বিজ্ঞান

জে বি এস হ্যালডেন

জে বি এস হ্যালডেন

বিংশ শতকের বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জে. বি. এস. হ্যালডেন (J. B. S. Haldane), যিনি শারীরবিদ্যা, বংশগতিবিদ্যা, বিবর্তনবাদ এবং গণিত বিষয়ে গবেষণার জন্য খ্যাতি লাভ করেছিলেন। জীববিদ্যায় পরিসংখ্যানের উদ্ভাবনী ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি নব্য-ডারউইনবাদ (neo-Darwinism)-এর একজন প্রবক্তা হয়ে ওঠেন। জীববিদ্যায় তাঁর কোন শিক্ষাগত উপাধি না থাকলেও তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, দ্য রয়্যাল ইনস্টিটিউশন ও লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজে জীববিদ্যার শিক্ষকতা করেছিলেন। ভারতে আসার পর তিনি ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটেও শিক্ষকতা করেছেন।

১৮৯২ সালের ৫ নভেম্বর ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে জে. বি. এস. হ্যালডেনের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম ছিল জন বার্ডন স্যান্ডারসন হ্যালডেন (John Burdon Sanderson Haldane)। তাঁর বাবার নাম ছিল জন স্কট হ্যালডেন যিনি একজন শারীরবিদ (physiologist) ও দার্শনিক ছিলেন। হ্যালডেনের মা লুইসা ক্যাথলিন ট্রটার এক গোঁড়া স্কটিশ বংশের সন্তান ছিলেন। হ্যালডেনের একমাত্র বোনের নাম নাওমি, পরবর্তী জীবনে তিনি একজন লেখিকা হয়েছিলেন। বিজ্ঞানী হ্যালডেনের বিবাহ হয়েছিল শার্লট ফ্র্যাঙ্কেন নামে এক মহিলার সঙ্গে। কিন্তু এই সম্পর্ক স্থায়ী হয়নি। শার্লটের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর হ্যালডেন আবার হেলেন স্পারওয়ে নামের এক মহিলাকে বিয়ে করেন।

তিন বছর বয়সে হ্যালডেনের অক্ষর পরিচয় হয় ও তিনি পড়তে শেখেন। আট বছর বয়স থেকেই তিনি বাবার গবেষণাগারে বিষাক্ত গ্যাস নিয়ে নানারকম বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করতে শুরু করেছিলেন। তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় ১৮৯৭ সালে। তিনি ‘অক্সফোর্ড প্রিপারেটরি স্কুল’-এ (অধুনা ‘ড্রাগন স্কুল’) ভর্তি হন। ১৮৯৯ সালে হ্যালডেনের পরিবার অক্সফোর্ডের উপকণ্ঠে ‘চেরওয়েল’ (Cherwell) নামে একটি বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। এই বাড়িতে তাঁদের একটি নিজস্ব ও ব্যক্তিগত গবেষণাগার ছিল। ১৯০১ সালে হ্যালডেনের বাবা তাঁকে ‘অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি জুনিয়ার সায়েন্টিস্ট ক্লাব’-এ সদ্য আবিষ্কৃত ‘মেন্ডেলিয়ান জেনেটিক্স’ (Mendelian genetics)-এর উপরে একটি বক্তৃতা শুনতে নিয়ে গিয়েছিলেন। এছাড়াও হ্যালডেন সেই বয়সেই অক্সফোর্ডের ব্যালিয়ল কলেজের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের প্রকাশক (demonstrator) আর্থার ডুকিনফিল্ড ডার্বিশায়ার-এর বক্তৃতা শুনেছিলেন। এই দুটি ঘটনা পরবর্তীকালে বিভিন্ন গবেষণার ক্ষেত্রে তাঁকে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল।

১৯০৪ সালে হ্যালডেন এটন (Eton)-এ ভর্তি হওয়ার জন্য বৃত্তি লাভ করেন। ১৯০৫ সালে তিনি এখানে ভর্তি হন। এখানে ভর্তি হওয়ার পর অহঙ্কারী ও গম্ভীর হওয়ার অভিযোগ তুলে উঁচু শ্রেণির ছাত্ররা তাঁকে অনেক নির্যাতন করে। কিন্তু এই ব্যাপারে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছিলেন উদাসীন। এই উদাসীনতা হ্যালডেনের মনে প্রথাগত ইংরেজি শিক্ষা সম্পর্কে ঘৃণা তৈরি করেছিল।

১৯০৬ সালে তিনি তাঁর বাবার একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগদান করেন। এই বছরের জুলাই মাসে তিনি স্কটল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত রোথেস অঞ্চলে রাজকীয় সেনাবাহিনীর এইচএমএস স্প্যাঙ্কার (HMS Spanker) নামে একটি টর্পেডো যুক্ত জাহাজ থেকে পরীক্ষামূলক সাঁতারের পোশাক (experimental diving suit) পরে অতলান্তিক মহাসাগরে ঝাঁপ দেন। এই ঘটনাটি ১৯০৮ সালে ‘দ্য জার্নাল অফ হাইজিন’ নামে একটি পত্রিকায় একটি ১০১ পৃষ্ঠার প্রবন্ধে প্রকাশিত হয়। এখানে হ্যালডেনকে উল্লেখ করা হয়েছিল ‘জ্যাক হ্যালডেন’ নামে। এই পরীক্ষাটি পরবর্তীকালে ‘হ্যালডেন’স ডিকম্প্রেসন মডেল’ নামে একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

তিনি অক্সফোর্ডের নিউ কলেজে গণিত এবং গ্রিক ও লাতিন ভাষার বিভিন্ন রচনা সম্পর্কে পড়াশোনা করতে শুরু করেন। ১৯১২ সালে তিনি গণিত বিষয়ে স্নাতক পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে পাশ করেন। এরপর বংশগতিবিদ্যায় তাঁর আগ্রহ জন্মায়। তিনি ১৯১২ সালে মেরুদন্ডী প্রাণীদের জিন সংযোগের উপর একটি গবেষণাপত্র তৈরি করেন। সেই বছরই হিমোগ্লোবিনের কার্যকারিতার উপর একটি ৩০ পৃষ্ঠার দীর্ঘ নিবন্ধ তাঁর বাবার সঙ্গে সহ-লেখক হিসেবে প্রকাশিত হয়। এটি ছিল হ্যালডেনের প্রথম প্রযুক্তিগত গবেষণাপত্র।

যুদ্ধের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করার জন্য হ্যালডেন স্বেচ্ছায় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। ১৯১৪ সালের ১৫ আগস্ট ‘ব্ল্যাক ওয়াচ’ নামের রয়্যাল হাইল্যান্ড রেজিমেন্টের তৃতীয় ব্যাটেলিয়নে অস্থায়ী দ্বিতীয় লেফটেন্যান্ট হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অস্থায়ী লেফটেন্যান্ট এবং ১৮ অক্টোবর অস্থায়ী অধিনায়ক পদে উন্নীত হন জে বি এস হ্যালডেন। ফ্রান্সে কাজ করার সময় তিনি কামানের আগুনে আহত হয়েছিলেন যার জন্য তাঁকে স্কটল্যান্ডে ফেরত পাঠানো হয়। সেখানে তিনি ব্ল্যাক ওয়াচের নতুন নিযুক্ত সৈন্যদের গ্রেনেডের প্রশিক্ষণ দিতেন। ১৯১৬ সালে তিনি মেসোপটেমিয়া (অধুনা ইরাক) যুদ্ধে যোগ দেন এবং এখানে শত্রুপক্ষের একটি বোমা তাঁকে গুরুতর আহত করে। আহত হ্যালডেনকে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং যুদ্ধের বাকি সময়টুকু তিনি সেখানেই থেকেছিলেন। ১৯১৯ সালে তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন এবং ১৯২০ সালের ১ এপ্রিল অধিনায়কত্ব বজায় রেখে কমিশন ত্যাগ করেন।

১৯১৯ থেকে ১৯২২ সালের মধ্যে তিনি অক্সফোর্ডের নিউ কলেজের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা সত্ত্বেও তিনি এখানে শারীরবিদ্যা ও বংশগতিবিদ্যা পড়ান এবং গবেষণা করেন। এখানে থাকাকালীন প্রথম বছরেই তিনি জীববিদ্যার কয়েকটি বিষয়ে ছয়টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। এরপর তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান এবং পরবর্তী নয় বছর ধরে সেখানেই শিক্ষকতা করেন। এই সময়কালের মধ্যে তিনি বিভিন্ন উৎসেচক এবং বংশগতিবিদ্যার নানান গাণিতিক সমস্যা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন।

১৯২৭ সালে হ্যালডেন ‘জন ইনস হর্টিকালচার ইনস্টিটিউশন’-এ স্বল্প সময়ের কাজের জন্য যোগ দেন। জিনগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা বিভাগের অফিসার হিসেবে তাঁকে নিয়োগ করা হয়েছিল। হ্যালডেন ১৯২৯ সালে ‘দ্য র‌্যাশনালিস্ট অ্যানুয়াল’ পত্রিকায় ‘জীবনের উৎস’ শিরোনামে আট পৃষ্ঠার একটি নিবন্ধে অ্যাবায়োজেনেসিস-এর (abiogenesis) আধুনিক ধারণার সূচনা করেন। তাঁর মতে, আদিম মহাসাগর ছিল একটি ‘বিশাল রাসায়নিক গবেষণাগার’ (vast chemical laboratory)। এখানে অসংখ্য অজৈব যৌগের মিশ্রণ থাকে যেখান থেকেই পরবর্তীতে পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, অ্যামোনিয়া এবং জলীয় বাষ্পের সঙ্গে বিক্রিয়ার ফলে বিভিন্ন জৈব যৌগ উৎপন্ন হয়েছিল। জীব সৃষ্টির এই প্রথম অবস্থাকে তিনি বর্ণনা করেছিলেন ‘গরম তরল স্যুপ’ (hot dilute soup) নামে। ১৯৩০ সালে তিনি রয়্যাল ইনস্টিটিউশনে শারীরবিদ্যা বিভাগে ‘ফুলেরিয়ান প্রফেসর’ (Fullerian Profeasor) পদে নিযুক্ত হন। ১৯৩৩ সালে তিনি জন ইনস সেন্টারের কাজ ছেড়ে দিয়ে লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজে বায়োমেট্রি বিভাগে প্রথম ‘ওয়েল্ডন প্রফেসর’ (weldon professor) হিসেবে কাজে যোগ দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বোমার হামলা থেকে বাঁচতে ১৯৪১ থেকে ১৯৪৪ সালের মধ্যে হ্যালডেন তাঁর দলকে নিয়ে হার্টফোর্ডশায়ারের রোথামস্টেড এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশনে তাঁর দলকে নিয়ে যান।

১৯৫৬ সালে হ্যালডেন লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ ছেড়ে দেন এবং ভারতে এসে কলকাতার ‘ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট’-এর বায়োমেট্রি বিভাগে কাজ শুরু করেন। হ্যালডেন ভারতে এসে কম খরচসাপেক্ষ গবেষণার প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি ভারতের একটি সাধারণ পাখি, হলুদ-গলা ল্যাপউইংকে (Vanellus malabaricus) পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তাছাড়াও তিনি দেখেছিলেন মটরের একটি প্রজাতি যার বৈজ্ঞানিক নাম Vigna sinensis, উদ্ভিদের জিনগত পরীক্ষার মডেল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। পুটুস গাছের (Lantana camara) পরাগমিলনের পদ্ধতি সম্পর্কেও তিনি গবেষণা করেছিলেন। ফুলের গঠনগত প্রতিসাম্য (floral symmetry) বিষয়েও তাঁর আগ্রহ ছিল। পরবর্তীকালে তিনি কলকাতা ছেড়ে ওড়িশায় চলে যান এবং ভুবনেশ্বরের বায়োমেট্রি বিভাগে কাজ শুরু করেন।

হ্যালডেন ভারতের নাগরিকত্বও গ্রহণ করেছিলেন। ধীরে ধীরে তিনি হিন্দুধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং নিরামিষ খাওয়া শুরু করেন। ১৯৬৩ সালে হ্যালডেন কয়েকটি বিজ্ঞান বিষয়ক সম্মেলনের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান। সেখানে গিয়ে তাঁর পেটে প্রচন্ড যন্ত্রণা শুরু হয়। তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে চলে যান এবং সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষার পর তাঁর পেটে ক্যান্সার ধরা পড়ে। ১৯৬৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর পেটে অস্ত্রোপচার হয়। সেটি সফল হলেও জুন মাসে ভারতে ফিরে আসার পর তাঁর শরীরে আবার ক্যান্সারের লক্ষণ দেখা দিতে থাকে। আগস্ট মাসে ভারতের ডাক্তাররা জানিয়ে দেন, হ্যালডেনের শরীরের অবস্থা একদম ভালো নয় এবং তিনি জীবনের শেষ সময়ে এসে গিয়েছেন।

সারাজীবনে গবেষণার পাশাপাশি হ্যালডেন অনেক বই লিখেছিলেন। তাঁর লেখা বিখ্যাত কয়েকটি বই হল ‘দ্য কজেস অফ ইভোলিউশন’, ‘পসিবল ওয়ার্ল্ডস অ্যান্ড আদার এসেস’, ‘মাই ফ্রেন্ড: মিস্টার লিকি’, ‘হোয়াট ইস লাইফ’, ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’, ‘এভরিথিং হ্যাজ আ হিস্ট্রি’, ‘ফ্যাক্ট অ্যান্ড ফেথ’ ইত্যাদি।

বিভিন্ন মূল্যবান গবেষণার জন্য হ্যালডেন অনেক পুরস্কার ও সম্মান লাভ করেছিলেন। রয়্যাল সোসাইটি তাঁকে ‘ফেলো’ হিসেবে নির্বাচন করেছিল। এই রয়্যাল সোসাইটির পক্ষ থেকেই হ্যালডেন ‘ডারউইন পদক’ অর্জন করেছিলেন। গ্রেট ব্রিটেনের ‘অ্যানথ্রোপলজিক্যাল ইনস্টিটিউট’ তাঁকে ‘হাক্সলে স্মৃতি পদক’ প্রদান করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স’ তাঁকে ‘কিম্বার পুরস্কার’-এ সম্মানিত করে। তিনি লন্ডনের ‘লিনিয়াস সোসাইটি’ প্রদত্ত সম্মানসূচক ‘ডারউইন-ওয়ালেস পদক’ লাভ করেছিলেন। অক্সফোর্ডের নিউ কলেজ তাঁকে সম্মানসূচক ‘ডক্টরেট’ উপাধি এবং সদস্যপদ দিয়ে সম্মানিত করেছিল।

১৯৬৪ সালের ১ ডিসেম্বর ৭২ বছর বয়সে ওড়িশার ভুবনেশ্বরে জে. বি. এস. হ্যালডেনের মৃত্যু হয়।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়