ভারতীয় বিচারালয়ের ইতিহাসে এমন কয়েকটি মামলা রয়েছে যেগুলির ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। কয়েকটি মামলার সঙ্গে আবার স্বনামধন্য ব্যক্তিরাও জড়িত থেকেছেন, ঠিক যেমন বর্তমানে আমাদের আলোচ্য মামলাটির কেন্দ্রে ছিলেন ভারতবর্ষের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। তবে এই মামলার পিছনের প্রধান কাণ্ডারি ছিলেন রাজনারাইন, যিনি এককালে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচনী দুর্নীতির বিরূদ্ধে তাঁর করা এই মামলা ইন্দিরা গান্ধী বনাম রাজনারাইন মামলা (Indira Gandhi vs Raj Narain) নামে সুপরিচিত। এই আইনি লড়াই সংবিধানের ৩৯তম সংশোধনের বৈধতা যাচাই করে এবং ৩২৯ক -এর ৪ এবং ৫ ধারাদুটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় আদালত৷ সেই সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচনী দুর্নীতি বিষয়েও চরম রায় শোনানো হয়। এলাহাবাদ হাইকোর্ট থেকে মূলত সমস্যার সূচনা হয়েছিল যা সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে শেষ হয় অবশেষে। বুঝতেই পারা যাচ্ছে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাসে ইন্দিরা গান্ধী বনাম রাজনারাইন মামলার গুরুত্ব কতখানি। কংগ্রেস সরকারের পতনের পিছনে এই মামলাটির প্রভাব অনস্বীকার্য৷
এলাহাবাদ হাইকোর্টের উত্তরপ্রদেশ রাজ্য বনাম রাজনারাইন মামলাটি থেকেই মূল সমস্যাটির সূত্রপাত হয়েছিল। সেই মামলার কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচনী দুর্নীতি। ১৯৭১ সালের ভারতীয় সাধারণ নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশের রায়বেরিলি নির্বাচনী এলাকার এসএসপি প্রার্থী রাজনারাইন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে। গান্ধী রায়বেরিলিতে পুনরায় নির্বাচিত হন এবং তাঁর কংগ্রেস (আর) দল ভারতীয় সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তবে রাজনারাইন তারপরেই আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। এই মর্মে তিনি ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে মামলা করেন যে, বিশেষ একটি রাজনৈতিক দল ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রীর পুনর্নিবাচনের জন্য সরকারি অর্থের অপব্যয় করেছে। বিশেষভাবে তিনি ইন্দিরার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারীদের নির্বাচনের এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার এবং সরকারি বেতনভুক্ত থাকাকালীন নির্বাচনী এলাকায় প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করার অভিযোগ করেন। এছাড়াও প্রচারের জন্য সরকারি যানবাহন ব্যবহার করা, ভোটারদের প্রভাবিত করার জন্য মদ ও কম্বল বিতরণ করার মতো অভিযোগও তোলা হয়েছিল।
সেই মামলায় আদালতের বিচারপতি জগমোহনলাল সিনহা ১৯৫১ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ১২৩(৭) ধারা অনুযায়ী ইন্দিরাকে দোষী সাব্যস্ত করেন এবং তাঁর নির্বাচনকে বাতিল ঘোষণা করেন। সেইসঙ্গে আগামী ছয় বছরের জন্য ইন্দিরাকে যে-কোনো নির্বাচনী পদে থাকার অযোগ্যও ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্ট। এছাড়াও আদালত কংগ্রেস দলকে ইন্দিরা গান্ধীর স্থানে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের জন্য কুড়ি দিন সময় দিয়েছিল। এলাহাবাদ হাইকোর্ট ইন্দিরাকে দোষী সাব্যস্ত করে যখন নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করে এবং তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্ব বিপদের মুখে পড়ে তখন তিনি পাল্টা সেই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট সেই সময়ে বন্ধ থাকায় আদালত পরবর্তী কার্যক্রম শুরু না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের এই আদেশে সাময়িক স্থগিতাদেশ জারি করেছিল। এই আদেশের ফলে শ্রীমতি গান্ধী সংসদীয় অধিবেশনে যোগদান করতে পারতেন কিন্তু লোকসভায় বিতর্ক এবং ভোটদানে অংশগ্রহণ করতে পারতেন না। তারই মধ্যে ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলী আহমেদ অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। সেই জরুরি অবস্থার মধ্যেই ৩৯তম সাংবিধানিক সংশোধনী আনা হয় যার মাধ্যমে সংবিধানে ৩২৯ক অনুচ্ছেদ প্রবর্তন করা হয়েছিল। সেই সংশোধনী অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং লোকসভার স্পিকারের নির্বাচনকে কোনও ভারতীয় আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। অতএব বোঝা যাচ্ছে এই সংশোধনী আসলে ইন্দিরা গান্ধীর মামলার ওপর থেকে সুপ্রিম কোর্টের কর্তৃত্ব কেড়ে নিয়েছিল। এই সংশোধনীর বৈধতাকে রাজনারাইনরা পুনরায় চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। এটাই ইন্দিরা গান্ধী বনাম রাজনারাইন মামলার কেন্দ্রীয় সমস্যা।
সর্বোচ্চ আদালতের সামনে অতএব যে সমস্যাগুলি প্রধান হয়ে ওঠে সেগুলি হল ৩৯তম সংশোধনীর অন্তর্ভুক্ত ৩২৯ক অনুচ্ছেদের (৪) ধারাটি কি অসাংবিধানিক? ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচন কি বৈধ ছিল? ১৯৭৪ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব (সংশোধন) আইন এবং ১৯৭৫ সালের নির্বাচন আইন (সংশোধন) আইন কি সাংবিধানিকভাবে বৈধ?
এই সমস্যাগুলির পক্ষে-বিপক্ষে দীর্ঘ বাগবিতন্ডা চলেছে। ইন্দিরার পক্ষে লড়াই করা বিজ্ঞ অ্যাটর্নি জেনারেল নানারকম যুক্তির জাল বুনেছিলেন। প্রথমত, তিনি আমেরিকান সংবিধানের প্রসঙ্গ তুলে বলেছেন নির্বাচন সম্পর্কিত বিরোধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আদালতের হাতে নয় বরং আইনসভার হাতে ন্যস্ত থাকা উচিত। এও বলা হয়েছিল যে রাজনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত বিষয়গুলি বিচার বিভাগের সাহায্যে সমাধান করা উচিত নয়। ৩৯তম সংশোধনীর প্রসঙ্গও তোলেন তাঁরা এবং সেই সূত্রেই ৩২৯ক অনুচ্ছেদের ধারাগুলিকে টেনে আনেন। বলা হয় ৩২৯ক অনুচ্ছেদের (১) ধারা অনুযায়ী সংসদ কর্তৃক কোনও কর্তৃপক্ষ নিযুক্ত না-হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী বা সংসদের স্পিকারের পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না। ওই অনুচ্ছেদেরই (৪) ধারার প্রসঙ্গও তোলা হয়। সেই ধারা অনুযায়ী ৩৯তম সংশোধনীর আগে সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইন যা-কিনা নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত তা বাতিল বলে গণ্য হবে না এবং সংশোধনী লাগু হওয়ার পরেও তা বহাল থাকবে। গান্ধীর আইনজীবী যুক্তি হিসেবে এও বলেন যে জরুরি অবস্থার সময়, যখন দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল না তখন সংবিধান কর্তৃপক্ষের নেওয়া বিচারবিভাগের ক্ষমতা সীমিত করার সিদ্ধান্তকে একটি বিশেষ ক্ষমতা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। প্রধানমন্ত্রীর পদটি অজেয় হওয়া তখন ছিল সময়ের দাবি। তাছাড়া পক্ষের আইনজীবীরা এও বলেন যে ৩২৯ক অনুযায়ী বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার ক্ষমতাকে বাতিল করা ১৪ অনুচ্ছেদে বর্ণিত সমতার অবজ্ঞা করা নয়। কারণ ৩৩ অনুচ্ছেদে সংসদের এমন ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে যার দ্বারা সংসদ সংবিধান কর্তৃক প্রদত্ত মৌলিক অধিকারগুলিকে শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে সীমিত বা বাতিল করতে পারে। এইসমস্ত যুক্তির জাল বিস্তার করে অবশেষে ইন্দিরার আইনজীবীরা ৩৯তম সংশোধনীকে সাংবিধানিক তকমা দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন।
উল্টোদিকে বিবাদীপক্ষের আইনজীবীদের কাছেও ছিল জোরালো সব প্রতিযুক্তি। বিপক্ষের আইনজীবী প্রথমত ৩৯তম সংশোধনীর সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন যে এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোটিকে ধ্বংস করে। এই যুক্তির সমর্থনে ১৯৭৩ সালের কেশবানন্দ ভারতী বনাম কেরালা রাজ্য মামলাটির প্রসঙ্গ টেনে আনা হয়। এই মামলাটির নিষ্পত্তি থেকেই উঠে এসেছিল এক রায়, যাতে বলা হয়েছিল সংসদ সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংশোধন করতে পারে না। কেশবানন্দের এই মামলা থেকেই নির্বাচনের বৈধতা বিষয়ক আরও কয়েকটি দিক উঠে এসেছিল। বিবাদীপক্ষের উকিল যুক্তি দেন যে নির্বাচন সম্পর্কিত বিষয়ে বিচারবিভাগকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দেওয়ার মাধ্যমে আসলে সংবিধানের গণতান্ত্রিক কাঠামোটিকে ধ্বংস করা হয়েছে। ৩২৯ ও ১৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এটি বিচারবিভাগীয় নির্ধারণেরই বিষয় যা তার থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তাছাড়াও বিবাদি বলেন ৩৯তম সংশোধনী আদালতের ক্ষমতা সীমিত করে এবং ব্যক্তিদের শুনানির সুযোগ না দিয়ে আটক করে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে প্রভাবিত করে যা ৩৬৮ অনুচ্ছেদের অধীনে প্রদত্ত সংসদের সংশোধনী ক্ষমতার বাইরে। এও বলা হয়েছিল যে, ইংরেজ-আইনের অধীনে নির্বাচন-সম্পর্কিত বিষয়গুলির শুনানি করার ক্ষমতা সংসদের উপর ন্যস্ত ছিল কিন্তু ১৮৭০ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সেই ক্ষমতা বিচার বিভাগকে অর্পণ করা হয়েছিল। এছাড়াও আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বিবাদীপক্ষের তরফ থেকে মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে, জরুরি অবস্থা জারি হওয়ার পর বেআইনিভাবে আটক করা কিছু সংসদ সদস্যের অনুপস্থিতিতে ৩৯তম সংবিধান সংশোধনী পাশ করা হয়েছিল। বিবাদীপক্ষ স্পষ্টতই জানান ৩৯তম সংশোধনী কেবল সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলিকেই ধ্বংস করে না, আইনের শাসনকেও প্রভাবিত করে এবং একে অসাংবিধানিক বলে দাবি করেন।
সুপ্রিম কোর্ট এই ঐতিহাসিক ইন্দিরা গান্ধী বনাম রাজনারাইন মামলার রায় দিয়েছিল ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। এই মামলায় প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে ছিলেন এ.এন রায় এবং বেঞ্চের অন্যান্য বিচারপতিরা হলেন এইচ.আর খান্না, কে. কে ম্যাথিউ, এম.এইচ বেগ এবং ওয়াই.ভি চন্দ্রচূড়। প্রথমত সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টত ৩৯তম সংশোধনীর ৩২৯ক-এর (৪) ধারাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে বাতিল করে দিয়েছে। আদালত জানিয়েছে এই ধারাটি কেশবানন্দ ভারতী মামলায় প্রতিষ্ঠিত নজির থেকে প্রাপ্ত সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর ধারণাটিকে লঙ্ঘন করে। বিচারপতিরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, ক্ষমতা পৃথকীকরণ এবং বিচারিক পর্যালোচনা ভারতীয় সংবিধানের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য এবং সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে এটি বাতিল করা যাবে না। আদালত ১৯৭৪ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব (সংশোধন) আইন এবং ১৯৭৫ সালের নির্বাচন আইন (সংশোধন) আইনকে সাংবিধানিকভাবে বৈধ ঘোষণা করেছে। তবে ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে ওঠা নির্বাচনী অসদাচরণের অভিযোগের পক্ষে যুতসই প্রমাণ না পাওয়ায় সুপ্রিম কোর্ট নিম্ন আদালত অর্থাৎ এলাহাবাদ হাইকোর্টের আদেশকে বাতিল ঘোষণা করেছিল এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের অনুমতি দিয়েছিল।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান