ইতিহাস

নীহাররঞ্জন রায়

নীহাররঞ্জন রায় (Niharranjan Ray) একজন খ্যাতনামা ভারতীয় বাঙালি ইতিহাসবিদ তথা সাহিত্য সমালোচক ও শিল্পকলা গবেষক যিনি ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস : আদি পর্ব’ গ্রন্থটি রচনার জন্য ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন।

১৯০৩ সালের ১৪ জানুয়ারি ময়মনসিংহের কায়েতগ্রাম নামক গ্রামে নীহাররঞ্জন রায়ের জন্ম হয়৷ তাঁর বাবা মহেন্দ্রচন্দ্র রায় পেশায় ছিলেন স্থানীয় ন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষক। নীহাররঞ্জনের স্ত্রীর নাম মণিকা রায়। 

নীহাররঞ্জন রায়ের পড়াশোনা প্রথমে ময়মনসিংহে অবস্থিত মৃত্যুঞ্জয় স্কুল এবং তারপরে আনন্দমোহন কলেজ থেকে সম্পন্ন হয়৷ ১৯২৬ সালে সিলেটের মুরারী চাঁদ কলেজ থেকে তিনি ইতিহাস নিয়ে বি.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন৷ এরপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে এম.এ.পরীক্ষায় রেকর্ড নম্বর সহ প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। ওই একই বছর ‘Political History Of Northen India AD600-900’ নিবন্ধের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃণালিনী স্বর্ণপদক পুরস্কার পান তিনি৷ ১৯২৮ সালে তিনি প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি লাভ করেন। এরপর ঊচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি ইউরোপ যান এবং হল্যান্ডের লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি ও লন্ডন ইউনিভারসিটি কলেজ থেকে গ্রন্থাগার পরিচালনা বিষয়ে ডিপ্লোমা লাভ করেন৷ 

নীহাররঞ্জন রায়ের কর্মজীবন শুরু হয় প্রাচীন ভারতে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে। ১৯৩৭ সালে তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গ্রন্থাগারিক হিসেবে নিযুক্ত হন। এরপর ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের রানী বাগেশ্বরী অধ্যাপক পদে যুক্ত হন। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৫ সালে তিনি সিমলা ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাডভান্সড স্টাডির প্রথম পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন। এরপর তিনি ১৯৭০ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত  তৃতীয় পে কমিশনের সদস্য ছিলেন। ১৯৭৩-৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি ইউনেস্কোর প্রতিনিধি হিসেবে ব্রহ্মদেশ (অধুনা মায়ানমার) সরকারের সংস্কৃতি ও ইতিহাস-বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন।

ছাত্রাবস্থা থেকেই নীহাররঞ্জন প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। অনুশীলন সমিতির প্রতি নীহাররঞ্জন বেশ আকৃষ্ট হয়েছিলেন। এছাড়াও অসহযোগ আন্দোলন-এ অংশ নিয়েছিলেন তিনি সুভাষচন্দ্র বসু প্রতিষ্ঠিত লিবার্টি পত্রিকার সাহিত্য বিভাগও পরিচালনা করেছেন নীহাররঞ্জন। ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি ফলস্বরূপ ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত তাঁকে কারাবরণও করতে হয়। ১৯৫৩ সালের নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের লখনৌ অধিবেশনে এবং ১৯৮০ সালের জামশেদপুর অধিবেশনে নীহাররঞ্জন মূল সভাপতি হিসেবে যোগদান করেছিলেন। ১৯৮০ সালে শান্তিনিকেতনে অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া ওরিয়েন্টাল কনফারেন্সে তিনি সভাপতিত্ব করেন৷

নীহাররঞ্জন রায় সম্পাদিত বইগুলির মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য হল ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস : আদি পর্ব’ (১৯৪১)। এই বইটির পরিচয় পত্রে নীহাররঞ্জন লিখেছেন,”আমি কেন নতুন শিলালিপি বা তাম্রপট্টের সন্ধান পাই নাই, কোন নূতন উপাদান আবিষ্কার করি নাই৷…  যে সমস্ত তথ্য ও উপাদান পণ্ডিত হইলে অল্পবিস্তর পরিচিত ও আলোচিত, প্রায় তাহা হইতেই আমি সমস্ত তথ্য উপকরণ আহরন করিয়াছি৷” তাঁর মনীষার সমৃদ্ধি এই বইয়ের পাতায় পাতায় ধরা পরে তবুও তাঁর বিনয়ী মনোভাব এখানে পরিস্ফুট হয়েছে৷ কেবল ইতিহাস নয় ভাষা ও সাহিত্যের দিক থেকেও এই বইটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাঙালী জীবনের গভীর ও মৌলিক চরিত্রটি নীহাররঞ্জন অসাধারণ দক্ষতায় তথ্য ও যুক্তির সাহায্যে ফুটিয়ে তুলেছেন৷ নীহাররঞ্জনের অন্যান্য গ্রন্থগুলি হল, ‘রবীন্দ্র-সাহিত্যের ভূমিকা’ (১৯৪১), ‘কৃষ্টি কালচার সংস্কৃতি’ (১৯৭৯), ‘বাংলার নদ-নদী’, ‘বাঙালী হিন্দুর বর্ণভেদ’ (১৩৫৪), ‘প্রাচীন বাংলার দৈনন্দিন জীবন’, ব্রাহ্মনিকাল গডস্ ইন বার্মা (১৯৩২), সাংস্কৃত বুদ্ধিজম ইন বার্মা, মৌর্য অ্যন্ড শুঙ্গ আর্ট (১৯৪৭) প্রভৃতি। 

সারাজীবনের কর্মের জন্য নীহাররঞ্জনের প্রাপ্তিও কম ছিল না৷ ১৯৩০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মোয়াট স্বর্ণপদক লাভ করেন তিনি৷ ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস:আদি পর্ব’ গ্রন্থটির জন্য তিনি ১৯৫০ সালে রবীন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন৷ ১৯৬৯ সালে তিনি পেয়েছেন পদ্মভূষণ পুরস্কার। ১৯৭০ সালে কলকাতা এশিয়াটিক সোসাইটির বিমলাচরণ লাহা স্বর্ণপদক এবং ১৯৮০ সালে কলকাতার প্রফুল্লকুমার সরকার (আনন্দ) পুরস্কার লাভ করেন।  

প্রফেসর হেমচন্দ্র রায় চৌধুরী, প্রফেসর বেণীমাধব বড়ুয়া এবং প্রফেসর স্টেলা ক্রামরিশ- শিক্ষক হিসেবে এই তিন অধ্যাপকের প্রভাব তাঁর জীবনে অপরিসীম সেকথা নীহাররঞ্জন নিজেই স্বীকার করে গেছেন।

১৯৮১ সালের ৩০ আগস্ট নীহাররঞ্জন রায়ের মৃত্যু হয়৷ 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে শিক্ষিত ব্যক্তি


শ্রীকান্ত জিচকর
শ্রীকান্ত জিচকর

এনার সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন