বিবিধ

সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির নামের পেছনে উড লেখার চল এল কীভাবে

সিনেমা মানেই আমরা সাধারণ বাঙালিরা সাধারণত তিন ধরণের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি বুঝি- ইংরেজি ভাষার সিনেমা মানে হলিউড, হিন্দি ভাষা হলে বলিউড আর বাংলা মানে টলিউড। সিনেমার দেখার আতিশয্যে আমরা খেয়ালই করিনি কোনদিন যে ভাষার সিনেমাই হোক না কেন তার শেষে একটা ‘উড’ (wood) শব্দ যুক্ত থাকে। এখন প্রশ্ন হল কেন থাকে? এর অর্থই বা কি? এসব কিছু আজ জেনে নেওয়া যাক এই লেখায়।

১৮৮৬ সালে হারভে (Harvey)ও ডেইডা উইলকক্স (Daeida Wilcox)নামের এক ধনী দম্পতি ক্যালিফোর্নিয়ার কেহুঙ্গা পাসের (Cahuenga Pass)কাছে ১২০ একর জমি কেনেন ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে। এর এক বছরের মাথায় কিছু পরিচিত লোক মারফৎ হলিউড নামটি কানে আসে ডেইডা উইলকক্সের। ডেইডা তাঁদের এই নতুন জমির নাম হলিউড রাখার ইচ্ছাপ্রকাশ করেন তাঁর স্বামীর কাছে।

১৮৮৭ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি স্ত্রীর ইচ্ছাপূরণ করতে লস আঞ্জেলেস কাউন্টি রেকর্ডারের অফিসে প্রথমবার হলিউডের সাবডিভিশনাল ম্যাপ নথিভুক্ত করেন হারভে উইলকক্স। এর কয়েক বছর পর হলিউড এবং তাঁর সংলগ্ন কিছু অঞ্চল কিনে সেখানে জমি, জনপদ তৈরির ব্যবসা শুরু করেন এইচ. জে. হুইটলি (H.J.Whitley) যিনি হলিউডের জনক হিসেবে ভবিষ্যতে পরিচিত হবেন। এক অর্থে হলিউড নামটির প্রকৃত উদ্ভাবকও তিনি। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার যে অঞ্চলে হলিউড অবস্থিত সেখানকার সান্টা মনিকা পাহাড়ে ‘ক্রিসমাস হলি’ গাছের মত দেখতে একধরণের বেরি প্রজাতির গাছ পাওয়া যেত। এই গাছের থেকে তিনি ‘হলি’ নামটি গ্রহণ করলেন। এই এলাকাটি তৎকালীন সময়ে ‘ফিগউড’ নামে পরিচিত ছিল ফিগ গাছের প্রাধান্যের জন্যে। হুইটলি এই দুটি নামের মিশ্রণে তৈরি করলেন ‘হলিউড’।

হলিউড নামকরণ বিষয়ে এই রকমই আরও একটি কাহিনী শুনতে পাওয়া যায়। ১৮৮৬ সালে হুইটলি একদিন পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে এক শ্রমিককে দেখতে পান যে কাঁধে করে একরাশ কাঠের বোঝা বয়ে ফিরছিল। হুইটলি তাঁকে দেখে এই জায়গাটির নাম কি জানতে চান। সে বেচারা সাহেবের ভাষা না বুঝতে পেরে ভাবে তিনি বোধ হয় জানতে চাইছেন সে কি করতে গেছিল। তাই সে হুইটলিকে বলে, ” hauling wood” (কাঠের বোঝা বয়ে আনছি)। এই ‘হউলিং উড’ শব্দটি হুইটলির মনের মাধুরিতে জারিত হয়ে প্রকাশ পেল “হলিউড” নামে আর তিনি পরিচিত হলেন সেই হলিউডের জনক (ফাদার অফ হলিউড) হিসেবে।

হলিউড নামে হোটেল, পোস্ট অফিস, জনপদ সম্বলিত এক ছিমছাম শহর তৈরি করলেন তিনি। পাশের হলিউড হিলস এ “হলিউডল্যান্ড” লেখা বিখ্যাত সাইনবোর্ডটিও এই সময় তৈরি ঐ নামের একটি হোটেলের বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে নিউ ইয়র্ক, নিউ জার্সিতে যে সব ফিল্ম স্টুডিয়োগুলি ছিল, তারা ব্যবসায়িক কারণে ধীরে ধীরে তাদের স্টুডিয়ো সরিয়ে আনতে শুরু করলো এই হলিউডে।ইতিমধ্যে নির্বাক ছবির দিন শেষ হয়ে শুরু হল টকি’র যুগ, গোটা দেশ থেকে শিল্পী, কলাকুশলীরা এসে ভিড় জমাতে শুরু করল হলিউডে এবং হলিউডে তৈরি হওয়া অসাধারণ সব ছবি তাক লাগিয়ে দিলো গোটা দুনিয়ায়। সেই নামের মাহাত্ম্য ম্যাজিকের মতো লেগে আছে এই অঞ্চলের সাথে শতাব্দী পার করেও।

গত নয় দশক ধরে সারা পৃথিবীর প্রতিভাবান শিল্পীরা গিয়ে কাজ করেছেন হলিউডের ওয়ার্নার ব্রাদার্স (Warner Brothers), ইউনিভার্সাল স্টুডিয়োর (Universal Studios)ছবিতে এবং সেই ছবি আজ অবধি দর্শক আর সমালোচকদের আনুকুল্য পেয়ে এসেছে গোটা দুনিয়া জুড়ে। এই সাফল্যের হাত ধরেই আরেক অদ্ভুত প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিগুলি। শুধুমাত্র ছবি তৈরির কাজে অনুসরণ করেই ক্ষান্ত না হয়ে, হলিউড নামটির ‘উড’ শব্দটির সাথে নিজেদের নাম জুড়ে আজব এক অনুকরণের খেলা শুরু হল দুনিয়াজুড়ে। চট করে ভাবতে গেলে যদিও ভারতের বলিউড (Bollywood) এবং টলিউড (Tollywood) নামটিই প্রথমে মনে পড়ে, খতিয়ে দেখলে এরকম আরও অনেক দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে। খোদ আমেরিকাতেই আছে আরও কয়েকটি ‘উড’। কানাডায় বেশ কিছু ছবি বা টিভি শোয়ের শুটিং হয়েছে বলে তাঁদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির প্রচলিত নাম হলিউড নর্থ (Hollywood North)। আটলান্টা, জর্জিয়ার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির নাম ইয়ালিউড (Y’allywood)। মরমন (Mormon)নামের বিশেষ ধার্মিক, সামাজিক গোষ্ঠী নিজস্ব ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির নাম দিয়েছে মলিউড (Mollywood)। প্রতিবেশী দেশ পেরুতে আছে দুটি ‘উড’ পেরুলিউড (Peruliwood) এবং কোলিউড (Choliwood)। নিউ মেক্সিকোর ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে বলা হয় তামালেউড (Tamalewood)। কলম্বাস,ওহায়োর সোমালি অধ্যুষিত অঞ্চলের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির নাম সোমালিউড(Somaliwood)।

আফ্রিকার তালিকাও নেহাত কম নয়। ঘানার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির নাম ঘলিউড (Gholiwood), পার্বত্য রোয়ান্ডার ইন্ডাস্ট্রি হিলিউড (Hillywood), নাইজেরিয়ায় নলিউড (Nollywood), কেনিয়ায় রিভারউড (Riverwood), তানজানিয়ায় সোয়াহিলিউড (Swahiliwood), উগান্ডায় উগাউড (Ugawood), জাম্বিয়ায় জাম্বিউড (Zambiwood), জিম্বাবোয়েতে জলিউড (Zollywood), এরকম আরও অনেক প্রজাতি বা ভাষাভিত্তিক ‘উড’ ছড়িয়ে আছে গোটা আফ্রিকা মহাদেশ জুড়ে। ‘উড’-এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ছাড়াও প্রাচীরে ঘেরা চীনেও। ক্যান্টনিজ ভাষার ছবি যাকে সিনেমা অফ হংকং বলা যায়, তা তৈরি হয় ক্যানটনউডে (Cantonwood)। চীনের সবথেকে বড় স্টুডিয়ো হেংদিয়ান ওয়ার্ল্ড স্টুডিয়োর ডাকনাম চায়নাউড (Chinawood), তাইওয়ানিজ নিউ ওয়েভ ছবি তৈরি হয় তাইউডে (Taiwood)। আসল হলিউডকে সাফল্য আর প্রযুক্তির দিক দিয়ে প্রায় ছুঁয়ে ফেলা দক্ষিণ কোরিয়ার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ডাকনাম হ্যালিউউড (Hallyuwood)। আকিরা কুরোসাওয়ার দেশ জাপানের ছবি তৈরি হয় তাঁদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি হোগাউডে (Hogawood)।

ইউরোপের নানান দেশেও আছে উডের উপস্থিতি। হাঙ্গেরির বুদাপেস্টের কাছে করডা স্টুডিয়োকে স্থানীয় মিডিয়া ভালবেসে ডাকে এটইয়েকউড (Etyekwood)নামে। শুটিংয়ের জন্য বহুল ব্যবহৃত জার্মানির গরলিতস শহরের নামে জার্মানিতে আছে গরলিউড (Gorliwood)। সুইডেনের ফিল্ম প্রযোজনা সংস্থা ট্রলহাটানের নামে তৈরি হয়েছে ট্রলিউড (Trollywood)। ওয়েলস এর ড্রাগন ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম স্টুডিয়োকে কেউ কেউ ভ্যালিউড (Valleywood)বলেও ডাকে। নিউজিল্যান্ডের ওয়েটা ওয়ার্কশপের নামে নামকরণ ওয়েলিউডের (Wellywood)এবং প্রতিবেশী অস্ট্রেলিয়ার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির নাম (Oziwood)।

ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে ফিরে তাকালে চোখে পড়বে, ১৯৭০ এর দশক থেকে অধুনা মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বলিউড নামে পরিচিত যা পৃথিবীর বৃহত্তম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিও বটে। পলিউড (Pollywood) বলতে পাঞ্জাব ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এবং পাকিস্তানের পেশাওয়ারের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি দুটির নামই মনে পড়ে। ললিউড (Lollywood)নামে পরিচিত লাহোরের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি, কারিউড (Kariwood) করাচীর ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। বাংলাদেশের ঢাকায় আছে ঢালিউড (Dhaliwood)ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এবং শ্রীলঙ্কায় ফলিউড (Follywood)। টলিউড (Tollywood)নামে ভারতে দুটি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি একটি কলকাতার টালিগঞ্জে, অন্যটি অন্ধ্র প্রদেশের তেলেগু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। বিহারের ভোজপুরী ছবির ইন্ডাস্ট্রির নাম ভোজীউড(Bhojiwood)আর ছত্তিসগড়ে আছে ছলিউড (Chholywood)। কলিউড (Kollywood)নামের দুটি ইন্ডাস্ট্রি আছে, একটি তামিলনাড়ুর কোদাম্বক্কম অঞ্চলের নামে, আরেকটি নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে। কেরলের মালায়ালি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির নাম মলিউড (Mollywood)এবং চন্দন কাঠের জন্য বিখ্যাত কর্ণাটকের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির নাম স্যান্ডালউড (Sandalwood)। ওলিউড (Ollywood)এবং জলিউড (Jollywood)হল যথাক্রমে ভারতের দুই প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশা ও আসামের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির নাম।

ঢলিউড (Dhollywood) হল গুজরাতের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এবং ম্যাঙ্গালোরের টুলু সম্প্রদায়ের আছে নিজস্ব ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি যার নাম কোস্টালউড (Coastalwood)। যত দিন যাবে, তত আরও রঙে রূপে ভরে উঠবে সকলের প্রিয় এই শিল্পমাধ্যম, তত বেশী ছবি তৈরি হবে নিত্য নতুন ভাষায়, নতুন নতুন সংস্কৃতিতে। কিন্তু নামের দিক দিয়ে পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে যে কোনও ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকেই এক সুতোয় বেঁধে রাখবে আমেরিকার পশ্চিম প্রান্তের অদ্ভুত ম্যাজিকে মোড়া এই অঞ্চলটি যাকে সবাই হলিউড বলে জানে।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।