গোলকনাথ বনাম পাঞ্জাব মামলা

ভারতীয় বিচারালয়ের ইতিহাস ঘাঁটলে বহু যুগান্তকারী মামলার হদিস পাওয়া যাবে, যেগুলি এদেশের সংবিধানকে সমৃদ্ধ করেছে নানাভাবে। তেমনই একটি ঐতিহাসিক মামলা হল, গোলকনাথ বনাম পাঞ্জাব মামলা। মূলত জমির মালিকানা এবং তৎসংক্রান্ত আইনকে কেন্দ্র করে এই মোকদ্দমার জন্ম হয়েছিল৷ এই মামলাতেই প্রশ্ন উঠেছিল সংবিধানের তৃতীয় অংশে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের আইনগুলি খর্ব বা সংশোধন করবার কোনো এক্তিয়ার পার্লামেন্ট বা সংসদের আছে কিনা। এমন কি সংবিধানের কোনো ধারা সংশোধিত হলে তা আইন হিসেবে গণ্য হবে কিনা, সে প্রশ্নও উত্থাপিত হয় এই মামলায়। দীর্ঘ শুনানি, সওয়াল জবাবের পর আদালত অবশ্য রায় দিয়েছিল সংসদ কখনই মৌলিক অধিকারগুলি সংশোধন করতে পারে না। এই গোলকনাথ মামলা সংসদের ক্ষমতা এবং সংবিধান বিষয়ে যে জরুরি এক তর্কের অবতারণা করেছিল, তা আখেরে ভারতীয় আইন ব্যবস্থাকেই ঋদ্ধ করে।

ঘটনাটি পাঞ্জাবের জলন্ধর এলাকার। সেখানকার হেনরি এবং উইলিয়াম গোলকনাথের পরিবারের হাতে ৫০০ একরেরও বেশি কৃষিজমির মালিকানা ছিল। কিন্তু ১৯৫৩ সালের পাঞ্জাব সিকিউরিটি অ্যান্ড ল্যান্ডস টেনিউরস অ্যাক্টে বলা হয় যে, প্রত্যেকে ৩০ একরের বেশি জমির মালিকানা রাখতে পারবে না। কয়েক একর জমি যাবে ভাড়াটেদের কাছে এবং অবশিষ্ট জমিটুকু উদ্বৃত্ত হিসেবে গণ্য করা হবে। গোলকনাথের পরিবার কিন্তু অত সহজেই এই আইন স্বীকার করে নিয়ে তাদের মালিকানা ছাড়তে রাজি হননি৷ বরং এই আইনের বিরুদ্ধেই লড়াই করতে নেমেছিলেন তাঁরা। ১৯৫৩ সালের এই জমি আইনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ৩২ ধারার অধীনে আদালতে একটি পিটিশন দাখিল করেন গোলকনাথ। ১৯৬৫ সালে এই মামলাটিকে সুপ্রিম কোর্টে পাঠানো হয়েছিল। পিটিশনে গোলকনাথদের মূল অভিযোগ ছিল যে,  ১৯ এফ এবং জি ধারা অনুযায়ী সম্পত্তি অর্জন এবং ধারণ করার সাংবিধানিক অধিকারে বাধা দেওয়া হচ্ছে, মনমতো পেশা নিয়ে অগ্রগতিতেও এই আইন অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, এবং সর্বোপরি সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদে যে সমান সুরক্ষার অধিকারের কথা বর্ণিত আছে, তাও সংকটের মুখে পড়েছে। ফলত, একপ্রকার সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার খর্ব করারই অভিযোগ করেছিলেন গোলকনাথরা।

যেহেতু সংবিধান প্রদত্ত অধিকার হ্রাসের প্রশ্ন অতএব সুপ্রিম কোর্ট বেশ নড়েচড়ে বসেছিল এই মামলায়। অভিযোগকারীদের বক্তব্য ছিল যে, ভারতীয় সংবিধান সংশোধন বা পরিবর্তনের চেষ্টা করার ক্ষমতা কারও থাকা উচিত নয়। তাঁরা আরও বলেন যে, মৌলিক অধিকারগুলির পরিবর্তন সাধন করা উচিত নয়, সেগুলি অপরিবর্তনীয়। ৩৬৮ ধারা অনুযায়ী সংসদের সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা বিষয়ক কথা আছে বলে অভিযোগকারীরা মন্তব্য করেন যে, সংশোধন শব্দটি কেবলমাত্র ছোটখাটো কিছু পরিবর্তনকে বোঝায়, যা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোটির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং যা সম্পূর্ণ নতুন কোনো ধারণার আমদানি করে না। ৩৬৮ ধারাটি সম্পর্কে তাঁরা খুব সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করে বলেন, আসলে সেই ধারায় সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতিগুলি বিষয়ে আলোচনা করা রয়েছে, সংসদের হাতে সংশোধনের ক্ষমতা দেওয়ার কথা নেই। অবশেষে অভিযোগকারীরা আদালতের সামনে যুক্তি দিয়েছিল যে, ১৩ ধারার ৩ এ (3 A) অনুযায়ী কোনো রাজ্য বা কেন্দ্র সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধানের তৃতীয় অংশে বর্ণিত অধিকারগুলিকে খর্ব করার জন্য কোনোরকম আইন তৈরি করতে পারে না এবং মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে এমন যেকোনো সাংবিধানিক সংশোধন বেআইনি ঘোষণা করে বাতিল করা হবে।

অভিযোগকারীদের তথ্য সহযোগে পেশ করা এমন অকাট্য সব যুক্তি সেদিন এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ের জন্ম দিয়েছিল। যদিও বিপক্ষের আইনজীবীরা বলেছিলেন, সংবিধানের স্রষ্টারা কখনই চাননি যে, আমাদের সংবিধান অনমনীয় হোক, বরং সময় এবং প্রয়োজনানুসারে তা পরিবর্তনশীল হবে, এমনটাই ছিল তাঁদের কাম্য। এছাড়াও তাঁরা বলেছিলেন যে, সার্বভৌম ক্ষমতার ফলেই সংবিধান সংশোধন করা হয়েছিল। এটি সংসদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা থেকে আলাদা। অভিযোগকারীদের প্রত্যুত্তর দেওয়ার ঢঙেই তাঁরা আরও বলেছিলেন যে, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো এবং অ-মৌলিক কাঠামো বলে কিছু নেই, বরং এর সকল বিধানই সমান গুরুত্বের এবং সমান ওজনদার। সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনকেও তাঁরা চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল।

এই মামলার প্রধান বিচারপতি ছিলেন কে. সুব্বা রাও। এছাড়াও বেঞ্চ সদস্যদের মধ্যে ছিলেন, কেএন ওয়াঞ্চু, এম. হিদায়াতুল্লাহ, জেসি শাহ, এসএম সিক্রি, জেএম সেলাত, সিএ বৈদিয়ালিঙ্গম, বিশিষ্ট ভার্গব, জি.কে মিত্র, আরএস বাচাওয়াত, ভি. রামাস্বামীর মতো আইনজ্ঞরা। এই মামলার ক্ষেত্রে সুব্বা রাও আমেরিকান আইন থেকে ধার করে ওভাররুলিং মতবাদকে ব্যবহার করেছিলেন। ওভাররুলিংয়ের মতবাদ অনুসারে, আদালত বিদ্যমান আইনের পরিবর্তে একটি ভাল আইন তৈরি করতে পারে, তবে সেই নতুন আইন শুধুমাত্র ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে এবং এর কোনো পূর্ববর্তী প্রভাব থাকবে না। সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধন আইনের সাংবিধানিক বৈধতা সংরক্ষণের জন্য এই মতবাদটি ব্যবহার করেছিলেন তিনি।

দীর্ঘ শুনানি ও সওয়াল জবাবের পর উক্ত এগারোজন বিচারপতির ভোটের নিরিখে ১৯৬৭ সালে সুপ্রিম কোর্ট এই মামলার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল। ৬:৫ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় রায় গোলকনাথদের পক্ষেই গিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির রায় ছিল, সংবিধানের তৃতীয় অংশে বর্ণিত মৌলিক অধিকারগুলি সংশোধনের কোনো ক্ষমতা সংসদের থাকবে না। সুপ্রিম কোর্ট আরও বলেন যে, যদি সংসদকে সংবিধানের প্রতিটি বিধান পরিবর্তন বা সংশোধন করবার ক্ষমতা দেওয়া হয় তাহলে স্বৈরাচারের সম্ভাবনা দেখা দেবে। বিচারকমন্ডলী অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, সংশোধনগুলি অনেকক্ষেত্রেই মৌলিক অধিকারের সুযোগগুলিকে খর্ব করছে। সেকারণেই সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারক মৌলিক অধিকারগুলিকে সংবিধান সংশোধনের আওতার বাইরে রেখেছিলেন। অধিকাংশ বিচারকরেই মত ছিল যে, মৌলিক অধিকারগুলি প্রাকৃতিক অধিকারের সমান এবং মানব জীবনের বিকাশ ও বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির তালিকায়, প্রধান বিচারপতি সুব্বা রাও ছাড়াও, ছিলেন জেসি শাহ, এসএম সিক্রি, জেএম সেলাত এবং সিএ বৈদিয়ালিঙ্গম। বিচারপতি হিদায়াতুল্লাহও সুব্বা রাও-এর সঙ্গে একমত হয়েছিলেন।

সাংবিধানিক সংশোধনীগুলি ভারতীয় নাগরিকদের মৌলিক অধিকার খর্ব করার ক্ষমতা রাখে না, গোলকনাথ মামলার এই রায় নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। সংবিধান নিয়ে সংসদের স্বৈরাচারী আচরণগুলি বন্ধ করার ক্ষেত্রেও বিচারালয়ের এ-এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল বলা যায়।

পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্টের রায় বাতিল করতে সংসদ ১৯৭১ সালে ২৪তম সংশোধনী পাস করে। এতে স্পষ্টতই বলা হয় মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত বিধান সহ সংবিধানের যেকোনো অংশ সংশোধনের ক্ষমতা আছে সংসদের। গোলকনাথ মামলায় বলা হয়েছিল তৃতীয় খণ্ডে নিহিত মৌলিক অধিকার খর্ব করে এমন কোনো সংশোধন সংসদ করতে পারে না। পরবর্তীতে, ১৯৭৩ সালের কেশবানন্দ ভারতীর মামলায় সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল এমন কোনো সংশোধন করা যাবে না, যা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে প্রভাবিত করে। তবে, এত তর্কবিতর্কের ফলে যে, ভারতীয় আইন ব্যবস্থারই অগ্রগতি হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।

আপনার মতামত জানান