ইতিহাস

ইলা ঘোষ মজুমদার

ইলা ঘোষ মজুমদার (Ila Ghosh mazumdar) বাংলার তথা ভারতের প্রথম মহিলা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। তিনি হলেন শিবপুর বি.ই কলেজের (বর্তমানে IIEST) প্রথম ছাত্রী। শিক্ষানবিশ হিসেবে বিদেশে পড়তে যাওয়া ভারতের প্রথম মহিলা তিনি। শুধু তাই নয়, তিনি ভারতের সর্বপ্রথম মহিলা যিনি ভারী যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানায় কাজ করেছেন এবং কলকাতার প্রথম (ভারতের দ্বিতীয়) মহিলা পলিটেকনিক কলেজের (Women’s Polytechnic , Kolkata) প্রতিষ্ঠাত্রী। শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয় বাংলাদেশেরও প্রথম মহিলা পলিটেকনিক কলেজের স্থাপনাটি শ্রীমতি ইলা মজুমদারের তত্ত্বাবধানেই হয়েছিল।

১৯৩০ সালের ২৪ জুলাই বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর গ্রামে ইলা মজুমদারের জন্ম হয়। তাঁরা ছয় বোন ও দুই ভাই ছিলেন। ইলা মজুমদারের বাবা, যতীন্দ্র কুমার মজুমদার ছাত্রবয়সে এম.এস.সি-তে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে পরবর্তীকালে অবিভক্ত বাংলার বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে যোগদান করেন। মা ছিলেন গৃহবধূ। যতীন্দ্র কুমার ছোট থেকেই মেয়েকে মুক্ত পরিবেশে বড় করে তোলেন।

ইলা মজুমদার অধুনা বাংলাদেশের খুলনায় নবম শ্রেণী অবধি পড়াশোনা করেন। বাবার বিভিন্ন জেলায় পোষ্টিং এর দৌলতে, ইলার পড়াশোনা বিভিন্ন জায়গায় হয়েছিল। ইলা ১২ বছর বয়সেই সাইকেল চালাতে শেখেন এবং মাত্র ১৬ বছর বয়সে জিপ চালানোও শিখে ফেলেন। ধর্মীয় উত্তেজনার কারণে ইলার পরিবার ১৯৪৪ সালে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসে এবং ১৯৪৫ সালে তাঁরা পাকাপাকিভাবে কলকাতায় চলে এলে পরের বছর ১৯৪৬ সালে ইলা প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় বসেন। তাঁর ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফল আশানুরূপ হয়নি। তিনি দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর তিনি আশুতোষ কলেজে ভর্তি হয়ে প্রথম বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট (আই.এস.সি।-তে) উত্তীর্ণ হন।

১৯৪৭ সালে তৎকালীন বাংলার শিক্ষামন্ত্রী, শ্রী নিকুঞ্জ বিহারী মাইতির উদ্যোগে মহিলাদের জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং–সহ শিক্ষার সব ক্ষেত্রের পড়ার দরজা খুলে দেওয়া হয়। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তির প্রবেশিকা পরীক্ষায় অত্যন্ত ভালো ফলাফল করার ফলে একই সঙ্গে তিনি ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি শিক্ষা এবং শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পড়ার সুযোগ অর্জন করেন। কিন্তু তৎকালীন সময়ে প্রবেশিকা পরীক্ষায় কৃতী মহিলা মাত্রেই যখন কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ডাক্তারি পড়তে যাচ্ছেন, ইলা ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজে সুযোগ পেয়েও ডাক্তারি না-পড়ে শিবপুর বি.ই. কলেজে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হলেন।

শুরুতে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করে, দুজন ভর্তি হলেও, একজন মাঝপথেই ছেড়ে দেন। যেহেতু সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে প্রচণ্ড শারীরিক পরিশ্রম দরকার সেহেতু কলেজের অধ্যক্ষ তাঁকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে নিষেধ করলে মত পরিবর্তন করে অবশেষে ইলা ভর্তি হন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। শিবপুরের কয়েকশো ভারতীয় এবং ইউরোপীয়ান ছাত্রের মধ্যে, ভারতবর্ষের প্রথম মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্রী হিসাবে ইলা মজুমদার ভর্তি হন।

সেসময় ছাত্রীদের জন্যে আলাদা হোস্টেল না-থাকায় ছাত্রী-অবস্থায় ইলা মজুমদার থাকতেন কলেজ লাইব্রেরির বাঁ দিকের একটি ঘরে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান পুলিন বিহারী ঘোষ প্রথমা ছাত্রী ইলাকে শুরু থেকেই স্নেহ করতেন। প্রকৃতপক্ষে কলেজে পুলিন বিহারীই হয়ে উঠেছিলেন ইলার অভিভাবক। আর্থিক অসুবিধা যাতে পড়াশোনায় বিঘ্ন না ঘটায়,সেই ব্যাপারে কলেজের অধ্যাপক, অধ্যক্ষ সবাই ইলাকে উদারহস্তে সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছিলেন যদিও ইলার বাবাই সব দায়িত্ব বহন করেছিলেন। বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সব ধরনের খেলাধুলায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন ইলা।নিজে খুব ভালো তাসের খেলা ব্রিজ খেলতেন। কলেজের একমাত্র ছাত্রী হিসেবে সকলের প্রিয়প্রাত্রী ছিলেন এবং পঠনকালে সহপাঠীদের খুবই সহযোগিতা পেয়েছিলেন। ১৯৫১ সালে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বাংলা তথা সমগ্র ভারতের প্রথম স্নাতক হয়ে ইতিহাস গড়লেন ইলা। এসত্ত্বেও বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের প্রিন্সিপাল ভেবেছিলেন ভারত বোধহয় তখনও মহিলা ইঞ্জিনিয়ারের কাজের জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠেনি। তাঁকে ভুল প্রমাণ করে ইলা মজুমদার এরপর শিক্ষানবিশির জন্য গেলেন ইউরোপের স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে। সেখানে ‘বার অ্যান্ড স্টাইড’ সংস্থা থেকে স্নাতকোত্তর শিক্ষা নেন।

শিক্ষানবিশির শেষে ভারতে ফিরে এসেই ইলা মজুমদার দেরাদুনের ‘অর্ডিন্যান্স ফ্যাক্টরি’ (Ordinance Factory) নামক একটি ভারী যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানাতে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। এখানেও স্বভাবতই আরেক নতুন ইতিহাসের অংশীদারি হয়ে ওঠেন ইলা। কর্মক্ষেত্রে যোগদানের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি হয়ে ওঠেন ভারী যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানার ভারী ইঞ্জিনিয়ারিং উৎপাদন বিভাগে কর্মরতা ভারতের সর্বপ্রথম প্রযুক্তিবিদ নারী। কর্মরতাবস্থায় ইলা থাকতেন কারখানার স্টাফ কোয়ার্টারেই। ছয় মাস চাকরি করার পর ১৯৫৫ সালে দিল্লি পলিটেকনিক কলেজে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। বিয়ের পর তিনি পাকাপাকিভাবে কলকাতা চলে আসেন এবং ইন্সটিটিউট অব জুট টেকনোলজি-তে লেকচারার পদে যোগ দেন। বিবাহ পরবর্তী তাঁর নাম পরিচিত হয় ইলা (মজুমদার) ঘোষ নামে।

ভারতের প্রথম মহিলা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ইলা মজুমদারের সবথেকে উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব হল ১৯৬৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর, কলকাতার গড়িয়াহাট রোডে বাংলার প্রথম মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের (Women’s Polytechnic , Kolkata) প্রতিষ্ঠা করা। কলকাতার ‘ইনস্টিটিউট অফ জুট টেকনোলজি’-তে লেকচারার থাকাকালীনই কলকাতার প্রথম মহিলা পলিটেকনিক কলেজের ভিত তৈরি হয়। আর্কিটেকচার ও ইলেকট্রনিক্স নিয়েই মুলত শুরু করা হয় এই কলেজের পঠন পাঠন। ইলা মজুমদারই ছিলেন তাঁর স্থাপিত উইমেনস্‌ পলিটেকনিক কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ। তাঁর বিস্তৃত এই কর্মকাণ্ডে মুগ্ধ হয়ে ১৯৮৫-তে রাষ্ট্রপুঞ্জের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের ঢাকাতেও একটি মহিলা পলিটেকনিক কলেজ খোলার দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়। প্রথম দিকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে অধ্যক্ষ পদ থেকে অব্যাহতি দিতে রাজি না হলেও পরবর্তীকালে তিনি বাংলাদেশে যান এবং তাঁরই তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশের প্রথম মহিলা পলিটেকনিক কলেজ স্থাপনার গৌরব অর্জন করেন। এইসময়ে ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগলে তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বহু হিন্দু পরিবারকে সাহায্য করেছিলেন। কোকিলা সাহা নামক এক বিধবা সর্বহারা মহিলাকে সঙ্গী করে কলকাতা নিয়ে এসে নিজের আত্মীয়ের মতো আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং আজীবন নিজের সঙ্গী করেই রেখেছিলেন।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন