বাঙালির দ্বারা ব্যবসা হয় না, এটা এখন প্রায় প্রবাদবাক্যের মতো হয়ে গিয়েছে। অথচ এই বাঙালিরই হাতে গড়া বেশ কিছু জনপ্রিয় পণ্য আজও বাংলার ঘরে ঘরে শোভা পায়, কোনটা আবার বিশ্বের বাজারেও জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছে। তেমনই কালের নিয়মে কিছু জনমোহিনী দ্রব্যের চাহিদা কমলেও সেগুলির গুনমান এবং বাঙালির হৃদয়ে তাদের জন্য স্থানের অভাব কখনও হয়নি। সেসব পণ্যের ব্র্যান্ডভ্যালু আজও অমলিন। এই শেষোক্ত তালিকায় বাঙালির অতি পছন্দের জবাকুসুম তেল-কে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। চুলের যত্ন নেওয়ার তেল বলতেই একসময় বাঙালি বুঝত এই জবাকুসুম তেল। সম্পূর্ণ আয়ুর্বেদিক পদ্ধতিতে এই তেল প্রস্তুত করা হয়, ফলে এর ঔষধি ভেষজ গুণ চুলকে ভাল রাখে। জবাকুসুম তেল এবং তার কোম্পানির সঙ্গে জড়িয়ে আছে রঙিন ইতিহাস। ভারতের প্রথম চলচ্চিত্র-নির্মাতাদের মধ্যে একজন হিসেবে গণ্য করা হয় যাঁকে, সেই হীরালাল সেনের নামও জড়িয়ে রয়েছে জবাকুসুম তেলের সঙ্গে। বহু গৌরবময় ইতিহাস পেরিয়ে আসা এই পণ্য আজ আধুনিক চটকদারিত্বের সামনে ম্লান হয়ে পড়েছে।
চুল মানুষের সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তুলতে সহায়তা করে, ফলে চুলের যত্ন নিতে চান সকলেই, বিশেষত বলতে হয় নারীদের কথা। এই কারণেই বাজারে চুল ভাল রাখবার নানারকম সস্তা এবং দামী প্রসাধনী তেলের রমরমা। নানা গবেষণা এবং তার প্রয়োগের ফলে এখন এবিষয়ে সকলেই অবগত যে প্রকৃতির মধ্যেই এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা মাথার চুলের জন্য খুবই উপকারি। মানুষ জানে সেইসব প্রকৃতিপ্রসূত উপকরণগুলি চুল পড়া আটকায়, চুল বৃদ্ধিতেও সাহায্য করে। ফলে তৈল নির্মানকারী বাণিজ্যিক সংস্থাগুলি এখন মন দিয়েছে ভেষজ গুণসম্পন্ন তেল নির্মানের দিকে। সেইসব তেলের বিজ্ঞাপনে গুরুত্ব দেওয়া হয় এইসব প্রাকৃতিক উপাদানগুলিকেই।
এই ভেষজ উপকরণ সহযোগে প্রসাধনী তৈল নির্মাণের কাজ কিন্তু এক বাঙালিই শুরু করেছিলেন উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে। যে বাঙালির কথা এখানে বলা হচ্ছে তিনি সি কে সেন নামে পরিচিত। তাঁর সম্পূর্ণ নাম চন্দ্রকান্ত সেন (Chandra Kanta Sen)। তিনি ছিলেন বর্ধমানের কালনার বিশিষ্ট বৈদ্য পরিবারের সন্তান, যে-পরিবার ঐতিহ্যগতভাবে আয়ুর্বেদিক ঔষধের চর্চা করেছে৷ চন্দ্রকান্ত সেনের কাকা ছিলেন কবিরাজ বিনোদলাল সেন, যিনি নিজেও ‘কুন্তলবৃষ’ নামের একটি আয়ুর্বেদিক চুলের তেল তৈরি করেছিলেন, যা চুলবৃদ্ধিতে ও চুলের গুণমান বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং চুল ধুসর হয়ে যাওয়া আটকায়। এই বংশেরই একজন হয়ে আয়ুর্বেদ চর্চার পরিবেশে বড় হওয়ার ফলে চন্দ্রকান্তের মধ্যেও এবিষয়ে আগ্রহ তৈরি হয়। তিনি নিজের উদ্যোগে পারিবারিক ঐতিহ্যকে বজায় রেখে একটি স্বতন্ত্র ব্যবসা করতে চেয়েছিলেন। সেই উদ্দেশ্যেই বর্ধমান থেকে কলকাতায় চলে এসেছিলেন তিনি। আয়ুর্বেদিক পণ্যের বড় একটি বাজার তৈরি করতে চেয়েছিলেন চন্দ্রকান্ত। ১৮৭৮ সালে বাণিজ্যিকভাবে প্রকৃত আয়ুর্বেদিক পণ্য প্রচারের ধারণা নিয়ে কলকাতার চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউতে সিকে সেন অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড চালু করেছিলেন। নিজের পরিশ্রম ও মেধায় চন্দ্রকান্ত নিজেও একটি ভেষজ গুণসম্পন্ন চুলের তেল তৈরির কাজে লাগলেন। প্রাচীন সূত্র থেকে প্রাপ্ত ধারণা নিয়ে প্রধান উপকরণ হিসেবে জবাফুলকে বেছে নিয়েছিলেন তিনি যা চুলের জন্য অত্যন্ত উপকারি। জবাফুল ছাড়াও গাঁদা, ক্যাস্টর অয়েল, নারকেল তেল এবং অ্যালোভেরার মিশ্রণে জবাকুসুম তেল তৈরি হত। এই তেল বাজারে আসামাত্রই বাঙালির অত্যন্ত প্রিয় একটি পণ্যে পরিণত হয়েছিল। এতই প্রিয় হয়ে উঠেছিল যে একটা দীর্ঘসময় প্রসাধনী তৈলের কথা উঠলে জবাকুসুম তেলের কথাই হত। বাঙালি মেয়েরা চুলের সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং চুলকে সতেজ রাখবার জন্য জবাকুসুমকেই বেছে নিয়েছিল এবং এই তেল তাদের নিরাশ করেনি।
বেশ কিছু চমকপ্রদ ঘটনাও জড়িয়ে আছে জবাকুসুমের সঙ্গে যেগুলিকে আজ ঐতিহাসিক তকমা দেওয়া যায়। প্রথমত, জবাকুসুমের বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল বেঙ্গল গেজেটে। এই প্রথম কোনও হেয়ার অয়েলের বিজ্ঞাপন বেরোল এবং তাও ভারতের প্রধান একটি পত্রিকা যা ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হত। ১৭৮০ সালে এই পত্রিকার পথচলা শুরু হয়েছিল। এই ঘটনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে বৈকি।
স্বয়ং সত্যজিৎ রায়ের মতো মহান চিত্রশিল্পী ও চলচ্চিত্রকার এই তেলের বিজ্ঞাপন এঁকেছিলেন। পরবর্তীকালে রণেন আয়ন দত্তের মতো প্রথিতযশা শিল্পী জবাকুসুমের জন্য বিজ্ঞাপনের ছবি এঁকেছেন। এছাড়াও জবাকুসুম তেলের ব্র্যান্ডটিই হল এশিয়ায় প্রথম যার একটি বিজ্ঞাপনচিত্র তৈরি হয়েছিল, যেটির নির্মাণের নেপথ্যের প্রধান কান্ডারি ছিলেন হীরালাল সেন যাঁকে ভারতবর্ষের প্রথম চলচ্চিত্র-নির্মাতাদের একজন এবং বিখ্যাত ফোটোগ্রাফার হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। এই বিজ্ঞাপনচিত্রটি ১৯০৩ সালে নির্মিত হয়েছিল। সি.কে. সেনের আগরপাড়ার বাগানবাড়িতে এই চলচ্চিত্রটির শ্যুটিং হয়েছিল। জবাকুসুমের বিজ্ঞাপনে কৌশিক রায়কে দেখা যেত যা ভারতীয় টেলিভিশন জগতের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল। ১৯৮১ সালে বিখ্যাত চিত্রতারকা মুনমুন সেনকে জবাকুসুম তেলের বিজ্ঞাপনীচিত্রতে দেখা গিয়েছিল।
একসময় দাদাঠাকুরের ‘জঙ্গীপুর সংবাদ’ পত্রিকায় জবাকুসুম তেলের বিজ্ঞাপন ছাপা হয়েছিল। দাদাঠাকুর নিজে বেশ কয়েকটি আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন লিখে দিয়েছিলেন। একবার দাদাঠাকুরের চৌত্রিশ টাকার প্রয়োজন হওয়াতে তিনি সি.কে. সেনের কোম্পানির তৎকালীন পরিচালক বলাইচন্দ্র সেনের কাছে আগাম টাকাটি চেয়েছিলেন। বলাইবাবু তখন বলেছিলেন একটা বিজ্ঞাপন লিখে দিয়ে টাকাটি নিয়ে যান। তখন দাদাঠাকুর ছন্দে লেখা লম্বা একটি কবিতা লিখে দিয়েছিলেন। সেই কবিতার প্রথম চারটি লাইন হল, “আয়ুর্বেদ জলধিরে করিয়া মন্থন/ সুক্ষণে তুলিল এই মহামূল্য ধন/ বৈদ্যকুল ধুরন্ধর স্বীয় প্রতিভায়/ এর সমতুল্য তেল কি আছে ধরায়?” জবাকুসুমের হয়ে দাদাঠাকুরের বিজ্ঞাপন লেখার আরেক মজাদার ঘটনা রয়েছে। একবার সত্যব্রত সেনের বাড়ির দুর্গাপুজোয় অনেক জ্ঞানীগুণীর সমাবেশ হয়েছিল, সেখানে দাদাঠাকুরও ছিলেন। সেসময় সি.কে. সেনের কোম্পানির বলাইচন্দ্র হাতে দুটি ছবি নিয়ে এসে হাজির, জবাকুসুমের বিজ্ঞাপনের জন্য কোনও শিল্পীকে দিয়ে আঁকানো হয়েছে। একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে দুর্গাপ্রতিমার সামনে একটি মেয়ে জবাফুল দিয়ে অঞ্জলি দিচ্ছে এবং অন্যটিতে আয়না, চিরুণি ও জবাকুসুম তেলের শিশি নিয়ে এক নারী কেশচর্চায় মগ্ন রয়েছেন। ছবিদুটি হিতবাদী পত্রিকার সম্পাদক চন্দ্রোদয় বিদ্যাবিনোদের হাতে দিয়ে বলাইবাবু বিজ্ঞাপনের জন্য দুটি ক্যাপশন লিখে দিতে বললেন। চন্দ্রোদয়বাবু দাদাঠাকুরের দিকে এগিয়ে দিলেন এ-কাজের ভার। দাদাঠাকুর বললেন ‘এটি সাধনে জবাকুসুম আর ঐটি হল প্রসাধনে জবাকুসুম’। এমনই সব গৌরবময় ঐতিহ্য জবাকুসুম তেলটিকে ঘিরে রয়েছে। জবাকুসুমের জন্য ইংরেজি ভাষাতেও আকর্ষণীয় ট্যাগলাইন লেখা হয়েছে একসময়, যেমন—’টাইমস চেঞ্জ বাট নট দ্য ম্যাজিক অব সফট, হেলদি হেয়ার’, ‘বাই দ্য অ্যাপয়নমেন্ট টু দ্য প্রিনসেস অব ইন্ডিয়া’ ইত্যাাদি। এইসব ট্যাগলাইন সাধারণ মানুষকে ভীষণভাবে পণ্যটির প্রতি কৌতুহলী করে তুলেছিল।
জবাকুসুম হেয়ার অয়েল মূলত কালো বা সাদা শিশিতে থাকে এবং জবাফুলের ছবি আঁকা লাল কাগজ জড়ানো থাকে শিশিতে। এখন যদিও প্লাস্টিকের বোতলে এই তেল বিক্রি হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজারে আরও নানা প্রসাধনী কোম্পানি এসে হরেকরকম তেলের সম্ভার সাজিয়ে দিয়েছে মানুষের সামনে। প্রতিযোগিতা বেড়েছে, মানুষের সামনে চয়েস বেড়ে গেছে অনেক, ফলে ক্রমে জবাকুসুম তেলের চাহিদা কমেছে, তাঁর রমরমা ম্লান হয়েছে। যদিও জবাকুসুম তেল আজও বিভিন্ন প্রসাধনের বিপণী এবং অনলাইন মার্কেটিং-এর বিবিধ প্ল্যাটফর্মগুলিতে কিনতে পাওয়া যায়, কিন্তু অতীতদিনের সেই ঐশ্বর্য আজ অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


Leave a Reply to অজ্ঞাতনামাCancel reply