সববাংলায়

ফুট বাইন্ডিং – চীনের একটি নিষ্ঠুরতম প্রথা

প্রাচীন চীন সমাজ ছিল মূলত পুরুষতান্ত্রিক। প্রাচীন সেই সমাজে  শুধুমাত্র পুরুষদেরই  লেখা পড়ার অধিকার ছিল। প্রাচীন চীনের একটি অন্যতম নিষ্ঠুর প্রথা ছিল ‘ফুট বাইন্ডিং’ । চীনা এই রীতি অনুসারে চীনা মহিলাদের পায়ের পাতা ভেঙে তারপর তাকে শক্ত করে বেঁধে রাখা হত যাতে পায়ের পাতার আকার এবং আকৃতি দুটিই পরিবর্তিত হয়।  এই প্রথার মধ্যে পরিবর্তিত পা কে ‘ চরণ কমল’ (Lotus feet) বলা হত।  সামন্ততান্ত্রিক চীনে এই প্রথাকে আভিজাত্যের নিদর্শন রূপে দেখা হত এবং নারী সৌন্দর্য বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম হিসেবে মযার্দা দেওয়া হত।  এই প্রথার কারণে মহিলাদের চলনে একটি  চিরস্থায়ী অক্ষমতা তৈরী হত।  

সময়ের সাথে সাথে এবং অঞ্চল এবং সামাজিক শ্রেণী অনুসারে ফুট বাইন্ডিংয়ের ব্যাপকতা এবং ব্যবহার পরিবর্তিত হয়। দশম শতকের চীনে রাজ দরবারের নর্তকীদের মধ্যে এই এই প্রথা পালনের উৎপত্তি হতে পারে বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করে থাকেন। ক্রমে সং রাজবংশের রাজত্বকালে অভিজাতদের মধ্যে এই প্রথা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফুটবাইন্ডিং শেষ পর্যন্ত কিং রাজবংশের রাজত্বকালে অভিজাত শ্রেণীর গন্ডি পেরিয়ে সমাজের নিম্নবিত্ত  শ্রেণীতে ছড়িয়ে পড়ে। মাঞ্চু সম্রাটরা ষোড়শ শতকে এই প্রথা নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। চীনের কিছু অঞ্চলে ফুট বাইন্ডিং প্রথা মহিলাদের বিবাহের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলেছিল। এটি অনুমান করা হয় যে অষ্টাদশ শতকের মধ্যে প্রায় সমস্ত চীনা মহিলাদের অন্তত চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ শতাংশ মহিলা এই প্রথার অনুসারী হয়েছিলেন কিন্তু উচ্চ শ্রেণীর হান চীনা মহিলাদের মধ্যে প্রায় একশো শতাংশ মহিলাই এই প্রথা অনুসরণ করতেন।

সং রাজবংশের আমলে ফুটবাইন্ডিংয়ের উৎপত্তি সম্পর্কে বেশ কয়েকটি গল্প প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে একটি হল  দক্ষিণ কিউই সম্রাট জিয়াও বাওজুয়ানের প্রিয় স্ত্রী প্যান ইউনুর গল্প। প্যান ইউনু, সে সময় বিখ্যাত ছিলেন তাঁর অত্যন্ত আকর্ষণীয় পায়ের জন্য। সোনার পদ্মের নকশা সমন্বিত মেঝেতে খালি পায়ে তিনি নৃত্য পরিবেশন করলে তার নাচে মুগ্ধ সম্রাট প্রশংসা করে বলেছিলেন যে “তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ থেকে পদ্ম ঝরে পড়ুক!” এই গল্পটি থেকেই ফুট বাইন্ডিংয়ের আরেক নাম ‘সোনার পদ্ম’ বা ‘পদ্মপদ্ম’ শব্দের জন্ম হয়েছে ; তবে প্যান কখনো ফুট বাইন্ডিং করেছিলেন কিনা এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না ।

পায়ের পাতার বাঁক সম্পূর্ণরূপে বিকশিত হওয়ার আগেই এই ফুট বাইন্ডিং প্রক্রিয়াটি শুরু হয়।  সাধারণত চার থেকে নয় বছর বয়সী বালিকাদের পায়ে ফুট বাইন্ডিং করা হয়। এই প্রক্রিয়াটি সাধারণত শীতের মাসগুলিতে শুরু হয় যেহেতু পা অসাড় হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে তাই ব্যথা ততটা বেশি লাগে না।  প্রথমে, প্রতিটি পা ভেষজ এবং পশুর রক্তের একটি উষ্ণ মিশ্রণে ভিজিয়ে রাখা হয় যাতে পায়ের পাতা নরম হয়। এরপরে পরবর্তী সংক্রমণ রোধ করার জন্য পায়ের নখগুলি যতটা সম্ভব কেটে ফেলা হয়  যেহেতু পায়ের আঙ্গুলগুলিকে পায়ের তলায় শক্তভাবে চাপতে হবে। এরপর ৩ মিটার লম্বা এবং ৫ সেমি চওড়া ব্যান্ডেজ রক্ত ​​এবং ভেষজ মিশ্রণে ভিজিয়ে প্রস্তুত করা হয়। পায়ের পাতার আকার কমাতে এরপর প্রতিটি পায়ের পাতা প্ৰচণ্ড জোরে নীচের দিকে চাপ দেওয়া হতে থাকে যতক্ষণ না পায়ের পাতা ভেঙে না যায়।  পায়ের পাতা ভেঙে দেওয়ার পর অত্যন্ত যত্ন এবং মনোযোগ দেওয়া হয় পায়ে। পায়ের বাঁধন নিয়মিতভাবে  খোলা হয়। প্রতিবার পায়ের বাঁধন খোলার পর পায়ের পাতাটিকে ধুয়ে ফেলা হয়, পায়ের আঙ্গুলগুলি পরীক্ষা করা হয় এরপর পায়ের ভাঙ্গা হাড়গুলিকে আরও নমনীয় করার জন্য পায়ের তলায় প্রায়শই আঘাত করা হয়। এরপর মেয়েটির ভাঙা পায়ের আঙ্গুলগুলিকে নীচে ভাঁজ করা হয় এবং পায়ের পাতা আবার ব্যান্ডেজ করে দেওয়া হয়। প্রতিবার পা বাঁধার সময় বাঁধনগুলি অত্যন্ত শক্ত করে বাঁধা হয়। এই বাঁধন খোলা এবং পুনরায় বাঁধন বাঁধার রীতিটি  যতবার সম্ভব পুনরাবৃত্তি করা হত। ধনীদের জন্য প্রতিদিন অন্তত একবার দরিদ্র কৃষকদের জন্য সপ্তাহে দুই বা তিনবার। এই কাজটি সাধারণত মেয়েটির পরিবারের কোন বয়স্ক মহিলা সদস্য বা কোন পেশাদার ব্যক্তি করতেন। 

ফুট বাইন্ডিংকে  অল্পবয়সী মেয়েদের বয়ঃসন্ধি, ঋতুস্রাব এবং প্রসবের জন্য প্রস্তুতি বলে মনে করা হত। এটিকে নারী  আনুগত্যের প্রতীক বলে মনে করা হত।  এই প্রথা এটি মহিলাদের গতিশীলতা এবং ক্ষমতাকে সীমিত করে, মহিলাদেরকে পুরুষের অধীনস্থ করে এবং লিঙ্গ জনিত পার্থক্য বৃদ্ধি করে। এই প্রথা পুরুষতান্ত্রিক চীনা সংস্কৃতিতে একটি মেয়ের বিবাহযোগ্যতা নিশ্চিত করেছিল।  ফুট বাইন্ডিং প্রতিপত্তি দেখানোর প্রতীকও ছিল এবং বিশ্বাস করা হত যে এই প্রথার কারণে রক্ত পা, নিতম্ব এবং যোনি এলাকায় প্রবাহিত হবে।

কিং রাজবংশের শাসনকালে সম্রাট কাংজি ১৬৬২  সালে এই প্রথা নিষিদ্ধ করেছিলেন কিন্তু ১৬৬৮ সালে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেন কারণ অনেক চীনা ব্যক্তিই এটি পালন করত। এই প্রথার বিরোধিতা আরও ব্যাপক হয়ে ওঠে যখন চীনা মিশনারিরা যুক্তি দেখায় যে এটি একটি বর্বর প্রথা। ১৯১১ সালে জাতীয়তাবাদী বিপ্লবের পর ১৯১২ সালে ফুটবাইন্ডিং নিষিদ্ধ করা হয়। 


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading