সববাংলায়

হুগলি ইমামবাড়া

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে বহু প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শনের ছড়াছড়ি। সেইসব স্থাপত্যের মধ্যে আবার পুরনো মন্দির মসজিদের সংখ্যাই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি। এইসব মন্দির-মসজিদগুলি শত শত বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে আজও। তেমনই প্রাচীন একটি মসজিদ হল হুগলি ইমামবাড়া (Hooghly Imambara)। এটি হুগলি জেলার চুঁচুড়াতে অবস্থিত। এই ইমামবাড়াটি মূলত শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলমানদের প্রার্থনাস্থল। বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ব্যক্তি হাজি মহম্মদ মহসিনের নাম জড়িয়ে রয়েছে এই ইমামবাড়ার সঙ্গে। হুগলি নদীর একেবারে পাশেই অবস্থিত এই ইমামবাড়াটিতে এমন সব আকর্ষণীয় জিনিস আছে যা খুবই বিস্ময়কর। উল্লেখ্য যে, এই ইমামবাড়ায় যে ঘড়ি রয়েছে, সেটিকে লন্ডনের বিগ বেনের পরে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ঘড়ি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলার বুকে অবস্থিত এই প্রাচীন চোখধাঁধানো স্থাপত্যকর্মটি দেখবার জন্য বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটকেরা এসে ভিড় করেন।

হুগলি ইমামবাড়া তৈরির পিছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। বর্তমানে যে স্থাপত্যকর্মটি আমরা দেখি তা উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত। অবশ্য তারও আগের ইতিহাস এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

সপ্তদশ শতাব্দীর শেষদিকে আগা মোতাহের মূলত লবণ ব্যবসার জন্য  হুগলির চুঁচুড়াতে পরিবার এবং বেশ কয়েকজন চাকরবাকর নিয়ে উপার্জনের অর্থ দিয়ে বসতি স্থাপন করেছিলেন। ঔরঙ্গজেব তাঁকে বড় জায়গির প্রদান করেছিলেন। যে ভবনটি তিনি নির্মাণ করেছিলেন তা ছিল একতলা। এই বাড়িতেই আজীবন থাকবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। ১৭১৭ সালে ভবনটিকে তিনি আল্লাহর নামে উৎসর্গ করে দেন এবং এর নাম রাখেন, ‘নজরগাহ হোসেন’। পরবর্তীকালে, ১৭৩৫ সালে তাঁর জামাতা সালেহ-উদ্-দীন ভবনটির সম্প্রসারণের কাজ করেন এবং নামকরণ করেন ‘তাজিয়া খানা’। এই সালেহ-উদ্-দীনের স্ত্রী মন্নুজান ছিলেন হুগলি জেলার উল্লেখযোগ্য এবং বিশিষ্ট ব্যক্তি হাজি মহম্মদ মহসিনের সৎ বোন। মন্নুজান ছিলেন আগা মোতাহেরের কন্যা। বিধবা মন্নুজানের মৃত্যুর পর তাঁর সম্পত্তির উত্তরাধিকার হন মহসিন। মহসিন ছিলেন একজন অত্যন্ত ধার্মিক ব্যক্তি। ভীষণ কঠোর জীবনযাপন করতেন তিনি, নানা ইসলামী তীর্থস্থানে ভ্রমণ করতেন। এছাড়াও জনহিতকর কাজের জন্যও তিনি পরিচিত ছিলেন। ১৭৭৬ সালের বঙ্গীয় দুর্ভিক্ষের সময় তিনি অনেকগুলি লঙ্গরখানা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এমনকি ত্রাণ তহবিলেও প্রভূত পরিমাণ অর্থ প্রদান করেছিলেন। তাঁর কোন সন্তান ছিল না এবং সমস্ত সম্পত্তি তিনি দান করে গিয়েছিলেন। ১৮০৬ সালে তিনি একটি ট্রাস্ট চুক্তির মাধ্যমে তাঁর সম্পত্তি পরিচালনার জন্য দুজন মুতাওয়াল্লি নিযুক্ত করেছিলেন। তাঁর উইলে তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন যে, ধর্মীয় উৎসবে, সরকারী রাজস্ব প্রদানে, ইমামবাড়া তৈরিতে সেই অর্থ ব্যয় করতে হবে।

বর্তমানে হুগলির যে ইমামবাড়াটি আমরা দেখি সেটি এই হাজি মহম্মদ মহসিনের স্মৃতিতেই নির্মিত হয়েছিল। আগা মোতাহেরের ভবনের ধ্বংসাবশেষের স্থানেই ইমামবাড়া নির্মাণ করা হয়েছিল। ১৮১২ সালে মহসিনের মৃত্যুর পর সরকার ট্রাস্ট গ্রহণ না করা পর্যন্ত মুতাওয়াল্লিদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে ইমামবাড়া নির্মাণের কাজ শুরু হতে পারেনি। তৎকালীন গভর্নর-জেনারেল লর্ড অকল্যান্ড নতুন ট্রাস্টি হিসেবে সৈয়দ কেরামত আলীকে নিয়োগ ক’রে ইমামবাড়া নির্মাণের দায়িত্ব দেন। অবশেষে ১৮৪১ সালে হুগলি ইমামবাড়া তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল। উত্তরমুখী এই ইমামবাড়াটি তৈরি করতে ২০ বছর সময় লেগেছিল। ১৮৬১ সালে নতুন ইমামবাড়াটির উদ্বোধন হয়েছিল।

হুগলি ইমামবাড়া-র স্থাপত্যশৈলীও সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দোতলা ইঁটের তৈরি এই ইমামবাড়াটির নকশা করেছিলেন কেরামতুল্লাহ খান। ইমামবাড়ার প্রবেশদ্বারটিই চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। প্রবেশদ্বারে দেখা যায় একটি ক্লক টাওয়ার। দুটি সুউচ্চ টাওয়ার একটি কেন্দ্রীয় ক্লক টাওয়ারের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে, যার মাঝখানে একটু ওপরের দিকে বসানো রয়েছে একটি ঘড়ি। সেই বিরাটাকার ঘড়িটি ইংল্যান্ডের ব্ল্যাক অ্যান্ড মুরে কোম্পানির তৈরি করা যারা লন্ডনের বিগ বেনের ঘড়িটিরও নির্মাতা। ১৮৫২ সালে এই ঘড়িটি ক্রয় করে আনা হয় ১১ হাজার ৭২১ টাকার বিনিময়ে। ঘড়িটি দ্বিমুখী, অর্থাৎ বাইরে থেকে এবং ভিতরের প্রাঙ্গন থেকেও এটি দেখা যায়। ঘড়ির ডায়ালে লেখা সংখ্যাগুলি পূর্ব-আরবি-ইন্ডিক সংখ্যাসূচক লিপিতে লেখা। ঘড়িটিকে সপ্তাহে অন্তত একবার আধঘন্টা দম দিতে হয় এবং দম দেওয়ার চাবিটি এতই বড় এবং ভারি যে, এটি বহন করতে দুজন মানুষের প্রয়োজন হয়। ঘড়িতে বিভিন্ন মাপের তিনটি ঘন্টা রয়েছে, যা বিভিন্ন সময়ে বাজে। সবচেয়ে বড়টির ওজন ৩২০০ কেজি, মাঝারি ঘণ্টাটির ওজন প্রায় ১৬০০ কেজি এবং সবচেয়ে ছোটটির ওজন ১২০০ কেজি। দুটি ছোট ঘণ্টা ১৫ মিনিটের ব্যবধানে বাজে এবং সবচেয়ে বড় ঘণ্টাটি প্রতি ঘণ্টায় বাজে। ওই টুইন টাওয়ারের উচ্চতা প্রায় ১৫০ ফুট এবং তার ছাদে উঠতে হলে ১৫২টি সিঁড়ি অতিক্রম করে উঠতে হয়। টাওয়ারে ওঠার জন্য পুরুষ ও মহিলাদের পৃথক পৃথক সিঁড়ি রয়েছে। পুরুষদের জন্য দক্ষিণ টাওয়ার এবং মহিলাদের জন্য উত্তরদিকের টাওয়ার ধার্য রয়েছে। টাওয়ারের ছাদ থেকে হুগলি নদীর অপূর্ব দৃশ্যও দেখা যায়।

হুগলি ইমামবাড়া-র অভ্যন্তরে একটি আয়তাকার উন্মুক্ত প্রাঙ্গন রয়েছে এবং তা দীর্ঘ করিডোর-সহ দোতলা মহল দ্বারা বেষ্টিত। সেখানে অনেক কক্ষ রয়েছে এবং তারমধ্যে কিছু কক্ষ এখন মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। প্রাঙ্গনের মাঝে আয়তাকার জলাধার রয়েছে এবং তার চাপপাশে চারটি ফোয়ারা এবং কেন্দ্রে একটি বড় ফোয়ারা রয়েছে। বিল্ডিংয়ের পূর্বপ্রান্তে রয়েছে প্রার্থনা হল, যেটি জারিদালান নামে পরিচিত। এই প্রার্থনা কক্ষে সাদা-কালো চেকের মার্বেলের মেঝে দেখা যায়। দেওয়ালে খোদাই করা রয়েছে পবিত্র কোরানের কিছু কিছু পাঠ। সেখানকার জানলা এবং স্কাইলাইট রঙিন কাচ দ্বারা আবৃত।  মসজিদের অভ্যন্তর মার্বেল, মোমবাতি এবং ঝুলন্ত লন্ঠন দ্বারা সজ্জিত। ইমামের সুদৃশ্য সাত তারকাখচিত সিংহাসনটিও বেশ আকর্ষণীয়। জরিদালান থেকে বেরিয়ে বামদিকে গেলে যে গলি পড়ে তা দিয়ে ভবনের পিছনের উঠোনে পৌঁছনো যায়। সেই লেনের শেষে রয়েছে একটি সান ডায়াল বা সূর্যঘড়ি। এছাড়াও ইমামবাড়া বিল্ডিংয়ের বাইরের দিকের উপরের দেয়ালে যেটি হুগলি নদীর মুখোমুখি রয়েছে তাতে তোয়ালেতনামা বা হাজি মহম্মদ মহসিনের ট্রাস্ট ডিড ফার্সি ও ইংরেজি উভয় ভাষায় লেখা আছে।

হুগলি ইমামবাড়ায় ইসলাম ধর্মের মূলত শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলমানদের বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়ে থাকে। তবে বিশেষভাবে বলতে হয় মহরমের কথা। মহরমের সপ্তম দিন কয়েক হাজার ভক্ত হুগলির এই ইমামবাড়ায় এসে ভিড় করেন আল্লাহের নিকট প্রার্থনা করবার জন্য৷ প্রত্যেকের সারিবদ্ধভাবে নামাজ পড়ার দৃশ্য সত্যিই অতুলনীয়।

বর্তমানে এই ঐতিহাসিক স্থাপত্যটি পর্যটকদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading