সববাংলায়

একটি হীরে যেভাবে টাটা স্টিলকে বাঁচালো

ভারত ও ভারতবাসীদের জন্য টাটাদের অবদান অকল্পনীয় রকমের বৃহৎ। এ প্রসঙ্গে টাটা পরিবারের পুত্রবধূ মেহেরবাঈ টাটার নামও একইরকম উল্লেখযোগ্য যদিও টাটা পরিবারের সন্তানদের তুলনায় তাঁর নাম খুব কম মানুষেই জানে। জামসেদজী টাটার পুত্রবধূ তথা স্যার দোরাবজী টাটার স্ত্রী ছিলেন মেহেরবাঈ টাটা। একটি হীরে এবং টাটা স্টিল ও মেহেরবাঈ টাটার নাম কিভাবে একসূত্রে গেঁথে গেল আজ সেই গল্পই বলবো।

দক্ষিণ আফ্রিকার ব্লুমফন্টেন থেকে প্রায় একশো দশ কিমি পশ্চিমে অবস্থিত হীরের খনি জ্যাগারফন্টেইন। এই জ্যাগারফন্টেইন খনি থেকে এর আগে বহু হীরে উত্তোলিত হয়েছে কিন্তু ১৮৯৫ সালে উত্তোলিত একটি হীরে নিয়ে সাড়া পড়ে গেল সারা বিশ্বে। ২৪৫.৩৫ ক্যারাটের (প্রায় ৫০ গ্রাম) সেই হীরে আকৃতিতে অনেকটা সোফায় হেলান দেওয়ার কুশনের মতো। পৃথিবী বিখ্যাত কোহিনুর হীরের থেকেও আয়তনে প্রায় দ্বিগুণ এই হীরে। হীরেটি শুধু তার আয়তনের কারণেই বিখ্যাত ছিল না, আরও একটা কারণে এই হীরে বিখ্যাত ছিল। হীরেটি অবিশ্বাস্য রকমের শুদ্ধ এবং উজ্জ্বল ছিল। হীরেটি তোলার পর সেটি পাঠিয়ে দেওয়া হয় আমস্টারডামে এম বি বারেন্ডস ( M.B. Barends) কোম্পানির কাছে সেটিকে পালিশ করানোর জন্য। পালিশ এবং কাটিং হয়ে যখন সেই হীরে এল তার কাটিং এতটাই নিখুঁত হল যে হীরেটি তার নিচের দুই মিলিমিটার চওড়া সূচের মত সরু অংশটির ওপর অনায়াসে দাঁড়িয়ে থাকতে পারত। হীরেটি লন্ডনের একটি হীরে কোম্পানি কিনে নেয় এবং ১৮৯৭ সালে রানী ভিক্টোরিয়ার রাজ্যাভিষেকের হীরক জয়ন্তী (Diamond Jubilee) উপলক্ষে হীরেটির নাম রাখে ‘জুবিলী ডায়মন্ড’।

১৯০০ সালে প্যারিসে একটি বিখ্যাত প্রদর্শনী আয়োজিত হল যেখানে মূল আকর্ষণ ছিল এই জুবিলী হীরে। এপ্রসঙ্গে বলে রাখা যাক ১৯০৫ সাল অবধি পৃথিবীর বৃহত্তম হীরে ছিল এই জুবিলী। সেই প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন জামসেদজী টাটার পুত্র স্যার দোরাবজী টাটা। সবে দুই বছর আগে তাঁর বিয়ে হয়েছে মেহেরবাঈ টাটার সাথে। ঠিক করলেন হীরেটি তিনি স্ত্রীকে উপহার দেবেন। যেমন ভাবা তেমন কাজ। হীরেটি কিনে নিলেন তিনি এক লক্ষ পাউন্ড দিয়ে। প্ল্যাটিনাম বেসের ওপর প্ল্যাটিনাম চেনের সাথে হীরেটি যুক্ত করে লেডি টাটা সেটি বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠান যেমন তৎকালীন আমেরিকান রাষ্ট্রপতি কালভিন কুলিজ কিংবা ইংল্যান্ডের রানীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে পরতেন। হীরেটি লন্ডনের একটি বিশেষ ব্যাংকের ভল্টে রাখা থাকতো। এমনকি হীরেটির জন্য বীমা ও করেছিলেন দোরাবজী এবং যে জন্য প্রত্যেকবার হীরেটি ব্যবহারের জন্য ভল্ট থেকে বের করার কারণে বীমা কোম্পানিকে দুশো পাউন্ড করে জরিমানা দিতেন তিনি।

