বর্তমানে LED-র (Light Emitting Diode) যুগে ভাস্বর বাল্ব (incandescent bulb) এবং CFL-এর(Compact fluorescent lamp) উজ্জ্বলতা অনেকটাই ফিকে। কিন্ত পাঁচ বছর আগেও এরকমটা ছিল না। আজকের আলোচনা এই তিন ধরনের বৈদ্যুতিক আলোক উৎস নিয়েই। ছোট থেকেই এই তিন ধরনের লাইট-বাল্ব সবাই দেখেছি। অনেকের মনেই প্রশ্নটা এসেছে যে ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্ব সাধারণত হলুদ বর্ণের আলো দেয় কিন্ত CFL বা LED বাল্ব সাদা আলো দেয় কেন? এই লেখায় সেই বিষয়েই বিস্তারিত আলোচনা করা হল।
প্রথমে আমাদের ছোটবেলার পরিচিত ভাস্বর বাল্বের ব্যাপারে আসা যাক। এই বাল্বের হলুদ আলোর রহস্যটা লুকিয়ে আছে বাল্বের মধ্যে থাকা দুটি লেড তারের মাঝের প্যাঁচালো তারটিতে। এটিকে আমরা ফিলামেন্ট বলে চিনি। ফিলামেন্ট হল টাংস্টেনের তৈরি একটি তার। বাল্বের ক্ষেত্রে তড়িৎ প্রবাহ এই তারটির মধ্যে দিয়েই হয়। ভাস্বর বাল্ব মূলত তাপীয় বিকিরণ তত্ত্ব বা thermal radiation theory এর ওপর কাজ করে। এই ধরনের বাল্বের ক্ষেত্রে তাপের উৎস হল তড়িৎ প্রবাহ। তারের মধ্যে দিয়ে তড়িৎ প্রবাহের ফলে উৎপন্ন তাপের কারণে তারটি হলুদ আলোয় জ্বলে। কিন্ত এখানেও প্রশ্ন থেকে যায় হলুদ আলোই কেন? সবুজ, সাদা বা নীল আলো কেন নয়? এর উত্তরটিও খুঁজে দেখা যাক। তাপপ্রবাহ হলে টাংস্টেন একটি কৃষ্ণবস্তু বা black body এর মতো আচরণ করে। কৃষ্ণবস্তু হল এমন একটি বস্তু যা নিজের ওপর এসে পড়া সমস্ত তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ বা electro magnetic radiation কে শোষণ করে নেয় এবং তাপীয় বিকিরণ হিসেবে উজ্জ্বল বর্ণের আলো বিচ্ছুরিত করে যার ফলে বস্তুর মধ্যে উজ্জ্বল আলোক ছটা দেখতে পাওয়া যায় । এই কারণেই যখন কোনো বস্তুকে তাপ দেওয়া হয় সেটির উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়। তবে আলোক রশ্মি বিকিরণের আগে বস্তু থেকে অপেক্ষাকৃত বেশি তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের অদৃশ্য অবলোহিত রশ্মি বা Infrared ray বিকিরিত হয়। বস্তুকে আরো বেশি তাপ দিলে সেটি দৃশ্যমান বর্ণালীর লাল, কমলা, হলুদ, সাদা এবং নীল বর্ণের আলো বিচ্ছুরিত করে (চিত্র ১ দ্রষ্টব্য)। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় আগ্নেয়গিরি থেকে বেরোনো লাভার উষ্ণতা থাকে ১০০০° সেলসিয়াসের বেশি। এই তাপমাত্রায় বস্তু থেকে অধিক তরঙ্গ দৈর্ঘ্য সম্পন্ন লাল আলোক রশ্মি বিচ্ছুরিত হয়। তাই আমরা লাভাকে লাল বর্ণের দেখি। তেমনই তড়িৎ প্রবাহের সময় টাংস্টেন তারের উষ্ণতাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাপমাত্রা যখন ২৭০০° সেলসিয়াস অতিক্রম করে তখন তারটি হলুদ আলোয় জ্বলতে থাকে। এখানেও প্রশ্ন থাকতে পারে যে, আলোর রং হলুদে থামবে কেন ? সাদা বা নীল বর্ণের আলো কেন বিচ্ছুরিত হবে না ? এর কারণ, সাদা বা নীল বর্ণের আলোক রশ্মি বিচ্ছুরিত হতে তাপ লাগে প্রায় ৩৫০০-৬০০০° সেলসিয়াস। এই পরিমাণ তাপে তারের গলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। টাংস্টেনের গলনাঙ্ক ৩৪২২° সেলসিয়াস হওয়ায় এটি হলুদ বর্ণের আলোই বিচ্ছুরিত করতে পারে।

খেয়াল করলে বোঝা যাবে CFL বা LED এর থেকে বাল্বের আলো বেশি উজ্জ্বল। এর কারণ কী? এর কারণও লুকিয়ে তারের মধ্যেই। জুলের তত্ত্ব অনুযায়ী তারের রোধ যত বেশি হবে তারের মধ্যে তাপপ্রবাহ তত বেশি হবে। অর্থাৎ হলুদ বর্ণের উজ্জ্বল আলো পেতে হলে দরকার উচ্চ মানের রোধ। ভাল করে খেয়াল করলে বোঝা যায় টাংস্টেনের তারটি আসলে ভীষণ পাতলা এবং কুণ্ডলীর মতো প্যাঁচানো। কোনও তারের প্রস্থচ্ছেদ (cross section) যতো কম হয় অর্থাৎ তারটি যত পাতলা হয় এবং তারটির দৈর্ঘ্য যত বেশি হয় তত বেশি মানের রোধ সেটি থেকে পাওয়া যায়। তাই অনেকটা দৈর্ঘ্যের অল্প প্রস্থচ্ছেদের পাতলা টাংস্টেন তারকে অল্প জায়গায় ধরে রাখতে তারটিকে কুন্ডলীকৃত করে রাখা হয়। বাল্বের ভিতরে নিয়ন, আর্গণের মতো নিষ্ক্রিয় গ্যাস ব্যবহার করা হয়। যাতে অক্সিজেনের প্রভাবে তারটি নষ্ট না হয়ে যায়।
তাহলে ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্বের হলুদ আলোর রহস্যভেদ করা গেল। এবার জেনে নেওয়া যাক CFL বা Compact fluorescent lamp এর সাদা আলোর পিছনের রহস্য। ইনক্যান্ডেসেন্ট বাল্ব ও CFL দুটিতেই ফিলামেন্ট তারের ব্যবহার করা হয় কিন্ত CFL এর কার্যপদ্ধতিতে কিছু পার্থক্য আছে। CFL এ একটি কাঁচের প্যাঁচানো নলের ব্যবহার করা হয়। এই নলের ভিতরের পৃষ্ঠতলে থাকে ফ্লুরোসেন্ট পাউডারের সাদা কোটিং। মূলত ফ্লুরোসেন্ট পাউডার হিসেবে ব্যবহার করা হয় ফসফরাস এর গুঁড়ো। কাঁচের নলটির ভিতরে ভরা থাকে পারদের বাষ্প বা Mercury vapour এবং আর্গণ গ্যাস। নলটির দুই প্রান্তে দুটি টাংস্টেন ইলেকট্রোড বা তড়িৎদ্বার সংযুক্ত থাকে। এবার তড়িৎদ্বার এর মধ্যে দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহ শুরু হলে তড়িৎদ্বার দুটির তাপমাত্রা প্রায় ৯০০° সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়। এই অবস্থায় তড়িৎদ্বারে উপস্থিত ইলেকট্রনগুলি উদ্দীপিত হয়ে ওঠে এবং নলে উপস্থিত মার্কারি এবং আর্গণের পরমাণুগুলিকে প্রবল বেগে আঘাত করে। আঘাতের ফলে উৎপন্ন শক্তি মার্কারি এবং আর্গণের পরমাণুতে উপস্থিত ইলেকট্রনগুলিতে পৌঁছায় এবং তারা নিউক্লিয়াসের বাইরের দিকের উচ্চশক্তি সম্পন্ন কক্ষপথে স্থানান্তরিত হয়। কিন্ত কিছুক্ষণ পরে শক্তি বিকিরণ করে আবার ইলেকট্রনগুলি তাদের আগের কক্ষপথে ফিরে আসে ( বোরের স্বীকার্য :৩)। এই শক্তি বিকিরিত হয় UV Ray বা অতিবেগুনি রশ্মি রূপে। এই UV Ray বা অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে সাদা রং বিচ্ছুরিত হয়। মার্কারির পরমাণু থেকে নির্গত এই অতিবেগুনি রশ্মি নলের গায়ে ফ্লুরোসেন্ট পাউডার হিসেবে থাকা ফসফরাসের দ্বারা শোষিত হয় এবং এটি সাদা আলোকরশ্মি বিচ্ছুরিত করে। এই কারণেই আমরা CFL এর আলো সাদা রঙের দেখি।
এবার আসা যাক আমাদের তৃতীয় আলোক উৎস বা LED আলোর ব্যাপারে। বর্তমানে সব জায়গায় সর্বাধিক যেই আলোর ব্যবহার হয় সেটি হল এই LED। LED এর পুরো কথা হলো Light Emitting Diode। বোঝাই যাচ্ছে এই আলোক উৎসে যেই জিনিসটির ব্যবহার করা হয় সেটি হলো ডায়োড। ডায়োড হল একটি অর্ধ পরিবাহী (semi-conductor) যেটি কারেন্ট বা তড়িৎ প্রবাহকে এক মুখী করে। ডায়োড বানাতে একটি p টাইপ অর্ধপরিবাহী বা সেমিকন্ডাক্টরকে n টাইপ সেমিকন্ডাক্টরের সঙ্গে জুড়ে দিতে হয়। এটিকে p-n জাংশন ডায়োড বলা হয়। ডায়োডের p দিকটি হয় ধনাত্মক দিক এতে চার্জ ক্যারিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয় হোল (hole)। হোল হল একটি চার্জ ক্যারিয়ার যা ইলেকট্রনের শূন্যতা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়) । এবং n দিকটি ঋণাত্মক দিক এতে চার্জ ক্যারিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয় ইলেকট্রন। p-n জাংশন ডায়োডের p দিকে তড়িৎ উৎসের ধনাত্মক দিক ও n দিকের সঙ্গে ঋণাত্মক দিক যুক্ত করা হয়। ফলে ডায়োডের মধ্যে দিয়ে উচ্চ মাত্রার ভোল্টেজ পাঠালে n দিকটি থেকে ইলেকট্রনের প্রবাহ p দিকে হতে শুরু করে। এভাবে ডায়োডে তড়িৎ প্রবাহ শুরু হয়। সহজ করে বলতে গেলে n দিকটিতে উপস্থিত ইলেকট্রন p তে উপস্থিত হোল বা শূন্যস্থান পূরণ করতে সেই দিকে প্রবাহিত হয়। এখন ইলেকট্রন যখনই p দিকটি অতিক্রম করে n দিকটিতে এসে পৌঁছায় তখন তা কিছু পরিমান শক্তি বিকিরণ করে। LED তে এই শক্তি মূলত ফোটন কনা বা আলোক শক্তি রূপে নির্গত হয়। কিন্ত এই আলো হয় মূলত নীল বর্ণের। LED এর সাদা আলোর বিচ্ছুরণ ‘ফসফর পদ্ধতিতে” ব্যাখ্যা করা যায়। এই পদ্ধতিতে একটি LED চিপকে হলুদ ফসফরাস দ্বারা কোটিং করা হয়। LED এর নীল বর্ণের আলো যখন এই ফসফরাসের আস্তরণের মধ্যে দিয়ে যায় তখন তা সাদা বর্ণের আলোয় পরিবর্তিত হয়। এবং এই কারণেই আমরা LED বাল্ব থেকে সাদা বর্ণের আলো বেরোতে দেখি। তবে LED থেকে যে সাদা আলোই বের হয় এরকম মোটেই নয়। LED এর মাধ্যমে বিভিন্ন বর্ণের আলোক রশ্মি তৈরি করার জন্যে RGB ডায়োডের ব্যবহার করা হয়। এই RGB বলতে red, green, blue তিনটি বর্ণকেই বোঝানো হয়। এক্ষেত্রে তিনটি আলাদা বর্ণের আলোর জন্যে তিনটি আলাদা ডায়োডের ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এবার এই ডায়োডগুলির মধ্যে ভোল্টেজের পার্থক্য ঘটিয়ে আলাদা আলাদা রঙের আলো তৈরি করা হয়ে থাকে।
আশা করি পুরনো দিনের বাল্ব হলুদ কিন্তু CFL বা LED বাল্ব সাদা হয় কেন সেটি এই ব্যাখ্যা থেকে সহজেই বোঝা গেল।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান