হজ মুসলমানদের জন্য অন্যতম প্রয়োজনীয় ইবাদত বা ধর্মীয় উপাসনা। অনেক সময় একে হজ্জ নামেও অভিহিত করা হয়। এটি ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম একটি স্তম্ভ। যিনি সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় হজ করতে যান, তাকে হাজী বলে। বলা হয় প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানকেই তার জীবনে একবার হলেও এটি করা উচিত। তবে শারীরিক ও আর্থিক ভাবে সক্ষম হলে তবেই যাওয়া উচিত।
২০২৬ সালের হজ কবে?
- বাংলা তারিখ: ১৪৩৩ সালের ১০ জ্যৈষ্ঠ থেকে ১৪ জ্যৈষ্ঠ
- ইংরাজি তারিখ: ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২৯ মে

হিজরি বছরের শেষ মাস হল জিলহজের ৮ থেকে ১২ তারিখ হজের জন্য নির্ধারিত করা রয়েছে। এই মাসের ৯ তারিখ খুব গুরুত্বপূর্ণ দিন যা আরাফাতের দিন হিসেবে পরিচিত এবং ১০ তারিখে পালিত হয় ইসলামের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ইদুজ্জোহা।
বিভিন্ন ইসলামিক বর্ণনায় উল্লেখ আছে ইব্রাহিম তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরাকে নির্জন মরুভূমিতে রেখে এসেছিলেন। বলা হয় তিনি আল্লাহর থেকেই তাঁর স্ত্রী এবং সন্তানকে মক্কায় নির্বাসনে রেখে আসার নির্দেশ পেয়েছিলেন। তিনি চলে আসার পর একসময়ে তাদের সঙ্গে আনা খাদ্য ও পানীয় শেষ হয়ে যায়। শিশু ইসমাঈল ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কান্নাকাটি শুরু করে। সাহায্যের জন্য কাউকে না পেয়ে তিনি জলের খোঁজে সাফা এবং মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করেন। এই ঘটনাকে স্মরণ রেখেই হজের সময় মুসলিমদের জন্য সাফা এবং মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে হাঁটার নিয়ম রয়েছে। এভাবে দৌড়াদৌড়ি করার পর সপ্তমবারে হাজেরা দূর থেকে দেখেন যে, শিশু ইসমাঈলের পায়ের আঘাতে মাটির বুক চিরে বেরিয়ে আসছে জল। অন্য একটি বর্ণনা অনুযায়ী যখন হাজেরা এবং শিশু ইসমাঈল জলের জন্য ছটফট করছিল, তখন আল্লাহর নির্দেশে জিব্রাঈল নামের ফেরেশতা (স্বর্গীয় দূত) মাটিতে গোড়ালির আঘাতে ফোয়ারার সৃষ্টি করলেন। হাজেরা ছুটে এসে বাচ্চাকে কোলে নিলেন অসীম মমতায়। এবং দুজনে এই জল পান করে আল্লাহকে অনেক ধন্যবাদ জানালেন। তাই মুসলমানদের জন্য মক্কার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হল জমজমের জলপান।
হঠাৎ কাছেই একটি শব্দ শুনে হাজেরা চমকে উঠলেন। জিব্রাঈল বললেন, “তোমরা ভয় পেয়ো না। এখানেই আল্লাহর ঘর। তোমার স্বামী ও সন্তান এই ঘর শীঘ্রই পুনর্নির্মাণ করবেন।” বলেই সেই শব্দ মিলিয়ে গেল। পরবর্তীকালে ইব্রাহিম তাঁর পুত্র ইসমাঈলের সাথে মিলিত হয়েছিলেন। আল্লাহর নির্দেশেই ইব্রাহিম কাবাগৃহ পুনর্নির্মাণ করেন। বলা হয় পৃথিবীতে আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্মিত প্রথম ইমারত হচ্ছে মক্কাতে অবস্থিত পবিত্র কাবা , যা ‘বায়তুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর ঘর’ নামে পরিচিত। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী বায়তুল্লাহ প্রথমে ফেরেশতাগণ নির্মাণ করেন। পরে আদম তা পুনর্নিমাণ করেন। তারপর বহুযুগ পরে আল্লাহর নির্দেশে ইব্রাহিম ছেলের সাথে সেটি পুনর্নির্মাণ করেন। ইব্রাহিমই সর্বপ্রথম কাবাকে কেন্দ্র করে হজেরও প্রবর্তন করেন। তাঁর আহ্বানে লোকেরা মক্কায় আসতে থাকে। তারপর থেকে প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তর থেকে লোকজন মক্কায় সমবেত হতে থাকে।
বলা হয়, মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা জয়ের আগের কয়েকশ বছর ধরে হজের নিয়মে যে পরিবর্তন হয়েছিল, তা ইব্রাহিমের প্রবর্তিত পথ নয়। মানুষ তাঁর দেখানো পথে না চলে পথ ভুলে গিয়েছিল। মুহাম্মদের (সা.) মক্কা জয়ের পরে তিনি কাবার অনেক সংস্কার করেন। বলা হয় দশম হিজরি বছরে তিনি হজের জন্য যাত্রা করেন। তখন তাঁর সঙ্গে ছিল অসংখ্য মানুষ। ইসলামে এটি ছিল তাঁর প্রথম ও শেষ হজযাত্রা, যা ‘বিদায়ী হজ’ নামেই অধিক পরিচিত। এখানে মুসলিমদের জন্য তিনি যে উপদেশ দিয়েছিলেন তাকে বিদায়ী হজের খুতবা বলা হয়। খুতবা হল মুসলিমদের উদ্দেশ্যে দেওয়া উপদেশমূলক বক্তৃতা। বলা হয়ে থাকে তখন থেকেই হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম হয়ে ওঠে।
হজ মুসলমানদের অবশ্য পালনীয় একটি ধর্মীয় বিধি। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক মুসলমানের জীবনে অন্তত একবার এই ইবাদত পালন করা কর্তব্য। তবে একটি শর্ত রয়েছে – যদি কেউ শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম হয় তবেই সে এতে অংশ নিতে পারে। সামর্থ্যবানদের ক্ষেত্রে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর যাওয়ার কথা অনেক সময় বলা হয়। সুযোগ থাকলে প্রতিবছর যাওয়াও উত্তম বলে মনে করা হয়। তবে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কেউ শারীরিকভাবে অক্ষম হলে তার পরিবর্তে অন্য কাউকে দিয়ে বদলি হজ করানো যায়। এমনকি কেউ জীবদ্দশায় এই ফরজ ইবাদত আদায় করতে না পারলেও তার জন্য বদলি হজের ব্যবস্থা করা সম্ভব। সে মারা গেলে তার সম্পত্তি থেকে খরচ করে এই ব্যবস্থা করা যায়। পরিচিত বা অপরিচিত- যে কোনো ব্যক্তি এই বদলি হজ আদায় করতে পারেন।
প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ মুসলমান হজ পালন করার উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যান। বিশ শতকের শুরুতে হাজীদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম ছিল। উদাহরণস্বরূপ, ১৯২০ সালে হাজীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫৯ হাজার, যা ২০১২ সালে এসে প্রায় ৩১ লাখে পৌঁছে যায়। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এটি সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তেল ও গ্যাসের পর ধর্মীয় পর্যটন দেশটির অন্যতম বড় আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ হাজী ও উমরাহ পালনকারীর আগমনের ফলে পরিবহন, হোটেল, খাদ্য, বাণিজ্যসহ নানা খাতে ব্যাপক অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হয়। ফলে এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানই নয়, বরং বিশ্ব মুসলিম সমাজের এক বিশাল মিলনমেলা এবং সৌদি আরবের অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- https://en.wikipedia.org/Hajj
- https://www.britannica.com
- https://www.bbc.co.uk
- https://www.humanappeal.org.uk
- https://www.prothomalo.com/
- https://www.bd-pratidin.com/
- https://www.jagonews24.com/
- https://www.at-tahreek.com/
- https://www.quraneralo.com/
- https://en.wikipedia.org/History_of_the_Hajj
- https://www.islamicfinder.org/


আপনার মতামত জানান