বিজ্ঞান

সাপের হিমোটক্সিন বিষ প্রাণীদেহে কাজ করে কীভাবে

বিভিন্ন সাপের কামড়ের ফলে শারীরিক প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন হয়। এর কারণ হল বিভিন্ন সাপের বিষ বিভিন্ন ধরণের হয়। সাপের কামড়ে মানুষ মারা যায় কেন জানতে গিয়ে সাপের বিষের বিভিন্ন প্রকারভেদ সম্বন্ধে আমরা জেনেছি। এর মধ্যে নিউরোটক্সিন বিষ কীভাবে কাজ করে আমরা জেনেছি। আমরা এখানে সাপের হিমোটক্সিন বিষ প্রাণীদেহে কাজ করে কীভাবে সেই বিষয়ে জানব।

কিছু কিছু সাপের বিষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল কামড়ের জায়গায় ফুলে যাওয়া এবং শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে রক্তপাত আরম্ভ হওয়া। এই সকল সাপের বিষে থাকে রক্তদূষণকারী হিমোটক্সিন (hemotoxin) যেগুলি প্রাণীর শরীরে ঢুকে রক্ত ও রক্তবাহীনালীর কিছু পরিবর্তন ঘটিয়ে তাদের কার্য সমাধা করে।

ভাইপার (viper) ও পিট-ভাইপার (pit viper) প্রজাতির সাপগুলির বিষে সাধারণত হিমোটক্সিন উপাদান থাকে। ভারতীয় উপমহাদেশে এই প্রজাতির সাপগুলির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল চন্দ্রবোড়া ও বাঁশবোড়া। এই সাপগুলি প্রাণীর যে জায়গায় কামড় দেয় সেখানে স্থানীয়ভাবে বিষ ছড়িয়ে পড়ে। এরকম বিষের প্রধান উপাদানগুলির মধ্যে অন্যতম হল প্রোটিনভঙ্গকারী কিছু ধাতব অনুযুক্ত উৎসেচক (snake venom metalloprotease) যেগুলি প্রাণীদেহের রক্তবাহী নালীর প্রাচীরকে ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে সাপের কামড়ের জায়গায় রক্তবাহী নালীর ভিতর থেকে রক্ত এবং রক্তরস বাইরে বেরিয়ে আসে। রক্তরস সেই জায়গায় জমে গেলে জায়গাটা ফুলে ওঠে। একই কারণে কামড়ের জায়গা থেকে রক্তপাত হতে থাকে। দেহের ভিতর রক্তের মাধ্যমে বিষ অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়লে সেখান থেকেও রক্তপাত হয়। দেখা গেছে যে বোড়া জাতীয় সাপে কামড়ানোর কয়েক ঘন্টা পর দাঁতের মাড়ি, চোখ, অন্ত্র ইত্যাদি অঙ্গ থেকে রক্তপাত হয়।

হয়তো আপনারা লক্ষ্য করেছেন, আমাদের দেহে কোথাও কেটে গিয়ে রক্ত বেরোতে থাকলে কিছু সময় পর আপনা আপনিই রক্তপাত বন্ধ হয়ে যায়, এই ঘটনাকে রক্ততঞ্চন বলে। রক্ততঞ্চনে সাহায্য করে রক্তে থাকা বিভিন্ন রকমের প্রোটিন। হিমোটক্সিক সাপের বিষে সেরিন প্রোটিয়েজ (serine protease) নামে এক ধরনের উৎসেচক থাকে যারা দেহের স্বাভাবিক রক্ততঞ্চনকারী প্রোটিনগুলিকেই নষ্ট করে দেয়। অর্থাৎ তখন আর দেহের স্বাভাবিক নিয়মে রক্তপাত বন্ধ হয় না।

বোড়া জাতীয় সাপের বিষে থাকা প্রোটিনভঙ্গকারী ধাতব অনুযুক্ত উৎসেচক প্রাণীদেহে কয়েক টুকরোয় ভেঙে গিয়ে ডিসইন্টিগ্রিন (disintegrin) নামে ছোট প্রোটিন তৈরি করে। এই ডিসইন্টিগ্রিন রক্তে প্রবাহিত হয়ে প্রাণীর হৃৎপিণ্ডে পৌঁছালে হৃৎপেশীতে অক্সিজেন সরবরাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে ধীরে ধীরে হৃৎপিণ্ড কাজ করা বন্ধ করে দেয়।

যেকোন সাপের বিষের অন্যতম উপাদান হল ফসফোলাইপেজ এ২ (phospholipase a2), যেটি কোষপর্দাকে ফাটিয়ে দিয়ে কোষের ভিতরের জিনিসগুলোকে বাইরে বের করে দেয়, ফলে কোষের মৃত্যু ঘটে। বোড়া জাতীয় সাপের বিষে থাকা ফসফোলাইপেজ এ২ উৎসেচকটি প্রাণীর রক্তে থাকা লোহিত রক্ত কণিকার কোষপর্দা ফাটিয়ে দেয়। ফলে লোহিত রক্ত কণিকার ভিতরে থাকা হিমোগ্লোবিন বাইরে বেরিয়ে আসে এবং হিমোলাইসিস (hemolysis) হয়, রক্ত আর বেশি অক্সিজেন পরিবহন করতে পারে না। বাইরে বেরিয়ে আসা হিমোগ্লোবিন কিডনীতে গিয়ে জমতে থাকলে কিডনীও ধীরে ধীরে অকেজো হতে থাকে। সেজন্য বোড়া জাতীয় সাপের কামড়ে অনেক সময় কিডনীর কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। সাপের বিষে থাকা হিমোটক্সিন রক্তে মিশলে খুব দ্রুত তার কাজ আরম্ভ করে বলে সাপে কামড়ালে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিকটবর্তী হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীকে নিয়ে যাওয়ার দরকার।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


তথ্যসূত্র


  1. Slagboom et al, 2017, Haemotoxic snake venoms: their functional activity, impact on snakebite victims and pharmaceutical promise. Br J Haematol. 177(6): 947–959.
  2. Menon and Joseph, 2015, Complications of Hemotoxic Snakebite in India. In: Clinical Toxinology in Asia Pacific and Africa. Toxinology, vol 2. Springer, Dordrecht, pp.209-232.
  3. https://en.m.wikipedia.org/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।