তিনের দশক থেকে শুরু করে ছয়ের দশক পর্যন্ত ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একমাত্র মহিলা স্টান্টম্যান হিসেবে বিখ্যাত হয়েছিলেন ফিয়ারলেস নাদিয়া (Fearless Nadia)। ১৯৩৫ সালে প্রথম ‘হান্টারওয়ালি’ ছবিতে দেখা যায় দুঃসাহসী এই অস্ট্রেলিয়ান অভিনেত্রীকে। সোনালি চুল আর নীল চোখের এই অসামান্য সুন্দরী অভিনেত্রী প্রথম চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে ১৯৪০-এর দশকে বলিউডের জনপ্রিয় তারকায় পরিণত হয়েছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপর হলিউডে যেখানে সুপারহিরো ভিত্তিক ছবির রমরমা শুরু হয়, একের পর এক উঠে আসতে থাকে সুপারম্যান, ব্যাটম্যান, ওয়াণ্ডার ওম্যানরা। সেখানে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সুপারহিরো নয়, সুপারহিরোইন হয়ে উঠেছিলেন নাদিয়া। তরোয়াল চালানো, বন্দুক চালানো, খালি হাতে শত্রুদের মোকাবিলা করা, দুই হাতে একটি মানুষকে শূন্যে তুলে দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর বিখ্যাত চাবুক চালানোর দৃশ্য ভারতের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় কয়েকটি মুহূর্ত। ওয়াডিয়া মুভিটোনের প্রযোজনায় একের পর এক ছবিতে দেখা গেছে নাদিয়াকে। ইতিহাসের ধূসর পাতায় আজও দুঃসাহসী অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিত ‘হান্টারওয়ালি’ নাদিয়া।
১৯০৮ সালের ৮ জানুয়ারি পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পার্থে নাদিয়ার জন্ম হয়। তাঁর আসল নাম মেরি অ্যান ইভান্স। তাঁর বাবা হার্বার্ট ইভান্স জাতিতে একজন স্কটিশ এবং পেশায় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একজন স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন। তাঁর মা মার্গ্রেট ছিলেন গ্রিক মহিলা। মেরির পাঁচ বছর বয়সে হার্বার্টের রেজিমেন্ট স্থানান্তরিত হয় ভারতের বম্বেতে। ১৯১৩ সালে তখনই তাঁরা প্রথম ভারতে আসেন। ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশেই মেরি বড় হয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি গায়িকা এবং নৃত্যশিল্পী হতে চাইতেন। বাবার কাছ থেকে স্কটিশ নৃত্য শিখেছিলেন তিনি এবং একইসঙ্গে মায়ের কাছে গ্রিক সঙ্গীতও রপ্ত করেছিলেন। স্কুলে পড়াকালীন চার্চ কয়্যারগুলিতে গান গাইতে থাকেন মেরি ইভান্স। যখন তাঁরই বয়সী অন্য মেয়েরা নরম তুলোর পুতুল নিয়ে খেলত, মেরি পছন্দ করতেন তাঁর প্রিয় ঘোড়ার সঙ্গে খেলতে। মাছ ধরা, ঘোড়ায় চড়া, শিকার করা ইত্যাদি কাজেই তাঁর বেশি আগ্রহ ছিল যা ঐ বয়সে সচরাচর দেখা যায় না। ১৯১৫ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর বাবা মারা গেলে মায়ের সঙ্গে মেরি বম্বেতে ফিরে যান। সেখানে একজন রুশ নৃত্যশিল্পী মাদাম অ্যাস্ট্রোভার একটি ব্যালে নৃত্য গোষ্ঠীতে যোগ দেন তিনি। মাদাম অ্যাস্ট্রোভাই মেরির মধ্যেকার সুপ্ত প্রতিভাকে খুঁজে পান এবং তাঁকে নিজের ভ্রাম্যমান নাচের দলে নিয়ে নেন।
নাচের পাশাপাশি অর্থ উপার্জনের জন্য বম্বের ‘আর্মি অ্যাণ্ড নেভি স্টোর’ নামের একটি সংস্থার হয়ে সেলসগার্লের কাজ করতেন মেরি। সেইসঙ্গে আরো ভালো কাজ পাবার আশায় শিখছিলেন শর্টহ্যাণ্ড টাইপিং আর পাশাপাশি নাচের অনুষ্ঠান তো চলছিলই। এমনকি সার্কাসে ট্র্যাপিজ খেলা দেখানোর জন্যেও তিনি যুক্ত হয়েছিলেন একটি সার্কাস দলে। ১৯৩০ সালে মেরি জারকো সার্কাসে যোগদান করেন। নিজেকে একজন দক্ষ জিমন্যাস্ট হিসেবে গড়ে তোলার জন্য নিয়মিত অভ্যাস করতেন কার্টহুইল, তাঁর দুঃসাহসী সব স্টান্টের খেলায় দর্শক মুগ্ধ হয়ে থাকত। মাদাম অ্যাস্ট্রোভার নাচের দলের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতেই এক আর্মেনীয় ভবিষ্যদ্বক্তার সঙ্গে পরিচয় হয় মেরির। তিনিই তাঁকে বলেন একটি নতুন নাম ধারণ করলে তাঁর জীবনে অভাবিত সাফল্য আসবে, তবে নামের শুরুতে থাকতে হবে ইংরেজি N অক্ষরটি। সেই মতোই মেরি ইভান্স নতুন নাম গ্রহণ করেন- ‘নাদিয়া’। জারকো সার্কাসের কাজটা ছেড়ে দিয়ে নাচের দলের সঙ্গেই পূর্ণসময়ের জন্য যুক্ত হন নাদিয়া। লাহোরে তাঁর অনুষ্ঠান দেখে এক সিনেমা হলের মালিক ইরুচ কাঙ্গা তৎকালীন সময়ের ওয়াডিয়া মুভিটোন প্রোডাকশান হাউজের দুই কর্তা জে.বি.এইচ ওয়াডিয়া এবং হোমি ওয়াডিয়াকে নাদিয়ার কথা জানান। নাদিয়াকে দেখেই পছন্দ হয়ে যায় জে.বি.এইচ ওয়াডিয়ার যার পুরো নাম জামশেদ বোমান হোমি ওয়াডিয়া এবং তাঁকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করানোর পরিকল্পনা করেন ওয়াডিয়া ভ্রাতৃদ্বয়। সেই সময় থেকেই বলিউডের চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে শুরু করেন মেরি ইভান্স ওরফে নাদিয়া।
একেবারে প্রথমে ১৯৩৩ সালে ওয়াডিয়া মুভিটোনের প্রযোজনায় নির্মিত ‘দেশ দীপক’ ছবিতে নাদিয়া একটি চাকরাণীর ভূমিকায় খুব ছোট অংশে অভিনয় করেন। তারপর ‘নুর-ই-ইমান’ ছবিতে মহারানি পারিজাতের ভূমিকায় নাদিয়ার অভিনয় দর্শক আনুকূল্য লাভ করে। এই ঘটনায় নাদিয়াকে মুখ্য অভিনেত্রী করে ছবি তৈরির সিদ্ধান্ত নেন জে.বি.এইচ ওয়াডিয়া। ১৯৩৫ সালে প্রথম ওয়াডিয়া মুভিটোনের প্রযোজনায় ‘হান্টারওয়ালি’ ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করে সাড়া ফেলে দেন নাদিয়া। ছবির পরিচালক ছিলেন হোমি ওয়াডিয়া। স্টান্টে দক্ষতা, জিমন্যাস্টিক, দুঃসাহসিক কাজে অকুতোভয় এই অভিনেত্রীকে দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন সেদিন সকল ভারতবাসী। একজন নতুন অভিনেত্রীকে দিয়ে স্টান্ট করিয়ে সেকালে টানা ছয় মাস ধরে ছবির শ্যুটিং করে প্রায় আশি হাজার টাকা খরচ করে সিনেমাটি বানিয়েছিলেন ওয়াডিয়া ভ্রাতৃদ্বয় যা সেকালের একটি আঞ্চলিক ছবির ভিত্তিতে অনেকমাত্রায় বেশি ব্যয়বহুল ছিল। বলা যেতে পারে নাদিয়াকে নিয়ে চলচ্চিত্র বানিয়ে একপ্রকার জুয়াই খেলেছিলেন তাঁরা। ছবি সফল নাও হতে পারত, কিন্তু তার বদলে প্রভূত জনপ্রিয়তা পায় ‘হান্টারওয়ালি’। ১৬৪ মিনিটের সেই ছবিতে ‘মাধুরী’ নামের মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করে তাক লাগিয়ে দেন নাদিয়া। যে সময় ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলন চরম পর্যায়ে, প্রতিটি ভারতবাসীর মনে ইংরেজবিদ্বেষ এবং প্রবল জাতীয়তাবোধ জাগ্রত, সেখানে সিনেমার পর্দায় এই সাদা চামড়ার অভিনেত্রীর ভারতীয় অভিনেতাদের পেটানো দেখেও আপামর জনসাধারণ একজন ইউরোপিয়ান অভিনেত্রী হিসেবে নাদিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। এর পরবর্তী দশ বছরে নাদিয়া পঞ্চাশটি ছবিতে অভিনয় করে বলিউডের এক তারকা হয়ে ওঠেন। মহিলাকেন্দ্রিক চলচ্চিত্রের সূচনা তাঁকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে। এরপর থেকে ক্রমেই রবিনহুডের মতোই নাদিয়া সিনেমার জগতে হয়ে ওঠেন গরীব-দুঃখীর ত্রাণকর্তা। ভারতীয় চলচ্চিত্রে হলিউড স্টান্টম্যান পার্ল হোয়াইটের সমতুল্য হয়ে ওঠেন নাদিয়া। আবার অন্যদিকে ভারতীয়দের মনে তিনি ইতিহাসের লক্ষ্মীবাঈ, রাজিয়া সুলতানার মতো বীরাঙ্গনা নারীদের অনুষঙ্গ জাগিয়ে তোলে ভারতীয়দের মনে। সেই ‘হাণ্টারওয়ালি’ ছবি থেকেই নাদিয়া ‘এ লেডি উইথ দ্য হুইপ’ নামে পরিচিত হন। মুখে মুখোশ আর হাতে চাবুক থাকত নাদিয়ার, সেই সঙ্গে ছবিতে তাঁর পাশাপাশি দেখা যেত একটা ঘোড়াকে, একটা কুকুরকে আর কখনো বা একটা আস্ত রোলস রয়েস গাড়িকেও। এইসবই ছিল হান্টারওয়ালির নিজের যার মধ্যে ঘোড়াটির নাম ছিল ‘পাঞ্জাব কি বেটি’, বক্সার কুকুরটির নাম ছিল ‘গানবোট’ আর গাড়িটাকে ছবিতে বলা হত ‘রোলস রয়েস কি বেটি’।
চলন্ত ট্রেনের উপরে যুদ্ধ, খরস্রোতা ঝর্নার মধ্যে লাফ মারা, সিংহের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো কিংবা ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফ মেরে প্লেন থেকে ঝোলানো দড়ির মইতে উঠে পড়া কী না পারতেন নাদিয়া! অস্ট্রেলিয়ান হওয়ার কারণে খুব একটা ভালো হিন্দি বলতে পারতেন না তিনি। ফলে তাঁকে দিয়ে খুব বেশি সংলাপ বলানো হত না ছবিতে। মূল আকর্ষণ থাকত নাদিয়ার এইসব দুঃসাহসী স্টান্টে। তবে ক্রমশ নিছক স্টান্টের কারণে নাদিয়াকে নিয়ে ছবি করলেন না জে.বি.এইচ ওয়াডিয়া, তাঁর ছবিতে ধীরে ধীরে নাদিয়া হয়ে উঠলেন একটি রাজনৈতিক চরিত্র। ১৯৪০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ডায়মণ্ড কুইন’ ছবিতে দেখা যায় নাদিয়া একটি হীরের খনিতে কর্মরত শিশুদের উদ্ধারের জন্য যুদ্ধ করছেন আর একইসঙ্গে নারীর অধিকার এবং নারীর শিক্ষাই যে স্বাধীনতার পথ উন্মুক্ত করতে পারে সে বিষয়ে বক্তব্য রাখছেন। চল্লিশের দশকের স্কুলে পড়া শিশু-কিশোরদের কাছে নাদিয়ার সেই ‘হে-এ-এ-এ’ বলে ঘোড়াকে ডাকার আহ্বান স্মরণীয় হয়ে আছে।
এই সব স্টান্ট করতে গিয়ে প্রাণ সংশয়ও দেখা দিয়েছিল নাদিয়ার। একবার একটা মারপিটের দৃশ্য শুটিং-এর সময় অনেক উঁচু থেকে মুখ থুবড়ে পড়েন নাদিয়া আর একবার মহারাষ্ট্রের ভানদরদরা ঝর্নার প্রবল স্রোতে তিনি তলিয়েই যাচ্ছিলেন প্রায়। কিন্তু দুই বারই কোনমতে বেঁচে ফেরেন নাদিয়া। এভাবে এক জনপ্রিয় তারকায় পরিণত হন নাদিয়া এবং সে কালে ভারতের সবথেকে বেশি সাম্মানিক প্রাপক অভিনেত্রী ছিলেন তিনি। তাঁর জনপ্রিয়তায় ব্যাগ, বেল্ট, জুতো এমনকি জামা-কাপড়েও ‘হান্টারওয়ালি ব্র্যাণ্ড’ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। পরাধীন ভারতেও যখন পুরুষ-আধিপত্যকে খর্ব করে নারীরা উপার্জনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে চাইছে, সেখানে নাদিয়া এক ‘আইকন’ হয়ে উঠেছিলেন তাঁদের কাছে। নারীবাদী শব্দটা তখনও উদ্ভূত না হলেও, নাদিয়াকে অনেকেই সেকালের একমাত্র নারীবাদী অভিনেত্রী বলে মনে করেছেন। একটি ছবিতে একজন মানুষকে পুরোপুরি দুই হাতে শূন্যে তুলে ধরতে দেখা যায় নাদিয়াকে। ‘বোম্বাইওয়ালি’ ছবিতে একটি বাছুরকেও তিনি ঐভাবেই উপরে তুলে ধরেছিলেন। ‘জাঙ্গল প্রিন্সেস’ ছবিতে চারটি সিংহের মধ্যে শুটিং করেন নাদিয়া।
১৯৬১ সালে হোমি ওয়াডিয়াকে বিবাহ করেন নাদিয়া ওরফে মেরি ইভান্স। এই হোমি ওয়াডিয়াই তাঁকে নাদিয়া থেকে ‘ফিয়ারলেস নাদিয়া’ নাম দিয়েছিলেন। ১৯৬৮ সালে ষাট বছর বয়সে হোমি ওয়াডিয়া পরিচালিত ‘খিলাড়ি’ ছবিতে আবার ফিরে আসেন নাদিয়া একজন স্যাসে গুপ্ত গোয়েন্দা হিসেবে। ১৯৯৩ সালে তাঁকে কেন্দ্র করে প্রথম একটি তথ্যচিত্র নির্মিত হয় ‘ফিয়ারলেস : দ্য হান্টারওয়ালি স্টোরি’ নামে।
নাদিয়া অভিনীত ছবিগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘মিস ফ্রন্টিয়ার মেল’ (১৯৩৬), ‘লুটেরু ললনা’ (১৯৩৮), ‘পাঞ্জাব মেল’ (১৯৩৯), ‘মুকাবলা’ (১৯৪২), ‘ধূমকেতু’ (১৯৪৯) এবং সর্বশেষ ছবি ‘খিলাড়ি’ (১৯৬৮)। তাঁর স্মরণে ২০১৮ সালের ৯ জানুয়ারি গুগল ডুডল একশো দশতম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন করেছে। ২০১৭ সালে ফিয়ারলেস নাদিয়ার জীবনের অনুপ্রেরণায় বিশাল ভরদ্বাজ পরিচালিত ‘রেঙ্গুন’-এ নাদিয়ার ভূমিকায় অভিনয় করেন কঙ্গনা রানাউত।
১৯৯৬ সালের ৯ জানুয়ারি দুঃসাহসী নাদিয়ার মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান