সববাংলায়

হীরালাল চৌধুরী

সাহিত্য-সংস্কৃতি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিশ্ব তথা ভারতে বাঙালির অবদান অত্যন্ত সদর্থক এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে বিভিন্ন সময়ে। মাৎস্যবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এরকমই একটি সদা উজ্জ্বল এবং চিরস্মরণীয় নাম বিজ্ঞানী হীরালাল চৌধুরী (Hiralal Chaudhuri)। তাঁকে ভারতীয় নীল বিপ্লবের জনক (Father of Blue Revolution in India) বলা হয়।

১৯২১ সালের ২১ নভেম্বর তৎকালীন আসামের শ্রীহট্টে (অধুনা বাংলাদেশের সিলেট) হীরালাল চৌধুরীর জন্ম হয়। তাঁর বাবা গিরিশ চন্দ্র চৌধুরী ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এবং আসাম সরকারের একজন আমলা। তাঁর মা সরসীবালা চৌধুরী একজন গৃহবধু হলেও অত্যন্ত মেধাবী মহিলা ছিলেন।

ছোটবেলা থেকেই হীরালাল চৌধুরী ভীষণ মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা হয়েছিল শিলংয়ের লবণ বেঙ্গলি প্রাইমারী স্কুল থেকে। ১৯৩৬ সালে গোমস্‌ স্কুল থেকে চারটি বিষয়ে লেটার নিয়ে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করেন। তিনি ১৯৪১ সালে কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে সাম্মানিকসহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীকালে ১৯৪৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ থেকে প্রাণীবিদ্যা বিষয়ে স্নাতকোত্তর স্তরের পড়াশোনা সম্পূর্ণ করেন।

এক নজরে হীরালাল চৌধুরীর জীবনী:

  • জন্ম: ২১ নভেম্বর, ১৯২১
  • মৃত্যু: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৪
  • কেন বিখ্যাত: মাৎস্যবিজ্ঞানী হীরালাল চৌধুরী ভারতে নীল বিপ্লবের জনক নামে পরিচিত। তিনি পোনা মাছের প্রণোদিত প্রজননের আবিষ্কর্তা। কৃত্রিমভাবে উন্নত প্রজাতির মাছের বীজ তৈরির পদ্ধতি আবিষ্কারের ফলে মৎস্য চাষে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়।
  • স্বীকৃতি: হীরালাল চৌধুরীর সাফল্যের দিনটি স্মরণ করে ১০ জুলাই জাতীয় মৎস্য চাষী দিবস পালন করা হয়। জাপানের প্রখ্যাত মীনবিদ্যাবিশারদ ড. কিউরোনিউমা তাঁকে ফাদার অফ্‌ ইনডিউস্‌ড ব্রিডিং উপাধিতে ভূষিত করেন। উল্লেখযোগ্য পুরস্কার – গামা-সিগমা-ডেলটা অ্যাওয়ার্ড এবং গোল্ডেন কী অ্যাওয়ার্ড, প্রাণীবিজ্ঞানে অবদানের জন্য ইন্ডিয়ান ন্যাশ্‌নাল সায়েন্স অ্যাকাডেমি থেকে চন্দ্রকলা হোড়া স্বর্ণ পদক, রফি আহ্‌মেদ কিদওয়াই পুরস্কার, ওয়ার্ল্ড অ্যাকোয়াকালচার অ্যাওয়ার্ড ইত্যাদি।

পরবর্তীকালে মানিকচাঁদ সরকারী কলেজে লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৪৮ সালের ১ জুন তারিখে ব্যারাকপুরের সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিশারিজ় রিসার্চ ইনস্টিটিউটে (Central Inland Fisheries Research Institute, CIFRI) জুনিয়র রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগদান করেছিলেন।

একদিন তিনি যখন গঙ্গার ধার দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন বয়ে চলা জলের মধ্যে একটি মাছকে দেখতে পান এবং তিনি সেটিকে ধরেন। মাছটির পেটে চাপ দিতে স্বচ্ছ ডিম বেরিয়ে আসে এবং তিনি একটি পাত্রের মধ্যে সেইগুলিকে রাখেন। সেইখান থেকেই তাঁর মাছেদের প্রজননের (breeding) চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছিল। সাধারণত, পুকুরের যেসব মাছ হয়, তাদের প্রজনন ক্ষমতা কম হয়, সেটা পরিবেশগত কারণ অথবা হরমোনের কারণে হতে পারে। এক্ষেত্রে মূল বিচার্য বিষয়গুলি হতে পারে বৃষ্টিপাত, জলের গুণমান, তাপমাত্রা ইত্যাদি।

মাছেদের প্রজনন সম্পর্কিত সমস্যা সমাধান করার জন্য ১৯৩৭ সালে হামিদ খান প্রথম প্রণোদিত প্রজনন বা ইনডিউস্‌ড ব্রিডিং (induced breeding) -এর চেষ্টা করেন সিরিনাস মৃগল (cirrhinus mrigala) প্রজাতির মাছের উপর, কিন্তু এই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ১৯৪৮ সালে ড. হীরালাল চৌধুরী ঠিক করেছিলেন, ভারতবর্ষের কার্প প্রজাতির মাছের উপর এই ইনডিউস্‌ড ব্রিডিং প্রয়োগ করবেন, যা এর আগে পৃথিবীর কোথাও ঘটেনি। ১৯৪৯ সালে এক বছরের মধ্যে তিনি বদলি হয়ে চলে যান সেন্ট্রাল ইনল্যান্ড ফিশারিজ় রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ওড়িশার কটক শাখায়। তিনি সেখানেও প্রজননের উপর তাঁর গবেষণা চালিয়ে যেতে থাকেন।

হীরালাল চৌধুরী তাঁর গবেষণার প্রাথমিক স্তরে, ছোট গোবি (Gobioptures chuno) প্রজাতির মাছের উপর প্রজনন গবেষণায় সফল হন। তাঁর এই সাফল্য মাছের প্রজননের উপর তাঁর গবেষণার আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত জুনিয়র রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করার পরে ১৯৫০ সালে সিনিয়র রিসার্চ অ্যসিস্ট্যান্ট হিসেবে তাঁর পদোন্নতি হয়। এর পরের সময়কালে, তিনি অপর এক বিজ্ঞানী কে. এইচ. আলিকুনহির (K. H. Alikunhi) তত্ত্বাবধানে কাজ করেছিলেন। প্রসঙ্গতঃ জেনে রাখা ভাল, এই কে. এইচ. আলিকুনহির হীরালাল চৌধুরীকে শুধু মৎসবিজ্ঞানের বিষয়ে গবেষণা করতেই অনুপ্রেরণা দেননি, তাঁকে ১৯৫৪ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে, অওবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে (Auburn University) প্রখ্যাত মাৎস্যবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ এইচ. এস. সুইঙ্গলের (H. S. Swingle) অধীনে বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্যও পাঠিয়েছিলেন। এই প্রশিক্ষণ সফলভাবে শেষ হওয়ার পর ১৯৫৫ সালে তিনি এম এস ডিগ্রি (Master of Science or MS) অর্জন করেন। একই সময়ে হীরালাল চৌধুরী অওবার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুকুরের মাছের উপর একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন।

ভারতে ফিরে আসার পরে, ১৯৫৫ এবং ১৯৫৬ সালে কিছু বিশেষ ধরনের মাছের (Esomus danricus, Pseudeutropis atherinoides) প্রজনন করাতে সফল হন। পরবর্তীকালে, তিনি ওড়িশাতে ইনডিউস্‌ড ব্রিডিংয়ের মাধ্যমে বীজ উৎপাদন প্রযুক্তির উপর একটি বড় প্রকল্প হাতে নেন। ১৯৫৭ সালের ১০ জুলাই তারিখে এই প্রকল্পে সফল হওয়ায় ভারতে অ্যাকোয়াকালচারের (Aquaculture) ক্ষেত্রে নতুন জোয়ার আসে।

ড. হীরালাল চৌধুরীর ভারতীয় প্রধান কার্প প্রজাতির মাছ যেমন রুই, কাতলা ইত্যাদির উপর সফলভাবে ইনডিউস্‌ড ব্রিডিং পদ্ধতি আবিষ্কারের পরে ভারতবর্ষে নীল বিপ্লবের (Blue Revolution) সূচনা হয়। এই কারণে তাঁকে নীল বিপ্লবের জনকও (Father of Blue Revolution) বলা হয়ে থাকে। ১০ জুলাই তারিখটি ভারতে পোনা মাছ চাষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং তাঁদের এই কৃতিত্বকে মনে রেখে ২০০১ সাল থেকে ১০ জুলাই ভারতে “জাতীয় মৎস্য চাষী দিবস” হিসেবে পালন করা হয়।

১৯৫৯ সালে ড. হীরালাল চৌধুরীর ফিশারি এক্সটেনসান অফিসার (Fishery Extension Officer) পদে পদোন্নতি হয়। ১৯৬১ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর পিএইচ. ডি. ডিগ্রি অর্জন করেন। পিএইচ. ডি.-তে তাঁর গবেষণা পত্রের বিষয় ছিল মাছেদের প্রজননের উপর পিটুইটারি ইঞ্জেকশানের প্রভাব (Effect of Pituitary Injection on Fish Breeding)। ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত ফিশ ব্রিডিং ইনচার্জ ছিলেন। তারপরে ১৯৬৪ সালে অফিসার-ইন-চার্জ হন।

১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সময়কালে উচ্চমানের মৎস্য বীজ তৈরির ক্ষেত্রে গবেষণার কাজে গতি আসে এবং তা আগের থেকে আরও দ্রুত গতিতে এগোতে থাকে, এই সাফল্যের পিছনে বিজ্ঞানী হীরালাল চৌধুরীর অবদান কখনওই অস্বীকার করা যায় না, কারণ তাঁর সুদক্ষ তত্ত্বাবধানের ফলেই এই সাফল্য এসেছিল।

১৯৭১ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত হীরালাল চৌধুরী ভুবনেশ্বরের ফিশ কালচার ডিভিসনে কাজ করেছিলেন বর্তমানে যা সেন্ট্রাল ইন্সটিটিউট অফ ফ্রেশ ওয়াটার অ্যাকোয়াকালচার নামে পরিচিত।

১৯৭৬ সালে ড. হীরালাল চৌধুরী স্বেচ্ছাবসর নেন এবং ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন্‌ অফ ইউনাইটেড নেশন্‌সে যোগদান করেন। শুরুর দিকে তিনি সাউথ ইস্ট এশিয়ান ফিশারিজ ডেভ্‌লপমেন্ট সেন্টারের অ্যাকোয়াকালচার ডিপার্টমেন্টে রিজিওনাল অ্যাকোয়াকালচার কোঅর্ডিনেটর হিসেবে যোগদান করেছিলেন এবং পরে তিনি সেখানে ডেপুটি ডিরেক্টর হন। তিনি দীর্ঘ ৯ বছর এই প্রতিষ্ঠানটির জন্য কাজ করেছিলেন এবং ১৯৮৪ সালে সেখান থেকে অবসর নেন। কিন্তু ১৯৮৫ সালে ড. হীরালাল চৌধুরীকে পুনরায় তাঁর কাজের দক্ষতার কারণে সাউথ ইস্ট এশিয়ান ফিশারিজ ডেভ্‌লপমেন্ট সেন্টারের তরফ থেকে আমন্ত্রণ জানান হয় এবং তিনি সেখানে সিনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাড্‌ভাইসর হিসেবে কাজে যোগদান করেন। পরবর্তী চার বছর তিনি এই কাজ করেছিলেন।

১৯৮৮ সালে ড. হীরালাল চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অফ ফিলিপিন্সে ভিজি়টিং সায়েন্টিস্ট হিসেবে যোগ দেন এবং তিনি সেখানে ইনস্টিটিউট অফ বায়োলজিকাল সায়েন্স গড়ে তুলেছিলেন। ১৯৯৩ সালে তিনি সেখান থেকে অবসর নেন।

১৯৭৫ সালে ভ্যানকোভারে (Vancouver) আয়োজিত পেসিফিক সায়েন্স কংগ্রেসে (Pacific Science Congress) জাপানের প্রখ্যাত মীনবিদ্যাবিশারদ (Ichthyologist) ড. কিউরোনিউমা (Dr. Kuronuma) তাঁকে ফাদার অফ্‌ ইনডিউস্‌ড ব্রিডিং উপাধিতে ভূষিত করেন।

এছাড়াও ড. হীরালাল চৌধুরী তাঁর সমগ্র উজ্জ্বল কর্মজীবনে অসংখ্য সম্মান এবং পুরস্কার লাভ করেছিলেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: অওবার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গামা-সিগমা-ডেলটা অ্যাওয়ার্ড এবং গোল্ডেন কী অ্যাওয়ার্ড, প্রাণীবিজ্ঞানে অবদানের জন্য ইন্ডিয়ান ন্যাশ্‌নাল সায়েন্স অ্যাকাডেমি থেকে চন্দ্রকলা হোড়া স্বর্ণ পদক, রফি আহ্‌মেদ কিদওয়াই পুরস্কার, ১৯৯৪ সালে ওয়ার্ল্ড অ্যাকোয়াকালচার অ্যাওয়ার্ড ইত্যাদি।

পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, মুম্বাইয়ের সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অফ ফিশারিজ এডুকেশনের মত বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি থেকে সাম্মানিক ডিএসসি উপাধি পেয়েছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে চেয়ার ইন ফিশারিজ় সম্মান দিয়েছিল।

পেশাগত জীবনের বাইরে ড. হীরালাল চৌধুরী ব্যক্তিজীবনে খুবই নরম হৃদয়ের, দয়ালু ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ছাত্রমহলে তিনি দরদী শিক্ষক হিসেবে জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি সুরেলা অথচ ব্যক্তিত্বপূর্ণ কন্ঠের অধিকারী এবং একজন ভাল গায়কও ছিলেন। ২০১৪ সালে ১২ সেপ্টেম্বর কলকাতার সল্টলেকে ড. হীরালাল চৌধুরীর মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading