ইতিহাস

মজরু সুলতানপুরী

ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম জনপ্রিয় গীতিকার এবং বিখ্যাত উর্দু কবি মজরু সুলতানপুরী (Majrooh Sultanpuri)। বহু হিন্দি চলচ্চিত্রের গান লিখেছেন তিনি। বম্বে ফিল্ম ইণ্ডাস্ট্রিতে শচীন দেব বর্মণের সুরে আর তাঁর কথায় কিশোরকুমারের কণ্ঠে বহু গান বহু ছবিকে বিখ্যাত করে তুলেছে। ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে একইসঙ্গে তিনি হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন এবং প্রগতিশীল লেখক-শিল্পী আন্দোলনের এক অন্যতম মুখপাত্র ছিলেন। বিংশ শতাব্দীর উর্দু সাহিত্যে মজরু সুলতানপুরী একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ আঁভা-গার্দ সাহিত্যিক হিসেবেই বোদ্ধামহলে পরিচিত। ১৯৫৫ সালে ‘দোস্তি’ ছবিতে ‘চাহুঙ্গা ম্যায় তুঝে’ গানটির কথা লিখে ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ গীতিকার পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। সারাজীবনের অসংখ্য কৃতিত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ ভারত সরকার তাঁকে ১৯৯৩ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত করে। আনন্দ-মিলিন্দ, যতীন-ললিত প্রমুখ বহু মানুষের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। ১৯৪৯ সালে মিল ইউনিয়ন ওয়ার্কাস মিটিং-এ একটি কবিতা আবৃত্তি করার সুবাদে দুই বছর কারাবাসও করতে হয়েছে মজরু সুলতানপুরীকে।

১৯১৯ সালের ১ অক্টোবর উত্তরপ্রদেশের সুলতানপুরে একটি রাজপুত মুসলিম পরিবারে মজরু সুলতানপুরীর জন্ম হয়। তাঁর আসল নাম আসরার উল হাসান খান। তাঁর বাবা পুলিশ বিভাগে কর্মরত থাকায় মাঝে মাঝেই তাঁর বদলি হতো। তাঁর জন্মের সময় উত্তরপ্রদেশেই তার বদলি হওয়ায় উত্তরপ্রদেশেই মজরু সুলতানপুরীর জন্ম হয়।

তাঁর বাবা কখনোই ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণকে পছন্দ করতেন না। তাই মজরু সুলতানপুরীকে প্রথাগত মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করে দেওয়া হয়। সেখানেই সাত বছর ধরে বিভিন্ন ধর্মীয় পাঠ নিয়ে এবং আরবি ও ফার্সি ভাষা ভালোভাবে রপ্ত করে মজরু সুলতানপুরী ‘দর্স-ই-নিজামি’ কোর্স শেষ করেন এবং ‘আলিম’ উপাধি পান। তারপর তিনি লক্ষ্ণৌয়ের তক্‌মিল-উৎ-তিব কলেজে গ্রিক ঔষধশাস্ত্র ও চিকিৎসাপদ্ধতি বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। হাকিম হয়ে প্রবল সংগ্রাম করতে হয়েছে তাঁকে। সেই সময়ই সুলতানপুরে একটি মুশায়েরায় গজল আবৃত্তি করেন মজরু সুলতানপুরী ওরফে আসসার-উল-হাসান খান। আর সেই গজল আবৃত্তি এতই জনপ্রিয় হয়ে উঠলো যে তিনি ডাক্তারি পড়া ছেড়ে স্বতন্ত্রভাবে কবিতা লিখতে শুরু করেন এবং সেই কাজেই মনোনিবেশ করেন। ফলে ঐ মুশায়েরায় তিনি নিয়মিত যাতায়াত শুরু করেন এবং সেখানে নিয়তই কবিতা, গজল পড়তে থাকেন। তৎকালীন শ্রেষ্ঠ মুশায়েরা জিগর মোরাদাবাদীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন তিনি। পরবর্তীকালে তিনি চলচ্চিত্রের গান লেখার জন্য জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও উর্দু ভাষায় তাঁর লেখা বেশ কিছু শায়েরী, কিছু গজল আজও মানুষের স্মৃতিতে অক্ষয় হয়ে আছে।

১৯৪৫ সালে মজরু সুলতানপুরী বম্বেতে আসেন এবং শাবু সিদ্দিকী ইনস্টিটিউটে একটি মুশায়েরায় যোগ দেন তিনি। এখানে তাঁর পাঠ করা স্বরচিত গজল এবং কবিতাগুলি দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই মুগ্ধ দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র-প্রযোজক এ. আর. কারদার। তিনি নিজে থেকেই জিগর মোরাদাবাদীর সঙ্গে যোগাযোগ করে মজরুর সঙ্গে দেখা করেন। তিনি মজরুকে চলচ্চিত্রে গান লেখার প্রস্তাব দিলেও প্রথম দিকে মজরু ফিল্মের ব্যাপারে খুব একটা উচ্চমনোভাবাপন্ন ছিলেন না বলে এই প্রস্তাবে অসম্মত হন। কিন্তু জিগর মোরাদাবাদী তাঁকে বোঝান যে চলচ্চিত্রে গান লিখলে অর্থনৈতিকভাবে মজরু সচ্ছ্বল হয়ে উঠবেন এবং তা তাঁর পরিবারের অন্ন-সংস্থানে সহায়ক হবে। ফলে সম্মত মজরুকে নিয়ে এ. আর. কারদার সঙ্গীত সুরকার নৌশাদের কাছে যান। নৌশাদ এই তরুণ নতুন যুবকটির একটি পরীক্ষা নেন এবং সেই জন্য তাঁকে একটি ধুন দিয়ে একই মিটারে কিছু কথা লেখার জন্য বলেন। সেই সময় তরুণ মজরু ঐ ধুনে লিখে ফেলেন ‘যব উসনে গেসু বিখরায়ে / বাদল আয়ে ঝুমকে…’ যা নৌশাদের বেশ পছন্দ হয়। ফলে সেই বছরই ১৯৪৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘শাহ জাহান’ ছবিতে গীতিকার হিসেবে যোগ দিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করেন মজরু সুলতানপুরী। এই চলচ্চিত্রের গানগুলি এতই জনপ্রিয় হয় যে গায়ক কে. এল. সায়গল বলনে যে তাঁর শবযাত্রাতেও যেন এই চলচ্চিত্রের বিখ্যাত গান ‘যব দিল হি টুট গ্যয়া’ বাজে। এরপরে নাটক (১৯৪৭), দোলি (১৯৪৭), অঞ্জুমান (১৯৪৮) ইত্যাদি ছবিতে গীতিকার হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন মজরু। এরপরই ১৯৪৯ সালে ‘আন্দাজ’ ছবিতে বিখ্যাত ‘তু কহে আগর’, ‘ঝুম ঝুমকে নাচো আজ’, ‘হাম আজ কহি দিল খো ব্যঠে’-র মতো গান লিখে ফেলেন। আরেকটি ছবি শহীদ লতিফ পরিচালিত ‘আরজু’ (১৯৫০)-তে দিলীপকুমার আর কামিনী কৌশল অভিনীত অংশে ‘অ্যায় দিল মুঝে এইসি জাগা লে চল’ গানটি লিখে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি।

কিন্তু ইতিমধ্যে ১৯৪৯ সালে তাঁর লেখা রাজনৈতিক কবিতার জন্য তাঁকে দুই বছরের কারাবাস করতে হয়। এরপরে যদিও গুরু দত্তের পরিচালনায় ‘বাজ’ (১৯৫৩) এবং ‘আর পার’ (১৯৫৪) ছবিতে গান লেখার সুযোগ পান তিনি। একের পর এক হিট গানের গীতিকার হয়ে ওঠেন মজরু সুলতানপুরী। গুরু দত্তের পরিচালনায় ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ৫৫’ (১৯৫৫) ছবিতেও গীতিকার ছিলেন তিনি আর এই চলচ্চিত্রের প্রায় প্রতিটি গান সে সময় বম্বের অলিতে-গলিতে বাজতো। সেকালের বিখ্যাত সব সঙ্গীত পরিচালক অনিল বিশ্বাস, নৌশাদ, মদন মোহন, ও.পি. নায়ার, সলিল চৌধুরী, লক্ষ্মীকান্ত প্যায়ারেলাল, কল্যাণজি-আনন্দজির সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। আরেক বিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক এবং সুরকার শচীন দেব বর্মণের সঙ্গে একের পর এক ‘পেয়িং গেস্ট’ (১৯৫৭), ‘ন দো গ্যরাহ্‌’ (১৯৫৭), ‘কালা পানি’ (১৯৫৮), ‘সোলভা সাল’ (১৯৫৮), ‘সুজাতা’ (১৯৫৯), ‘বোম্বাই কা বাবু’ (১৯৬০) ইত্যাদি ছবিতে মজরু সুলতানপুরীর লেখা গান প্রায় প্রতিটিই দর্শক আনুকূল্য লাভ করেছিল এবং সর্বকালের জনপ্রিয় গানগুলির মধ্যে অন্যতম হয়ে উঠেছিল সেই গানগুলি। এইসব ছবিগুলিতে একইসঙ্গে ছোড় দো আঁচল, আঁখো মে ক্যয়া জি, দিওয়ানা মস্তানা হুয়া দিলের মতো রোমান্টিক গান লেখার পাশাপাশি চাঁদ ফির নিক্‌লা, হাম বেখুদি মে তুমকো পুকারে, সাথি না কোই মঞ্জিলের মতো ‘সিরিয়াস’ গান লিখে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছেন মজরু। ষাট, সত্তর এবং আশির দশকে রাহুল দেব বর্মণের সুরে পরপর ‘তিসরি মঞ্জিল’ (১৯৬৬), ‘ইয়াদো কা বারাত’ (১৯৭৩), ‘হাম কিসিসে কম নেহি’ (১৯৭৭) ইত্যাদি ছবিতে গীতিকারের ভূমিকায় ছিলেন মজরু সুলতানপুরী যার প্রতিটিই বক্স অফিসে বাণিজ্যসাফল্য পেয়েছিল। ১৯৬৪ সালে ‘দোস্তি’ ছবির মধ্য দিয়ে মজরু সুলতানপুরী আর লক্ষ্মীকান্ত প্যায়ারেলালের জুটি তৈরি হয় এবং এই ছবিতেই গান লেখার জন্য মজরু সুলতানপুরী ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ গীতিকারের পুরস্কারে ভূষিত হন। এরপর তাঁদের জুটি আরো চল্লিশটি ছবিতে কাজ করেছে এবং সেই জুটির বিখ্যাত সব গানগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য চাহুঙ্গা ম্যায় তুঝে, পায়েল কি ঝংকার, বড়ে মিয়া দিওয়ানে, হুই শাম উনকা, চলো সজ্‌না, মেরে হামদাম মেরে দোস্ত, তৌবা ইয়ে মতোয়ালি চল ইত্যাদি। ১৯৮৮ সালে ‘কয়ামত সে কয়ামত তক’ ছবিতে এবং ১৯৯২ সালে ‘জো জিতা ওহি সিকান্দার’ ছবিতেও মনসুর খানের পরিচালনায় তিনি গীতিকারের ভূমিকায় ছিলেন।

বলরাজ সাহানির মতো বাম-মনস্ক অভিনেতার সঙ্গে তাঁকেও ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠানবিরোধী কবিতা লেখার জন্য জেলে যেতে হয়েছিল। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসের পর থেকে দেশে সর্বত্র কমিউনিস্ট নেতাদের গ্রেপ্তার করতে শুরু করে ভারত সরকার। সেই সময়েই মজরু সুলতানপুরী গ্রেপ্তার হন।

১৯৫৬ সাল থেকে জনপ্রিয় ছবির জন্য গান লিখতে থাকেন মজরু। ফৈজ আহমেদ ফৈজ, খুমার বরাবাঁকির সঙ্গে এক সারিতে শ্রেষ্ঠ গজল লেখক হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন মজরু সুলতানপুরী। তিনিই প্রথম ভারতীয় গীতিকার যিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন।

২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁর স্মরণে একটি পাঁচ টাকার ডাকটিকিট প্রকাশ করে। তাঁর স্মৃতিতে সুলতানপুরের মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন দিওয়ানি চৌরাহার কাছে একটি পার্ক স্থাপন করে ‘মজরু সুলতানপুরী উদ্যান’ নামে।

২০০০ সালের ২৪ মে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বম্বেতে ৮০ বছর বয়সে মজরু সুলতানপুরীর মৃত্যু হয়।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন