ইতিহাস

ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ

স্বাধীন ভারতের পঞ্চম রাষ্ট্রপতি ছিলেন ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ(Fakhruddin Ali Ahmed)। তিনি ভারতের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি যাঁর মৃত্যু রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন অবস্থায় হয়।

১৯০৫ সালের ১৩ মে পুরনো দিল্লীর হাউজ কাজী অঞ্চলে জন্ম হয় ফখরুদ্দিন আলী আহমেদের৷ তাঁর বাবা কর্নেল জালনুর আলী আহমেদ ছিলেন আসামের অভিবাসী মুসলমান এবং উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে প্রথম অধিবাসী যিনি এম.ডি ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তাঁর মায়ের নাম সাহেবজাদী রুকাইয়া সুলতান। তিনি হরিয়ানার লোহারু’র নবাবের মেয়ে ছিলেন। 

ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ দিল্লীর সেন্ট স্টিফেন কলেজে পড়াশোনা শেষ করার পর ইতিহাস নিয়ে তিনি ইউনিভার্সিটি অফ কেম্ব্রিজ থেকে ১৯২৭ সালে গ্র্যাজুয়েশন পাশ করেন৷ অসুস্থতার কারণে তিনি আই.সি.এস পরীক্ষায় বসতে পারেননি। ১৯২৮ সালে লাহোর হাইকোর্টে তিনি ব্যারিস্টার হিসেবে আইন অনুশীলন শুরু করেন। 

ফখরুদ্দিন আলী আহমেদের কর্মজীবন বলতে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের কথা বোঝায়৷ ১৯২৫ সালে ইংল্যান্ডে জওহরলাল নেহেরুর সঙ্গে তাঁর প্রথম দেখা হয়। এরপর তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন এবং ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহন করেন। ১৯৩৫ সালে তিনি আসামের আইনসভার সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন৷ ১৯৩৮ সালে আসামের অর্থ ও রাজস্ব মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তিনিই প্রথম আসাম কৃষি আয়কর বিল প্রস্তাব শুরু করেন।তৎকালীন ভারতে এই ধরণের বিল একেবারেই নতুন ছিল৷ ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলের ব্রিটিশ শক্তির সঙ্গে সংঘাত হয় এবং আহমেদের আবার এক বছরের জন্য কারাদণ্ড হয়। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় তিনি গ্রেপ্তার হন এবং সাড়ে তিন বছরের জন্য তাঁর কারাদণ্ড হয়৷ স্বাধীনতার পরে আহমেদ রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন এবং সেখানে আসাম সরকারের অ্যাডভোকেট-জেনারেল হিসেবে পদাধিকার পান। তিনি বিধানসভায় কংগ্রেসের টিকিটে জানিয়া আসন (Jania constituency)থেকে দুটি পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন-  (১৯৫৭ – ১৯৬২ সাল) এবং (১৯৬২ – ১৯৬৭ সাল)। পরবর্তীকালে তিনি ১৯৬৭ সালে এবং আবারও ১৯৭২ সালে আসামের বরপেটা নির্বাচনী (Barpeta constituency)এলাকা থেকে লোকসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় তাঁকে খাদ্য ও কৃষি, সমবায়, শিক্ষা, শিল্প উন্নয়ন ও সংস্থার আইন সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। 

ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ ২০ আগস্ট ১৯৭৪ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।ধর্মের দিক থেকে তিনি ছিলেন ভারতের দ্বিতীয় মুসলিম রাষ্ট্রপতি। ১৯৭৫ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে  মধ্যরাতের বৈঠকের পর তিনি ভারতে জরুরি অবস্থা(৩৫২(১)ধারা) জারি করেন। মধ্যরাতের এই জরুরী অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জানিয়েছিলেন ভারতের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষার জন্য জরুরি ভিত্তিতে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন৷  প্রধানমন্ত্রী সর্বদা তাঁর মন্ত্রী পরিষদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেন কিন্তু এই আপতকালীন পরিস্থিতিতে তিনি কোন আলোচনা ছাড়াই রাষ্ট্রপতির কাছে এসেছিলেন। এই সময় ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করেছিলেন৷ তাঁর এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ প্রবল সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিলেন। 

 ১৯৭৫ সালে  যুগোস্লোভিয়া সফর কালে ফখরুদ্দিন আলী আহমেদকে কসোভোর প্রিস্টিনা বিশ্ববিদ্যালয় ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। তিনি বেশ কয়েকবার আসাম ফুটবল সমিতি এবং আসাম ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি আসাম স্পোর্টস কাউন্সিলের সহ-রাষ্ট্রপতিও ছিলেন। ১৯৬৭ সালের এপ্রিলে তিনি নিখিল ভারত ক্রিকেট সমিতির সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। তাঁর সম্মানে আসামের বরপেটায়  একটি মেডিকেল কলেজের নামকরণ করা হয়েছে ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ মেডিকেল কলেজ নামে ।

ব্যক্তি ফখরুদ্দিন গলফ এবং টেনিস খেলা পছন্দ করতেন। গালিবের কবিতার একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন তিনি। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি অনেক দেশ ভ্রমণ করলেও তাঁর অন্যতম কৃতিত্ব ১৯৭৫ সালে তাঁর সুদান সফর। ভারতবর্ষের কূটনৈতিক পদক্ষেপে তাঁর এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

১৯৭৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর অফিসে নামাজ পড়াকালীন অবস্থায় ফখরুদ্দিন আলী আহমেদের হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়৷ তাঁকে পার্লামেন্টের কাছে সুনহারি মসজিদে সমাধিস্থ করা হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।