১৯০৭ সালে জামসেদজী টাটা স্টিল (তৎকালীন TISCO) প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে টাটা স্টিল ভালো ব্যবসা করলেও যুদ্ধ শেষে বেশ সমস্যায় পড়ে। সেই সময় কোম্পানির দায়িত্বে দোরাবজী টাটা। যুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বে অর্থনৈতিক যে মন্দা দেখা দিল তাঁর প্রভাব এসে পড়ে ইস্পাত তৈরির কাঁচা মালেও। অত্যধিক মূল্য বৃদ্ধি যেমন উৎপাদনে প্রভাব ফেললো তেমনি কর্মচারীদের বেতন দেওয়াও একটা বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে জাপানে প্রবল ভূমিকম্পের কারণে বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়ে যায়। ফলে ইস্পাত আমদানির চাহিদাও স্বাভাবিকভাবে হ্রাস পায় এবং জাপান থেকে আসা অর্থের জোগানও কমে যায়। ১৯২৪ সালে জামশেদপুরে অবস্থিত টিসকো (TISCO) থেকে টেলিগ্রাম মারফত বোম্বেতে অবস্থিত টাটার প্রধান কার্যালয়ে জানিয়ে দেওয়া হয় টিসকোর কর্মচারীদের আগামী মাস থেকে আর বেতন দেওয়া সম্ভব হবে না। দেউলিয়া ঘোষণা এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।

দোরাবজী টাটা খবরটি পাওয়া মাত্র মনস্থির করলেন যেভাবে হোক টিসকো কে বাঁচাতেই হবে দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার হাত থেকে। কিন্তু এত টাকা তিনি কোথায় পাবেন এখন ? স্ত্রী মেহেরবাঈয়ের সাথে আলোচনা করবার সময় মেহেরবাঈ নিজেই প্রস্তাব দেন তিনি তাঁর সমস্ত স্ত্রী ধন সাথে অবশই সেই জুবিলী হীরেও বন্ধক রাখতে রাজি। স্ত্রীয়ের এই কোথায় উজ্জীবিত দোরাবজী সাথে সাথে সিদ্ধান্ত নিলেন – পরের বাড়ির মেয়ে হয়ে মেহেরবাঈ যদি এই মহানুভবতা দেখতে পারেন তাহলে এই কোম্পানির প্রতি তাঁর দায় এবং দায়বদ্ধতা তো আরও অনেক বেশি। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁদের সমগ্র সম্পত্তি (তৎকালীন সময়ে প্রায় এক কোটি টাকারও বেশি)টাই তাঁরা বন্ধক রেখে দেবেন। আর দিলেনও তাই। ইম্পেরিয়াল ব্যাঙ্ক (অধুনা স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া) এর কাছে বন্ধক রাখলেন তাঁদের সমগ্র সম্পত্তি বদলে এক কোটি টাকা ধার নিলেন ব্যাঙ্ক থেকে। ধার নেওয়া এক কোটি টাকায় যেমন উৎপাদন পুনরায় শুরু করা গেল তেমনি টিসকো’র সমস্ত কর্মচারীর বেতন দেওয়া হল কোন বিরতি ছাড়াই। কেবল মাত্র যারা টিসকো’র অংশীদার তাদের লভ্যাংশটুকু কয়েক বছরের জন্য দেওয়া হবেনা সিদ্ধান্ত হল।

১৯২৯ সালে স্যার দোরাবজী টাটার মৃত্যু হয়। তাঁর দুই বছর পর লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মেহেরবাঈ টাটার মৃত্যু হল। মৃত্যুর আগে দোরাবজী টাটা তাঁর সম্পূর্ণ সম্পত্তি উইল করে স্যার দোরাবজী টাটা চ্যারিটেবল ট্রাস্ট এ দান করে যান। সাথে অবশ্যই সেই বিখ্যাত জুবিলি হীরেটিও। পরবর্তীকালে ১৯৩৭ সালে বিখ্যাত ফরাসি গহনা প্রস্তুতকারক সংস্থা কার্টিয়ার মারফত এই হীরেটি বিক্রি করে দেওয়া হয় জনৈক ফরাসি শিল্পপতিকে বিক্রি করে দেওয়া হয়। তাঁর থেকে এই হীরেটি কিনে নেন বিখ্যাত লেবানীয় অলঙ্কার প্রস্তুতকারী সংস্থা মৌওয়াদ হাউসের পক্ষ থেকে রবার্ট মৌওয়াদ। বর্তমানে এই সংস্থার কাছেই জুবিলী হীরেটি রয়েছে। হীরে বিক্রির সমস্ত লভ্যাংশ জমা হয় স্যার দোরাবজী টাটা চ্যারিটেবল ট্রাস্টে। এই ট্রাস্টের টাকাতেই পরবর্তীকালে তৈরী হয় লেডি মেহেরবাঈয়ের স্মৃতিতে টাটা মেমোরিয়াল হসপিটাল। এছাড়া টাটা ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্সেস, টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ সহ আরও বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও তৈরী হয়। সম্প্রতি ২০২০ সালে জামসেদপুরে স্যার দোরাবজী টাটা পার্কে লেডি মেহেরবাঈ টাটার মূর্তি স্থাপিত হয় ও সেই সঙ্গে টাটা স্ট্রাকচুরা স্টিল দ্বারা নির্মিত একটি হীরের আকৃতির ইস্পাতের স্থাপত্য তৈরী হয় জুবিলী ডায়মন্ডের সাথে টাটা স্টিলের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে সম্মান জানিয়ে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. Tata Stories, 40 timeless tales to inspire you, Harish Bhatt, Chapter 12 – Diamonds, Steel and hearts of Gold
  2. https://www.tatacentralarchives.com/
  3. https://theprint.in/
  4. https://www.businesstoday.in/
  5. https://www.youtube.com/
  6. https://www.tatasteel.com/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading