ইতিহাস

গ্লোব সিনেমা

প্রায় ২০০ বছর আগে, মধ্য কলকাতার তৎকালীন সাহেবপাড়ায়, লিন্ডসে স্ট্রীট যেখানে হগ মার্কেটের সামনে গিয়ে পড়েছে, ঠিক সেই তেমাথার মোড়ে বাঁদিকে তাকালেই চোখে পড়তো কাঠের তৈরি এক বিশাল অপেরা হাউস যার নাম ছিল বিজু গ্র্যান্ড অপেরা হাউস। মধ্য কলকাতার সাহেবসুবোরা সন্ধ্যে হলেই ভিড় জমাতেন এই অপেরা হাউসে। দীর্ঘ ৭৯ বছর ধরে এই পরিষেবা দিয়ে আসার পরে অপেরার তৎকালীন মালিক ই এইচ ডুকাসের থেকে এর মালিকানা হস্তান্তরিত হয় ই এম কোহেনের কাছে। নতুন মালিকের হাতে আসার পরেও জয়যাত্রা অব্যাহত থাকে গ্র্যান্ড অপেরা হাউসের। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ১৯২২ সালের ২৩শে নভেম্বর সময়ের সাথে তাল রেখে এই কোহেন সাহেবের হাত ধরেই গ্র্যান্ড অপেরা হাউস হয়ে ওঠে গ্লোব সিনেমা(Globe Cinema)। স্পোর্টিং ডাবল নামের একটি নির্বাক ছবি প্রথমবার প্রদর্শিত হয় দর্শকদের সামনে।

বিনোদনের দুনিয়ায় এ এক নতুন অধ্যায়। গ্লোব সিনেমাই ছিল সেই সময়ের হাতে গোনা কয়েকটি হলের মধ্যে অন্যতম যেখানে হলিউডের সারা জাগানো ছবিগুলি দেখতে ভিড় জমাতে শুরু করতেন শহরবাসী। এর কিছু বছর পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব পড়ে মহানগরীর ওপরেও। কলকাতায় ভিড় জমাতে শুরু করেন মিত্রশক্তির সৈনিকের দল। এই সময়টা হয়ে ওঠে গ্লোব সিনেমা হলের স্বর্ণযুগ। নিজের দেশের, নিজের ভাষার বিনোদনের স্বাদ পেতে এইসব সৈনিকেরা ভিড় জমাতে শুরু করেন গ্লোব সিনেমা হলে। গ্লোব, নিউ এম্পায়ার, লাইটহাউসের এই ত্রিভুজ বহুদিন অব্ধি ঝকঝকে হলিউডি বিনোদনের রসদ জুগিয়ে এসেছে এইসব ভিনদেশী দর্শকদের কাছে।

১৯৪৭ সালে দেশজুড়ে স্বাধীনতার ঝড় বয়ে যাওয়ার পর দেখা যায়, সেই সাথে অদৃশ্য হয়ে গেছে গ্লোবের বহু ইউরোপীয় দর্শককুল। সদ্য স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া এই শহর ছেড়ে তাঁদের খুঁজে নিতে হয়েছে অন্য কোনও ঠিকানা, পৃথিবীর অন্য কোনও প্রান্তে। শহরের চলচ্চিত্র ইতিহাসের উজ্জ্বল সাক্ষী হয়ে গ্লোব সিনেমা থেকে গেছিল তাঁর নিজের জায়গাতেই। এর কয়েক বছরের মধ্যেই পরিস্থিতি আবার বদলাতে শুরু করে। ফের গমগম করে ওঠে শতাব্দী প্রাচীন গ্লোব সিনেমার হল ঘর। ততদিনে ভারতীয় ছবির থেকে প্রযুক্তির দিক দিয়ে অনেক উন্নত, অনেকটাই অন্যরকম হলিউডি ছবির স্বাদ পেয়ে কলকাতার তরুণ দর্শকের দল নতুন নতুন ছবির সন্ধানে ভিড় জমাতে শুরু করেন গ্লোব প্রেক্ষাগৃহে। পাশ্চাত্যের অসাধারন স্থাপত্যকীর্তির নিদর্শন, উন্নত প্রক্ষেপণ ব্যবস্থা, গায়ে কাঁটা দেওয়া শব্দ প্রক্ষেপণ ব্যবস্থা, আরামদায়ক সিট, বড়পর্দা এত বছর পরেও মনে রেখে দিয়েছেন সেদিনের সেই সব দর্শকেরা। এই সময়ের বেশীর ভাগ চলচ্চিত্রমোদী বা নির্দেশক, অভিনেতা, কলাকুশলী, যাদের ছোটবেলা বা বড় হয়ে ওঠা এই মহানগরীতেই তাঁরা আজও ভোলেননি গ্লোবের সেই মায়াময় অতীতের কথা। বাবার হাত ধরে হিচককের “দ্য ম্যান হু নিউ টু মাচ” বা মা’র সাথে ছুটিতে কলকাতায় এসে চার্লি চ্যাপলিনের “মডার্ন টাইমস” দেখার অভিজ্ঞতা এখনও রসিয়ে রসিয়ে বলতে শোনা যায় তাঁদের। হলের বড় বড় থামের আড়ালে যাতে বসতে না হয় তাঁর জন্য টিকিট কাউন্টারে অনুরোধ করার অভিজ্ঞতাও মজা করেই বলেন তাঁরা। পরিচ্ছন্নতার অভাব বা দুর্বল পরিকাঠামো নিয়ে অভিযোগ করতে শোনা যায়না তাঁদের। তাঁদের বড় হয়ে ওঠার সাথে, চলচ্চিত্রপ্রেমী হয়ে ওঠার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে থাকা সুন্দর অভিজ্ঞতা হিসেবেই আজও রয়ে গেছে গ্লোব সিনেমা হল।

এতকিছুর পরেও সময়টা ভাল যাচ্ছিলনা গ্লোবের। শহর জুড়ে লড়াই করতে থাকা আরও শতাধিক সিনেমা হলের মতই গ্লোবকেও লড়তে হচ্ছিল নিজের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার জন্য। এই পরিস্থিতির জন্য কেউ দায়ী করল টেলিভিশনকে আবার কেউ দোষ দিল ভিডিও পাইরেসির মাত্রাতিরিক্ত উপদ্রবকে। কারণ যাই হোকনা কেন, পাহাড় প্রমাণ ঋণের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে একে একে ঝাঁপ নামাতে বাধ্য হচ্ছিলো কলকাতার ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা একের পর এক সিঙ্গল স্ক্রিন প্রেক্ষাগৃহগুলি।

বোম্বাইয়ের গ্লোব থিয়েটারস প্রাইভেট লিমিটেডের অনুরোধে ২০০০ সালে গ্লোব সিনেমা হল লীজ নেন প্রিয়া এন্টারটেনমেন্টের কর্ণধার শ্রী অরিজিৎ দত্ত। গ্লোবকে তাঁর স্বমহিমায় ফিরিয়ে আনতে প্রাণপণ চেষ্টা করেন তিনি, কিন্তু কিছু সমস্যার সমাধান তাঁর কাছেও ছিলনা। পাশের গলিতে ক্রমাগত বাড়তে থাকা দোকানপাট, খাবারের অস্থায়ী স্টলে পথচলতি মানুষের ভিড়, পারকিং এর ব্যবস্থা না থাকা, যাতায়াতের অসুবিধা এই সব মিলে অরিজিৎবাবুর সমস্যা আরও বাড়িয়ে তুলছিল। তাঁর সংস্থার অধীনে থাকা প্রিয়া সিনেমা হল রমরমিয়ে চললেও তাঁর থেকে আসা লভ্যাংশ চলে যাচ্ছিল বাকি হলগুলোর ঘাটতি পূরণ করতে। ২০০০ সালে পাওয়া গ্লোব সিনেমা হলের মালিকানা ২০০৬ সালে অগত্যা তাঁকে ফেরত দিয়ে দিতে হল পূর্ববর্তী মালিকদের হাতে।

এই সময়ে সিঙ্গল স্ক্রিন সিনেমা হলগুলোর কফিনের শেষ পেরেক পোতা হল শহরজুড়ে একাধিক মাল্টিপ্লেক্সের আবির্ভাবে। শহরের ঐতিহ্যকে ভুলে গিয়ে আরামপ্রিয় দর্শক আরও বেশী অর্থ খরচ করে দলে দলে মাল্টিপ্লেক্সমুখী হয়ে উঠতে লাগলেন। এক সময় নানারকম কর মকুবের অনুরোধ নিয়ে সরকারের দ্বারস্থ হলেও, নতুন প্রজন্মের সরকার এই প্রস্তাবকে আমল দিতে রাজি হলনা। একে একে দীপ নেভাতে বাধ্য হল শহরজুড়ে কয়েকশো সিনেমা হল।

অবশেষে এই ঐতিহ্যশালী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ত্ব নিতে ২০১১ সালে এগিয়ে এলেন নিতিন কুমার জৈন এবং কন্সরশিয়া কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড। এই সংস্থার হাত ধরে হৃত গৌরব ফিরে পেতে একটা শেষ চেষ্টা করা হল। ২০১৪ সালে এই প্রয়াসের ফলস্বরূপ গ্লোব সিনেমাকে ভেঙে তৈরি হল একটি বুটিক শপিং মল যাতে ১০০ টি দোকান, একটি প্রশস্ত ফুড কোর্টের সাথে থাকছে দুটি হল সম্বলিত একটি মাল্টিপ্লেক্স। আরতি সিনেমার কর্ণধার রাজকমল চৌরাসিয়ার নেতৃত্বে তৈরি এই নতুন যুগের গ্লোব আরতি সিনেমার ১০,০০০ বর্গফুট জায়গা জুড়ে তৈরি করা হয়েছে দুটি হল, যার একটিতে ত্রিমাত্রিক প্রক্ষেপণ ব্যবস্থা আছে, এবং অন্যটিতে আছে অত্যাধুনিক ডলবি সাউন্ড সিস্টেম।

প্রায় দুশো বছর পার করা এই প্রতিষ্ঠানের গল্প শেষ হল? নাকি শুরু হল আরেক নতুন অধ্যায়ের, সেই দিকেই তাকিয়ে আছে সেইসব উৎসাহী, সিনেমাপ্রেমী শহরবাসী, গ্লোব সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেলে যাদের পৃথিবীর একটা অংশেরও সমাপ্তি ঘোষিত হবে।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন