ফতিমা বিবি

ফতিমা বিবি

ভারতীয় প্রশাসন এবং রাজনীতিতে নারীদের অবস্থান নিয়ে আলোচনা করতে গেলে যাঁদের নাম তালিকার উপর দিকে স্থান পাবে, তাঁদের মধ্যে নিঃসন্দেহে অন্যতম ফতিমা বিবি (Fatima Beevi)। তিনিই ভারতবর্ষের প্রথম নারী যিনি দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বলা ভালো, সমগ্র এশিয়া উপমহাদেশের মধ্যে তিনিই প্রথম নারী যিনি সর্বোচ্চ আদালতের বিচার বিভাগে এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছিলেন। আরও একটি ব্যাপার উল্লেখ্য যে, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি পদে একজন মুসলিম মহিলার প্রবেশও সেই প্রথম। আধুনিক ভারতে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে নারীশক্তির জয়যাত্রা যে আর থেমে নেই, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন ফতিমা। কেরালার নিম্ন বিচার বিভাগ থেকে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি, তারপর ধাপে ধাপে জেলা ও দায়রা বিচারক, আয়কর আপিল ট্রাইব্যুনালের বিচার বিভাগীয় সদস্য, হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি এবং সর্বশেষে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে গুরুদায়িত্ব পালন করেন তিনি। আইনের দুনিয়া থেকে অবসর নেওয়ার পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্যপদও অলঙ্কৃত করেছিলেন ফতিমা। তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল হিসেবেও পরবর্তীকালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। গভর্নর থাকাকালীন রাজীব গান্ধী হত্যা মামলায় দণ্ডিত চারজন সদস্যের ক্ষমার আবেদন না-মঞ্জুর করে দেন ফতিমা বিবি। রাজ্যপাল হিসেবে তাঁকে কেন্দ্র করে বিতর্কও দানা বেঁধে উঠেছিল একসময়।

১৯২৭ সালের ৩০ এপ্রিল ব্রিটিশ শাসনাধীন কেরালার ত্রিবাঙ্কোর রাজ্যের অন্তর্গত পাথানামথিত্তা নামক পৌরসভা অঞ্চলে ফতিমা বিবির জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম মীরা সাহেব ফতিমা বিবি (Meera Sahib Fatima Beevi)। তাঁর বাবা আন্নাভিটিল মীরা সাহেব (Annaveetil Meera Sahib) ছিলেন সরকারি কর্মচারী এবং তাঁর মায়ের নাম খাদেজা বিবি (Khadeja Bibi)। ছয় বোন এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে ফতিমা ছিলেন জ্যেষ্ঠ। শৈশবকাল থেকেই তিনি ছিলেন অদম্য জেদি, পরিশ্রমী এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন।

স্বাধীনতা-পূর্ব ভারতবর্ষের গোঁড়া, কুসংস্কারাচ্ছান্ন এবং রক্ষণশীল সমাজে মেয়েদেরকে শিক্ষাগ্রহণ বিষয়ে নানাবিধ বাধা-নিষেধের শৃঙ্খলে বেঁধে রাখা হত। বিশেষত মুসলমান মেয়েদের লেখাপড়ার বিরুদ্ধে এই সামাজিক ফতোয়া ছিল আরও বেশি জোরালো। তেমনই এক সমাজের বুকে দাঁড়িয়ে নিজের দুর্দমনীয় ইচ্ছা ও জেদকে সঙ্গী করে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন মুসলমান বংশজাত ফতিমা। পাথানামথিত্তার ক্যাথলিকেট হাইস্কুল থেকে ১৯৪৩ সালে বিদ্যালয় স্তরের শিক্ষা সমাপ্ত করেছিলেন ফতিমা। কিন্তু কেবল স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে থেমে যাওয়ার জন্য এত লড়াই তিনি করেননি। আরও উচ্চশিক্ষা লাভের আকাঙ্ক্ষা তাঁকে নিয়ে যায় ত্রিভান্দ্রামে। সেখানে ছয়বছর তিনি যাপন করেন পড়াশুনার জন্য।  তিরুবন্তপুরমের ইউনিভার্সিটি কলেজে রসায়ন নিয়ে পড়াশুনা করেছিলেন তিনি। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বি.এসসি ডিগ্রি অর্জনে সফলতা পান ফতিমা। প্রথমে তিনি আরও বিস্তারিতভাবে বিজ্ঞান অধ্যয়ন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর বাবার ইচ্ছা তেমনটা ছিল না। মীরা সাহেব সম্ভবত তাঁদের বাড়ির কাছেই কর্মরত মিসেস আন্না চান্ডির সাফল্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, যিনি ভারতের প্রথম মহিলা বিচারক এবং যিনি হাইকোর্টেরও বিচারপতি হয়েছিলেন। ফলত বাবার ইচ্ছানুসারেই বিজ্ঞান নিয়ে আর এগোনো হয়নি তাঁর এবং আইন অধ্যয়নের জন্য প্রবেশ করেন তিরুবন্তপুরমের গভর্নমেন্ট ল কলেজে। ক্লাসের পাঁচজন মাত্র ছাত্রীর মধ্যে একজন ছিলেন ফতিমা। যদিও পরবর্তীকালে সেই পাঁচজন থেকে কমে হয়ে গিয়েছিল তিনজন। এই সংখ্যা এবং সংখ্যাহ্রাস লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় সেসময় লেখাপড়ায় মেয়েদের অবস্থান বিশেষত আইনের মতো এমন বিষয়ে যা কেবল পুরষদের জন্যই যথাযথ বলে মনে করা হত। যদিও ফতিমা হাল ছাড়বার পাত্রী ছিলেন না, বরং প্রচন্ড পরিশ্রমী একজন ছাত্রী ছিলেন তিনি। ১৯৫০ সালে আইনের পরীক্ষায় পাশ করে বি.এল ডিগ্রি অর্জন করবার পর ফতিমা বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়ার পরীক্ষা দেন এবং তিনিই প্রথম মহিলা হিসেবে সেই পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অধিকার করে বার কাউন্সিল কর্তৃক স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন।

সেই বছরই অর্থাৎ ১৯৫০ সালের ১৪ই নভেম্বর কেরালার নিম্ন বিচারবিভাগে আইনজীবী হিসেবে যুক্ত হয়ে নিজের কর্মজীবন শুরু করেন ফতিমা। আট বছর সেখানে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করবার পর তিনি ১৯৫৮ সালের মে মাসে কেরালা সাব-অর্ডিনেট জুডিশিয়াল সার্ভিসে মুন্সেফ হিসেবে নিযুক্ত হন। সেখানেও ভীষণ পরিশ্রমের সঙ্গে কাজ করে তিনি ১৯৬৮ সালে সাব-অর্ডিনেট বিচারকের দায়িত্ব পান এবং উত্তরোত্তর তাঁর পদোন্নতি ঘটতে থাকে ধাপে ধাপে। ১৯৭২ সালে হন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং ১৯৭৪ সালে জেলা ও দায়রা বিচারকের পদে উন্নীত হয়েছিলেন ফতিমা।

১৯৮০ সালের জানুয়ারি মাসে আয়কর আপিল ট্রাইব্যুনালের বিচার বিভাগীয় সদস্য হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। এরপর ১৯৮৩ সালের ৪ঠা আগস্ট কেরালা হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন, যদিও তখনও স্থায়ী বিচারকের পদ পাননি তিনি। তবে তীক্ষ্ণ বিচার বিবেচনার দক্ষতা প্রদর্শন করে, সম্পূর্ণ নিজের যোগ্যতাতেই ফতিমা ১৯৮৪ সালের ১৪ই মে কেরালা হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারক হয়েছিলেন। এই পদে বেশ কিছুদিন অত্যন্ত দক্ষতা এবং ন্যায়ের সঙ্গে নিজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। এই সময়পর্বে দাঙ্গা ও বিভিন্ন  খুনের মামলা সামলেছিলেন তিনি দক্ষ হাতে।

১৯৮৬ সালের ৬ই অক্টোবর ফতিমা হাইকোর্ট থেকে অবসর গ্রহণের পর ছয়মাসের মধ্যেই দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হয়েছিলেন। এই ঘটনা এক অমূল্য ঐতিহাসিক ঘটনা নিঃসন্দেহে। এই পদে আসীন হয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি দরজা খুলে দিয়েছি’। এই পথে নারীরাও বিচার বিভাগের গুরুদায়িত্ব পালনের পথে অগ্রসর হতে পারবে বলেই বিশ্বাস ছিল তাঁর। বলেছিলেন যে, সুপ্রিম কোর্টে নিযুক্ত হওয়ার মাধ্যমে তিনি এই পুরুষশাসিত বিচারবিভাগে নারীদের কর্মজীবনের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন যে, ভারতীয় বিচারব্যবস্থা হল পিতৃতান্ত্রিক। যেসমস্ত মহিলারা আিন অনুশীলন করেন তাঁদের প্রতি সমাজের বিধিনিষেধের বিরোধিতা করার জন্য সোচ্চার হয়েছিলেন তিনি। উচ্চতর বিচার বিভাগে নারীর প্রতিনিধিত্বের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে তা প্রকাশ করেছিলেন ফতিমা। তিনি এও বলেছিলেন যে, পুরুষদের সঙ্গে বিচার বিভাগে নরীদের সমান প্রতিনিধিত্ব পেতে সময় লাগবে, কারণ নারীরা খুব দেরী করে আসেন এই আইনের ক্ষেত্রটিতে। এছাড়াও আরও বেশি মহিলা যাতে এই আইন প্রতিষ্ঠানের অংশ হতে পারে সেজন্য উচ্চতর বিচার বিভাগে মহিলাদের জন্য সংরক্ষণের পক্ষেও দাঁড়িয়েছিলেন ফতিমা। ফতিমার পর থেকে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে আরও ছয়জন মহিলা বিচারককে নিয়োগ করা হয়েছিল। সিনিয়র অ্যাডভোকেট দুষ্যন্ত দাভের মতে, বিচারপতি হিসেবে ফতিমার বর্ণাঢ্য সময়কালে তিনি যতটা বিনয়ী ছিলেন ততটাই ছিলেন ভারসাম্যপূর্ণ। যেকোনো মামলার ইতিহাস সম্পর্কে ভীষণভাবেই ওয়াকিবহাল এবং প্রস্তুত থাকতেন তিনি।

১৯৯২ সালে সুপ্রিম কোর্ট থেকে অবসর গ্রহণের পর ১৯৯৩ সালে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগদান করেছিলেন ফতিমা। এছাড়াও সেবছরই কেরালা কমিশন ফর ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসের চেয়ারম্যানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলে তিনি।
মূলত হাইকোর্ট সর্বোপরি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবেই স্বমহিমায় ভাস্বর ছিলেন তিনি৷ বিচারপতি হিসেবেই তাঁর প্রাথমিক পরিচয় ছিল কিন্তু রাজনীতির ক্ষেত্রে পদার্পণ করে তাঁর পরিচিতির পরিধিটা বেড়ে গিয়েছিল অনেকটা। ১৯৯৭ সালের ২৫শে জানুয়ারি তিনি ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শঙ্কর দয়াল শর্মা কর্তৃক তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। রাজ্যপাল থাকাকালীন রাজীব গান্ধী হত্যা মামলায় চার দন্ডিত বন্দীর দায়ের করা ক্ষমার আবেদন প্রত্যাখান করেছিলেন ফতিমা। রাজনীতিতে এসে বিতর্কের মধ্যেও জড়িয়ে পড়তে হয়েছে তাঁকে। তামিলনাড়ুর আইন শৃঙ্খলার পরিস্থিতিকে ক্লিন চিট দিয়েছিলেন তিনি, যা কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষোভকে প্ররোচিত করেছিল। তৎকালীন আইনমন্ত্রী অরুণ জেটলি ফতিমার পদত্যাগ চেয়েছিলেন। ২০০১ সালে তিনি এআইএডিএমকে (AIADMK)-এর সাধারণ সম্পাদক জয়ললিতাকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানালে, এই সিদ্ধান্তের প্রভূত সমালোচনা করা হয়েছিল৷ কারণ জয়ললিতার দল সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও একটি দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার কারণে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বাধা দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। শুধু তাই নয়, সংবিধান অনুযায়ী জয়ললিতা ছয়মাসের মধ্যে জনগণের দ্বারা বিধানসভায় নির্বাচিত হতে পারবেন না, এমনটাই দস্তুর। তা সত্ত্বেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে জয়ললিতাকে শপথবাক্য পাঠ করান ফতিমা। পরবর্তীতে যদিও ফতিমা বলেছিলেন এটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত সিদ্ধান্ত ছিল না, তিনি ভারতের প্রধান বিচারপতি সহ, সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন বিচারপতিদের সঙ্গে পরামর্শ করেই সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে জয়ললিতার নিয়োগের বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে কয়েকটি জনস্বার্থ মামলাও দায়ের করা হয়েছিল। জয়ললিতা পরবর্তীকালে বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন। তবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা পালনে ব্যর্থ হওয়ায় রাজ্যপাল ফতিমা বিবিকে প্রত্যাহারের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত নিলে ২০০১ সালে ফতিমা বিবি বিবিনিজেই পদত্যাগ পত্র জমা দিয়েছিলেন। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এম. করুণানিধি এবং দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মুরাসোলি মারান ও টিআর বালুকে গ্রেপ্তারের পর ঘটনার ক্রমানুসারের একটি স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন না করায় ফতিমা বিবির প্রতি কেন্দ্র ক্ষুব্ধ হয়েছিল।

এছাড়াও রাজ্যের গভর্নর হিসেবে ফতিমা মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সমসাময়িক তামিল সাহিত্যের একটি নতুন বিভাগ প্রতিষ্ঠার জন্য সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তে উপাচার্য ফতিমার অনুমোদন রোধ করবার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর পি.টি মনোহরণ পদত্যাগ করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

এই প্রতিভাশালী লড়াকু নারী ফতিমা বিবি নিজের কৃতিত্বের জন্য নানাবিধ পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ১৯৯০ সালে তাঁকে সম্মানীয় ডিলিট উপাধি প্রদান করা হয়েছিল এবং পেয়েছিলেন ‘মহিলা শিরোমণি’ পুরস্কার। এছাড়াও ‘ভারত জ্যোতি’ পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন তিনি।

আপনার মতামত জানান