ইতিহাস

হীরালাল সেন

হীরালাল সেন (Hiralal Sen) একজন ভারতীয় বাঙালি চিত্র পরিচালক। ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনক হিসেবে দাদাসাহেব ফালকের নাম উচ্চারিত হলেও ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম প্রকৃত পথিকৃৎ ছিলেন হীরালাল সেন। কেবল ভারতীয় বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রই নয়, তিনি একাধারে ভারতের প্রথম বিজ্ঞাপনী ছবিরও নির্মাতা ছিলেন তিনি। ফোটোগ্রাফির চর্চা থেকে ক্রমশ বায়োস্কোপ দেখানোর নেশায় নিত্য নতুন চলমান ছবি তুলেছেন হীরালাল। বাংলা রঙ্গমঞ্চে অমরেন্দ্রনাথ দত্তের বিখ্যাত সব নাটকের ছবি তোলার সাথে সাথে একের পর এক বিজ্ঞাপনী ছবিও তুলেছেন তিনি। ভাগ্যের পরিহাসে তাঁর তোলা ছবি, ছবির রিল, ক্যামেরা এক বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে নষ্ট হয়ে যায়। হীরালাল সেনের বিখ্যাত সৃষ্টি ক্লাসিক থিয়েটারের ‘আলিবাবা’, সি. কে. সেনের জবাকুসুম তেলের বিজ্ঞাপনী ছবি এগুলি সবই আজ বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে। এমনকি ভারতের প্রথম রাজনৈতিক ছবির নির্মাতাও ছিলেন হীরালাল সেন।

আনুমানিক ১৮৬৮ সালে (মতান্তরে ১৮৬৯) সালের ২ আগস্ট অধুনা বাংলাদেশের মানিকগঞ্জ জেলার বাগজুরি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে হীরালাল সেনের জন্ম হয়। তাঁর বাবা জমিদারবংশীয় চন্দ্রমোহন সেন এবং তাঁর মা বিধুমুখী দেবীর আট সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন হীরালাল সেন। তাঁর ঠাকুরদা গোকুলকৃষ্ণ মুনশি সেকালের বিখ্যাত আইনজীবী ছিলেন। বিখ্যাত বাঙালি প্রাবন্ধিক-ঐতিহাসিক এবং সাহিত্য-সমালোচক ড. দীনেশচন্দ্র সেন ছিলেন সম্পর্কে হীরালালের পিসতুতো দাদা। বাংলাদেশে জন্ম হলেও তাঁর শৈশব কেটেছে কলকাতায়। শোনা যায়, ছেলেবেলায় বাংলাদেশে থাকাকালীন দীনেশচন্দ্র সেন বাড়িতে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে শাড়ির উপর নানারকম আলোছায়ার খেলা দেখাতেন হীরালাল ও তাঁর ভাই-বোনেদের আর সেই থেকেই হয়তো চলচ্চিত্র সম্পর্কে তাঁর আলাদা একটা অনুভূতির জগৎ তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

মানিকগঞ্জ মাইনর স্কুলেই হীরালাল সেনের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। ১৮৭৯ সালে মাইনর স্কুল থেকে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ভর্তি হন ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে। এরপর কলকাতায় এসে হীরালাল এখানকার ডাফ কলেজে ভর্তি হন উচ্চশিক্ষার জন্য। কিন্তু লেখাপড়ায় অমনোযোগী হীরালাল মাঠে মাঠে খেলে বেড়িয়ে আর ফোটোগ্রাফির নেশাতেই বহু সময় অতিবাহিত করেছেন।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


হীরালালের কর্মজীবন বহু ব্যাপ্ত এবং তা মূলত ফোটোগ্রাফি, চলচ্চিত্র-নির্মাণকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে। তিনি প্রথাগত কোনো চাকরি বা ব্যবসা না করলেও বায়োস্কোপ দেখানোর জন্য একটি কোম্পানি খুলে অর্থ উপার্জন শুরু করেছিলেন। গ্রামের বাড়িতে থাকাকালীন তাঁর ভাই মতিলাল সেনের সঙ্গে একত্রে ‘হীরালাল সেন অ্যাণ্ড ব্রাদার্স’ নামে একটি ফোটগ্রাফির ব্যবসা শুরু করেছিলেন তিনি। বোর্ন অ্যাণ্ড শেফার্ড কোম্পানির ফোটোগ্রাফি প্রতিযোগিতায় হীরালালের তোলা স্থিরচিত্র প্রথম স্থান অধিকার করায় সাহেবরাও সেসময় অবাক হয়েছিলেন কীভাবে একজন নেটিভের পক্ষে সাহেবদের থেকে বেশি ভালো ছবি তোলা সম্ভব। তাই হীরালালকে ওই ছবিটি আবার তুলে প্রমাণ দিতে হয়েছিল এটি সত্যিই তাঁর তোলা। ১৮৮৭ থেকে ১৮৯৮ সালের মধ্যে ফোটোগ্রাফিতে হীরালাল সাতবার স্বর্ণপদক লাভ করেন। ফোটোগ্রাফিতে হাত পাকানোর পর তিনি ঠিক করেন বায়োস্কোপ বানানো শিখবেন। বায়োস্কোপ বানানো শেখার জন্য তিনি স্টিফেন্স সাহেবের কাছে যান। স্টিফেন্সের কাছ থেকে অনেক সাধ্য-সাধনা করে ক্যামেরায় চলমান ছবি তোলা শিখে ফেলেন হীরালাল সেন। স্টিভেনসনের ক্যামেরাতেই হীরালাল প্রথম চলমান ছবি তোলেন যার নাম ‘এ ড্যান্সিং সিন ফ্রম দ্য অপেরা, দ্য ফ্লাওয়ার অফ পার্সিয়া’। স্টার থিয়েটারে এই স্টিভেনসন সাহেব বায়োস্কোপ দেখাতেন। ১৮৯৮ সালের ১০ ডিসেম্বর সেই স্টার থিয়েটারেই ‘সতী কি কলঙ্কিনী’ নাটকের সঙ্গে হীরালাল সেনের তোলা ছবি বায়োস্কোপের মতো দেখানোয় সমগ্র বাংলায় আলোড়ন পড়ে গেল। জানা যায়, মায়ের কাছ থেকে সেকালে হাজার পাঁচেক টাকা চেয়ে নিয়ে শুধুমাত্র ছবি তুলবেন বলে লণ্ডনের জন বেঞ্চ কোম্পানি থেকে মুভি ক্যামেরা কিনেছিলেন হীরালাল সেন।

এরপর ১৮৯৭ সালে কলকাতার ইডেন গার্ডেন এবং হাওড়া স্টেশনেই একমাত্র বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল। চলমান ছবি দেখানোর জন্য সে সময়ে ইলেকট্রিক আর্কল্যাম্প বা লাইম লাইটের দরকার হত। লাইম লাইটের জন্য অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন গ্যাসের প্রয়োজন। হীরালাল হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন গ্যাস ভরার রবার ব্যাগ জোগাড় করলেন কিন্তু সেই ব্যাগ ফেটে গিয়ে বিপত্তি ঘটে। তখন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের ফাদার লাফোঁর পরামর্শে তিনি প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা করেন তাঁর তৈরি চলচ্চিত্র দেখানোর জন্য। ১৮৯৮ সালেই ভাই মতিলাল সেন, বোনপো কুমারশঙ্কর গুপ্তকে সঙ্গে নিয়ে ‘রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি’ গড়ে তোলেন হীরালাল সেন। ভারতের প্রথম চলচ্চিত্র কোম্পানি হিসেবে রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানির নাম ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে। এই কোম্পানিতে থেকেই একের পর এক ছবি বিখ্যাত সব ছবি তুলতে থাকেন হীরালাল।

১৯০০ সাল থেকে তাঁর পেশাদারিত্বের সঙ্গে চিত্রগ্রহণ শুরু হয়। ১৯০০ সালে নিজের গ্রামে ভাইদের সঙ্গে পুকুরে স্নানের দৃশ্য, পরে ‘কোটের খেলা’ নামে দুটি ট্রিক ছবি তোলেন হীরালাল সেন। ১৯০১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি (মতান্তরে ৮ ফেব্রুয়ারি) মিনার্ভা থিয়েটার ভাড়া নিয়ে তাঁর ক্যামেরায় তোলা সেকালের থিয়েটারে বিখ্যাত কয়েকটি নাটকের খণ্ডদৃশ্য বায়োস্কোপে দেখান হীরালাল সেন আর এর ফলেই সারা কলকাতা জুড়ে তাঁকে নিয়ে শোরগোল পড়ে যায়। বাংলা নির্বাক চলচ্চিত্রের সূচনা লগ্নে সেদিন মিনার্ভা থিয়েটারে হীরালালের দেখানো ‘আলিবাবা’, ‘ভ্রমর’, ‘বুদ্ধ’, ‘সরলা’, ‘দোললীলা’, ‘হরিরাজ’ আর ‘সীতারাম’ ছবিগুলি বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্বের দাবিদার। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে চলমান ছবিতে চিত্রগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রথম টিল্ট, প্যান, ক্লোজআপ শট ইত্যাদি আধুনিক পদ্ধতির ব্যবহার করেছিলেন হীরালাল তাঁর ‘আলিবাবা ও চল্লিশ চোর’ ছবিতে। এটি আসলে পূর্ণদৈর্ঘ্যের একটি নাটক যা ১৯০৪ সালে ক্লাসিক থিয়েটারে প্রথম দেখানো হয়। তারপর তিনি আরো তিনটি ছবি বানান যথাক্রমে – ইয়ং ভ্যাগাবণ্ড, ফিশারম্যান এবং পিক পকেট। হীরালাল সেনের সবথেকে বড়ো কৃতিত্ব হল ভারতের প্রথম রাজনৈতিক তথ্যচিত্র নির্মাণ। ১৯০৫ সাল নাগাদ বাংলার গভর্নর লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা করলে তার প্রতিবাদে একটি জনসমাবেশে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বক্তব্য রাখছিলেন আর হীরালাল সেই ছবি তুলে রাখেন নিজের ক্যামেরায়। তৎকালীন কলকাতার ট্রেজারি বিল্ডিং-এর ছাদ থেকে এই বক্তব্যের ছবি তুলে তিনিই বোধহয় প্রথম চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে এরিয়াল শটের প্রয়োগ করেছিলেন।

ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে এত বহুমুখী অবদানের জন্য কোনো স্বীকৃতিই তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। বিজ্ঞাপনের জন্যেও তিনি বেশ কিছু ছবি তুলেছিলেন যার মধ্যে সি. কে. সেনের জবা-কুসুম কেশ তৈল, বটকৃষ্ণ পালের ‘এডওয়ার্ডস অ্যান্টিম্যালেরিয়া স্পেসিফিক’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। সেসময় পারসি জামসেদজি ম্যাডান কলকাতায় বায়োস্কোপ দেখাতে আসেন এবং শোনা যায় হীরালালের তোলা ছবিও নাকি বিদেশি ছবি বলে ম্যাডান তাঁর বায়োস্কোপের তাঁবুতে দেখাতেন। ফলে রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যাডানের দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। ১৯০৩ সালে হীরালালের বোনপো কুমারশঙ্কর গুপ্ত ‘লণ্ডন বায়োস্কোপ’ নামে আলাদা একটি কোম্পানি খুললে হীরালালের অবস্থা সঙ্গীন হতে শুরু করে। অন্যদিকে তাঁর নিজের ভাই মতিলালের সঙ্গেও বিবাদ বাধে। হীরালালের বানানো সব চলচ্চিত্রের সংগ্রহ ছিল মতিলালের কাছেই যা দিয়ে মতিলাল এম. এল. সেন বায়োস্কোপ নামে পৃথক কোম্পানি খোলেন। পরে রামলাল দত্ত নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে একত্রে জোড়াসাকোঁয় শো-হাউস নামে আরেকটি কোম্পানি চালু করেন হীরালাল কিন্তু রাম দত্তের প্রতারণায় সেই কোম্পানিও হীরালালের রইলো না, রাম দত্ত তাঁকে ঠকিয়ে কোম্পানি নিজের নামে করে নেন। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার সময় নিজের দুটি প্রিয় ক্যামেরা কলকাতার আংটি মল্লিক অর্থাৎ পান্না মল্লিকের কাছে বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন হীরালাল সেন। শেষজীবনে ধনী ব্যক্তিদের ফোটোগ্রাফ থেকে ছবি এঁকে দেওয়া, বিভিন্ন দেব-দেবীর ছবি আঁকার কাজ করতেন তিনি। আর এই সময়েই এক বিপত্তি ঘটে হীরালালের সব স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দেয়। ১৯১৭ সালের ২৪ অক্টোবর মতিলাল সেনের রায়বাগানের বাড়ির গুদামে আগুন লেগে হীরালাল সেনের সব চলচ্চিত্রের রেকর্ড, রিল সব পুড়ে যায়। তবে অন্য তথ্য অনুসারে হীরালালের কিছু ছবি, লেন্স, ক্যামেরা ইত্যাদি গচ্ছিত ছিল পুত্র বৈদ্যনাথ সেনের কাছে। অনেক পরে তাও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

হীরালাল সেনের তোলা চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘বধূ’ , ‘দুটি প্রাণ’, ‘সোনার স্বপন’, ‘চাবুক’, ‘গুপ্তকথা’, ‘দলিতা ফণিনী’, ‘ফটিকজল’ ইত্যাদির নাম তেমন শোনা যায় না। আবার কয়েকটি অতি মনোরম তথ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন তিনি যার মধ্যে গঙ্গার ঘাটের ছবি, চিতপুর রোডে চলমান দৃশ্য, রাজেন্দ্র মল্লিকের বাড়ির বিবাহ-উৎসব ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

সরকারি তরফে সেভাবে পুরস্কারের স্বীকৃতি না মিললেও বহু রাজা-মহারাজার দরবারে ছবি দেখিয়ে পুরস্কৃত হয়েছিলেন হীরালাল সেন। ১৯০১ সালে মোহন মেলায় তিনি স্বর্ণপদক লাভ করেন এবং পরের বছর ১৯০২ সালে স্বর্ণপদক পান নিখিল ভারত শিল্প প্রদর্শনীতে ছবি দেখানোর জন্য। এই সামান্য পুরস্কারই তাঁর সারা জীবনের স্বীকৃতি।

১৯১৭ সালের ২৬ অক্টোবর হীরালাল সেনের মৃত্যু হয়।

তথ্যসূত্র


  1. বাংলা সাহিত্য ও বাংলা চলচ্চিত্র, নিশীথকুমার  মুখোপাধ্যায়,নাভানা, মে ১৯৫৯, পৃ- ৩৪-৩৮
  2. http://www.bongblogger.com/
  3. https://www.anandabazar.com/
  4. https://www.bongodorshon.com/

1 Comment

1 Comment

  1. Pingback: দীনেশচন্দ্র সেন | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য