বিবিধ

এশিয়ান পেইন্টস- গাট্টু

ভারতে রঙের জগতে  প্রথম সারির রঙ উৎপাদনকারী  সংস্থার মধ্যে এশিয়ান পেইন্টস অন্যতম। সাধারণ মানুষ থেকে বিখ্যাত ব্যাক্তি সকলেই অন্দরসজ্জা ও গৃহসজ্জায় প্রথম পছন্দের  মধ্যে এশিয়ান পেইন্টসকে এগিয়ে রাখেন। ‘হর ঘর কুছ ক্যাহতা হ্যায়’ এই ট্যাগ লাইন আর রঙের ব্রাশ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট ছেলেটি হল এশিয়ান পেইন্টসের প্রতীকী। ‘পদ্মভূষণ’ ও ‘পদ্মবিভূষণ’  সম্মানিত  কার্টুনিস্ট আর. কে. লক্ষণের মানসপুত্র গাট্টু (Gattu) শুধুমাত্র এশিয়ান পেইন্টসের নয় ভারতের বিজ্ঞাপন জগতের অন্যতম বিখ্যাত একটি ম্যাসকট। ‘গাট্টু -র আবেদনে সাড়া দিয়ে গ্রাম থেকে শহর সবক্ষেত্রেই এশিয়ান পেইন্টস সর্বসমক্ষে গৃহীত হয়েছে। ছোট্ট একটি গ্যারেজে জন্ম হয়ে আজ ভারতের প্রথম এবং পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম রং উৎপাদনকারী কোম্পানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এশিয়ান পেইন্টস। এই সাফল্যের পিছনে গাট্টুর অবদান কিন্তু অনস্বীকার্য।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতে বিদেশ থেকে রঙ আমদানির ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে ভারতীয় রঙ ব্যবসায়ীদের কাছে সুযোগ আসে দেশীয় পদ্ধতিতে রঙ প্রস্তুত করে তা সারা ভারতে ছড়িয়ে দেওয়ার। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ১৯৪২ সালে বোম্বের (অধুনা মুম্বাই) চম্পকলাল চৌকসি ও তিনজন বন্ধু মিলে একটি গাড়ীর গ্যারাজে মাসিক ৭৫ টাকা ভাড়ায় একটি রঙ কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। নাম দেন ‘এশিয়ান পেইন্টস’। সেই সময় জনসন নিকোলসন কোম্পানির প্লাস্টিক রঙ ভারতীয় বাজারে একচেটিয়া ব্যবসা করত। এই রঙ বেশ চড়া দামেই বিক্রি করত তারা। মধ্যবিত্ত ভারতীয়রা ঘর রঙ করার জন্য এত দামী রঙ কিনতে না পেরে রঙের বদলে চুন ব্যবহার করত। চুন রঙ গায়ে ও জামাকাপড়ে লেগে যেত। চম্পকলাল এমন এক রঙ তৈরী করলেন যা ছিল চুন রঙের মত দামেও সস্তা এবং প্লাস্টিক রঙের মত টেকসই। ১৯৫০ সালে ওয়াশেবেল ডিসটেম্পার (Washable Distemper) বাজারে আনল এশিয়ান পেইন্টস যা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠল। চম্পকলাল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর নজর দিয়েছিলেন। তিনি রাজ্য অনুযায়ী সেখানকার উৎসবের কথা মাথায় রেখে নতুন নতুন রঙের ছোট কৌটো বাজারে আনতেন যা সাধারণ মানুষের চাহিদা পূরণে সক্ষম ছিল।

ব্যবসার প্রসার ঘটানোর উদ্দেশ্য চম্পকলাল তৎকালীন রঙের সরবরাহকারিদের কাছে তাঁর রঙের সরবরাহের বরাত দেওয়ার জন্য যেতে শুরু করলেন বটে কিন্তু কেউই নতুন এবং অনামী কোন রঙ কোম্পানির সরবরাহকারি হতে রাজি হলেন না। একটুও হতাশ না হয়ে চম্পকলাল সিধান্ত নেন তাঁর কোম্পানির প্রথম সরবরাহ কেন্দ্র গ্রামে খুলবেন। সেইমতো মহারাষ্ট্রের সাংলি গ্রামে এশিয়ান পেইন্টসের প্রথম সরবরাহ কেন্দ্র খুললেন তিনি। সেই থেকে শুরু হয়ে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি রঙ নিয়ে (লাল, কালো, সাদা, নীল, হলুদ) এশিয়ান পেইন্টস ২৩ কোটি টাকার ব্যবসা করে।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


জনসাধারণের মধ্যে ঘর রঙের আরও প্রসার ঘটাতে কোম্পানি সিধান্ত নেয় বিজ্ঞাপনের সাহায্য নেওয়ার। সেইসময় ভারতের বিজ্ঞাপন বাজারে ম্যাসকটের ব্যবহার জনপ্রিয়তা লাভ করছিল। আমূল বা পার্লে তাদের ম্যাসকট বাজারে আনার প্রয়াস করছিল। সেই একই ধারাকে বজায় রেখে এশিয়ান পেইন্টস কর্তৃপক্ষ ১৯৫৪ সালে কোম্পানির জন্য একটি ম্যাসকট বাজারে আনে এবং ম্যাসকটটি প্রবলভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। ম্যাসকটটি এতটাই জনপ্রিয় হয় যে একটা সময় এশিয়ান পেইন্টসের ব্র্যান্ড নামের থেকেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এটি।

প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট আর. কে. লক্ষ্মণকে এশিয়ান পেইন্টস কর্তৃপক্ষ দায়িত্বে দেয় তাদের লোগো হিসেবে একটি ম্যাসকট আঁকার জন্য।  লক্ষ্মণের ধূমপানের প্রবল নেশা ছিল। তো একদিন ধূমপান করতে করতে সিগারেটের কুন্ডলী পাকানো ধোঁয়ার মধ্যে তিনি একটি বাচ্চা ছেলের অবয়ব কল্পনা করেন। তিনি তাঁর কল্পনায় দেখতে পান একটি বাচ্চা ছেলে রঙের ব্রাশ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখের ভাবে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে দুষ্টুমি। সে কেবল সুযোগ খুৃঁজছে রঙ করার। এই অবধি কল্পনা করে আর. কে. লক্ষণ তৈরী করে ফেলেন একটি নামহীন ম্যাসকট। ১৯৫৪ সালে এই ম্যাসকটটিকে বাজারে নিয়ে আসে এশিয়ান পেইন্টস। এই ম্যাসকটটির নামকরণের জন্য ‘গিভ মি এ নেম’ শিরোনামে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে এশিয়ান পেইন্টস এবং পুরস্কার হিসেবে ৫০০ টাকা ধার্য করে। তাদের আবেদনে সাড়া দিয়ে সাতচল্লিশ হাজারটি জমা পড়া নামের মধ্যে থেকে মুম্বইয়ের গিরগাঁওয়ের মিঃ রেলে এবং সিওনের মিঃ আরাসের দেওয়া ‘গাট্টু’ নামটি মনোনীত হয় এবং তাঁরা পুরস্কারের অর্থ সমানভাবে ভাগ করে নেন।

গ্রাম থেকে শহর সব জায়গায় ‘গাট্টু’ ঘরের ছেলের মত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এশিয়ান পেইন্টসের লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষ। এশিয়ান পেইন্টসের ডিসটেম্পার এবং ক্রেতা সহায়ক কৌটো জনসাধারণের আয়ত্তের মধ্যে রঙকে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। আর কৌটোর উপর দুষ্টু ছোট্ট ছেলেটির ম্যাসকট রঙের কৌটোগুলিকে আরও আর্কষণীয় করে তোলে। গ্রাম থেকে শহর সব ক্ষেত্রেই এশিয়ান পেইন্টসকে মানুষ  চিহ্নিত করতে শুরু করে ‘গাট্টু’র দ্বারা। বিভিন্ন সময়ে গাট্টুকে বিভিন্ন রূপে দেখা দিলেও তার মুখের ভাব কোনদিনই বদলায়নি।  মানুষ ধীরে ধীরে ঘরের দেওয়ালে  চুন রঙ ছেড়ে রঙ করার প্রতি ঝুঁকতে শুরু করে। এশিয়ান পেইন্টস যে উদ্দেশ্য নিয়ে ম্যাসকটটি বাজারে এনেছিল তাতে একশভাগ সফলতা লাভ করে। তাদের বিজ্ঞাপনের ট্যাগ লাইন হিসেবে কখনও এসেছে ‘হর ঘর কুছ ক্যাহতা হ্যায়’ অথবা ‘এনি সারফেস ইউ নিড টু কালার ইউ নিড এশিয়ান পেইন্টস’ কিন্তু ‘গাট্টু’ একইভাবে রয়ে গেছে কোম্পানির লোগোতে। একটা সময় এশিয়ান পেইন্টস কর্তৃপক্ষ বিখ্যাত বিজ্ঞাপন সংস্থা ‘ওগলিভি’র কাছে তাদের কোম্পানির বিজ্ঞাপনের দায়িত্ব প্রদান করে। তারা এসে কোম্পানির বিজ্ঞাপনে নানা ধরণ নিয়ে আসে, কিন্তু গাট্টু ও তার পেইন্ট ব্রাশ একইভাবে থেকে যায় কোম্পানির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে। গাট্টু যেন রঙের ভান্ডার উম্মুক্ত করে দেয় জনসাধারণের সামনে। আজ প্রায় পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে এশিয়ান পেইন্টেসের ভারতের রঙের জগৎ শাসন করার পিছনে ‘গাট্টু’ র অবদান অনস্বীকার্য।

১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত এশিয়ান পেইন্টসের ব্যবসা দশগুণ বৃদ্ধি পায় কেবল মাত্র গাট্টুর কারণে। ১৯৫৭ সালে এশিয়ান পেইন্টস ভারতের সবচেয়ে বড় রঙ প্রস্তুতকারি সংস্থায় পরিণত হয়। ১৯৬৯ সালে ভারতের ‘শ্রেষ্ঠ কোম্পানি’ শিরোপা পায় এশিয়ান পেইন্টস এবং ১৯৮২ সালে ভারতীয় শেয়ার বাজারে নিজেদের শেয়ার ছাড়া শুরু করে তারা।

এইভাবেই এশিয়ান পেইন্টের সাথে ‘গাট্টু’ একে অপরের নামের পরিপূরক হয়ে ওঠে। একটা সময় আসে যখন গাট্টুর জনপ্রিয়তা ‘এশিয়ান পেইন্টস’ ব্র্যান্ডের থেকেও বেশী জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কোথাও কোথাও গাট্টুর কারণে ‘এশিয়ান পেইন্টস’ এই নামটি অবদমিত হয়ে পড়ে। অদ্ভুতভাবে ‘গাট্টু’ এবং ‘এশিয়ান পেইন্টস’ দুটি নাম সর্মাথক হয়ে ওঠে।  তাদের পরিচয়ে একটা দ্বন্দ্ব তৈরী হয়।  একটা সময়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয় গাট্টুকে আর কোম্পানির লোগোতে ম্যাসকট হিসেবে ব্যবহার করা হবে না কারণ তারা কোম্পানির দুটি পরিচয়কে একসঙ্গে রাখতে ইচ্ছুক ছিল না।  সেইমতো ২০০২ সালে কোম্পানির লোগো থেকে গাট্টু ম্যাসকটটিকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। ভারতীয় বিজ্ঞাপন জগতে এমন ঘটনা বিরল।

ভারতীয় বিজ্ঞাপন ও ম্যাসকটের আলোচনা যখনই হবে তখনই তাঁর মধ্যে ‘গাট্টু’র প্রভাব ও জনপ্রিয়তা বর্ণিত হবে।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও