ইতিহাস

হুগলী জেলার নাম হল কিভাবে

পশ্চিমবঙ্গের ২৩টি জেলার মধ্যে  হুগলী একটি অন্যতম জেলা। পশ্চিমবঙ্গের  বর্ধমান বিভাগের একটি জেলা হল এই হুগলী জেলা।এই জেলাকে ঘিরে উত্তরে বর্ধমান, দক্ষিণে হাওড়া এবং পূর্বে হুগলী নদী অবস্থান করেছে।হুগলী জেলার দক্ষিণ- পশ্চিমে মেদিনীপুর এবং উত্তর পশ্চিমে বাঁকুড়া জেলা অবস্থিত।

এই জেলার নাম ‘হুগলী’ হল  কিভাবে সেই প্রসঙ্গে কোন বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিভিন্ন যুক্তির অবতারণা করেছেন।কিন্তু কেউই সুস্পষ্টভাবে প্রামাণ্য কোন তথ্যপ্রমাণ দেখাতে পারেননি যা থেকে  ‘হুগলী’ নামের উৎপত্তি বিষয়ে সব মতবাদকে একত্রিত করে একটিই মাত্র মতকে প্রাধান্য দিতে পারে।এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জনশ্রুতি।

যেমন আমরা যদি ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ ঘেঁটে দেখি তাহলে দেখতে পাব, সপ্তদশ শতকের বিভিন্ন গ্রন্থে এবং প্রথম ইংরেজ গভর্নর উইলিয়াম হেজেস এর ডায়েরীতে হুগলী বিভিন্ন নামে উল্লেখিত হয়েছে। যেমন- ওগোলি, ওগলি, গোলিন, হিউগলি, হাগলে প্রভৃতি।আবার একটি প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী সপ্তগ্রাম বন্দরে যাতায়াতের পথে পর্তুগীজরা ভাগীরথী তীর সংলগ্ন একটি গ্রাম্য জনপদ লক্ষ্য করে যেখানে নদীর ধারে প্রচুর ‘হোগলা’ গাছ জন্মেছিল। নদীপথে যাতায়াতের সময় পাশের গ্রামের নাম জানতে চায় কোন সাহেব নাবিক।কিন্তু সাহেব নদীর তীরে থাকা গাছের নাম জানতে চাইছে– এমন ধারণার বশবর্তী হয়ে উত্তর দেওয়া হয়েছিল- ‘হোগলা’।সেই ‘হোগলা’ থেকে এই জনপদের নাম হয় হুগলী। তবে এ ধরণের ঘটনার কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।

হুগলী নামের উৎপত্তি বিষয়ে এরকমই একটি ধারণা হল পর্তুগীজরা ভাগীরথী নদীর পশ্চিম তীরে গোলঘাট অঞ্চলে(অধুনা জেলখানা) একটি দুর্গ নির্মাণ করেছিল। পর্তুগিজ ভাষায় ‘গোলা’ শব্দের অর্থ দুর্গ সংলগ্ন প্রাচীরের বাইরের ওপরের দিকের অংশ। সেদিক থেকে দুর্গ হওয়ার জন্য গোলঘাট নামও হতে পারে। হুগলী জেলার ইতিহাস প্রণেতাদের মধ্যে অন্যতম D.G.Crawford তাঁর A BRIEF HISTORY OF THE HUGHLI DISTRICT গ্রন্থে এই যুক্তির সমর্থনে বলেছেন গোলঘাট থেকে ‘হুগলী’ নামের উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে। আবার কারও কারও মতে পর্তুগিজ বণিকরা পণ্য মজুত করার জন্য যে সকল গুদাম বা গোলা তৈরি করেছিল তা থেকেও ‘হুগলী’ নামটি এসে থাকতে পারে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের মতে পর্তুগিজদের মুখের ভাষায় যা ‘ও-গোলিম’ বা ‘ও-গোলি’ বাঙালি উচ্চারণে তাই ‘হুগলী’।তবে অনেকেই এই মতটিকে যুক্তিগ্রাহ্য নয় বলেই মনে করেন।

আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে সুস্পষ্টভাবে ‘হুগলী’ নামটি উল্লেখিত আছে।কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল ‘আইন-ই-আকবরী’ রচনার পরবর্তী সময়ে রচিত পর্তুগীজ লেখক ফারিয়া সৌজার বইতে হুগলী নামটির বদলে ‘গোলিন’, ১৬২০ সালে লেখা হিউগেস ও পার্কারের চিঠিতে ‘গোললিন’ এমনকি ফরাসি পর্যটক বার্নিয়ের লেখা Travels in the Mogul Empire গ্রন্থেও ‘ও-গোলি’ নামটি ব্যবহার করা হয়েছে।১৬৩২ খ্রীষ্টাব্দে আব্দুল হামিদ লাহরী ‘হুগলী’ বন্দরের উল্লেখ করে সেখানে পর্তুগীজ প্রাধান্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

বিভিন্ন বিদেশী পর্যটকের উচ্চারণে হুগলী নামটি বিভিন্ন ভাবে উচ্চারিত হয়েছে।১৫৮০ সাল নাগাদ আগত পর্তুগীজরা হুগলী কে চিনত- পোর্তো পেকুয়েনো।আবার ১৫৮৮ খ্রি Ralph Fitch হুগলী বানান লিখে গেছেন – Hugeli ।অনেক ঐতিহাসিক  একথা মনে করেন যে প্রচলিত ‘হুগলী’ নাম থেকেই উচ্চারণ বিকৃত হয়ে বিদেশীদের লেখায় গোলিন বা ‘ও-গোলি’ এসেছিল।কারণ, ১৪৯৫ সালে বিপ্রদাস পিল্লাই রচিত মনসামঙ্গল কাব্যেও হুগলী নামের উল্লেখ দেখা যায়। একথা তাই মনে করা হয়, হুগলী কোন বিদেশী নাম নয়। পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেছেন- “Hooghly was even the settlement of Portuguese, a place of some importance….. Voorraad who writes before the arrival of the Portuguese in India mentions it by the proper name Highly.”

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!