সববাংলায়

পদবীর উৎস (বর্ণানুক্রমিক চ – ঝ বর্ণ)

চট্ট/চাটুজ্যে/চ্যাটার্জি/চট্টোপাধ্যায় – স্থানভিত্তিক পদবী। এসেছে গাঞি নাম অনুসারে। আদি পদবী ছিল চাটুতি, বর্ধমান জেলার চাট্তি গ্রামের নাম অনুসারে। আচার, বিদ্যা, বিনয়, প্রতিষ্ঠা, তীর্থদর্শন, নিষ্ঠা, আবৃতি, তপঃ ও দান – এই নয়টি গুণের অধিকারী ব্রাহ্মণদের মূল উপাধি ‘উপাধ্যায়’ এর সাথে গাঞি নাম যুক্ত হয়ে চট্টোপাধ্যায় হয়েছে। চাটুজ্যে, চাটুয্যা, চ্যাটার্জি ইত্যাদি চট্টোপাধ্যায়েরই অপভ্রংশ বলে মনে করা হয়। কেউ কেউ মনে করেন যে চট্ট বা চাটুতির সাথে ওঝা (উপাধ্যায় থেকে ওঝা) জুড়ে চাটুওঝা -> চাটুয্যা হয়েছে। সেখান থেকেই চাটুজ্যে বা চ্যাটার্জি। আবার অনেকে মনে করেন যে ইংরেজদের ভ্রান্ত উচ্চারণের দরুণ এই ধরণের বিকৃতি ঘটেছে। 

চন্দ/চন্দ্র – মূলত কায়স্থ পদবী। গুপ্ত যুগের আগেই পশ্চিম ভারত থেকে বাংলায় কায়স্থরা এসেছিল। তাঁরা তাঁদের অধিপতি ও ধর্মাচার্য্যের উপাধি অনুকরণে, নিজেদের উপাস্য দেবতাদের নামে এবং নিজেদের পারদর্শিতা বা বীর্যবত্তা অনুসারে বিভিন্ন উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন যেগুলো পরে পদবীতে রূপান্তরিত হয়েছে। ‘চন্দ্র’ এসেছে উপাস্য দেবতার নাম অনুসারে। এই পদবীর উৎপত্তির পিছনে অন্য একটি কারণ ব্যাখ্যা করেছেন ড. নীহাররঞ্জন রায় তাঁর ‘বাঙালির ইতিহাস’ বইয়ে। সেই মত অনুসারে, ব্রাহ্মণ্যধর্মের অবক্ষয়ের যুগে, বহু মানুষ বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হযে ধর্মান্তরিত হলে তখন তাঁদের নতুন নামকরণ হয়। পরবর্তী সময়ে ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনরুজ্জীবনের সাথে সাথে ধর্মান্তরিত মানুষের একটা বড় অংশ আবার ফিরে আসে ব্রাহ্মণ্যধর্মের আশ্রয়ে। তারপর থেকে ধীরে ধীরে তাঁদের বৌদ্ধ বা জৈন নামের শেষাংশ পদবী হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। এভাবেই দত্ত, পাল, মিত্র, নন্দী, চন্দ, চন্দ্র ইত্যাদি পদবীর উৎপত্তি।

চক্রবর্ত্তী – প্রাপ্ত পদবী, এসেছে সম্ভবত রাজাদের থেকে। সার্বভৌম নৃপতিকে চক্রবর্ত্তী বলার চল ছিল। আবার বিশাল এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠা রাজ্য বা দেশসমূহকেও চক্রবর্ত্তী বলা হত। এই সব অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষজনের উপাধিও চক্রবর্ত্তী হয়ে থাকতে পারে বলে একাংশের অনুমান। এটি মূলত ব্রাহ্মণদের পদবী। 

চতুর্বেদী/চৌবে  – এই পদবী আসলে ডিগ্রীর সমতুল্য। এখন যেমন, বি.এ., এম. এ. ইত্যাদি লেখা হয়, সেই সময় পণ্ডিত, দ্বিবেদী, ত্রিবেদী, চতুর্বেদী ইত্যাদির চল ছিল। চার বেদ অর্থাৎ ঋক, শাম, যজুঃ, অথর্ব বেদে যাঁরা পারঙ্গম ছিলেন তাঁদের বলা হত চতুর্বেদী। এই উপাধি পরবর্তীকালে পদবীতে পরিণত হয়। উত্তর পুরুষেরা বেদ পাঠ করুক বা না করুক, পদবীটি রয়ে যায়। আর্যাবর্ত থেকে পূর্ব ভারতের পথে পদবীগুলোর খানিকটা দেশজ রূপ দেখা যায়। সেই সূত্রেই চতুর্বেদী পরিণত হয়েছে চৌবে-তে।

চাকী/চাকি  – সম্ভবত চক্রী থেকে এসেছে এই পদবী।

চাপরাশি – পেশাগত পদবী। চাপরাশ থেকে এসেছে চাপরাশি। আভিধানিক অর্থ ভৃত্য বা পেয়াদা। মুঘলদের থেকে ইংরেজ আমল হয়ে পদবীটি বাংলায় এসেছে বলে অনুমান। ইংরেজ আমলে যাঁরা পিওন পদে চাকরি করতেন তাঁদের চাপরাশি বলা হত। সেখান থেকেই এটি ক্রমে পদবীতে পরিণত হয়েছে।

চাকলাদার – চাকলা ছিল কয়েকটি পরগণার সমাবেশ। শাহ্জাহানের সময় সাম্রাজ্য চাকলায় বিভক্ত হয়। এইসব চাকলা দেখাশোনার জন্য নিয়োজিত কর্মচারীকে চাকলাদার বলা হতো। সেখান থেকেই এই পদবীর উৎপত্তি বলে মনে করা হয়।

চোঙ্গাদার/চোঙাদার/চোঙদার/চোংদার – পেশাগত পদবী। সরকারী দলিল বা গুরুত্বপূর্ণ নথি একজায়গা থেকে অন্যত্র পাঠানোর জন্য একধরণের ‘রোল’ বা চোঙের ব্যবহার করা হত সুরক্ষার জন্য। যিনি এই চোঙ বা চোঙ্গা সরবরাহ করতেন নবাব সরকার তাঁকে চোঙ্গাদার বা চোঙদার বলতেন। সেখান থেকেই এই পদবীটি এসেছে বলে মনে করা হয়। অন্য এক মত অনুসারে, সেনাদলের অধিপতিদেরও চোঙদার বলার চল ছিল, পরে তা পদবীতে পরিণত হয়েছে।

চৌধুরী – এই পদবীর উৎপত্তি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কারও মতে সংস্কৃত চতুর্ধরিন্ থেকে চৌধুরী এসেছে; আবার অন্য মতে চতুর্ধুরী বা চারধুরি (অর্থাৎ নৌ, হস্তী, অশ্ব ও গজ এই চার বলের অধিকারী) থেকে চৌধুরী এসেছে। এ প্রসঙ্গে আর একটি মতের উল্লেখ প্রয়োজনীয়। মনে করা হয়, ‘চৌথ হারী’ থেকে চৌধুরী এসেছে। চৌথ বা রাজস্ব আদায়কারী (মতান্তরে হরণকারী) দের চৌথ হারী বলা হত। এই চৌথ বা এক চতুর্থাংশ কর আদায়ের রীতি এক প্রাচীন রীতি। মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার আগে রাজা বা সম্রাট ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৌদ্ধ, জৈন শ্রমণদের জমি দান করতেন, যাকে বলা হত অগ্রহার ভূমি দান। এই ভূমি দান যাঁদের করা হত সেই অগ্রহারিকদের অধিকার ছিল সেই জমিতে উৎপন্ন শস্য থেকে কর আদায় করার। অগ্রহারিকদের দায়িত্ব ছিল সেই অর্থ থেকে মন্দির/বিহার/স্তূপ নির্মাণের, শান্তিরক্ষা ও শিক্ষাকেন্দ্র পরিচালনা করার। পরের দিকে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা কমে গেলে এই কাজ চৌথ আদায়কারী পদে পরিণত হয়। চৌথহারী থেকে হিন্দি চৌধরী ও বাংলা চৌধুরী পদবীর উদ্ভব বলে অনুমান।

চৌকিদার – পেশাগত পদবী। চৌকি শব্দের একটা অর্থ খাজনা বা কর আদায়ের ঘাঁটি। যদিও চৌকিদার বলতে পাহারাদার বোঝায়, কোনও এক সময়ে কর বা রাজস্ব আদায়ের সাথে এর একটা সম্পর্ক থেকে থাকতে পারে। 

ছত্রধারক/ছত্রধরা – উত্তরবঙ্গের পদবী, উৎপত্তি কুচবিহার রাজসভায়। রাজদরবারে যাঁরা রাজার মাথায় ছাতা ধরার কাজ করতেন তাঁদের ছত্রধারা বা ছত্রধারক উপাধি দেওয়া হতো। সেখান থেকেই এই পদবীর উৎপত্তি বলে মনে করা হয়।

জানা – এই পদবীর উৎপত্তি নিয়ে কয়েকটি মত প্রচলিত আছে। একটি মত অনুযায়ী ‘জন’ ( কুড়িটি গ্রামের সমাহারকে জন বা বিশ বলা হয়) এর অধিপতি বা জনপতি থেকে জানা পদবীটি এসেছে। কেউ কেউ মনে করেন যে জনৌ বা উপবীত বা জৈন শব্দের সাথে জানা-এর যোগাযোগ রয়েছে। আবার আর একটি মত অনুযায়ী ফার্সি শব্দ ‘জহান’ (অর্থ জগৎ) এর সংক্ষিপ্ত রূপ জান, তারই আঞ্চলিক রূপান্তর জানা।

জোতদার/জোদ্দার – স্বত্বযুক্ত জমির অধিকারীকেই জোতদার বলে। জোত শব্দের অর্থ জমি। মূলত কর্ষণযুক্ত জমি বা ভূসম্পত্তিকে জোত বলা হয়। জমিদারের অধীনস্থ জোতের মালিককে জোতদার বলা হত। সেখান থেকেই এই পদবীর উৎপত্তি বলে অনুমান।

জোয়ারদার – জোয়ার বা গম জাতীয় শস্যবিশেষের ব্যবসায়ীকে জোয়ারদার বলা হয়। এই পদবীর উৎপত্তি সেখান থেকেই বলে মনে করা হয়। অন্য একটি মতে, জোয়ারদার ছিল গ্রাম্য মণ্ডলের উপাধি। পরে সেটাই পদবীতে রূপান্তরিত হয়েছে।

ঝা – ঝা বাঙালির নিজস্ব পদবী নয়, এসেছে মূলত বিহার/উত্তরপ্রদেশ থেকে। উপাধ্যায়>ওঝা>ঝা  – এইভাবে রূপান্তর ঘটেছে বলে অনুমান।

পদবীর উৎস

পদবীর উৎস (বর্ণানুক্রমিক খ – ঘ বর্ণ) পদবীর উৎস (বর্ণানুক্রমিক ট – ণ বর্ণ)

সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1.  বঙ্গীয় শব্দকোষ – হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়
  2. আমাদের পদবীর ইতিহাস – লোকেশ্বর বসু
  3. পদবীর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস – শ্রীখগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
  4. বাংলার পদবি কথা – দেবাশিস ভৌমিক

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading