনি সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন কিন্তু যুদ্ধ শেষ হতেই আবার তিনি তাঁর পর্বত আরোহীর জীবনে ফিরে যান৷

১৯৪৯ সালের এভারেস্ট পৌঁছানোর প্রচলিত পথটি তিব্বত বন্ধ করে দেয়। এভারেস্ট পৌঁছানোর জন্য পরবর্তী বেশ কয়েক বছর ধরে নেপাল বছরে কেবল এক বা দুটি অভিযানের অনুমতি দিত। ১৯৫২ সালে একটি সুইস অভিযাত্রীদের দল (যার মধ্যে তেনজিং নোরগে অংশ নিয়েছিলেন) শীর্ষে পৌঁছতে চেষ্টা করেছিল কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে এবং অক্সিজেনের সমস্যার কারণে শীর্ষ থেকে ৮০০ ফুট (২৪০ মিটার) পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়। 

১৯৫২ সালে জন হান্টের নেতৃত্বে ব্রিটিশদের এভারেস্ট পর্বতঅভিযানে এডমন্ড হিলারি অংশগ্রহণ করেন। এই অভিযানে দশ হাজার পাউন্ড মাল বহন করার জন্য ৩৬২ জন মালবাহক ও ২০ জন শেরপা সহ চার শতাধিক মানুষ নিয়ে দল তৈরী করা হয়েছিল৷ মার্চ মাসে বেস ক্যাম্প তৈরী করে ধীরে ধীরে দলটি ৭,৮৯০ মিটার উচ্চতায় আরোহণ করে সাউথ কলে তাঁদের সর্বশেষ শিবির স্থাপন করে৷

এই সময় পাহাড়ি আবহাওয়া মোটেই অনুকূল ছিল না৷ তুষার এবং প্রচণ্ড শীতল বাতাস তাঁদের প্রতি পদে বাধা দিতে থাকে। ২৮ মে তাঁরা আং ন্যিমা, আলফ্রেড গ্রেগরি ও জর্জ লোর সাহায্যে ৮,৫০০ মিটার (২৭,৮৮৭ ফুট) উচ্চতায় তাঁদের শিবির তৈরী করেন।  পরের দিন সকালে হিলারি আবিষ্কার করেন যে তাঁবুর বাইরে থাকা তাঁর বুটগুলিতে তুষার জমে শক্ত হয়ে গেছে। তিনি ও তেনজিং নোরগে প্রায় দু ঘন্টা ধরে উনুনের আঁচে গরম করে বুটগুলিকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনেন৷ তারপর আবার ত্রিশ পাউন্ড ওজনের সরঞ্জাম নিয়ে তারা  শৃঙ্গ আরোহণের চেষ্টা শুরু করেন।  সামনের ৪০ ফুট খাড়াই একটি পাথর ছিল যেটি বর্তমানে “হিলারি স্টেপ” নামে পরিচিত৷

১৯৫৫ সালে তেনজিং তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে এভারেস্ট শীর্ষ আরোহণে এডমন্ড হিলারি প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছিলেন,  তিনি তাঁকে অনুসরণ করে এগিয়েছিলেন। তাঁরা সকাল ১১:৩০ মিনিটে এভারেস্ট পর্বত শৃঙ্গে এসে পৌঁছান। পর্বতশৃঙ্গে তাঁরা পনেরো মিনিট মতন ছিলেন। এই সময় হিলারি তেনজিংয়ের একটি ছবি তোলেন৷  এই আলোকচিত্রে তেনজিংকে তাঁর বরফ-কুঠার তুলে ধরে থাকতে দেখা যায়। কিন্তু কোন কারণ বশত এডমন্ড হিলারি নিজের কোন ছবি তোলেননি৷

পর্বত থেকে নেমে আসার সময় লো'(Lowe) এর সঙ্গে প্রথম দেখা হয়।  হিলারি তাঁকে দেখে বলেছিলেন, “Well, George, we knocked the bastard off.” তাঁরা কয়েক দিন পরে কাঠমান্ডুতে ফিরে এসে জানতে পেরেছিল যে হিলারি ইতিমধ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অর্ডার অফ নাইট কমান্ডার এবং হান্ট নাইট ব্যাচেলর উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন এবং তেনজিংকে জর্জ পদক প্রদান করা হয়েছে৷  ১৯৫৮ সালে হিলারিকে পোলার মেডাল (Polar Medal) পুরস্কারেও সম্মানিত করা হয়।

প্রথমে ১৯৫৬ সালে তারপর ১৯৬০-১৯৬১ অবধি হিলারি হিমালয়ের আরও দশটি চূড়ায়  আরোহণ করেছিলেন। তিনি কমনওয়েলথ ট্রান্স-অ্যান্টার্কটিক অভিযানের অংশ হিসাবে দক্ষিণ মেরুতেও পৌঁছেছিলেন যেখানে নিউজিল্যান্ড দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। ১৯১১ সালে আমুন্ডসেন এবং ১৯১২ সালে স্কট পৌঁছানোর পরে তাঁর দলই প্রথমবার মোটর গাড়ি ব্যবহার করে মেরু ভূখণ্ডে পৌঁছেছিল। ১৯৮৫ সালে তিনি নীল আর্মস্ট্রংয়ের সঙ্গে উত্তর মেরু সাগরের উপর দিয়ে একটি ছোট স্কি বিমানে করে উত্তর মেরুতে অবতরণ করেছিলেন। এডমন্ড হিলারি ছিলেন বিশ্বে প্রথম ব্যক্তি যিনি উত্তর এবং দক্ষিন মেরু উভয়তেই অবতরণ করেছিলেন৷

এডমন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগের সম্মানে ২০০৮ সালে নেপালের লুকলা এয়ারপোর্টের নতুন নামকরণ করা হয় তেনজিং- হিলারি এয়ারপোর্ট৷ ২০১১ সালের ১৮ আগস্ট নিউজিল্যান্ডের সর্বোচ্চ পর্বত আওরাকি বা মাউন্ট কুকের সাউথ রিজটির নামকরণ করা হয় হিলারি রিজ নামে৷

এডমন্ড হিলারি বেশ কিছু বই লিখেছিলেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, হাই অ্যাডভেঞ্চার ( ১৯৫৫) , East of Everest — An Account of the New Zealand Alpine Club Himalayan Expedition to the Barun Valley in 1954 (১৯৫৬) ,  নো ল্যাটিটিউড এরর (১৯৬১) , টু জেনারেশনস (১৯৮৪)  ইত্যাদি৷

২২ এপ্রিল ২০০৭ সালে কাঠমান্ডু ভ্রমণের সময় হিলারি পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়ে ছিলেন এবং নিউজিল্যান্ডে ফিরে আসার পরে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তারপর ২০০৮ সালের ১১ জানুয়ারী অকল্যান্ড সিটি হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এডমন্ড হিলারির মৃত্যু হয়।

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।