সববাংলায়

জর্জ ম্যালরি

মাউন্ট এভারেস্টে পরপর তিনটি ব্রিটিশ অভিযানে অংশ নেওয়ার জন্য বিখ্যাত ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন ইংরেজ পর্বতারোহী জর্জ ম্যালরি (George Mallory)। ১৯২২ সালের একটি অভিযানে তিনিই প্রথম মানুষ হিসেবে ৮০০০ মিটার উচ্চতা অতিক্রম করার রেকর্ড গড়েন। তিব্বতের দিক দিয়ে এভারেস্টে ওঠার নতুন রাস্তা আবিষ্কার করেছিলেন জর্জ ম্যালরি। এডমন্ড হিলারি এবং তেনজিং নোরগেরও ৩০ বছর আগে ম্যালরি মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেছিলেন বলে অনেকেই বিশ্বাস করেন। কিন্তু তিনি জীবিত ফিরে আসেননি, তিনি এবং তাঁর সঙ্গী স্যান্ডি আরভিন নিখোঁজ হয়ে যান। অনেক পরে এভারেস্টে জর্জ ম্যালরির মৃতদেহ পাওয়া যায়।

১৮৮৬ সালের ১৮ জুন ইংল্যান্ডের চেশায়ারের অন্তর্গত মবারলেতে জর্জ ম্যালরির জন্ম হয়। তাঁর বাবা হার্বার্ট লে ম্যালরি একজন ধর্মযাজক ছিলেন এবং তাঁর মা অ্যানি ব্রিজও এক ধর্মযাজকের কন্যা ছিলেন। জর্জ ম্যালরির দুই বোন এবং এক ভাই ছিল যার নাম ট্রাফোর্ড লে ম্যালরি। মবারলিতে একটি দশ কামরার বিশাল বাড়িতে তিনি বড়ো হয়েছেন। পরবর্তীকালে ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর মাত্র ৬ দিন আগেই রুথ টার্নারকে বিবাহ করেন জর্জ ম্যালরি। তাঁদের দুই কন্যা এবং এক পুত্রের নাম যথাক্রমে ফ্রান্সিস ক্লেয়ার, ব্রিজ রুথ এবং জন।  

পশ্চিম কিরসবির একটি প্রিপারেটরি স্কুলে জর্জ ম্যালরির শিক্ষা জীবন শুরু হয়। পরে তাঁকে ভর্তি করা হয় ইস্টবোর্নে ‘গ্লেনগোর্স’ নামের একটি বোর্ডিং স্কুলে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে গণিতে একটি বৃত্তি পেয়ে উইনচেস্টার কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন ম্যালরি। সেই কলেজের চূড়ান্ত বর্ষে এসে দক্ষ পর্বতারোহী আরভিং-এর মাধ্যমে পর্বতারোহণের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। আরভিং প্রতি বছর বহু পর্বতারোহীকে আল্পস পর্বতে নিয়ে যেতেন। ১৯০৫ সালে ম্যালরি ইতিহাস পড়ার জন্য ভর্তি হন কেমব্রিজের ম্যাগডালেন কলেজে এবং ব্লুমসবেরি দলের অনেক সদস্যদের সঙ্গে তাঁর সেখানেই পরিচয় গড়ে ওঠে। স্নাতক উত্তীর্ণ হওয়ার পরে জর্জ ম্যালরি মাত্র এক বছর কেমব্রিজে ছিলেন এবং সেই সময় ‘বসওয়েল : দ্য বায়োগ্রাফার’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন তিনি যা ১৯১২ সালে প্রকাশিত হয়। এরপরে কিছুদিনের জন্য তিনি ফ্রান্সে ছিলেন। সেখানেই কবি রবার্ট গ্রেভের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়।

১৯১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তিনি রবার্ট গ্যারিসন আর্টিলারিতে দ্বিতীয় লেফটেন্যান্ট হিসেবে কাজ করেন। ১৯১৭ সালের ১ জুলাই তাঁকে মুখ্য লেফটেন্যান্টের পদে বহাল করা হয়। কিন্তু ১৯২০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি কমিশন ত্যাগ করেন ম্যালরি। যুদ্ধের পরে তিনি চার্টারহাউসে ফিরে আসেন, কিন্তু ১৯২১ সালে মাউন্ট এভারেস্টে প্রথম ব্রিটিশ অভিযানে সামিল হওয়ার জন্য পুনরায় কমিশন ত্যাগ করেন জর্জ ম্যালরি। ১৯২৩ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সট্রাম্যুরাল স্টাডিজ বিভাগের লেকচারার হিসেবে কাজ যোগ দেন তিনি। সেই কাজে যুক্ত থাকার সময়ে ১৯২৪ সালে দ্বিতীয় মাউন্ট এভারেস্ট অভিযানে অংশ নেওয়ার জন্য স্বল্পদিনের ছুটি নিয়েছিলেন ম্যালরি।

ক্রমে ক্রমে লেক জেলায় এবং আল্পস পর্বতের বিভিন্ন অংশে পর্বতারোহণে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিলেন জর্জ ম্যালরি। আরভিং-এর নেতৃত্বে ১২,২২৮ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট মন্ট ভেলান, ১৫,৭৭৪ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট মন্ট ব্ল্যাঙ্ক এবং ১৪,৬৪৯ ফুট উচ্চতার মন্ট মডিটের ফ্রন্টিয়ার রিজে তৃতীয়বার আরোহন করতে সফল হন তিনি। ১৯১৩ সালে লেক অঞ্চলের পিলার পর্বতে একটি নতুন পথে ওঠার রাস্তা আবিষ্কার করেন তিনি। বহু বছর ধরে ইউনাইটেড কিংডমে এই রাস্তাটিই সবথেকে কঠিন পথ হিসেবে বিবেচিত হত। কর্নেল চার্লস হাওয়ার্ড-বুরি, হ্যারল্ড রেবার্ন এবং গাই বুইলক ও এডওয়ার্ড অলিভার হুইলারের অধীনে প্রথম মাউন্ট এভারেস্ট শিখর জয়ের ব্রিটিশ অভিযানে যোগ দেন জর্জ ম্যালরি। এই অভিযানটি মূলত মাউন্ট এভারেস্ট কমিটির অর্থানুকূল্যে সম্ভব হয় এবং এই অভিযানের ফলেই প্রথম পর্বতের ঐ অংশের প্রকৃত মানচিত্র তৈরি করা যায় এবং কয়েকজন শেরপার সাহায্যে ম্যালরির দলটি এভারেস্টের বহু ছোট-খাটো শৃঙ্গ জয় করেন। তাঁরাই প্রথম পশ্চিমি অভিযাত্রী হিসেবে লোটাস ফেসের পাদদেশে ‘ওয়েস্টার্ন সিডব্লিউএম’ (Western CWM) দেখতে পান। দক্ষিণ দিক থেকে পুরো পর্বতটিকে ঘুরে ফেলার পরই তাঁরা ইস্ট রংবাক হিমবাহ খুঁজে পান যা কিনা তিব্বতের দিক দিয়ে মাউন্ট এভারেস্টে ওঠার পথের প্রধান নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করেছিল। এই অভিযানে তাঁরা এভারেস্টের নর্থ কোলের বেশি উপরে উঠতে পারেননি, কিন্তু এই অভিযানের সবথেকে বড় সাফল্যের দিক ছিল মাউন্ট এভারেস্টে ওঠার একটি বিকল্প রাস্তা আবিষ্কার। এর পরের বছর ১৯২২ সালে আরেকটি অভিযান চালানো হয় যেখানে ৭ জন শেরপা তুষার ঝড়ে মারাও যায়। সেবারেও মাউন্ট এভারেস্ট জয় করা হল না ম্যালরির। তখন তাঁর বয়স ৩৬। অদম্য জেদের বশে ঠিক তার পরের বছরেই আবার পাড়ি দিলেন ম্যালরি এভারেস্ট জয়ের উদ্দেশ্যে।

১৯২৪ সালের গ্রীষ্মকালে এডওয়ার্ড নর্টন, জিওফ্রে ব্রুস, হাওয়ার্ড সমারভিল, জন নোয়েল, জন ডি ভার্স হ্যাজার্ড এবং অ্যান্ড্রু আরভিং প্রমুখদের সঙ্গে নিয়ে হিমালয়ের বুকে তৃতীয়বার পা রাখেন ম্যালরি। এইবারে পর্বতারোহণের সময় স্ত্রী রুথ বাধা দিয়েছিলেন জর্জ ম্যালরিকে। কিন্তু কোনও বাধাই তাঁর জেদকে দমাতে পারেনি। এমনকি শোনা যায় স্ত্রীকে নিজের ভালোবাসার কথা জানাতে ম্যালরি জানিয়েছিলেন যে এইবারের অভিযান সফল হলে শিখর চূড়ায় তিনি তাঁর স্ত্রীয়ের একটি ছবি রেখে আসবেন। এই অভিযান শুরু হওয়ার আগেই নিউ ইয়র্কে তাঁকে নিয়ে একটি সাংবাদিক সম্মেলন হয়, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় উঠে আসে তাঁর নাম। বহু সাংবাদিক যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে কেন তিনি এভারেস্ট জয় করতে চান, তার উত্তরে জর্জ ম্যালরি বলেছিলেন যে এভারেস্ট ওখানে আছে বলেই তিনি তা জয় করতে চান। ৮ জুন ৬ নং ক্যাম্প থেকে ২২ বছর বয়সী স্যান্ডি আরভিংকে সঙ্গে নিয়ে পর্বতারোহণ শুরু করেছিলেন তিনি। তাঁদের সঙ্গে উন্নতমানের অক্সিজেন যন্ত্র ছিল। সেই অভিযানকে সহায়তা করতে তাঁদের পিছনেই আসছিলেন নোয়েল ওডেল। তিনি জানিয়েছেন জর্জ ম্যালরি এবং আরভিংকে শেষবার দেখা গিয়েছিল এভারেস্টের ২৮ হাজার ২৫০ ফুট উচ্চতায়, অর্থাৎ আর মাত্র ৮০০ ফুট দূরত্ব ছিল শিখরচূড়ার থেকে। তারপর আর তাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ ৭৫ বছর জর্জ ম্যালরির মৃতদেহটাই খুঁজে পাওয়া যায়নি। ১৯৯৯ সালে কনরাড অ্যাঙ্কার ২৬ হাজার ৭০০ ফুট উচ্চতায় ম্যালরির মৃতদেহ খুঁজে পান, কিন্তু আরভিং-এর মৃতদেহ কিংবা তাঁদের সঙ্গে থাকা ক্যামেরা কোনওটাই পাওয়া যায়নি। ম্যালরির মৃতদেহের সঙ্গে বেসক্যাম্প থেকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া সব জিনিসই পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু তাঁর স্ত্রীয়ের ছবিটি কেবল পকেটে ছিল না আর চোখে গগলস ছিল না। ফলে এখানেই রহস্য দানা বাঁধে, আদৌ কি এভারেস্টের শিখর ছুঁয়ে আসতে পেরেছিলেন জর্জ ম্যালরি? এভারেস্ট জয় করে ফেরার পথেই কী তাহলে দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু হয় তাঁর? অনেকেই মনে করেন যে চোখের বদলে গগলসটি তাঁর পকেটে থাকার অর্থ হল চূড়ায় পৌঁছে ফেরার পথে সন্ধ্যে হয়ে আসছিল আর তাই চারপাশ পরিষ্কার দেখার জন্য তিনি হয়তো গগলস খুলে নামার আগেই তা পকেটে ভরে রেখেছিলেন। বহু ব্রিটিশ পর্বতারোহী আজও মনে করেন যে ১৯৫৩ সালে তেনজিং নোরগে এবং এডমন্ড হিলারির অনেক আগেই সম্ভবত জর্জ ম্যালরি এভারেস্ট জয় করেছিলেন। ম্যালরি মারা যাওয়ার সময় তাঁর পুত্রের বয়স ছিল মাত্র তিন বছর। পরে তিনি সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছিলেন যে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করে ফিরে আসাটাও একটি সফল অভিযানের অংশ, ফলে ফিরে আসতে না পারাটা অভিযানকে অসম্পূর্ণই রাখে।

১৯২৪ সালের ৮ জুন ৩৭ বছর বয়সে মাউন্ট এভারেস্টে পর্বতারোহণকালেই জর্জ ম্যালরির মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading