ইতিহাস

সুহৃদ কুমার রায়

ভারতের একজন বিশিষ্ট ভূ-বিজ্ঞানী হিসেবেই পরিচিত সুহৃদ কুমার রায় (Suhrid Kumar Roy)। শিলাতত্ত্ব আর অর্থনৈতিক ভূ-বিজ্ঞানের অধ্যাপক হয়েও ভূ-বিজ্ঞানের পাঠ্যক্রম নির্মাণে ফলিত-জ্ঞানের চর্চাকে অন্তর্ভুক্ত করে বিজ্ঞানমহলে কৃতিত্বের দৃষ্টান্ত রেখেছেন তিনি। ‘জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইণ্ডিয়া’র আধিকারিক হিসেবে উদয়পুরের দস্তা-তামা আকরিকের ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণের কৃতিত্ব তাঁরই দখলে। ভারতীয় জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থায় (INSA)ভূতত্ত্ব বিভাগের সদস্য ছিলেন সুহৃদ কুমার রায়। গুপ্ত বিপ্লবী সমিতি ‘যুগান্তর’ দলের সদস্যদের মধ্যে পত্রবাহকের কাজও করেছেন একসময় ভূ-বিজ্ঞানী। এমনকি রডা কোম্পানির পিস্তল লুঠের ঘটনায় অভিযুক্ত হয়ে বহুদিন অন্তরীণ ছিলেন সুহৃদ কুমার রায়।

১৮৯৫ সালের ১ জানুয়ারি নদীয়া জেলার কুড়ুলগাছিতে বিজ্ঞানী সুহৃদ কুমার রায়ের জন্ম হয়। তাঁর বাবা সয়ারাম রায় ছিলেন নদীয়ার রাজ পরিবারের সদস্য। সুহৃদ কুমার অল্প বয়সেই মাকে হারিয়ে কলকাতায় তাঁর বাবা আর দাদার কাছেই মানুষ হন তিনি। ফ্রাউ হারমান নামের এক জার্মান বংশোদ্ভূত মহিলাকে বিয়ে করেন সুহৃদ কুমার এবং তাঁদের তিনটি সন্তান হয় পরবর্তীতে।

স্থানীয় বিদ্যালয়ে সুহৃদ কুমার রায়ের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হলেও ১৯১০ সালে তিনি কলকাতার ভবানীপুরে লণ্ডন মিশনারী সোসাইটি’স ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন। এই বিদ্যালয় থেকেই ১৯১১ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন তিনি। তারপর ১৯১১ সালে বঙ্গবাসী কলেজে ভর্তি হন সুহৃদ কুমার এবং ১৯১৩ সালে এই কলেজ থেকে আই.এস.সি পরীক্ষাতেও প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। ১৯১৩ সালে তিনি ভর্তি হন কলকাতার ঐতিহ্যবাহী প্রেসিডেন্সি কলেজে এবং ভূতত্ত্ববিদ্যায় অনার্সসহ স্নাতক উত্তীর্ণ হন ১৯১৬ সালে। তাঁর সহায়ক বিষয় হিসেবে ছিল গণিত এবং রসায়ন। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াকালীন বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু এবং আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। সেসময় প্রেসিডেন্সি কলেজের হিন্দু হোস্টেলে থাকার সুবাদে সুহৃদ কুমার রায়ের সঙ্গে পরিচয় ঘটে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর। নেতাজীর সঙ্গে সাক্ষাৎ তাঁকে জাতীয়তাবোধে উদ্দীপিত করেছিল। অন্যদিকে তাঁর খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা। দেশপ্রেমের বন্ধনে উভয়েই একমন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিলেন। তাঁদের বন্ধুত্ব শেষ দিন পর্যন্ত টিকে ছিল। মানবেন্দ্র নাথ রায় নামে সমগ্র ভারতে পরিচিত যিনি সেই বিপ্লবী মানুষটিও তাঁর বন্ধু ছিলেন। মানবেন্দ্র নাথ রায়ের আসল নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। ১৯২১ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত ইউরোপের জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে খনিজতত্ত্ব এবং শিলাতত্ত্ব সম্পর্কে গভীর অধ্যয়ন করে সুহৃদ কুমার ১৯২৪ সালের জুলাই মাসে বিখ্যাত অধ্যাপক পল নিগলির তত্ত্বাবধানে গবেষণাকর্ম শেষ করে ‘ডক্টরেট’ উপাধি অর্জন করেন।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


১৯১৮ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত বাংলার বন দপ্তরে কাজের মধ্যে দিয়ে সুহৃদ কুমার রায়ের কর্মজীবন শুরু হয়। ইউরোপ থেকে পি.এইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করে দেশে ফিরে এসে বম্বের বাঁশদা রাজ্যে একজন ভূতাত্ত্বিক হিসেবে তিনি কাজ শুরু করেন এবং সেই এলাকায় জলনিগমেরও পরিকল্পনা করেন তিনি। পরে অধুনা হিমাচল প্রদেশের মাণ্ডি রাজ্যে ভূতাত্ত্বিক পদে বহাল করা হয় তাঁকে। এই সময় মাণ্ডি প্রদেশের লৌহ আকরিক এবং লবণ সঞ্চয়ের উপর ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা করেন তিনি। ১৯২৭ সালে ধানবাদের ইণ্ডিয়ান স্কুল অফ মাইন্স প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হন সুহৃদ কুমার রায়। সেসময় এই প্রতিষ্ঠানের নিয়মমাফিক সমস্ত অধ্যাপকরাই বাইরের দেশ থেকে পড়াতে আসতেন, কোনো ভারতীয় অধ্যাপক নিয়োগ করা হত না। কলকাতার জাতীয়তাবাদী সংবাদমাধ্যমে এই ঘটনা তীব্রভাবে সমালোচিত হলে খনিতত্ত্ব এবং ভূতত্ত্ব বিভাগে ভারতীয় অধ্যাপক নিয়োগ শুরু করে এই প্রতিষ্ঠান ১৯২৭ সাল থেকে। তার ফলে ১৯২৮ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে পাকাপাকিভাবে ইণ্ডিয়ান স্কুল অফ মাইন্স-এ যোগ দেন সুহৃদ কুমার। ১৯৪৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দীর্ঘ আঠারো বছর এই সংস্থায় কাজ করেছেন তিনি। ভূতত্ত্বের ফলিত বা প্রায়োগিক দিকটিতে জোর দেবার কথা তিনি প্রথমেই ভেবেছিলেন এবং সেইমতো ১৯২৮ সালের অক্টোবর মাসে পাঞ্জাব সরকারের অধীনে ‘ইরিগেশন রিসার্চ ল্যাবরেটরি’র অধিকর্তা ড. এন. কে. বসুর তত্ত্বাবধানে পাঞ্জাবের জল-নির্বহন প্রকল্পে কীভাবে ভূ-পদার্থবিদ্যার (Geo-physics) মাধ্যাকর্ষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, তার প্রশিক্ষণ নিয়ে আসেন তিনি লাহোর থেকে। ভূতত্ত্ববিদ্যার ডিপ্লোমা পাঠ্যক্রমে তিনি জিও-ফিজিক্যাল প্রস্পেক্টিং, সেডিমেন্টারি পেট্রোলজি, ওর-মাইক্রোস্কোপি এবং গ্রাউণ্ড-ওয়াটার প্রস্পেক্টিং-এর মতো বিষয় সংযুক্ত করেন। একইসঙ্গে এই বিষয়গুলি তিনি নিজেই পড়াতে থাকেন ও ছাত্র-ছাত্রীদের গবেষণার বিষয় হিসেবেও এই বিষয়গুলি নির্বাচনের অবকাশ করে দেন সুহৃদ কুমার। ১৯৩৯ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত ‘ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেস’-এর সভায় ভারতের খনিজ সংরক্ষণের ব্যাপারে তিনি দীর্ঘ মনজ্ঞ বক্তব্য রাখেন যা পরে ভারতের খনিজ শিল্পকে ত্বরান্বিত করেছে। ১৯৪২-’৪৩ সালে ইণ্ডিয়ান স্কুল অফ মাইন্স মিলিটারিদের দ্বারা অধিকৃত হলে, ড. রায়কে ‘জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইণ্ডিয়া’র ব্যবহারিক শাখার বিশেষ অফিসার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। এই সময় রাজস্থানের জওয়ার খনিতে সীসা আর দস্তার সঞ্চয়ের উপর তিনি ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা চালান এবং ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে অদূর ভবিষ্যতে এই খনি ভারতের কাছে অনেক সম্ভাবনার জন্ম দেবে। তৎকালীন সময়ে খনির উন্নয়ন প্রমাণ করে যে তাঁর এই বক্তব্য কতটা সত্য ছিল।

মূলত অর্থনৈতিক ভূতত্ত্ব এবং শিলাতত্ত্বের বিস্তৃত ক্ষেত্রে ড. সুহৃদ কুমার রায়ের অবদান আজও স্মরণীয়। জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন জার্মানির দক্ষিণের ব্ল্যাক ফরেস্টে অবস্থিত হার্সিনিয়ান পর্বতে তিনি শিলাতত্ত্বের সমীক্ষা করেছিলেন এবং ঐ অঞ্চলের আলবটাইল গ্রানাইট বিষয়ে বিস্তৃত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় ভূতাত্ত্বিক যিনি পাললিক শিলার প্রকৃতির সঙ্গে তাতে সঞ্চিত খনিজ উপাদানের সম্বন্ধ নিরূপণ করেন। ঝরিয়ার কয়লাখনিতে বেলেপাথরে সঞ্চিত ভারী খনিজ পদার্থের উপর পুনরায় বিস্তৃত পরীক্ষা করেন সুহৃদ কুমার। মাণ্ডিতে লৌহ-আকরিকের সঞ্চয়ের সমীক্ষা করে সেই অঞ্চলের অর্থনীতি এবং শিলাতত্ত্বের উপর ধারণা দেন। একইসঙ্গে ঐ এলাকায় সামান্য পরিমান খনিজ তেলের উপস্থিতিও লক্ষ্য করেন তিনি। দাক্ষিণাত্যের মালভূমি অঞ্চলে জল-নির্বহন প্রকল্পের কাজে তিনি উপযুক্ত কুয়ো খোঁড়ার স্থান নির্বাচনে যথেষ্ট অবদান রেখেছেন। মূলত ঝরিয়া কয়লাখনি এবং কোডার্মা খনিতে তিনি বিস্তর সমীক্ষা করেছেন। বিহারে অ্যাসবেস্টস সঞ্চয়ের সমীক্ষাতেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। উনিশ শতকের ত্রিশের দশকে পাঠ্যক্রমে ওর মাইক্রোস্কোপির মতো বিষয় চালু করায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন ড. সুহৃদ কুমার রায়।

১৯৩৯ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত ‘ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেস’-এর ভূতত্ত্ব বিভাগের সভাপতি নির্বাচিত হন সুহৃদ কুমার রায়। এছাড়াও ভারতের জিওলজিক্যাল, মাইনিং এবং মেটালার্জিক্যাল সমীক্ষা বিভাগের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।

১৯৫৯ সালের ১৬ জুলাই হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে বিজ্ঞানী সুহৃদ কুমার রায়ের মৃত্যু হয়।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

তথ্যসূত্র


  1. Biographical Memoirs, Indian National Academy of Sciences, Bangalore, Pg-  97-101
  2. https://web.archive.org/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও