সববাংলায়

হিড়িম্বা

হিড়িম্বা ছিলেন ভীমের স্ত্রী এবং কুন্তীর প্রথম পুত্রবধূ। তিনি ছিলেন  ঘটোৎকচের মা এবং রাক্ষস হিড়িম্ব’র বোন। তিনি ভীমকে ভালোবেসে নিজের কূল অর্থাৎ রাক্ষসকূল ত্যাগ করেছিলেন এবং ভীম তার কাছে না থাকলেও চিরকাল ভীমকে ভালোবেসে তার স্মৃতিতেই জীবন কাটিয়ে গেছেন।

জতুগৃহে পাণ্ডবদের পুড়ে মরার খবর তখন চারদিকে। কিন্তু বিদূরের সাহায্যে পান্ডবরা বেঁচে নদীর অন্যপাড়ে চলে এসেছে। নদীর পাড়ে এসে পাঁচভাই মাতা কুন্তীর সঙ্গে জিরোচ্ছিলো। ভীম তখন জেগেছিল এবং মনে মনে তাদের এই দশার জন্য দুর্যোধনকে দোষারোপ করছিল। এই বন ছিল রাক্ষস হিড়িম্ব’র দখলে। সে ছিল নরভোগী এক রাক্ষস। তার বোন হিড়িম্বাকে নিয়ে সে এই বনে বাস করত। ভীমদের দেখে হিড়িম্বার তাদের খাওয়ার ইচ্ছা হল। সে তার বোন হিড়িম্বাকে বলল এই মানুষগুলোকে মেরে নিয়ে আসতে।

ভাইয়ের কথামত হিড়িম্বা এল। তখন পাণ্ডবদের চারভাই এবং মাতা কুন্তী ঘুমিয়ে ছিল। জেগে ছিল শুধু মধ্যম পাণ্ডব ভীম। তার পেশীবহুল চেহারা দেখে প্রেম জাগল হিড়িম্বার মনে। তার দিকে চেয়ে হিড়িম্বা ভাবল যদি ওকে মেরে ভাইয়ের জন্য নিয়ে যাই, তাহলে ওর হাড়গোড় চিবিয়ে খেয়ে হয়তো ক্ষনিকের সুখ। কিন্তু ওকে বিয়ে করে সারাজীবন ওর সাথে থাকলে, সারাজীবন ওকে ভোগ করলে সে সুখ আজীবন। তাছাড়া ভাইয়ের ভালোবাসার চেয়ে স্বামীর ভালোবাসা অনেক সুখের। এই ভেবে সে তখন রাক্ষসরূপ ত্যাগ করে এক সুন্দরী মানবীর রূপ নিয়ে এল ভীমের কাছে। তাকে নিজের আসল পরিচয় দিয়ে জানাল সে তার ভাইয়ের আদেশে  ভীমদের বধ করতে এসেছে। কিন্তু এখানে এসে ভীমকে দেখে সে তার প্রেমে পড়েছে, তাই সে ভীমকে তার সঙ্গে নিয়ে যেতে চায়। তাকে আরো বলে অনেক দূরে ভীমকে সে নিয়ে চলে যাবে এবং তার সঙ্গে থেকে, তার সঙ্গে ঘুরে, তার সঙ্গে সহবাস করে ভীমেরও ভালো লাগবে। কিন্তু নিজের মা ভাইকে ত্যাগ করে কি ভীম এক নারীর কামনায় সাড়া দিতে পারে?

ভীম বলল নিজের ঘুমন্ত মা ভাইকে সেই রাক্ষসের হাতে তুলে কোথাও যেতে পারবে না। হিড়িম্বা নিজের ভুল শুধরে নিল এবং বলল সে শুধু ভীমকে নয়, তার পুরো পরিবারকেই নিয়ে পালাতে পারে এখান থেকে। ভীম তাকে জানাল সে এক তুচ্ছ রাক্ষসের ভয়ে ভীত নয় আর সেই জন্য সে তার মা ভাইকে জাগাতেও পারবে না। এত কথা বলতে বলতে অনেক দেরি হয়ে গেছিল। হিড়িম্ব এত দেরি সহ্য করতে না পেরে নিজেই সেই জায়গায় এসে দেখল তার বোন মানবীর রূপে এক পুরুষের সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। রাগে তার সর্বশরীর জ্বলে উঠল। বোনকেও এদের সাথে মেরে ফেলবে এই ভেবে সে ধেয়ে আসল। তাকে দেখে হিড়িম্বার ভয় হল। কিন্তু ভীম এগিয়ে এসে হিড়িম্বকে বলল, ” এখানে যারা ঘুমোচ্ছে তাদের থেকে দূরে গিয়ে কথা বল। আর তোর বোনকে তুই কি মারবি, আমি থাকতে তা হতে দেব না। ওর শরীর ওর বশে নেই। কামদেবের ইচ্ছাতেই ও আমাকে চায়। তাতে ওর কি দোষ?” এই বলে হিড়িম্বকে টেনে নিয়ে দূরে চলে গেল ভীম।

কিন্তু দূরে নিয়ে গেলে কি হবে, যুদ্ধের প্রচন্ড শব্দে কুন্তী এবং বাকি পান্ডবরা জেগে উঠল। জেগে সামনে সুন্দরী হিড়িম্বাকে দেখে কুন্তী তার পরিচয় জিজ্ঞেস করল। তখন হিড়িম্বা কুন্তীর পদতলে এসে সব সত্যি জানাল। ভীমকে যে সে নিজের স্বামীরূপে বরণ করেছে এবং তাকে ছাড়া বাঁচবে না এসব কিছু বলল। ততক্ষণে ভীম হিড়িম্বকে বধ করে ফেলেছে। এদিকে সবাই এইরকম রাক্ষসদের আগমনে হতচকিত। অর্জুন বলল এখান থেকে দ্রুত অন্য কোথাও যেতে হবে। সকলে হিড়িম্বাকে উপেক্ষা করেই চলতে শুরু করল। সদ্যভাইকে হারানো হিড়িম্বা একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তার মনের মানুষের চলে যাওয়া দেখতে থাকল। কিন্তু যাকে ভাইয়ের জীবনের বিনিময়ে চেয়েছে, তার চলে যাওয়া কি করে মেনে নেবে! তাই সেও চলতে শুরু করল। পাণ্ডবদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখেই সে তার পিছন পিছন চলতে লাগল।

এমনসময় প্রথম কথা বলল ভীমই। সে বলল হিড়িম্ব-এর মত তার বোনকেও মেরে ফেলা উচিত। তার কথাতে সবাই ঘুরে দেখল হিড়িম্বা তাদের পিছনেই আসছে। ভীম তার দিকে এগোতে গেলেই বাধা দিল যুধিষ্ঠির। তখন হিড়িম্বা এগিয়ে এসে কুন্তীকে প্রণাম করে আবার ভীমকে প্রার্থনা করল । সে বলল ভীমের জন্য সে আপনজনকে ত্যাগ করেছে। এখন যদি ভীমকেও না পায়, তাহলে তো তার ধর্ম মিথ্যে। সে আরো বলল, ” মা আপনার পুত্রকে আমার সাথে মিলিত হতে দিন। বিশ্বাস করুন মা, আমি ওকে নিয়ে যতই ঘুরি না কেন, আপনি স্মরণ করলেই আমি ওকে আপনাদের কাছে ফেরত দিয়ে যাব। “

যুধিষ্ঠির তখন নিয়ম করে দিলেন যে ভীম স্নান আহ্নিক করে তার সাথে যাবে, মিলিত হবে কিন্তু সন্ধ্যার আগেই যেন হিড়িম্বা তার ভাইকে তাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়। ভীম তাকে জানাল সে ততদিনই হিড়িম্বার সাথে থাকবে যতদিন না তার কোনো সন্তান হয়।

এরপরে হিড়িম্বা ভীম কে নিয়ে সুখে দিন কাটাতে লাগল। তাকে নিয়ে অনেক জায়গায় ঘুরত এবং ঠিক সময়মত আবার কুন্তীদের কাছে ফিরিয়ে দিত। এইভাবে একদিন তাদের এক বলশালী সন্তান হল, ঘটোৎকচ। ভীমের থেকে এমন সন্তান পেয়ে হিড়িম্বা তো মহাখুশি। কুন্তীও তার বংশের প্রথম সন্তানকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করল। এরপর হিড়িম্বার তার ভালোবাসার মানুষের থেকে আলাদা হওয়ার পালা। সে তার কথা রাখল। বিদায় দিল ভীমকে। পুত্রকে নিয়ে লালন পালন করতে লাগল।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


 
  1. “মহাভারত সারানুবাদ”, দেবালয় লাইব্রেরী(প্রকাশক সৌরভ দে, তৃতীয় প্রকাশ) – রাজশেখর বসু, আদিপর্ব (২৭। হিড়িম্বা ও হিড়িম্বা –  ঘটোৎকচের জন্ম) পৃষ্ঠাঃ ৬১- ৬৩
  2. “মহাভারতের অষ্টাদশী”, আনন্দ পাবলিশার্স, চতুর্থ মুদ্রণ – নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী, অধ্যায়ঃ হিড়িম্বা পৃষ্ঠাঃ ৩৭১-৪০৫
  3. “মহাভারতের একশোটি দুর্লভ মুহূর্ত”, আনন্দ পাবলিশার্স, পঞ্চম মুদ্রণ – ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য, অধ্যায়-১৭ ভীম ও হিড়িম্বার বিবাহ , পৃষ্ঠাঃ ৮৭-৯৩
  4. speakingtree.in/was-hidimba-the-real-queen-of-mahabharata

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading